মঙ্গলবার, নভেম্বর ২১, ২০১৭
হোম > লেকচার অনুবাদ > আগামী দিনের ইসলাম (পর্ব-৩)

আগামী দিনের ইসলাম (পর্ব-৩)

এডিটর’স নোট:

ড. তারিক সোয়াইদান আরব বিশ্বের খ্যাতিমান একজন স্কলার ও বক্তা। ২০০৪ সালে অস্ট্রেলিয়ায় শিক্ষার্থীদের এক প্রোগ্রামে ‘দ্যা ফিউচার অব ইসলাম’ শিরোনামে তিনি একটি বক্তৃতা করেন। বলা যায়, ইসলাম সম্পর্কে এটি একটি কম্প্রেহেনসিভ আলোচনা। প্রথমে তিনি বিশ্বসভ্যতাগুলোর উত্থান-পতনের কারণগুলো আলোচনা করেছেন। তারপর ইসলামের আগমন, উত্থান ও পরবর্তীতে খেলাফতের পতনের কারণ আলোচনা করেছেন। সবশেষে, আগামী দিনে ইসলাম কীভাবে পুনরায় বিশ্বসভ্যতা হিসেবে পৃথিবীকে নেতৃত্ব দেবে, তার রূপরেখা ব্যক্ত করেছেন।

সিএসসিএস-এর পাঠকদের জন্য লেকচারটি ইংরেজিতে অনুলিখন ও বাংলায় অনুবাদ করেছেন মো: হাবিবুর রহমান হাবীব।


প্রথম পর্ব | দ্বিতীয় পর্ব | শেষ পর্ব


মুসলিম সভ্যতার পতনের যুগ

রোমান, পারস্য ও স্প্যানিশ সভ্যতা নিয়ে আলোচনার সময় আমরা দেখেছি, সাফল্যের সর্বোচ্চ শিখরে পৌঁছতে এসব সভ্যতার শত শত বছর লেগে গিয়েছিল। অথচ মুসলমানদের লেগেছে একশ বছরেরও কম। 

সময় থাকলে আরো বিস্তারিত বলা যেতো। কিন্তু সময় খুব কম থাকায় সংক্ষেপে বলে যাওয়ার চেষ্টা করবো

সর্বোচ্চ শিখরে আরোহণ

যাই হোক, ইসলাম ক্রমান্বয়ে সাফল্যের দিকে যেতে থাকে। বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে মুসলমানরা ছড়িয়ে পড়ে। সভ্যতাও আরো বৃহৎ পরিসরে গড়ে ওঠতে থাকে। ইউরোপে যখন অন্ধকার যুগ চলছিল, মুসলমানরা তখন ছিল যথেষ্ট সৃজনশীল। চিকিৎসাশাস্ত্রে তারা নতুন দিগন্তের উন্মোচন করে। মুসলমানরা ছাড়া সত্যিকার অর্থে চিকিৎসাশাস্ত্রের সূচনাও হয়নি। গণিতেও আমাদের ব্যাপক অবদান রয়েছে। শূন্য (০) সংখ্যাটি উদ্ভাবনের ফলে গোটা বিশ্বই হঠাৎ পরিবর্তিত হয়ে যায়। এভাবে জীবনের সকল ক্ষেত্রে মুসলমানরা সর্বোচ্চ শিখরে পৌঁছে যায়। যতদিন তারা জিহাদ অব্যাহত রাখে ততদিন পর্যন্ত এ অবস্থা চলতে থাকে।

সামাজিক অবক্ষয়

কিন্তু এক সময় তারা জিহাদ থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়। মুসলিম শাসকেরা দুনিয়ার চাকচিক্যে মোহগ্রস্ত হয়ে পড়ে। দাসী, গানবাজনা, বিভিন্ন ধরনের খাবার-দাবার নিয়ে তারা মত্ত হয়ে পড়ে। তাদের কেউ কেউ তো একটা মুকুটের পেছনেই এক হাজার স্বর্ণমুদ্রা পর্যন্ত ব্যয় করত।

তারা ছিল যথেষ্ট ধনী এবং ক্ষমতাবান। তাদেরকে চ্যালেঞ্জ করার মতো কেউ ছিল না। তাদের ছিল শক্তিশালী সেনাবাহিনী এবং সবচেয়ে উন্নত সভ্যতা। এক পর্যায়ে তারা বিশ্বকে নেতৃত্ব দেয়ার পরিবর্তে আয়েশী জীবন বেছে নিলো। তারা কর্তব্য ভুলে গিয়ে নিজেদের নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়লো।

জিহাদ নিয়ে একটি গল্প

ইসলামের শত্রুরা মুসলিম অঞ্চলের এসব পরিস্থিতির খোঁজ-খবর রাখতো। তাদের নজরদারি নিয়ে স্পেনের একটি গল্প বলি। তৎকালীন স্পেন এবং দক্ষিণ ফ্রান্স ছিল মুসলমানদের দখলে। ফ্রান্স তখনো শক্তিশালী ছিল। স্পেন ফিরে পাওয়ার জন্য তারা চেষ্টা করে যাচ্ছিল। তাই মুসলমানদের উপর আক্রমণের পরিকল্পনার লক্ষ্যে ফরাসি নেতৃবৃন্দ স্পেনের পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করতে গুপ্তচর পাঠাতো। তারা পাহাড় পেরিয়ে সীমান্তবর্তী গ্রামগুলোতে আসা-যাওয়া করতো। এভাবে মুসলমানদের পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করতো। গল্পটা ছিল এ রকম–

ফরাসি নেতৃবৃন্দ কয়েকজন গুপ্তচর পাঠালেন। তারা সীমান্ত পেরিয়ে দেখলো, ১৬ বছরের একটি ছেলে কাঁদছে। একেবারে মেয়েদের মতো কান্না। তারা ছেলেটিকে জিজ্ঞেস করলো, বাবা, তুমি কাঁদছো কেন? ছেলেটি বললো, কোরআনের হাফেজ না হওয়া পর্যন্ত আমার মা আমাকে সেনাবাহিনীতে যোগ দিতে দিচ্ছেন না। কিন্তু আমি এখনই সেনাবাহিনীতে যোগ দিতে চাই। আমি এখনই জিহাদ করতে চাই।

খেয়াল করেছেন! ইন্টারনেট একসেস পাওয়া, বা একটি দামি গাড়ির জন্য কিন্তু তারা কাঁদতো না!

যা হোক, গুপ্তচররা ফিরে গিয়ে তাদের নেতৃবৃন্দকে এ ঘটনা জানালো। সব শুনে তাদের সম্রাট বললেন, এ রকম একটি মরণপণ জাতিকে আক্রমণ করা যায় না।

ত্রিশ বছর পর আরেকজন গুপ্তচরকে পাঠানো হলো। সীমানা পেরিয়ে সে দেখতে পেলো ১৬ বছরের একটি ছেলে কাঁদছে। সে জিজ্ঞেস করলা, বাবা, তুমি কাঁদছো কেন? ছেলেটি জবাব দিলো, আমার মা আমাকে একটি দাসী কেনার অনুমতি দিচ্ছেন না। সব শুনে তাদের নেতৃবৃন্দ বললো, হ্যাঁ, এবার আমরা আক্রমণ করতে পারি। তারপর তারা ঠিকই আক্রমণ চালিয়ে স্পেনের উত্তরাঞ্চল দখল করে নিলো।

এ ঘটনা থেকে বুঝা যায়, কম বয়সী ছেলেমেয়েরা কীভাবে বেড়ে ওঠছে, তা খুব গুরুত্বপূর্ণ। তারা কিসে আকৃষ্ট হয়, তাদের মন কিসে আচ্ছন্ন– এসবের উপর নির্ভর করছে আগামী দিনের ইসলাম। বৃদ্ধরা নয়, বরং এখনকার তরুণ প্রজন্ম, অর্থাৎ, আমাদের সন্তানদের আগ্রহ কোনদিকে, তারা কী নিয়ে ভাবে, তাদের জীবনের লক্ষ্য কী, তাদের উচ্চাকাঙ্খা কি নারী ও মেয়ে নাকি জিহাদ ও কোরআন– এসবই নির্ণায়ক ভূমিকা পালন করবে।



ক্রুসেডের মহড়া

ক্রুসেডাররা যখন দেখলো মুসলমানরা দুর্বল হয়ে পড়েছে, দুনিয়াবি বিষয়-আশয় নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়েছে, তখন তারা জেরুসালেম পুনর্দখলের জন্য ইউরোপকে ঐক্যবদ্ধ করল। সাতটি দেশ সম্মিলিতভাবে মুসলমানদের উপর আক্রমণের সিদ্ধান্ত নিলো। ফ্রান্স, ব্রিটেন ও জার্মানি– এই তিন দেশের তিন রাজা স্বয়ং সেনাবাহিনীর নেতৃত্ব দিলেন।

ফিলিস্তিন দখলের জন্য ইউরোপ থেকে কত সংখ্যক সৈন্য পাঠানো হয়েছিল, তা জানেন? জেরুসালেম দখলের জন্য পাঁচ লক্ষ সেনা পাঠানো হয়েছিল। শহরের উত্তর দিক ও সমুদ্র পথে তাদেরকে পাঠানো হয়েছিল। এবং তারা জয়লাভ করেছিল। সে এক দীর্ঘ ইতিহাস। আমার লেখা ‘তারিখ আল-কুদ্স ওয়া ফিলিস্তিন’ (জেরুসালেম ও ফিলিস্তিনের ইতিহাস) শিরোনামের গ্রন্থে এ সংক্রান্ত বিস্তারিত বর্ণনা দিয়েছি।

আনতাকিয়ার ট্রাজেডি

আমরা কেন পরাজিত হয়েছিলাম, সে বিষয়ে ছোট্ট একটি  ঘটনা বলি। জার্মান সেনাবাহিনী তুরস্ক এবং সিরিয়ার উত্তরাঞ্চল হয়ে আনতাকিয়া শহরে পৌঁছে যায়। আনতাকিয়া চারদিক থেকেই স্থলবেষ্টিত একটি শহর। মাত্র একদিকে (নদী পথে) সাগরের সাথে শহরটির সংযোগ রয়েছে।

তখনো শহরটির পতন হয়নি। আর আনতাকিয়ার নিয়ন্ত্রণ নিতে না পারলে জার্মান বাহিনীর পক্ষে জেরুসালেম দখল করা সম্ভব নয়। কারণ, আনতাকিয়ার উপর দিয়েই জেরুসালেম যেতে হয়। আনতাকিয়ার মুসলমানরা ছয় মাস পর্যন্ত প্রতিরোধ যুদ্ধ চালিয়ে গেলেন। তাদের অর্থ, খাদ্য এবং অস্ত্রের খুব প্রয়োজন ছিল। কিন্তু কেউ তাদের কাছে এসব সাহায্য নিয়ে যায়নি।

তখন আনতাকিয়ার কাছাকাছি মুসলমানদের সবচেয়ে শক্তিশালী অঞ্চল ছিল মিশর। তাই আনতাকিয়া থেকে দ্রুতগামী নৌযানে করে একটি প্রতিনিধি দল মিশরে পাঠানো হলো। প্রতিনিধি দলটি মিশরের শাসকের সাথে দেখা করে জরুরি ভিত্তিতে সাহায্য পাঠানোর অনুরোধ করলো।

ফলে মিশরীয় শাসক তাদের সাথে করে নিজের একটি প্রতিনিধি দল পাঠালেন। তারা আনতাকিয়ার নেতৃবৃন্দের সাথে দেখা করলো। কিন্তু তাদের সাথে কথা বলে আনতাকিয়ার নেতৃবৃন্দ আশ্চর্য হয়ে গেলেন। কারণ, অর্থ, অস্ত্র বা খাদ্য পাঠানোর ব্যাপারে মিশরীয় শাসকের কোনো ভাবনাই ছিল না। দেখা গেলো, মিশরীয় প্রতিনিধি দল পাঠানোর মূলত দুটি কারণ ছিল। প্রতিনিধি দলের মাধ্যমে মিশরীয় শাসক জানিয়েছেন– আমি শুনেছি, আনতাকিয়ায় একজন অপূর্ব সুন্দরী দাসী রয়েছে। আমি তাকে কিনতে চাই। এছাড়া আমি একজন খুব ভালো মানের আর্টিস্টের কথা শুনেছিলাম। তাকে আমি নিয়োগ দিতে চাই। মিশরীয় শাসকের এই চিঠি যখন আনতাকিয়ার নেতৃবৃন্দের  হাতে পৌঁছে, তখন তারা পরাজয় মেনে নেয়ার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। এভাবেই শহরটির পতন ঘটে।

দখলদারিত্বের নিরানব্বই বছর

একই ঘটনা বর্তমানে ফিলিস্তিনের সাথে ঘটছে। সেখানকার মুসলমানরা যখন চিৎকার করে বলছে, আমাদেরকে হত্যা করা হচ্ছে। মুসলমানরা তখন এই চিৎকারে ভ্রুক্ষেপ না করে মুভি দেখায় ব্যস্ত রয়েছে। তখনো যা হয়েছিল, এখনও তা হচ্ছে। তাই, পতনই অনিবার্য হয়ে দাঁড়িয়েছে।

বিভিন্ন সময়ে প্রায় নিরানব্বই বছর ফিলিস্তিন তাদের দখলে ছিল। প্রথমবার ৮৮ বছর তাদের দখলে থাকার পর জেরুসালেম আমাদের দখলে ফিরে আসে। তারপর তাদের দখলে ১০ বছর থাকার পর আমরা পুনর্দখল করি। তৃতীয়বারের মতো তারা আবার তা দখল করে এবং এক বছর পর আমরা পুনরায় তা পুনর্দখল করি। এই নিরানব্বই বছর তখনকার মুসলমানরা তাদের লড়াই চালিয়ে যায়। এখনকার মতো সমঝোতা করার জন্য হোটেলে আলোচনায় না বসে তারা জিহাদ চালিয়ে গিয়েছিল।

ইসলামী সভ্যতার পুনর্জাগরণ

জেরুজালেম ও ফিলিস্তিন মুসলমানরা কীভাবে ফিরে পেয়েছিল? এক্ষেত্রে আমরা সবাই সালাহ উদ্দীন আইয়ুবীর অবদানের কথা জানি। কিন্তু তিনি কোথাকার মানুষ, আমরা সাধারণত তা জানি না। হঠাৎ একজন মানুষের আবির্ভাব ঘটলো, আর অমনি মুসলিম উম্মাহর চেতনা ফিরে আসলো! – ব্যাপারটি মোটেও তেমন ছিল না।

আলেমদের ভূমিকা

সালাহ উদ্দিনের আগমনের প্রায় শতাব্দীকাল আগে দুজন মনীষী ছিলেন। এদের একজন ছিলেন আবু হামিদ আল গাজালী, আর অপরজন আবু বকর আত-তুরতুসি। দুজনই ইসলামের অন্যতম মহান আলেম ছিলেন। এই মনীষীগণ নিছক বইপত্র নিয়ে জীবন কাটিয়ে দেননি। মুসলিম উম্মাহর কল্যাণ সাধনেও তাঁরা ব্যস্ত ছিলেন। ক্রুসেডাররা আসার বহু আগেই তাঁরা খেয়াল করলেন, উম্মাহ দুর্বল হয়ে পড়ছে। তখনই তাঁদের আশংকা ছিল, শত্রুরা হয়তো শীঘ্রই আক্রমণ করবে।

তাই তাঁরা বাগদাদের আব্বাসীয় খলিফার কাছে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলেন। চলমান পরিস্থিতির উত্তরণ এবং জিহাদ ঘোষণা করার জন্য তাঁরা খলিফাকে অনুরোধ জানালেন। খলিফা জবাব দিলেন, আমি আপনাদের সাথে আছি। আমরা এগুলো বাস্তবায়ন করবো। তারপর তিনি আবার দাসীদের নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়লেন। কোনো পদক্ষেপই আর নিলেন না।

দিনের পর দিন তাঁরা শুধু এ ধরনের প্রতিশ্রুতিই শুনে আসছিলেন। যা ছিল নিছক কথার কথা এবং মিথ্যা প্রচারণা মাত্র। যেমন একদিন মসজিদে দাঁড়িয়ে খলিফা বললেন, আমাদের অবশ্যই জিহাদের ডাক দেয়া দরকার।

কিন্তু কে দেবে জিহাদের ডাক? এই দায়িত্ব তো তার নিজেরই! কিন্তু তিনি কিছুই করলেন না।

অবশেষে তুরতুসি এবং গাজালী বুঝতে পারলেন এসব নেতৃত্বের উপর কোনো ভরসা নেই। এসব কথার ফুলঝুরির চেয়েও  কাজের কাজ করা জরুরি।

প্রিয় ভাই ও বোনেরা! আমি অনেক সময় নিয়ে ফেলছি, এ জন্য দুঃখিত। আমি আপনাদেরকে ইতিহাস শোনাচ্ছি, বারংবার যার পুনরাবৃত্তি ঘটে। আপনারা যদি  ইতিহাস বুঝতে না পারেন, তাহলে বর্তমানের ও ভবিষ্যতের ঘটনাপ্রবাহ ধরতে পারবেন না।

যা হোক, এই মনীষীগণ ছিলেন সত্যিকারের আলেম। তারা নিছক তাদের পদমর্যাদা, বেতনভাতা কিংবা বইপুস্তক নিয়ে পড়ে না থেকে উম্মাহর ব্যাপারেও সচেতন ছিলেন। উম্মাহর জন্য জরুরি উদ্যোগগুলো তারা নিজেরাই গ্রহণ করার সিদ্ধান্ত নিলেন।

হারাকাত ইয়াহইয়া আদ-দ্বীন

এই দুজন মনীষী মিলে অন্যান্য আলেমদের ঐক্যবদ্ধ করলেন এবং  মুসলমানদেরকে ইসলামের প্রকৃত শিক্ষায় শিক্ষিত করে তুলতে শুরু করলেন। এক্ষেত্রে তরুণ নারী-পুরুষদেরকে তারা বেশি গুরুত্ব দিতেন। তাদের এই আন্দোলন ‘হারাকাত ইয়াহইয়া আদ-দ্বীন’ নামে পরিচিত। এর অর্থ ইসলামের পুনর্জাগরণ আন্দোলন। এই আন্দোলনের উদ্দেশ্য ছিল মুসলমানদের হৃদয়ে ইসলামের পুনর্জাগরণ ঘটানো। বলাবাহুল্য, তারা এতে সফল হয়েছিলেন।

দ্রুত এই আন্দোলন ছড়িয়ে পড়তে লাগলো। কোনো কোনো শহরে অন্য শহরগুলোর তুলনায় এটি অধিক ফলপ্রসূ হয়েছিল। ইসলামের জন্য কর্মরত কোনো কোনো কর্মী অন্যদের তুলনায় বেশি আন্তরিক ও কঠোর পরিশ্রমী ছিলেন।

দেখুন, ইসলাম যদিও আল্লাহ তায়ালার মনোনীত জীবন ব্যবস্থা, তাই আল্লাহ চাইলে বলতে পারতেন– হয়ে যাও। এর ফলে ইসলাম বিজয়ী হয়ে যেতো এবং গোটা বিশ্ব জয় করে ফেলতে পারতো। কিন্তু ইসলাম কখনোই এই পদ্ধতিতে কাজ  করেনি। আপনাকে অবশ্যই সংগ্রাম করতে হবে,  যুদ্ধ করতে হবে, অনুগত হতে হবে। খন্দকের মতো আপনাকে চতুর্দিক থেকে শত্রুরা ঘিরে ফেলবে, কিংবা উহুদের মতো আপনি পরাজিত হবেন। তারপরও আপনাকে ইসলামের কাজ চালিয়ে যেতে  হবে। মহানবী (সা) স্বয়ং আহত ও রক্তাক্ত হয়েছিলেন। কেন? কারণ, এটাই ইসলামের পথ। ইসলাম প্রতিষ্ঠা করতে চাইলে আমাদেরকে অবশ্যই কষ্ট করতে হবে। ইসলাম নিজে থেকেই প্রতিষ্ঠিত হয়ে যাবে না। নিছক দোয়ার মাধ্যমেও ইসলামের সফলতা আসবে না। যদিও দোয়া গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু এটাই যথেষ্ট নয়। ইসলাম প্রতিষ্ঠার জন্য আমাদেরকে অবশ্যই প্রচেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে এবং কাজ করতে হবে।

ইমাদ উদ্দীন জঙ্গী

ইরাকের কুর্দিস্তানের মসুল শহরে ‘হারাকাত ইয়াহইয়া আদ-দ্বীনের’ ব্যাপক প্রভাব সৃষ্টি হয়। উত্তর ইরাকের ওই শহর এবং আশপাশের এলাকা একটি রাজকীয় পরিবার শাসন করতো। সেই রাজকীয় পরিবারের নেতৃত্ব দিতেন ইমাদ উদ্দীন জঙ্গী। তাঁর সম্পর্কে আপনারা কারা কারা জানেন?

ইমাদ উদ্দীন জঙ্গী সালাহ উদ্দিনের চেয়েও বড় মাপের ব্যক্তিত্ব ছিলেন। তিনি জিহাদ ঘোষণা করলেন। ওই পরিস্থিতিতে তিনিই ছিলেন প্রথম মুসলিম শাসক, যিনি ক্রুসেডারদের বিরুদ্ধে জিহাদের ঘোষণা দেন। তার একটি ছোট সেনাবাহিনী ছিল। তখন বাগদাদের আব্বাসীয় খেলাফত এবং কায়রোর ফাতেমীয় খেলাফতে অধীনে ছিল সুবিশাল সেনাবাহিনী। তাছাড়া, ইমাদ উদ্দীন জঙ্গীর মসুল শহরটি ছিল খুবই ছোট। যা আমাদেরকে মদীনার কথা মনে করিয়ে দেয়।

তিনি তার আশপাশের মুসলিম শাসকদের কাছে প্রতিনিধি দল পাঠিয়ে আহবান জানালেন, আসুন ঐক্যবদ্ধ হই এবং ফিলিস্তিনে ক্রুসেডারদের বিরুদ্ধে লড়াই করি। সেইসব শাসকেরাও নিজেদের প্রতিনিধি দল পাঠিয়ে আশ্বস্ত করলেন। কিন্তু বাস্তবে কিছুই করলেন না।

তখনকার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শহর দামেস্কে প্রতিনিধি দল পাঠিয়ে সেখানকার শাসকের নিকট তিনি বার্তা পাঠালেন, দামেস্ক মুসলের সাথে যোগ দিলে দুই বাহিনী মিলে একটি শক্তিশালী সেনাবাহিনী তৈরি হবে। ফলে ক্রুসেডারদেরকে পাল্টা আক্রমণ করা যাবে। কিন্তু দামেস্কের শাসক মনে করলেন, ইমাদ উদ্দীন তার জন্য হুমকি হয়ে ওঠতে পারে। তাই তিনি খ্রিস্টান ক্রুসেডারদের কাছে প্রতিনিধি দল পাঠিয়ে দামেস্কের সাথে শান্তিচুক্তি এবং ইমাদ উদ্দীনের বিরুদ্ধে জোট গড়ে তোলার প্রস্তাব দিলেন।

এ খবর জানতে পেরে দামেস্কের জনগণ ফুঁসে উঠতে শুরু করলো। তারা ছিল ভালো মুসলমান। তারা তাদের শাসকের কার্যক্রম মেনে নিতে পারল না। কিন্তু তাদের শাসক ছিলেন স্বৈরচারী। তিনি তাদের দমিয়ে রাখলেন। তাই জনগণ প্রকাশ্যে কিছু করতে পারছিল না। কিন্তু গোপনে তারা ইমাদ উদ্দীনকে জানিয়ে দিলো, আমরা আপনার সাথে আছি।

আসলে মুসলমানরা যদি খাঁটি মুসলমান হয়, তাহলে শাসকরাও তাদেরকে দমিয়ে রাখতে পারে না।   

যাই হোক, ইমাদ উদ্দীন সিদ্ধান্ত নিলেন, ক্রুসেডারদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার আগে এই বিশ্বাসঘাতকদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা  নেবেন। তাই তিনি দামেস্ক আক্রমণের সিদ্ধান্ত নিলেন। জনগণ তাকে সহায়তা করলো এবং দামেস্ক তার দখলে চলে আসলো। তারপর তিনি আরো অভিযান চালিয়ে যেতে লাগলেন। এভাবে তিনি আলেপ্পো, হোমস নগরীসহ একের পর এক অঞ্চল জয় করলেন। এভাবে ইরাক থেকে বৈরুত পর্যন্ত ফিলিস্তিনের উত্তর দিকের মুসলমানদেরকে ঐক্যবদ্ধ করলেন। এই সমগ্র অঞ্চল তার শাসনাধীনে চলে আসলো।

নুরুদ্দীন জঙ্গী

ইমাদ উদ্দীনের অধীনস্ত একজন নেতা ছিলেন আসাদ উদ্দীন শারকুহ। তিনি তখন লেবাননের বায়ালবেক শহরে অবস্থান করছিলেন। তিনি জঙ্গী পরিবারের মতো কোনো রাজকীয় পরিবারের সন্তান না হলেও শীর্ষ নেতৃবৃন্দের একজন ছিলেন।

ইতোমধ্যে ইমাদ  উদ্দীন জঙ্গী মৃত্যুবরণ করেন। তার ছেলে নুরুদ্দীন জঙ্গী ক্ষমতায় আসেন। ইমাদ উদ্দীনের মতো নুরুদ্দীনও সালাহ উদ্দীনের চেয়ে বড় মাপের ব্যক্তি ছিলেন।

যাই হোক, তিনি ক্ষমতায় এসে আসাদ উদ্দীনের নেতৃত্বে মিশরের ফাতেমীয় খেলাফতের নিকট একটি প্রতিনিধি দল পাঠান। এই দলে আসাদ উদ্দীনের ভাতিজা ইউসুফও ছিলেন। ইউসুফকেই আমরা সালাহ উদ্দীন আইয়ুবী হিসেবে জানি। সালাহ উদ্দীন ছিল তার উপাধি।

ফাতেমীয় শাসকের বিশ্বাসঘাতকতা

নুরুদ্দীনের পাঠানো প্রতিনিধি দল মিশরে গিয়ে বললো, আপনারা ক্রুসেডারদের উপর দক্ষিণ দিক থেকে আক্রমণ করুন। আর আমরা আক্রমণ করবো উত্তর দিক থেকে। এভাবে আমাদের সম্মিলিত বাহিনী তাদেরকে ধুলায় মিশিয়ে দিতে পারি। ফাতেমীয় শাসক বললেন, হুম, চমৎকার প্রস্তাব!

কিন্তু আসাদ উদ্দীনের প্রতিনিধি দল দরবার ত্যাগ করার পর পরই তিনি ক্রুসেডারদের কাছে একটি প্রতিনিধি দল পাঠালেন। তারা ক্রুসেডারদেরকে ফাতেমীয়দের সাথে শান্তিচুক্তি ও নুরুদ্দীনের বিরুদ্ধে জোট গড়ে তোলার প্রস্তাব দিলো। বর্তমানেও এ রকম ঘটছে। এটা নতুন কিছু নয়।

যাই হোক, এই খবর পেয়ে একই প্রতিনিধি দলকে নুরুদ্দীন আবার পাঠালেন। কিন্তু ফাতেমীয় শাসক বললেন– না, আপনারা ভুল শুনেছেন। তাদের সাথে আমাদের কোনো চুক্তি হয়নি। আমি আপনাদের সাথেই আছি। এ কথা শুনে প্রতিনিধি দল ফিরে গেলো। অথচ ফাতেমীয়দের সাথে খ্রিস্টানদের চুক্তির বিষয়টি আসলেই সত্য ছিল।

এ ঘটনার প্রেক্ষিতে নুরুদ্দীন জঙ্গী এক অভাবনীয় কাজ করলেন। তিনি একটা সেনাবাহিনী গঠন করলেন। বাহিনীটি ফিলিস্তিনের উপর দিয়ে গেলো, অথচ ক্রুসেডারদের আক্রমণ না করে ফাতেমীয়দের মিশরে আক্রমণ (অবরোধ?) করে বসলো। তারপর খলিফার কাছে বার্তা পাঠানো হলো– হয় আমাদের সাথে ক্রুসেডারদের বিরুদ্ধে জিহাদের যোগ দিন, আর নয়তো আমরা আপনাদের সাথে লড়াই করবো। খলিফা জবাব পাঠালেন, আমরা আপনাদের সাথেই আছি। আপনাদের সাথে যোগ দেয়ার জন্য আমি বাহিনীকে প্রস্তুত করছি।

খলিফার কথায় আশ্বস্ত হয়ে আসাদ উদ্দিনের নেতৃত্বে পরিচালিত সেনাবাহিনী ফিলিস্তিন অভিমুখে রওয়ানা হলো। অব্যবহিত পরেই আসাদ উদ্দিন খবর পেলেন, তার সাথে চাতুরী করা হয়েছে। ফাতেমীয় খলিফা আবারো নুরুদ্দীনের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়েছেন। তিনি আসাদ উদ্দীনের বাহিনীর গতিবিধি গোপনে খ্রিস্টানদের জানিয়ে দিচ্ছেন। এই খবর পেয়ে তিনি পুনরায় ফিরে এসে কায়রোর নিয়ন্ত্রণ নিজের হাতে নিয়ে নেন। তারপর খলিফার কাছে খবর পাঠালেন, আমি আপনার সাথে লড়াই করার  জন্য আসিনি। আমি শুধু এটুকু নিশ্চিত করতে চাই, ফিলিস্তিনে যুদ্ধ করার জন্য আপনি আমাদের সাথেই যাচ্ছেন। তখন খলিফা আবারো নানা রকম ছলচাতুরীপূর্ণ কথাবার্তা শুরু করলেন।

সালাহ উদ্দীনের বুদ্ধিদীপ্ত পদক্ষেপ

সালাহ উদ্দিন পুরো ঘটনা প্রবাহ পর্যবেক্ষণ করছিলেন। তিনি তার চাচা আসাদ উদ্দীনকে গিয়ে বললেন, চাচা! এই নেতাদের উপর কোনো ভরসা নেই। তাই তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার অনুমতি নিন। চাচা জবাব দিলেন, মুসলমানদের মাঝে কোনো ঝামেলা হোক, তা আমরা চাই না। সালাহ উদ্দীন বললেন, খলিফার উপর কোনো ভরসা নেই। অথচ আমরা ঐক্যবদ্ধ হতে না পারলে ক্রুসেডারদের পরাজিত করা সম্ভব নয়। কিন্তু এই বিশ্বাসঘাতক নেতারা আমাদেরকে ঐক্যবদ্ধ হতে দিচ্ছে না। কিন্তু সালাহ উদ্দিনের পরিকল্পনা সম্পর্কে আসাদ উদ্দীন দ্বিধান্বিত ছিলেন। তাই চাচার অনুমতি ছাড়াই সালাহ উদ্দীন কিছু সৈন্য নিয়ে রাজপ্রাসাদে প্রবেশ করলেন এবং শাসককে হত্যা করলেন।

এর ফলে নুরুদ্দীনের কর্তৃত্ব উত্তর সিরিয়া ও এর আশপাশের অঞ্চল এবং মিশর পর্যন্ত বিস্তৃত হয়। এ ঘটনার দুই মাস পর আসাদ উদ্দীন মৃত্যুবরণ করেন। তখন নুরুদ্দীন মিশরের গভর্নর হিসেবে সালাহ উদ্দীনকে নিযুক্ত করেন।

এবার তারা ক্রুসেডারদের উপর আক্রমণ করতে প্রস্তুত। কিন্তু ইতোমধ্যে নুরুদ্দীনও ইন্তেকাল করলেন। তারপর নুরুদ্দীনের পরিবারের মধ্যে নেতৃত্ব নিয়ে দ্বন্দ্ব শুরু হয়। সালাহ উদ্দীন তাদের কাছে বার্তা পাঠালেন, নিজেরাই এভাবে দ্বন্দ্বে লিপ্ত থাকলে ক্রুসেডারদের বিরুদ্ধে জিহাদ করা সম্ভব নয়। কিন্তু অতীতের শাসকদের মতো তারাও এ কথায় কর্ণপাত করলো না। তারা নিজেদের স্বার্থেই মত্ত হয়ে রইলো।

সালাহ উদ্দিন এবার বিষয়টি নিজেই সমাধা করার সিদ্ধান্ত নিলেন। তিনি তার বাহিনী নিয়ে ফিলিস্তিন হয়ে নুরুদ্দীন জঙ্গীর  শাসিত অঞ্চলে পৌঁছলেন এবং এর নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নিলেন। এর ফলে তিনি পুরো অঞ্চলের উপর নিজের শাসন প্রতিষ্ঠা করলেন।

এবার ঐক্যবদ্ধ মুসলিম উম্মাহর সমর্থন নিয়ে তিনি খ্রিস্টানদের পরাজিত করলেন। হাত্তিনের যুদ্ধে তিনি তাদেরকে করুণভাবে পরাজিত করলেন। অথচ তার সৈন্য সংখ্যা ছিল মাত্র ১২ হাজার। এই পরাজয়ে খ্রিস্টানরা মহা ক্ষিপ্ত হলো। ক্রুসেডাররা যুদ্ধের ময়দানে আগের চেয়ে বেশি রসদ পাঠাতে লাগলো। তারা আক্রায় আড়াই লক্ষ সৈন্য সমাবেশ করলো। আর সালাহ উদ্দীন মাত্র ১২ হাজার সেনা নিয়ে তাদের মুখোমুখি হয়েছিলেন। তারপর কয়েক বছরের মধ্যে ক্রুসেডাররা ফিলিস্তিন থেকে বিতাড়িত হয়েছিল।

এভাবে আমরা আবার আমাদের কর্তৃত্ব ফিরে পেয়েছিলাম। কিন্তু এর পেছনে ছিল এক দীর্ঘ ইতিহাস। একজন গাজী সালাহ উদ্দীন আইয়ুবী হুট করেই আবির্ভূত হননি। শত্রুদেরকে পরাজিত করার আগে মুসলিম উম্মাহকে ঐক্যবদ্ধ করার জন্য ইসলামী স্কলারগণ যে কঠোর সাধনা ও পরিশ্রম করেছেন, তারই ফলাফল ছিলেন একজন আইয়ুবী।

ইজ্জ উদ্দীন ইবনে আব্দুস সালামের বুদ্ধিবৃত্তিক আন্দোলন

কয়েক বছর পর ইতিহাসের গতিধারায় এবার আগমন ঘটলো মোঙ্গল ঝড়ের। সামনে যাকেই পেয়েছে, তাকেই তারা শেষ করে দিয়েছে। প্রথমে তারা আব্বাসীয় খেলাফত তছনছ করে দিলো। তারপর একে একে উত্তর ইরাক, সিরিয়া, লেবানন, জর্ডান প্রভৃতি মুসলিম অঞ্চলে ধ্বংসযজ্ঞ চালালো। তারপর তারা প্রবেশ করে ফিলিস্তিনে। এবার তারা উত্তর আফ্রিকা দখল করার পরিকল্পনা করে, যাতে ইউরোপে প্রবেশ করা যায়।  কেউই তাদেরকে থামাতে পারছিল না।

আমাদের পরবর্তী প্রজন্মের সামনে যেন অনুসরণীয় কিছু উদাহরণ থাকে, সেই উদ্দেশ্যে আমি এই দীর্ঘ ইতিহাস বলে যাচ্ছি। প্রিয় তরুণ ভাই ও বোনেরা! মহান মানুষদের কারণেই ইসলাম মহান হয়েছে। ইসলাম আপনাতেই মহান হয়ে যায়নি। তাই আমাদেরকে এর জন্য কাজ করতে হবে।

যাইহোক, এমন এক পরিস্থিতিতে আবির্ভাব ঘটে একজন মহান মনীষীর। তাঁর নাম ইজ্জ উদ্দীন ইবনে আব্দুস সালাম। তিনি ছিলেন সিরিয়ার অধিবাসী। মিশরীয় ছিলেন না। মোঙ্গলরা আক্রমণ করার আগেই তাদের বিরুদ্ধে জিহাদ ঘোষণা করার জন্য তিনি দামেস্কের শাসককে আহ্বান জানালেন। কিন্তু সিরিয়ার শাসক এটি পছন্দ করলেন না। তিনি তাঁকে দেশ থেকে বহিস্কার করলেন। তখন তিনি মিশরে চলে গেলেন। মিশরের শাসক তাকে আশ্রয় দিলেন। তিনি ছিলেন মিশরে অবস্থানরত সিরিয়ান। দেখুন, ইসলামে জাতীয়তা নেই। যাই হোক, মিশরে তিনি বিদ্বান ব্যক্তিদের নেতা হয়ে ওঠলেন। সকল আলেম তাঁর শ্রেষ্ঠত্ব মেনে নিলেন। এ কারণে তাকে সুলতানুল উলামা (আলেমদের সুলতান) হিসেবে অভিহিত করা হয়।

দেখুন, আমরা যদি সত্যিকারের মুসলিম হয়ে থাকি, তাহলে আপনার জাতীয়তা কি, কোত্থেকে আপনি এসেছেন, আমি তা বিবেচনা করবো না। আপনিও আমার ব্যাপারে তা করবেন না। কারণ, তখন আমরা ইসলাম ছাড়া অন্য কিছুকে বিবেচনা করবো না।

সাইফুদ্দীন কুতুজ

যাই হোক, ইজ্জ উদ্দীন ইবনে আব্দুস সালাম জিহাদের বাণী ছড়িয়ে দিতে থাকলেন। এক পর্যায়ে মামলুক শাসকরা জিহাদ ঘোষণা করতে সম্মত হয় এবং তারা তা করেও। কার বিরুদ্ধে এই জিহাদ? অপ্রতিরোধ্য মোঙ্গলদের বিরুদ্ধে। এই তাতার জাতির গতি তখন পর্যন্ত কেউ রুদ্ধ করতে পারেনি।

মামলুক শাসক সাইফুদ্দীন কুতুজের নেতৃত্বে মিশরে খুব ছোট একটি সেনাদল গঠন করা হলো। এই মহান ব্যক্তিটির কথা আমাদের সবসময় মনে রাখা দরকার। সাইফুদ্দীন কুতুজ ঘোষণা করলেন, এই যুদ্ধ শুধু ইসলামের জন্য। কোনো জাতীয় স্বার্থ, সম্পদ বা তেলের জন্য এই যুদ্ধ নয়।

এই সেনাবাহিনীর সর্বাগ্রে ছিলেন সেই বৃদ্ধ আলেম ইজ্জ উদ্দীন ইবনে আব্দুস সালাম। শুধু খুতবা দেওয়া আর অকর্মন্য বসে থাকার মতো আলেম তিনি ছিলেন না। সেনাবাহিনীতে যোগ দিয়ে তিনি দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিলেন। ইসলামের পুনর্জাগরণের জন্য আলেমদের ভূমিকা আবারো আমরা প্রত্যক্ষ করলাম।

যাই হোক, মোঙ্গলদের বিরুদ্ধে মামলুকরা আইন জালুতের প্রান্তরে মুখোমুখি হয়। এই যুদ্ধে মুসলমানরা বিজয় লাভ করে এবং সেখান থেকে তাতাররা পালিয়ে যায়। এই পরাজয়ের মাধ্যমে মুসলিম ভূখণ্ডে মোঙ্গলদের আধিপত্যের অবসান ঘটে।

ইসলামী সভ্যতার অনন্য বৈশিষ্ট্য

যাই হোক, আমরা আবারো ইসলামী সভ্যতার একটি অগ্রগতি লক্ষ করলাম। ইসলাম অন্যান্য সভ্যতার মতো নয় যে, ২/৩ বছরের মধ্যে নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে। ইসলামের ক্ষেত্রে কখনোই এমনটি ঘটেনি। ইসলামী সভ্যতার পতন ঘটতে শত শত বছরে লেগেছে। কী জন্য এই পতন হয়েছে? কারণ, নেতৃবৃন্দের অনেকেই ইসলামের আদর্শ থেকে বিচ্যুত হয়ে গিয়েছিলেন। আলেমদের কেউ কেউও বিচ্যুত হয়েছিলেন। তবে ইসলামের মতাদর্শ অক্ষুন্ন রয়েছে। কারণ কোরআনও অবিকৃত রয়েছে। যতদিন পর্যন্ত কোরআন অবিকৃত থাকবে এবং  মুসলমানরা তা পড়ে অনুধাবন করবে, ততদিন পর্যন্ত তারা বার বার ফিরে আসবে।

মো: হাবিবুর রহমান হাবীব
মো: হাবিবুর রহমান হাবীব
প্রাক্তন শিক্ষার্থী, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ, চবি। সমাজ উন্নয়ন কর্মী। Email: habibircu5@gmail.com

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *