মঙ্গলবার, নভেম্বর ২১, ২০১৭
হোম > লেকচার অনুবাদ > আগামী দিনের ইসলাম (পর্ব-২)

আগামী দিনের ইসলাম (পর্ব-২)

এডিটর’স নোট

ড. তারিক সোয়াইদান আরব বিশ্বের খ্যাতিমান একজন স্কলার ও বক্তা। ২০০৪ সালে অস্ট্রেলিয়ায় শিক্ষার্থীদের এক প্রোগ্রামে ‘দ্যা ফিউচার অব ইসলাম’ শিরোনামে তিনি একটি বক্তৃতা করেন। বলা যায়, ইসলাম সম্পর্কে এটি একটি কম্প্রেহেনসিভ আলোচনা। প্রথমে তিনি বিশ্বসভ্যতাগুলোর উত্থান-পতনের কারণগুলো আলোচনা করেছেন। তারপর ইসলামের আগমন, উত্থান ও পরবর্তীতে খেলাফতের পতনের কারণ আলোচনা করেছেন। সবশেষে, আগামী দিনে ইসলাম কীভাবে পুনরায় বিশ্বসভ্যতা হিসেবে পৃথিবীকে নেতৃত্ব দেবে, তার রূপরেখা ব্যক্ত করেছেন।

সিএসসিএস-এর পাঠকদের জন্য লেকচারটি ইংরেজিতে অনুলিখন ও বাংলায় অনুবাদ করেছেন মো: হাবিবুর রহমান হাবীব। আজ ছাপা হলো ধারাবাহিক অনুবাদের দ্বিতীয় পর্ব।


প্রথম পর্বতৃতীয় পর্ব | শেষ পর্ব


ইসলামী সভ্যতার গতিধারা

অন্যান্য সভ্যতা নিয়ে তো একটা ধারণা পাওয়া গেল। এবার ইসলামী সভ্যতাকে জানার চেষ্টা করা যাক।

ক্রমান্বয়ে বিস্তৃত হওয়া, সাফল্যের শিখরে পৌঁছানো, বহিঃশক্তির চ্যালেঞ্জ এবং অতি দ্রুত পতন– বিশ্বের সকল সভ্যতাই এই ধারাবাহিক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে গেছে। ইসলামই একমাত্র সভ্যতা, যা এর ব্যতিক্রম। আমি আপনাদের সামনে ইসলামী সভ্যতার গতিধারা সংক্ষেপে তুলে ধরতে চাই। অবশ্য এ জন্য লম্বা সময়ের প্রয়োজন। তবে আমি অল্প কথায় বিষয়টি তুলে ধরবো।

সভ্যতা ও সীমানা

ইসলামের সূচনা হয় মক্কা থেকে। সভ্যতা সংক্রান্ত প্রথাগত বিবেচনায়, কোনো একটি দেশ শাসনের মাধ্যমে সাধারণত সভ্যতার সূচনা হয়। শাসন করার মতো কোনো দেশ বা অঞ্চল ছাড়া কোনো পরিপূর্ণ সভ্যতা হতে পারে না। তত্ত্ব, পদ্ধতি এবং আদর্শ থাকা সত্ত্বেও এগুলো কোনো অঞ্চলে প্রতিষ্ঠিত করতে না পারা পর্যন্ত তা পরিপূর্ণ সভ্যতা হিসেবে গণ্য হবে না।

কনসেপ্টের গুরুত্ব

মক্কায় ইসলামের প্রথম ১৩ বছর ছিল মুসলমানদের আদর্শ, ঈমান ও নৈতিকতা গঠনের সময়। ফলে এই সময়ে ইসলামের রাজনৈতিক, সামাজিক, বিচার ব্যবস্থা কিংবা অন্য কিছুই ছিল না। এমনকি নামাজ ছাড়া অন্য কোনো ইবাদতও ছিল না। রোজা, জাকাত, হজ্জ ইত্যাদি সবকিছুই মদীনা থেকে শুরু হয়। মক্কী জীবন ছিল আদর্শ ও নৈতিকতা (ঈমান ও আখলাক) গঠনের সময়।  

ইসলামী সভ্যতার সূচনা

মক্কা থেকে মদীনায় হিজরতের মাধ্যমে ইসলামী সভ্যতার সূচনা হয়। ওমর (রা) কর্তৃক হিজরতের বছরকে ইসলামী ক্যালেন্ডারের সূচনা হিসেবে গ্রহণ করা তাই সঠিক সিদ্ধান্ত ছিল। কারণ হিজরত ছিল ইসলামী সভ্যতার সূচনা। একই সাথে এটি একটি রাষ্ট্রের সূচনাও বটে।

কোরআন নাজিলের বিষয়বস্তুগত ভিন্নতা

তারপর সবকিছুই পরিবর্তিত হয়ে গেলো। এমনকি কোরআনও! মক্কী সূরাগুলো পড়লে বুঝা যায়, এগুলোর বিষয়বস্তু মাদানী সূরাগুলো থেকে আলাদা। মক্কা থেকে মদীনায় যাওয়ার পর কোরআনের বিষয়বস্তু পর্যন্ত পাল্টে গেছে। তাই হিজরতের বছর হলো এমন একটা সময়, যেখান থেকে আমরা ইসলামী সভ্যতার আলোচনা শুরু করতে পারি।

মদীনায় নগর রাষ্ট্রের পত্তন

সেই ইসলামী রাষ্ট্রটি কত বড় ছিল? আয়তনে প্রায় সিডনি শহরের মতোই একটি ছোট শহর, যার নাম ছিল ইয়াসরিব। পরবর্তীতে ‘মদীনা মোনাওয়ারা’ হিসেবে এর নামকরণ করা হয়। খুবই ছোট একটি নগর রাষ্ট্র। সেই রাষ্ট্রে লক্ষ লক্ষ নাগরিক ছিল না। বড় জোর হাজার ত্রিশেক মানুষ বাস করতো। মুসলিম, ইহুদী, মুশরেক এবং অন্যান্যরা মিলে ছিল জনসংখ্যার এই পরিমাণ।

ইতিহাসের পট পরিবর্তন হচ্ছিল খুব দ্রুত। দ্বিতীয় হিজরীতে বদর যুদ্ধ সংগঠিত হয়। এই ফাঁকে আপনাদের জানিয়ে রাখি, ‘আস-সীরাহ আন-নবুবিয়্যাহ’ গ্রন্থে আমি বদর যুদ্ধের বিস্তারিত বর্ণনা দিয়েছি।



ইসলামের যুদ্ধসমূহ

বদর যুদ্ধ

বদর যুদ্ধে মুসলমানদের সংখ্যা ছিল তিন’শ চৌদ্দ জন। আর কাফেরদের সংখ্যা ছিল নয়’শ পঞ্চাশ জন। এ যুদ্ধে কাফেরদের ছিল দু’শ ঘোড়া। অন্যদিকে মুসলমানদের ছিল মাত্র দুইটি ঘোড়া। অর্থাৎ সংখ্যা, শক্তি ইত্যাদিতে আমরা তাদের চেয়ে বেশি ছিলাম না। সাড়ে নয়শ মানুষের বিরুদ্ধে তিনশ মানুষের এই যুদ্ধও খুব সংক্ষিপ্ত ছিল।

যে কোনো বিবেচনায় এই যুদ্ধ এখন পর্যন্ত বিশ্ব ইতিহাসের সবচেয়ে সংক্ষিপ্ত যুদ্ধ। আপনারা কি জানেন, যুদ্ধটি কত সময় ধরে স্থায়ী ছিল? মাত্র দুই ঘণ্টা! জ্বি, দুই দিন নয়, মাত্র দুই ঘণ্টা!

ইবনে আসেমের গল্প

একজন কাফের বদর যুদ্ধ দেখতে পাহাড়ের চূড়ায় বসেছিল। তিনি কোরাইশ কিংবা মুসলিম– কোনো পক্ষেই ছিলেন না। তাই যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেননি। যুদ্ধ শুরু হলে তিনি লাইভ সিনেমা দেখার মতোই তা উপভোগ করছিলেন। তার নাম ইবনে আসেম।

ঘণ্টা দুই পর হঠাৎ যুদ্ধ শেষ হয়ে গেল! ইন্ডিয়ান সিনেমা কিংবা যে কোনো লম্বা সিনেমায় যেমন অনেকক্ষণ ধরে যুদ্ধ চলতে থাকে, এ যুদ্ধও তেমন হবে বলে তিনি ভেবেছিলেন। কিন্তু এ যেন মাত্র ছোট্ট একটা ডকুমেন্টারি। এ দেখে তিনি তখন স্বগতোক্তি করলেন– “হায় আল্লাহ! এমন ঘটনা তো আমি জীবনেও দেখিনি, তারা (কাফেররা) নারীদের মতো পালিয়ে গেলো!”

পাঁচ বছর পরের ঘটনা। এই ব্যক্তি মদীনায় আসলেন। তখনো তিনি অমুসলিম ছিলেন। রাসূল (সা) তাকে দেখতে পেয়ে জিজ্ঞেস করলেন, তুমি কি ইবনে আসেম? তিনি বললেন, হ্যাঁ। রাসূল (সা) জিজ্ঞেস করলেন, তুমি কি বদরের যুদ্ধ দেখোনি? তিনি বললেন, হ্যাঁ, দেখেছি। রাসূল (সা) আবার জিজ্ঞেস করলেন, যুদ্ধ শেষ হয়ে যাওয়ার পর তুমি কী বলেছিলে? তিনি বললেন, কিছুই তো বলিনি। রাসূল (সা) তখন বললেন, তুমি কি মনে মনে এ কথা বলোনি, “হায় আল্লাহ! এমন ঘটনা তো আমি জীবনেও দেখিনি, তারা (কাফেররা) নারীদের মতো পালিয়ে গেলো”? এ কথা শুনে ইবনে আসেম সাথে সাথে ঘোষণা করলেন– আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি, আল্লাহ ছাড়া কোনো ইলাহ নেই এবং মোহাম্মদ নিশ্চয়ই আল্লাহর রাসূল। তারপর মনে মনে বললেন, এই কথাগুলো তো আমি কখনো কাউকে বলিনি!

এটাই হচ্ছে নবুওয়াতের শক্তি।

ইসলামের শ্রেষ্ঠ যুদ্ধ

বদর যুদ্ধে কাফেরদের ৭০ জন নিহত এবং ৭০ জন বন্দি হয়েছিল। মাত্র ৭০ জন! অথচ এখন বিভিন্ন স্থানে বোমা হামলায় এর চেয়ে অনেক বেশি মানুষ নিহত হয়। এটি ছিল ইসলামের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যুদ্ধ। নগণ্য সৈন্য সংখ্যা, ক্ষণস্থায়ী যুদ্ধ, সংকীর্ণ যুদ্ধ ময়দান, এমনকি এর ফলে মক্কা বিজয়ও সাধিত হয়নি; তারপরেও এর তাৎপর্য এত বেশি কেন? আল্লাহ তায়ালা এ প্রসঙ্গে কোরআনে বলেছেন,

يَوْمَ الْفُرْقَانِ يَوْمَ الْتَقَى الْجَمْعَانِ

এটি হলো হক ও বাতিলের মীমাংসার দিন এবং একে অপরের মুখোমুখি হওয়ার দিন। (সূরা আনফাল: ৪১)

এক তরুণ মুসলিম যোদ্ধার মন্তব্য

মদীনার একজন তরুণের মন্তব্য থেকে এ বিষয়টি আমরা সহজে বুঝতে পারবো। তিনি ছিলেন আনসার এবং মুসলিম বাহিনীর সদস্য। যুদ্ধে বিজয়ী হয়ে ফিরে আসার পর তার পরিবার তাকে অভিনন্দন জানাচ্ছিল। তখন তিনি বললেন, “তোমরা কেন আমাদের অভিনন্দন জানাচ্ছো? আমরা তো কিছু জীর্ণ নিষ্প্রাণ মানুষের মোকাবেলা করেছি মাত্র। ভেড়া জবাইয়ের মতো করে তাদেরকে হত্যা করেছি।”

তার কথার মর্মার্থ হচ্ছে, এটা আমাদের কাছে খুবই সাধারণ ব্যাপার ছিল। এটা কোনো কঠিন যুদ্ধ ছিল না। তখন রাসূল (সা) কথাগুলো শুনে তাকে শুধরে দিলেন, “ভাতিজা! এমন করে বলো না। আমরা  তো তাদের নেতৃবৃন্দকেই হত্যা করেছি।”

মাত্র দুইজন কোরাইশ নেতা জীবিত ছিল

বদরের যুদ্ধে মাত্র দুইজন কোরাইশ নেতা বেঁচে গিয়েছিল। এদের মধ্যে একজন আবু সুফিয়ান। তিনি কাফেলা নিয়ে পালিয়ে গিয়েছিলেন। অপরজন রাসূলের (সা) চাচা আবু লাহাব। তিনি যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেননি। পরাজয়ের খবর শুনে আবু লাহাব প্রচণ্ড ক্রুদ্ধ ও মর্মাহত হয়েছিলেন। এর মাত্র তিনদিন পর তিনি মারা যান। সুতরাং বাকি থাকল একমাত্র আবু সুফিয়ান।

একটি দেশ হঠাৎ করে তার সকল শাসককে হারালো এবং সকল সংসদ সদস্য এক ধাক্কায় নিহত হয়ে গেলো– এমনটা কল্পনা করা যায়! বদর যুদ্ধে ঠিক এ ব্যাপারটিই ঘটেছিল।

উহুদ যুদ্ধ

বদর যুদ্ধের ফলে নতুন অধ্যায়ের সূচনা হয়। কুরাইশরা বুঝতে পেরেছিল এই পরাজয় তাদের জন্যে মহাবিপদের কারণ। তাই তারা সৈন্য সংগ্রহ শুরু করল এবং অন্যান্য আরবদের সাহায্য নিতে থাকল। এভাবে তারা উহুদ যুদ্ধের দিকে অগ্রসর হয়। তৃতীয় হিজরীতে এই যুদ্ধ সংঘটিত হয়। মুসলমানরা এতে পরাজিত হয়।

শক্তিমত্তা নয়, আনুগত্যই মূলকথা

এ পরাজয়ের মাধ্যমে আল্লাহ তায়ালা মুসলমানদের বুঝাতে চাইলেন, যুদ্ধ জয়ের জন্যে শক্তিমত্তা চূড়ান্ত নিয়ামক নয়। বরং আল্লাহর আনুগত্যই হলো মূল ব্যাপার। অর্থাৎ, উহুদের প্রান্তরে আল্লাহর অবাধ্য হওয়ার কারণে তোমরা পরাজিত হয়েছো। যখন তোমরা সঠিক পথে থাকবে, তখন আর পরাজিত হবে না।

আহযাব বা খন্দকের যুদ্ধ

হিজরী পঞ্চম সাল। ইহুদী, বনু গাতফান এবং অন্যান্য আরব গোত্রগুলোর সহায়তা নিয়ে কোরাইশরা একটি শক্তিশালী যৌথ সেনাবাহিনী গড়ে তুলতে সক্ষম হয়। আহযাব অর্থ যৌথ বা সম্মিলিত। এই যৌথ বাহিনী মদীনা আক্রমণ করার জন্য এগুতে থাকে। দশ হাজার আরব সৈন্যের শক্তিশালী সেনাবাহিনী! ওই অঞ্চলে তৎকালীন সময়ে এটা ছিল ব্যাপক শক্তিশালী একটি বাহিনী।

রাসূল (সা) অত্যন্ত বিপজ্জনক পরিস্থিতির সম্মুখীন হলেন। মদীনাকে রক্ষা করতে শহরের চারপাশে পরিখা খনন করা হলো। এই কারণে আহযাবের যুদ্ধকে খন্দক বা পরিখার যুদ্ধও বলা হয়।

কোরাইশরা এক মাস ধরে মুসলমানদের অবরোধ করে রেখেছিল। মদীনার পূর্ব ও পশ্চিম সীমানা ছিল রুক্ষ পাথুরে অঞ্চল। ফলে শত্রুবাহিনী সেদিকে যেতে পারেনি। দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল ছিল পাহাড়-পর্বত দ্বারা সুরক্ষিত। উত্তর দিকে খনন করা হয় পরিখা। আর দক্ষিণ-পূর্ব দিক সুরক্ষিত রাখতে রাসূল (সা) ইহুদী গোত্র বনু কোরায়যার সাথে চুক্তি করেন।

ইহুদীদের বিশ্বাসঘাতকতা

যুদ্ধকালীন সময়ে ইহুদীরা যথারীতি চুক্তি ভঙ্গ করে। তারা গোপনে কাফেরদেরকে সহায়তা করতে চুক্তিবদ্ধ হয়। চুক্তির অংশ হিসেবে দক্ষিণ দিক থেকে তারা মুসলমানদের উপর আক্রমণের পরিকল্পনা করে। মুসলমানরা যখন উত্তরে দশ হাজার সৈন্যের শক্তিশালী বাহিনীকে প্রতিহত করার প্রস্তুতি নিচ্ছিলো, ঠিক তখনই মদীনার অভ্যন্তরে মুসলিম নারী-পুরুষ ও শিশুদের উপর আক্রমণ করতে ইহুদীরা উদ্যত হয়। সেখানে তখন কোনো নিরাপত্তা ব্যবস্থা ছিল না। কী ভয়ানক ব্যাপার! আল্লাহ তায়ালা এ ঘটনার বর্ণনা দিয়েছেন এভাবে–

إِذْ جَاءُوكُم مِّن فَوْقِكُمْ وَمِنْ أَسْفَلَ مِنكُمْ وَإِذْ زَاغَتِ الْأَبْصَارُ‌ وَبَلَغَتِ الْقُلُوبُ الْحَنَاجِرَ‌ وَتَظُنُّونَ بِاللَّـهِ الظُّنُونَا * هُنَالِكَ ابْتُلِيَ الْمُؤْمِنُونَ وَزُلْزِلُوا زِلْزَالًا شَدِيدًا

যখন তারা তোমাদের উচ্চ ও নিম্ন অঞ্চল থেকে তোমাদের উপর চড়াও হতে আসছিল, যখন ভয়ে তোমাদের চোখ বিস্ফোরিত হয়ে পড়েছিল, প্রাণ হয়ে পড়েছিল কণ্ঠাগত এবং (আল্লাহর সাহায্যের বিলম্ব দেখে) তোমরা আল্লাহ তায়ালা সম্পর্কে নানা রকম বিরূপ ধারণা পোষণ করতে শুরু করেছিলে। সেই (কঠিন) সময়ে মুমিনদেরকে চরমভাবে পরীক্ষা করা হয়েছিল এবং তাদেরকে ভীষণভাবে নাড়িয়ে দেয়া হয়েছিল। (সূরা আহযাব: ১০-১১)

প্রচণ্ড ভীতিকর পরিস্থিতি

বর্তমানে অনেক মুসলমান এ রকম প্রচণ্ড ভয়ে থাকে। স্বয়ং আল্লাহ তায়ালা আমাদের জানাচ্ছেন, ভয়ে তাদের প্রাণ কণ্ঠাগত হয়ে পড়েছিল! এটা হচ্ছে প্রচণ্ড ভীতির একটা একটা উদাহরণ। এটা ছিল পরীক্ষা।

যারা খুব বেশি ভয় পায় তারা মসজিদ, ইসলামী কার্যক্রম ও সংগঠন থেকে দূরে থাকতে চায়। সন্ত্রাসবাদ বিরোধী আইন বা অন্য কোনো কারণে তারা এমন আতঙ্কিত থাকে, যেন তাকে এখুনি ধরে ফেলবে!

আপনারা কি জানেন, ভয়ে রাসূলকে (সা) ছেড়ে চলে যাওয়া লোকের সংখ্যা কত ছিল? মাত্র তিন’শ জন রাসূলের (সা) সাথে ছিল। বাকি সবাই পালিয়ে যায়। তারপর সর্বশক্তিমান আল্লাহ তায়ালা একদল ফেরেশতা ও ঝড়ো বাতাস পাঠালেন। এতে কাফেরদের অন্তর ভয়ে কেঁপে উঠলো এবং তারা পালিয়ে গেল।

এর পর পরই রাসূল (সা) ইহুদীদের বিরুদ্ধে বনু কোরায়যার যুদ্ধ পরিচালনা করলেন এবং প্রায় সাত’শ বিশ্বাসঘাতককে হত্যা করলেন। তারপর মদীনা থেকে অবশিষ্ট ইহুদীদেরকে চিরদিনের মতো বিতাড়িত করা হয়। তারা খাইবারে চলে যায়। এটা ছিল হিজরী পঞ্চম সালের ঘটনা।

ইসলামী সভ্যতার অনন্যতা

তখন পর্যন্ত ইসলাম কি কোনো শক্তিশালী সভ্যতা ছিল? না। বিজ্ঞান ও গণিতে অগ্রগতি? না। অট্টালিকা? না। মসজিদ? খুবই সাধারণ একটি মসজিদ ছিল, যার কোনো কার্পেট ছিল না, চালার নিচে কোনো সিলিং ছিল না। শুধু কিছু খেজুর পাতা ছাউনি হিসেবে বিছানো ছিল। বৃষ্টি হলে স্বয়ং রাসূল (সা) কর্দমাক্ত মাটিতেই সিজদা করতেন।

বস্তুগত দিক থেকে একে কোনো বিশাল সভ্যতা বলা যায় কি? মোটেও না। কোনো শক্তিশালী সেনাবাহিনী ছিল? না। কোনো যুদ্ধ সরঞ্জাম ছিল? না। তাহলে সেই সভ্যতা কোন শক্তিবলে গোটা পৃথিবী জয় করতে পেরেছে? ভাবতে থাকুন, ভাই ও বোনেরা, ভাবতে থাকুন।

খাইবার যুদ্ধ

সপ্তম হিজরীতে রাসূল (সা) জানতে পারলেন, ইহুদীরা খাইবারে আরেকটি সম্মিলিত বাহিনীর সমাবেশ করতে যাচ্ছে। এ খবর শুনে রাসূল (সা) তখুনি খাইবার আক্রমণ করলেন এবং দখল করে নিলেন। এর মাধ্যমে আরব উপদ্বীপে ইহুদী অবস্থানের অবসান ঘটে। স্মরণ রাখা দরকার, তারপরও ইহুদীরা রাসূলের (সা) বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র চালিয়ে যেতে থাকে।

খাইবার যুদ্ধ শেষে (ইহুদীদের শহর ত্যাগের পূর্বে এ ঘটনা ঘটেছিল– অনুবাদক) একজন ইহুদী মহিলা রাসূলের (সা) কাছে কিছু খাবার নিয়ে আসে। রাসূল (সা) তার পরিবারকে ক্ষমা করে দিয়েছিলেন। অবশ্য খাইবারের সবাইকেই তিনি ক্ষমা করে দিয়েছিলেন। যারা আত্মসমর্পণ করেছে তাদের কাউকে হত্যা করা হয়নি। অথচ ইহুদীরা বর্তমানে আমাদের সাথে তার বিপরীত আচরণ করছে। প্রকৃতপক্ষে রাসূল (সা) অনেক শান্তিপ্রিয় ছিলেন।

যাইহোক, মহিলাটি রাসূলের (সা) প্রতি কৃতজ্ঞতা জানাতে কিছু ভেড়ার মাংস নিয়ে আসলো। এই মাংসের সাথে মেশানো ছিল বিষ! রাসূল (সা) ও সাহাবীরা খাওয়া শুরু করলেন। বিশর নামে একজন সাহাবী খাওয়ার সাথে সাথেই মৃত্যুবরণ করেন। রাসূল (সা) একটু মাংস খেয়ে থেমে গেলেন। উপস্থিত সকলকে বললেন, থামো! খেয়ো না। এই রান্না করা মাংস জানিয়ে দিচ্ছে যে, এটা বিষাক্ত। কিন্তু বিশর ততক্ষণে খেয়ে ফেলেছেন। ফলে তিনি মৃত্যুবরণ করেন। রাসূল (সা) পরবর্তীতে বলেছেন,

  مَا زِلْتُ أَجِدُ مِن أَكْلَةِ الشَّاةِ فِيْ خَيْبَرَ حَتَّى قَطَعَتْ الْأَبْهَرَ مِنِّىْ

খাইবারের আক্রান্ত বিষক্রিয়ার ব্যথা আমাকে জীবনভর বইতে হবে, যতদিন পর্যন্ত না আমার শিরা-উপশিরাগুলো থেমে যাবে।

ইমাম ইবনুল কাইয়ুম বলেছেন, ওই বিষক্রিয়ার কারণেই রাসূল (সা) ইন্তেকাল করেছেন। তাই তিনি একজন শহীদ।  কোনো যুদ্ধে আহত হয়ে কেউ দশ বছর পরেও সেই আঘাতের কারণে মৃত্যুবরণ করলে তিনি যে শহীদ হিসেবে গণ্য হবেন, এ ব্যাপারে সমস্ত স্কলারের ঐক্যমত্য রয়েছে। মুসলমানদের উদ্দেশ্যে ইবনুল কাইয়ুম বলেছেন, কারা আপনার রাসূলকে (সা) হত্যা করেছিল, সে কথা কখনো ভুলে যাবেন না।

মক্কা বিজয় এবং হোনায়েনের যুদ্ধ

অষ্টম হিজরীতে মুসলমানরা মক্কা জয় করেন। মক্কা বিজয়ের সেই মহান অভিযানের পর পর হাওয়াজিন গোত্র রাসূলের (সা) বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার সিদ্ধান্ত নেয়। তারা ছিল সবচেয়ে শক্তিশালী গোত্র। এমনকি কোরাইশদের থেকেও শক্তিশালী। ইতিহাসে এটি হোনায়েনের যুদ্ধ হিসেবে পরিচিত। মক্কা বিজয়ের দুই মাস পর তায়েফের যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছিল। হাওয়াজিন গোত্র সে যুদ্ধ পর্যন্তও অপেক্ষা করেনি। তায়েফবাসীর সহযোগিতায় মুসলমানদের বিরুদ্ধে হাওয়াজিনদের যুদ্ধের প্রথম দিকে মুসলমানরা প্রায় পরাজিত হয়ে পড়ে। এদিকে ইঙ্গিত করে আল্লাহ তায়ালা বলেছেন –

وَيَوْمَ حُنَيْنٍ إِذْ أَعْجَبَتْكُمْ كَثْرَتُكُمْ فَلَمْ تُغْنِ عَنْكُمْ شَيْئًا

এবং হোনাইনের দিনে যখন তোমাদের সংখ্যাধিক্য তোমাদের প্রফুল্ল করেছিল, কিন্তু তা তোমাদের কোনো কাজে আসেনি। (সূরা তওবা: ২৫)

হোনায়েনের যুদ্ধেই মুসলমানরা প্রথমবারের মতো শত্রুবাহিনী থেকে সংখ্যায় বেশি ছিল। মুসলমানদের সংখ্যা ছিল ১২ হাজার। আর কাফেরদের সংখ্যা ছিল ১০ হাজার। এ যুদ্ধে মুসলিম বাহিনী সাময়িকভাবে পরাজিত হয়েছিল। কারণ তারা ভাবছিল– আমরা যখন সংখ্যায় খুব নগণ্য ছিলাম তখনই কাফেরদের পরাজিত করেছি। আর এখন তো আমরা সংখ্যায় অনেক বেশি। সুতরাং আমরাই বিজয়ী হবো।

অথচ মুসলমানরা কখনো সংখ্যাধিক্য বা শক্তিশালী সেনাবাহিনীর জোরে কাফেরদের পরাজিত করেনি। বরং আল্লাহর সৈনিক হওয়ার কারণেই তাদেরকে পরাজিত করতে পেরেছিল। আল্লাহর প্রতি ঈমান ও আনুগত্যই ছিল আসল ব্যাপার।

যাই হোক, হোনায়েনের যুদ্ধের প্রতিকূল মুহূর্তে মাত্র শ’খানেক সাহাবী রাসূলের (সা) সাথে ছিলেন। মাত্র শ’খানেক! এই ক্ষুদ্র দল নিয়েই মহানবী (সা) ১০ হাজার হাওয়াজিন সৈন্যের বিরুদ্ধে যুদ্ধ চালিয়ে যান। এমতাবস্থায় পালিয়ে যাওয়া লোকেরা জানতে পারলো– রাসূল (সা) তখনো যুদ্ধ করে যাচ্ছেন, যুদ্ধের ময়দান ত্যাগ করেননি। এ খবর পেয়ে তারা ফিরে আসতে শুরু করল। তবে তারা ফিরে আসার আগেই একশ জনের ক্ষুদ্র মুসলিম বাহিনী ১০ হাজার কাফের সৈন্যের বিরুদ্ধে জয়লাভ করেন। এ সংক্রান্ত হাদীসের বর্ণনা হচ্ছে,

وَاللهِ مَا وَصَلَ مِنَّا أَحَدٌ إِلاَّ وَالْمُسْلِمُوْنَ يَجْمَعُوْنَ الْغَنَائِمَ

আমরা পৌঁছার আগেই দেখি মুসলমানরা গণিমতের মাল সংগ্রহ করছে।

খেয়াল করে দেখুন, কোথায় আমাদের শক্তির উৎস! যাই হোক, নবম হিজরীতে আরবরা দলে দলে মদীনায় এসে ইসলাম গ্রহণ করতে থাকে।

তাবুক যুদ্ধ

দশম হিজরীতে তাবুক যুদ্ধ সংঘটিত হয়। মোহাম্মদের (সা) নেতৃত্বে প্রথমবারের মতো মুসলমানরা রোমান সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনা করে। শুধু আরবই নয়, গোটা বিশ্বের জন্যেই এটি ছিল একটি তাৎপর্যপূর্ণ বার্তা।

মুসলিম বাহিনী সম্পর্কে সিজার জানতে পারলেন। এ বাহিনীর নেতৃত্বে যে স্বয়ং মহানবী (সা) রয়েছেন, তাও তিনি জেনেছেন। সিজার একজন যাজকও ছিলেন। ফলে তিনি আসমানী কিতাবগুলো সম্পর্কে জানতেন। তিনি দরবার আহ্বান করে সভাষদবর্গকে জিজ্ঞেস করলেন– তোমরা কি আমার উপদেশ গ্রহণ করবে?

তারা বললো– আপনি আমাদের নেতা, আমাদের ধর্মযাজক এবং আমাদের মধ্যে সবচেয়ে জ্ঞানী। দয়া করে বলুন, আমাদের জন্য আপনার কী উপদেশ।

তিনি বললেন– চলো আমরা ইসলাম গ্রহণ করি। কারণ এই ধর্ম গোটা বিশ্ব জয় করবে। এই ব্যক্তি একজন নবী। পবিত্র গ্রন্থেও তা বলা আছে।

তারা বললো– না। আমরা আমাদের ধর্ম ত্যাগ করবো না।

তখন তিনি বললেন– যদি তা না করো, তাহলে আমার আরেকটি উপদেশ শোনো।

তারা জানতে চাইল– কী আপনার উপদেশ?

তিনি বললেন– তোমরা তাঁর বিরুদ্ধে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ো না। সেক্ষেত্রে তিনি তোমাদের হত্যা করবেন। তোমাদের সেনাবাহিনী যত বড়ই হোক না কেন, তা কোনো ব্যাপার নয়।

তারা বলল– ঠিক আছে, আপনার এই উপদেশ আমরা মেনে চলবো।

এ কারণে মুসলিম বাহিনীর মুখোমুখি হওয়াকে রোমান বাহিনী এড়িয়ে চললো। মুসলিম বাহিনী তাবুক প্রান্তরে রোমান বাহিনীর জন্য এক মাস পর্যন্ত অপেক্ষা করলো। কিন্তু তারা আসেনি।

আকস্মিক আমূল পরিবর্তন, নাকি ধারাবাহিক পরিবর্তন?

পঞ্চম হিজরীতে ইসলাম ছিল মদীনায় সীমাবদ্ধ একটি ছোট্ট সভ্যতা। আমি আপনাদের বলেছিলাম, সেখানে সভ্যতার কোনো নিদর্শন ছিল না। ছিল না কোনো অট্টালিকা ইত্যাদি ইত্যাদি।

অথচ মাত্র পাঁচ বছরের ব্যবধানে দশম হিজরীর মধ্যে মুসলমানরা পুরো আরব জয় করে ফেললেন। তারপর রোমানদের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনা শুরু করলে, মুসলমানদের মুখোমুখি হওয়া থেকে রোমানরা নিজেদের এড়িয়ে চলে। ইসলাম কীভাবে এত প্রভাবশালী হয়ে উঠলো? এটা কি কোনো ধারাবাহিক অগ্রগতি, নাকি দ্রুততম সময়ে সর্বোচ্চ শিখরে পৌঁছানো? গভীর অন্তদৃষ্টি দিয়ে এসব নিয়ে ভাবুন।

ধর্মত্যাগীদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ

একাদশ হিজরীর শুরুতে রাসূল (সা) ইন্তেকাল করলেন। তারপর আরবরা ইসলাম থেকে দূরে সরে যেতে থাকল। আবু বকর সিদ্দিক (রা) তাদের বিরুদ্ধে লড়াই করার দৃঢ় সিদ্ধান্ত নিলেন। ওমর ইবনুল খাত্তাবের (রা) মতো দৃঢ় প্রত্যয়ী মানুষও এ ব্যাপারে দ্বিধান্বিত ছিলেন। তিনি বললেন, কীভাবে আপনি সমগ্র আরবের মোকাবেলা করবেন!

মদীনা, মক্কা ও তায়েফ– মাত্র এই তিনটি শহর মুসলমানদের সাথে ছিল। এরমধ্যে মক্কা ইসলাম থেকে বেরিয়ে যাওয়ার চিন্তা করছিল। তায়েফ নগরী মাত্র কিছুদিন আগে ইসলাম গ্রহণ করেছে। তাই প্রকৃতপক্ষে মদীনা ছাড়া অন্য কারো উপর আস্থা রাখা সম্ভব ছিল না। এভাবে সবাই ত্যাগ করায় ইসলাম আবার মদীনায় সীমাবদ্ধ হয়ে পড়লো।

আবু বকর সিদ্দিক (রা) ঘোষণা করলেন, আমি তাদের বিরুদ্ধে লড়াই করবো। এমনকি আমাকে সবাই ছেড়ে চলে গেলেও আমি তাদের বিরুদ্ধে লড়ে যাবো। তখনো সমগ্র আরব জুড়ে বিচ্ছিন্নভাবে অনেক মুসলমান ছড়িয়ে ছিটিয়ে ছিলেন। তিনি তাদেরকে মদীনায় আসতে আহ্বাবান জানালেন। যখনই কয়েক’শ মুসলমান সংগঠিত হতেন, তখনই তিনি তাদেরকে কোনো একটি গোত্রের বিরুদ্ধে লড়াই করতে পাঠিয়ে দিতেন। কয়েক মাসের মধ্যে তিনি ১২টি সেনাদল গঠন করলেন। তবে এগুলো কোনো বিশাল সেনাদল ছিল না। এই সেনাদলগুলোর সম্মিলিত যোদ্ধার সংখ্যা ছিল মাত্র ১০ হাজার। অর্থাৎ কোনো কোনো সেনাদলে এক হাজারেরও কম সেনা ছিল। এই ক্ষুদ্র দলগুলোই সমগ্র আরবের মোকাবেলা করেছে। কিছু কিছু সেনাদলকে তো প্রচণ্ড যুদ্ধ করতে হয়েছে।

ইয়ামামার যুদ্ধে নেতৃত্ব দেন খালিদ বিন ওয়ালিদ (রা)। এ যুদ্ধে মুসলিমদের সংখ্যা ছিল মাত্র তিন হাজার। অন্যদিকে মুসাইলামা কাজ্জাবের ছিল এক লক্ষ সৈন্যের বিশাল বাহিনী।

মাত্র এক বছরের মাঝে সমগ্র আরব আবার ইসলামে ফিরে আসে। বিশ্ব ইতিহাসে আর কোথায় কি এমনটা ঘটেছে? পতনের মাত্র এক বছরের মাঝে একটি সভ্যতা আবার দাঁড়িয়ে গেছে, এমন কোনো নজির কি ইতিহাসে আর একটা আছে?

প্রিয় ভাই ও বোনেরা! আমরা যা নিয়ে কথা বলছি তা অনন্য ও ব্যতিক্রম একটা বিষয়। তা হলো ইসলাম। এটা কোনো সাধারণ জীবনব্যবস্থা, সেনাবাহিনী কিংবা মামুলি কোনো সভ্যতা নয়। এটা হচ্ছে ইসলাম।

ইউরোপ অভিযান

তারপরের বছর অর্থাৎ দ্বাদশ হিজরীতে বিশ্বের সর্ববৃহৎ জাতির বিরুদ্ধে মুসলমানরা অভিযান শুরু করে। ব্যাপারটা যেন এমন– দুই বছরের ব্যবধানে মদীনার মতো ছোট একটি শহর মস্কো এবং ওয়াশিংটনকে আক্রমণ করছে। আমরা যে ঘটনা নিয়ে কথা বলছি, তা ঠিক এমনই। এটাই বাস্তব ইতিহাস। সবাই এগুলো জানে।

হিজরী ১২ সালে মুসলমানরা অভিযান শুরু করে। ১৪ হিজরীতে পারস্যের পতন হয়। ১৫ হিজরীতে রোমানদের পতন ঘটে। এভাবে ৯২ হিজরীতে স্পেন মুসলমানদের অধীনে চলে আসে। ৯৫ হিজরীতে মুসলমানরা ফ্রান্সের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে যায়।

ফ্রান্সে অভিযান পরিচালনাকারীদের মধ্যে অন্যতম একজন ছিলেন আব্দুর রহমান আল গাফেকী। তিনি একটি বিস্ময়কর পরিকল্পনা করেছিলেন। খুব কম লোকই এ সম্পর্কে জানে। আমার লেখা ‘তারিখুল আন্দালুসিয়া’ (আন্দালুসিয়ার ইতিহাস) বইয়ে এই সম্পর্কে বিস্তারিত বর্ণনা রয়েছে।

যাই হোক, মুসলমানরা পূর্ব ও পশ্চিম দিক থেকে ইউরোপের দিকে এগিয়ে গিয়েছিল। কিন্তু উত্তর দিক থেকে অগ্রসর হতে চাইলে কনস্টান্টিনোপল বা ইস্তাম্বুল তাদের সামনে বাধা হয়ে দাঁড়ালো। দুই’শ বছরেও তারা ইস্তাম্বুল জয় করতে পারেনি। ফলে মুসলমানরা উত্তরে ইউরোপের দিকে এগিয়ে যেতে পারছিল না। এই অবস্থায় আব্দুর রহমান আল গাফেকী বললেন, আমি পশ্চিম দিক দিয়ে ইস্তাম্বুলে আক্রমণ চালাবো। পশ্চিম তথা স্পেন, ফ্রান্স– এসব অঞ্চল দিয়ে ঢুকে আমি ইউরোপ জয় করবো।

ইউরোপ অভিযান স্থগিত

আল গাফেকী অগ্রসর হতে থাকলেন। কিন্তু তৎকালীন উমাইয়া খলিফা তাকে আর অগ্রসর হতে নিষেধ করলেন। কারণ তিনি মাত্র দুই হাজার চার’শ সৈন্য নিয়ে ইউরোপ অভিযানে যাচ্ছিলেন। যেখানে সমগ্র ইউরোপের সম্মিলিত সৈন্য সংখ্যা ৭০ লাখের কম নয়। তাই খলিফা তাকে থামিয়ে দিয়ে বললেন, ‘এটা করতে যাবেন না। এটা খুবই বিপজ্জনক কাজ।’ তবে আমার মনে হয়, তাকে অগ্রসর হওয়ার অনুমতি দিলে ইতিহাস হয়তো অন্যভাবে লিখতে হতো।

যাই হোক, এক’শ বছরেরও কম সময়ের মধ্যে কোন জাতির অধীনে সবচেয়ে বেশি অঞ্চলের কর্তৃত্ব ছিল? সর্ববৃহৎ সেনাবাহিনী কার ছিল? বিজ্ঞান, গণিত ও জ্যোতির্বিদ্যায় কারা অগ্রগামী ছিল? দর্শন, যুক্তিবিদ্যা, কাব্যসহ জীবনের সকল ক্ষেত্রে কারা এগিয়ে ছিল? শ্রেষ্ঠ সভ্যতা কারা গড়ে তুলেছিল?

এসব প্রশ্নের উত্তর হচ্ছে– মুসলমানগণ।

মো: হাবিবুর রহমান হাবীব
মো: হাবিবুর রহমান হাবীব
প্রাক্তন শিক্ষার্থী, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ, চবি। সমাজ উন্নয়ন কর্মী। Email: habibircu5@gmail.com

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *