শনিবার, সেপ্টেম্বর ২৩, ২০১৭
হোম > সমসাময়িক > তিউনিশিয়ায় ইসলামপন্থীদের মতাদর্শিক সমঝোতা (পর্ব-৩)

তিউনিশিয়ায় ইসলামপন্থীদের মতাদর্শিক সমঝোতা (পর্ব-৩)

এডিটরস নোট:

বিশ্বব্যাপী ইসলামপন্থা একটি পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। ব্রুকিংস ইন্সটিটিউশনের সিনিয়র রিসার্চ ফেলো শাদি হামিদ তার Islamic Exceptionalism: How the Struggle Over Islam Is Reshaping the World শীর্ষক বইয়ে এই পরিবর্তনের একটি চিত্র এঁকেছেন। Tunisia: Islamists Conceding Their Islamism শিরোনামে বইটিতে একটি চ্যাপ্টার রয়েছে। তিউনিশিয়ার রাজনীতি, বিশেষত সেখানকার ইসলামপন্থীদের কর্মকৌশল বোঝাপড়ার একটা চেষ্টা আমরা করে যাচ্ছি। এরই অংশ হিসেবে সিএসসিএস-এর পাঠকদের জন্য এই চ্যাপ্টারটির ধারাবাহিক অনুবাদ করছেন মাসউদুল আলম। আজ ছাপা হলো তৃতীয় পর্ব।


প্রথম পর্ব | দ্বিতীয় পর্ব | শেষ পর্ব


আন নাহদার নেতৃবৃন্দের মধ্যে যারা নীতি পরিবর্তনের ক্ষেত্রে অনড় বা কঠোর মনোভাবসম্পন্ন, তাদের মাঝে শায়খ হাবিব আল লাউজ অন্যতম। দলটির ইসলামী পরিচয় যেন অক্ষুন্ন থাকে, সে জন্য তিনি নিজ উদ্যোগে এক ধরনের অভিভাবকের  ভূমিকা পালন করেন। দলটি দিন দিন আপসের দিকে এগিয়ে যাওয়ায় তিনি উদ্বিগ্ন। ১৯৮০’র দশকের শেষ দিকে আন্দোলনটি যখন নিজের নাম ‘হারাকাত আল ইতিজাহ আল ইসলামীর’ পরিবর্তে ‘আন নাহদা’ গ্রহণের সিদ্ধান্ত নেয়, তখনো তিনি এই সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করেছিলেন। দুই দশক পর এখনো তিনি একই ধরনের সংগ্রাম করে যাচ্ছেন। ২০১৩ সালের ফেব্রুয়ারিতে সংসদীয় অধিবেশনের একটা উত্তেজনাপূর্ণ সময়ে আমি আল লাউজের সাথে প্রথমবারের মতো দেখা করি। আন্দোলনটির এই অন্যতম ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্ব এখন বেশ বৃদ্ধ। তের বছরের নির্জন কারাবাসকালে তার একটি চোখ অন্ধ হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু তাকে দেখতে বিশ বছরের প্রাণবন্ত যুবকের মতোই মনে হচ্ছিল। ইতিহাস নিজের পক্ষে ছিল বলে বিশ্বাসী কোনো ব্যক্তি যেভাবে আত্মবিশ্বাসের সাথে কথা বলে, তিনি সেভাবেই কথা বলছিলেন। নিছক কৌশল হিসেবে মধ্যপন্থার দিকে দলের এগিয়ে যাওয়াকে তিনি নাকচ করে দেন। তিনি আমাকে বলেছেন, “আমাদের মধ্যে এমন কেউ নেই, যিনি শরীয়াহ আইনে বিশ্বাস রাখেন না। আমাদের সবাই বিশ্বাস করে, একদিন মদ নিষিদ্ধ করা হবে। আমাদের ইসলামী আইডিয়াগুলো সর্বোৎকৃষ্ট পদ্ধতিতে কীভাবে তুলে ধরা যায়, সেটা নিয়েই কেবল আমাদের মতদ্বৈততা।”[1]

দুই বছর পর যখন তার সাথে আমি আবার দেখা করলাম, তখন তিনি আগের মতো নিঃশঙ্ক ছিলেন না। এই দুই বছরে অনেক কিছু পরিবর্তিত হয়ে গেছে। তিনি যে অপ্রাসঙ্গিক হয়ে পড়ছেন, তা বুঝতে পারছেন। তিনি আমাকে আন নাহদার সদর দপ্তরে দেখা করতে বলেছিলেন। কিন্তু সেখানে তো প্রায় সবাই তার থেকে ভিন্ন চিন্তাধারা পোষণ করে। তাই আমি ভাবলাম, তিনি যেহেতু দলের নতুন দৃষ্টিভঙ্গির সাথে আসলেই মানিয়ে নিতে পারছেন না, তাই সেখানে তার সাথে দেখা করাটা উচিত হবে না। সদর দপ্তরের কর্মকর্তাদের অধিকাংশই তরুণ। যাদের কমন পোশাক হলো সাদা শার্ট, কালো স্যুট, মানানসই চিকন কালো টাই। যেন আমরা একটি ফ্যাশন শুট সেশনে এসে পড়েছি– স্যুটগুলো চোখে পড়ার মতো সুন্দর করে বানানো এবং পরনের প্যান্টগুলো বেশ সরু। অন্যদিকে, আল লাউজ পরিধান করেন ঐতিহ্যবাহী জোব্বা, মাথায় থাকে লাল পশমি টুপি (তিউনিশিয়ায় এটি ‘শাশিয়া’ নামে পরিচিত)। যা হোক, আমরা একটি বড় কনফারেন্স রুমের এক প্রান্তে বসলাম। কিন্তু কিছু লোক সেখানে উচ্চস্বরে কথাবার্তা বলছিল। আন্দোলনটির একজন ঐতিহাসিক নেতা যে এখানে বসে সাক্ষাৎকার দেয়ার চেষ্টা করছেন, তারা তা খেয়ালই করছিল না। ফলে স্টাফদেরকে তিনি একটি শান্ত রুমের ব্যবস্থা করতে বললেন। কিছুক্ষণ পর আমরা এই পাঁচতলা ভবনটির টপ ফ্লোরের একটি ছোট রুমে স্থানান্তরিত হই।

দ্বিমত পোষণ করলেও আল লাউজ সবসময় দলের প্রতি অনুগতই ছিলেন। কিন্তু এবার তিনি দলের ব্যাপারে তার খোলামেলা ও ছাঁচাছোলা সমালোচনা তুলে ধরলেন। তিনি সমালোচনাগুলোর একটা তালিকা দিলেন এবং একে একে সবগুলো নিয়ে বিস্তারিত বললেন। প্রথমত, কর্মকর্তাদের তৈরি করা দায়সারা, সাদামাটা ও রেডিমেড প্রচারণায় সীমাবদ্ধ থাকলে নির্বাচনে হেরে যাওয়াই তো আন নাহদার জন্য স্বাভাবিক ব্যাপার। তিনি আরো বলেছেন, সেক্যুলারদের কাছে পৌঁছানোর যত চেষ্টাই আপনি করেন, তারা সবসময় আপনাকে সন্দেহ করবে।[2] তবে নির্বাচনী কৌশল নিয়ে মতদ্বৈততার ব্যাপারটি আরো জটিল। নির্বাসিত অবস্থায় যারা বড় হয়েছে কিংবা আন্দোলনের সংস্পর্শ যারা পায়নি, সেসব তরুণরা দলের নেতৃত্বে চলে আসায় তিনি উদ্বিগ্ন। তার মতে, এটাকে কৌশল হিসেবে নিলেও অচিরেই এর জন্য মূল্য দিতে হবে। আপনি যদি বার বার কোনো কিছু বলতে থাকেন, তাহলে এক পর্যায়ে আপনি তা বিশ্বাসও করতে শুরু করবেন। তবে দিন শেষে কেউই মনে করছে না যে, তারা ‘ডবল ডিসকোর্সে’ লিপ্ত আছে (আন নাহদার বিরোধীরা সবসময় এই অভিযোগই করে থাকে)। আপনি যা প্রকাশ্যে বলেন ও করেন এবং আপনি যা বিশ্বাস করেন– এ দুইয়ের মাঝখানে ব্যবধান কমিয়ে আনতে হলে আপনাকে সম্ভবত আপনার বিশ্বাসের দিকেই ফিরে যেতে হবে। এখন কেউ বলতে পারে, এটাই তো রাজনীতির মূলকথা। (আবার এটি বিপরীতভাবেও সত্য হতে পারে। অর্থাৎ, নির্বাচনী রাজনীতির সুবিধার জন্য ‘মধ্যপন্থীরা’ বেশি বেশি রক্ষণশীল ধ্যানধারণার কথা বলে থাকতে পারে এবং সময়ের ব্যবধানে, তাদের ব্যবহৃত এইসব রেটরিক তারা নিজেরাই বিশ্বাস করা শুরু করতে পারে।)

আন নাহদা যে ‘ব্যতিক্রমধর্মী’ এবং অত্যন্ত প্রগতিশীল একটি ইসলামপন্থী দল, এর একটি নিদর্শন হলো দলটি নানা মতের ব্যক্তিদেরকে নেতৃত্বে স্থান দিয়েছে। তাদের এই আত্ম-উপলব্ধি তাদেরকে সমাজের মূলধারায় পরিচালিত করেছে। এর ফলে তাদের রক্ষণশীল অংশ অসন্তুষ্ট হলেও যথেষ্ট নাড়া খেয়েছে। ‘আমরা গর্বিত’– এই কথাটা তাদের মুখে আমি অনেকবার শুনেছি। ‘ইসলাম ও গণতন্ত্রের মধ্যে সমন্বয় সম্ভব’– সন্দেহবাদী সেক্যুলারসহ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের নিকট এই বক্তব্য তুলে ধরে নিজেদের প্রতি আরোপিত অভিযোগকে ভুল প্রমাণ করার মধ্যে নিশ্চয় এক ধরনের ভালো লাগা কাজ করে।

এর পাশাপাশি ব্যক্তিও গুরুত্বপূর্ণ। অন্যান্য ইসলামপন্থী আন্দোলনে বড় মাপের চিন্তাবিদ বা তাত্ত্বিকের অভাব রয়েছে। গত কয়েক দশকে মিশরের ব্রাদারহুডে এমন কেউ নেই। অন্যদিকে, আন নাহদার ক্ষেত্রে রশিদ ঘানুশীর মতো বড় মাপের একজন তাত্ত্বিক রয়েছেন। যিনি দলটির জন্য একটি স্বতন্ত্র ভিশন দাঁড় করিয়েছেন। তুর্কি মডেলকে আন নাহদার অনুপ্রেরণার বড় উৎস মনে করা হলেও একেপির সাথে আন নাহদার স্পষ্ট পার্থক্য রয়েছে। এই দুই পার্টির মতাদর্শিক মিলের জায়গাটি হলো– উভয় দলই ব্রাদারহুড ঘরানার নমনীয় এবং অধিক সেক্যুলারবান্ধব একটি ধারা। এরদোয়ান হচ্ছেন ইস্তাম্বুলের তৃণমূল থেকে উঠে আসা একজন দক্ষ রাজনীতিবিদ। তিনি তার ধর্মীয় পরিচয়ে ফিরে গেছেন। কারণ, কিছু ক্ষেত্রে এটি কাজ দিয়েছে। অন্যদিকে ঘানুশী হলেন একজন ইন্টেলেকচুয়াল। তাই নির্বাচনে জেতার চেয়েও তার কাছে অধিক গুরুত্বপূর্ণ হলো নিজের অবস্থানকে সঠিক প্রমাণ করা। কিন্তু অনুসারীরা ব্যাপারটির গুরুত্ব অনুধাবন করার আগেই হয়তো দলীয় প্রধান হিসেবে কয়েকটি নির্বাচনে তিনি হেরে যেতে পারেন। ঘানুশীর জীবনী লেখক আজ্জাম তামিমী (যিনি নিজেও হামাসের সাথে সংশ্লিষ্ট একজন সুপরিচিত ইসলামপন্থী) আমাকে এ ব্যাপারে বলেছেন, “ঘানুশী নিজেই বিভিন্ন সময় স্ববিরোধী কাজ করেছেন। কারণ, একজন ইসলামী চিন্তাবিদ হিসেবে তিনি একভাবে চিন্তা করেছেন, কিন্তু একই সময়ে রাজনীতিবিদ হিসেবে তাকে ভিন্নভাবে কাজ করতে হয়েছে। এই দুইয়ের মধ্যে সবসময়ই একটা টানাপড়েন রয়ে গেছে।”[3]

কিছু বিষয় বিবেচনায় ঘানুশীর ভিশন হয়তো স্বতন্ত্র একটা কিছু। তবে তিউনিশিয়ার রাজনীতির বাস্তবতায় তার পদক্ষেপের ফলাফল সবসময় সঙ্গতিপূর্ণ বা সুস্পষ্ট নয়। আন নাহদা কি একটি বিপ্লবী দল, নাকি সংস্কারপন্থী? উল্লেখ্য, আগের মতো দলটির বিপ্লবী চরিত্র অক্ষু্ন্ন নেই– এই অভিযোগ তুলে ইতোমধ্যে বেশ কয়েকজন সুপরিচিত নেতা দল ত্যাগ করেছেন। দলটি মন্ত্রী পরিষদের একটি পদ গ্রহণ করায় তারা কি সরকারী দল, নাকি বিরোধী দল; নাকি একই সাথে উভয়ই? আন নাহদা কি একটি আন্দোলন, নাকি পার্টি; নাকি উভয়টিই? যদি উভয়টিই হয়, তাহলে তা কি টেকসই হবে? দলটি নিজেই যখন ধর্মীয় রেফারেন্সের গুরুত্ব কমিয়ে দিচ্ছে, সেখানে ‘এটি এমন একটি দল, ধর্মীয় রেফারেন্স যার ভিত্তি’ এ কথার মানে আসলে কী?

আন নাহদা এবং ইসলামিস্ট এক্সেপশনালিজমের সমস্যা

দশকের পর দশক ধরে চাপিয়ে দেয়া সেক্যুলারাইজেশনের অবসানের দ্বারপ্রান্তে এসে তুরস্কের মতো তিউনিশিয়াও পরীক্ষা-নিরীক্ষার একটি তাৎপর্যপূর্ণ ক্ষেত্র হয়ে ওঠেছে। দেশটির সেক্যুলার প্রেক্ষাপটে ইসলামের পুনর্জাগণের তৎপরতা কীভাবে সাধিত হচ্ছে? ঘানুশীর পরিকল্পনা ছিল ইসলামপন্থা, এমনকি সম্ভবত ‘ইসলামের’ মধ্যেও (ইসলাম ও ইসলামপন্থা– এ দুটিকে পরস্পর সম্পর্কিত ধরে নিয়ে) পরিবর্তন আনা। এটি করতে গিয়ে তিনি তার পুরো জীবনের অর্জনকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলে দিয়েছিলেন। তার চিন্তা ছিল ইসলাম ও ইসলামপন্থাকে ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থায় ফিরিয়ে আনতে পারলে মতাদর্শিক বিভাজন থেকে বেরিয়ে আসা যাবে। এটি খুবই দারুণ চিন্তা ছিল। বহুকাল পূর্বে ঐক্য ও সংহতির মূল সূত্র ছিল ইসলাম। কিন্তু ইসলামপন্থা এসে একে রাজনৈতিকীকরণ করেছে। এটা ইসলামপন্থার অন্যতম বড় ব্যর্থতা (কিংবা, সফলতা। এটি নির্ভর করে আপনার দৃষ্টিভঙ্গির উপর)।

ঘানুশীর বন্ধু ও সমমনা আব্দুল মোনায়েম আবুল ফুতুহ স্পষ্টত এই কারণেই মিশরের মুসলিম ব্রাদাহুড থেকে পদত্যাগ করেছিলেন। ২০১২ সালে প্রেসিডেন্ট পদের জন্য বিদ্রোহী প্রার্থী হিসেবে প্রচারণার সময় তিনি একটি সালাফী টিভি চ্যানেলের সাথে সাক্ষাৎকারে ঘোষণা করেছিলেন, ‘বর্তমানে যারা নিজেদেরকে লিবারেল কিংবা বামপন্থী হিসেবে দাবি করে, তাদের অধিকাংশই ইসলামী মূল্যবোধকে মেনে চলে ও সম্মান করে। এটা নিছক একটি রাজনৈতিক পরিচয় মাত্র। তারা শরীয়াহ সমর্থন করে এবং কখনোই এর বিরোধিতা করে না।”[4] আবুল ফুতুহর মতে, এক দৃষ্টিতে সকল মুসলমানই সালাফী। যেহেতু সবাই ইসলামের প্রাথমিক যুগের একনিষ্ঠ মুসলিম তথা সালাফদের অনুসরণ করে থাকেন। যেন তিনি বলতে চাচ্ছেন, কার্যত আমরা সকলেই তো ইসলামপন্থী, তাহলে কেন আমরা এ নিয়ে মতবিরোধে লিপ্ত?

মতবিরোধ হওয়ার যথেষ্ট কারণ নিশ্চয় ছিল। তাই একটি মধ্যপন্থী অবস্থানে যাওয়ার জন্য আন নাহদা যতই চেষ্টা করুক না কেন, দিন শেষে দলটির পরিচয় আন নাহদাই রয়ে গেছে। যদি আন নাহদা এই পরিচয় ত্যাগ করে একটি ‘লিবারেল’ দলে পরিণত হওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়, তাহলে কী ঘটবে? আপাতদৃষ্টিতে হয়তো মনে হবে, একটি ইসলামপন্থী দলের চেয়ে বিদ্যমান অন্যান্য লিবারেল দলগুলোই লিবারেল হিসেবে ভালো। যদিও ঘানুশী অনেক বেশি উদারতা দেখাতে রাজি।[5] আন নাহদা আগের পরিচয় থেকে সরেও আসলেও অন্য কেউ এসে সেই শূন্যস্থান ঠিকই পূরণ করে নেবে। যতদিন পর্যন্ত একটি পরিপূর্ণ ইসলামী রাজনীতির আবেদন থাকবে, ততদিন কেউ না কেউ তা পূরণ করে চলবে।

তবে এখানে আরেকটা সমস্যা আছে। কথা ও কাজে আন নাহদা সম্ভবত ঠিকই আছে, কিন্তু তারপরও সন্দেহ থেকেই যায়। আর ব্যাপারটা এমন কিছুও নয়, যার উপর দলের নেতাদের নিয়ন্ত্রণ আছে। অন্যদিকে, ইসলামপন্থীরা ইসলামপন্থী হওয়ার কারণেই সেক্যুলাররা ইসলামপন্থীদেরকে ঘৃণা বা অবিশ্বাস করে। ইসলামপন্থীরা বাস্তবে কী করে, সেটা তাদের বিবেচ্য বিষয় নয়। এটা সত্য যে, আন নাহদার সংস্পর্শে এসে লোকজন রক্ষণশীল প্র্যাকটিসিং মুসলিম হিসেবে গড়ে ওঠে। যেমন, কোনো মিটিংয়ের আগে বা পরে দলীয় নেতৃবৃন্দ সাধারণত জামায়াতের সাথে নামাজ আদায় করে। ইসলাম হলো তাদের শুরুর পয়েন্ট, এমনকি শেষ পয়েন্টও বটে। তবে এর মাঝখানে কোনো বিষয়ে তারা যা কিছু বলে, সেগুলো নিয়ে তাদের মাঝে বেশ মতদ্বৈততা রয়েছে।

ঘানুশীর সাথে সাক্ষাৎ শেষে তার সহকারী আমাকে খুব সম্মানের সাথে পরবর্তী মিটিংয়ে পৌঁছে দিয়েছিলেন। দেখেই মনে হয়েছে এই ব্যক্তি অত্যন্ত পরহেজগার। আন্দোলন ও শায়খের (আন নাহদার কর্মীরা ঘানুশীকে শ্রদ্ধার সাথে ‘শায়খ’ বলে সম্বোধন করে) নেতৃত্বের উপর স্থাপিত গভীর আস্থার উপর ভিত্তি করেই এই সহকারী জীবন সম্পর্কে তার দৃষ্টিভঙ্গি গড়ে তুলেছেন বলে মনে হলো। নীরবতার কারণে গাড়ির ভেতর একটা অস্বস্তিকর পরিবেশ তৈরি হয়েছিল। পরিবেশটাকে  হালকা করতে আমি আলাপ শুরু করার চেষ্টা করলাম। শীঘ্রই আমরা আলাপে মগ্ন হয়ে পড়লাম। এক পর্যায়ে জানতে চাইলাম, মদ্যপায়ী কোনো ব্যক্তি আন নাহদায় যোগ দিতে পারে কিনা। এ ধরনের প্রশ্নের জন্য তিনি প্রস্তুত ছিলেন না। যা হোক, তিনি দলের সদস্য হওয়ার শর্তগুলো বিস্তারিতভাবে জানালেন। সদস্যপ্রার্থীর নৈতিক চরিত্রের ব্যাপারে কাউকে সাক্ষ্য দিতে হয়। এই প্রক্রিয়াটি ‘তাজকিয়া’ হিসেবে পরিচিত। মদ পানকারী কোনো ব্যক্তি প্রথম সুযোগেই আন নাহদার সদস্য হয়ে যাবে, এমনটা অসম্ভব প্রায়। অবশ্য কেউ যদি মদ পান ছেড়ে দিয়ে ভালো মুসলমান হওয়ার ইচ্ছা পোষণ করে, তাহলে সম্ভবত তার পক্ষে দলে যোগদান করা সম্ভব।

এই দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে বলা যায়, একটি আধুনিক দলের যাবতীয় বৈশিষ্ট্য থাকা সত্ত্বেও আন নাহদা যথেষ্ট আধুনিক নয়। বরং অনেকটা পরিবারের মতো। আন নাহদার সাবেক নেতা রিয়াদ শাইবি আমার কাছে ব্যাপারটা বর্ণনা করেছেন এভাবে, “দল ত্যাগ করাকে অনেকটা ধর্মত্যাগের মতো ব্যাপার হিসেবে দেখা হয়।”[6] অধিকাংশ ইসলামপন্থী দলের মতো আন নাহদাও ‘শুমুলি’, অর্থাৎ সবার্ত্মকবাদী ধারার দল। ব্রাদারহুড ঘরানার সংগঠনগুলোর প্রাথমিক পরিচয় হলো, এরা দল নয়, মূলত আন্দোলন। এর মানে হলো, এটি জীবনের সকল দিককে পরিবেষ্টন করে আছে। এই সংগঠনগুলো ধর্মীয় শিক্ষা প্রদান করে এবং নানা ধরনের সাহায্য-সহায়তামূলক কাজকর্ম করে থাকে। সংগঠনের সদস্যরা যখন সমাজে একঘরে হয়ে যাওয়ার আশঙ্কায় ভোগে, সংগঠন তখন তাদেরকে ভ্রাতৃত্ববোধ ও গোষ্ঠীবদ্ধতার চেতনায় আবদ্ধ করে। সম্ভবত এটাই এই সংগঠনগুলোর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার। রাষ্ট্র শক্তিশালী হয়ে ওঠলে এবং সমাজ দুর্বল হয়ে পড়লে যে ধরনের শূন্যতা তৈরি হয়, তা পূরণে তারা এগিয়ে আসে। স্বৈরাচারী শাসনামলে তাদের কোনো কর্মী যখন অন্যায়ভাবে জেল খাটে, তখন ওই কর্মীর পরিবারকে তারা প্রয়োজনীয় আর্থিক, আইনগত ও নৈতিক সাপোর্ট দিয়ে থাকে।

একাডেমিকরা সঙ্গত কারণেই ইসলামপন্থীদের ময়দানের তৎপরতার দিকে মনোযোগী হয়েছেন। হ্যাঁ, দৃশ্যমান তৎপরতা পর্যবেক্ষণ করা সহজ। এটাকে আপনি মূল্যায়ন করতে পারেন। এটা বোধগম্য ব্যাপার। কিন্তু ইসলামপন্থীদের প্রকৃত পরিচয় কী, তার উপর ফোকাস করা বেশ কঠিন। কারণ, একজন ব্যক্তির মনের খবর কখনোই সত্যিকার অর্থে জানা যায় না। এর মানে হলো, ইসলামপন্থী সংগঠনগুলো যে ধরনের লোক তৈরি করছে, তার পরিবর্তে আমরা কেবল কিছু নির্দিষ্ট টার্ম বা রেটরিক বিশ্লেষণ করেই এসব সংগঠনকে বুঝার চেষ্টা করি। যদিও এসব সংগঠনের ব্যাপারে অনেক গুরুত্বপূর্ণ সমালোচনা রয়েছে, তারপরও তাদের ‘সর্বাত্মকবাদী’ বৈশিষ্ট্য (‘encompassing’ nature) অনালোচিত রয়ে গেছে। এই সংগঠনগুলোর ব্যাপারে যেসব উপসংহার টানা হয়, আসলে তারা এরচেয়েও বেশি কিছু। তারা একটি আন্দোলন। তাদের সদস্যপদ গ্রহণের গভীর তাৎপর্য রয়েছে। এই সংগঠনগুলোর সদস্যপদের কাঠামো সাধারণত ক্রমসোপনমূলক হয়ে থাকে। বিশেষত ব্রাদাহুড ঘরানার সংগঠনগুলোর ক্ষেত্রে এটি বিশেষভাবে সত্য। যা হোক, আন নাহদা হলো একের ভেতর দুই, অর্থাৎ একইসাথে দল ও আন্দোলন। তাই দলটিতে কেউ যোগ দিতে চাইলে তাকে আগে আন্দোলনের দৃষ্টিভঙ্গিকে মেনে নিতে হয়। আইনী বাধ্যবাধকতার কারণে সরকার অনুমোদিত দলগুলোতে যে কেউ যোগ দিতে পারে। সেদিক থেকে যে কেউ আন নাহদায়ও যোগ দিতে পারে। অন্তত তাত্ত্বিকভাবে এটি সত্য। কিন্তু আন নাহদা কিংবা অন্য যে কোনো বড় মাপের ইসলামপন্থী দলের বাস্তব অবস্থান এর থেকে ভিন্ন। আন নাহদার টিপিক্যাল সদস্যদের ব্যাপারে বলতে গিয়ে রিয়াদ শাইবি বলেছেন, “তারা নিজেদেরকে সমাজের অংশ মনে করে না। তারা মনে করে, তারা হলো উত্তম। এই ধার‍ণা তাদেরকে আত্মতুষ্টির দিকে নিয়ে যায়। তারা তখন ভাবে, ‘আমরা নিছক জাতির সদস্য মাত্র নই… আমরাই হলাম জাতির বিবেক।’

এমনকি আন নাহদার সবচেয়ে প্রাগ্রসর ব্যক্তিরাও প্রচ্ছন্নভাবে মনে করেন, ব্যক্তি হিসেবে তারা অন্যদের চেয়ে আলাদা। তারা অনেক কিছু করেছে এ জন্য নয়, বরং নিজেদের সম্পর্কে তাদের যে ধারণা সে কারণেই তারা এমনটি ভাবে। এ ব্যাপারে ঘানুশীর ঘনিষ্ট সহযোগী নুরুদ্দীন আরবাউয়ীর সাথে আমার আরো কিছু ইন্টারেস্টিং কথাবার্তা হয়েছে। ধর্মের গুরুত্বকে কমিয়ে দেশের সবচেয়ে দক্ষ লোকদের নিয়ে আন নাহদাকে নতুন করে সংগঠিত করার মাধ্যমে দলটির যে নতুন পরিচয় দাঁড়িয়েছে, তিনি এর প্রবল সমর্থক। আমি তাকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, দারিদ্র্য বিমোচন ও কর্মসংস্থান প্রশ্নে অন্য যে কোনো সেক্যুলার দল থেকে আন নাহদাকে কেউ বেশি দক্ষ মনে করবে কেন, যেখানে সেক্যুলার দলগুলোতে আরো বড় বড় অর্থনীতিবিদ রয়েছে এবং সরকার পরিচালনার অভিজ্ঞতাও তাদের বেশি? তখন তিনি স্বীকার করেন, “আন নাহদা, নিদা তিউনেস কিংবা অন্যান্যদের কর্মসূচির মধ্যে মিল রয়েছে, এটা সত্য। তাহলে আমরা এমন কী করলাম, যার জন্য নাগরিকরা আন নাহদাকে ভোট দেবে? এরদোয়ানের মতো বলতে চাই, আমরা চুরি করি না।” বিষয়টিকে ব্যাখ্যা করতে গিয়ে তিনি ২০০৬ সালের নির্বাচনে ফিলিস্তিনীরা ফাতাহর পরিবর্তে হামাসকে কেন ভোট দিয়েছিল, সেই উদাহরণ তুলে ধরেন:

হামাস যখনই কোনো কর্মসংস্থানমূলক প্রজেক্টের জন্য তহবিল সংগ্রহ করতে পেরেছে, তার শতকরা ৯০ টাকাই প্রাপ্য ব্যক্তিরা পেয়েছে। বড়জোর ১০ টাকার দুর্নীতি হয়তো হয়েছে। কিন্তু আপনি যদি একই প্রজেক্টের জন্য এই একশ টাকা ফাতাহকে দিতেন, তাহলে ৯০ টাকাই দুর্নীতির কারণে নষ্ট হয়ে যেত।[7]

আমার কাছে মনে হয়েছে, আরবাউয়ী পাশ্চাত্যের লোকদেরকে কথা বিবেচনায় রেখে এভাবে চিন্তা করেছেন। ইসলামপন্থীদের ব্যাপারে লোকদের মনে যদি কোনো ভীতি থেকে থাকে, তা যেন  দূর হয়। যেন ইসলামপন্থীরা পুরোপুরি সেক্যুলারদের মতোই, বরং তাদের চেয়েও ভালো। কারণ তারা কম দুর্নীতিগ্রস্ত। নিছক সৎ থাকা এবং একটি চমৎকার অর্থনৈতিক কর্মসূচি হাজির করাই রাজনীতিবদদের জন্য যথেষ্ট, বাকি সবকিছু অন্যদের মতোই চলবে– তারা সত্যিই যদি এমনটি ভেবে থাকে, তাহলে তা নিছক সরলতা মাত্র। কিন্তু আরবাউয়ীর মন্তব্য শুনতে যত নির্দোষই মনে হোক না কেন, এটা ইসলামপন্থীদের ধর্মীয় কমিটমেন্টের পরিপন্থী। কারণ, ইসলামপন্থীরা শুধু ভালো মানুষই নয়, ভালো রাজনীতিবিদ হওয়ার ব্যাপারেও প্রতিজ্ঞাবদ্ধ। এর মানে হলো, ইসলামপন্থী দলগুলো নিজেদেরকে যে ধরনের ‘স্বাভাবিক’ দল হিসেবে দাবি করে, শতভাগ আন্তরিকতা থাকা সত্ত্বেও তারা কখনোই তেমনটি হতে পারবে না।

যা হোক, স্বৈরাচারী শাসনামলে এই ধরনের প্রবণতা থাকাটা খুব একটা সমস্যাজনক নয়। কিন্তু ইসলামপন্থীদের কাঁধে সরকার পরিচালনার দায়িত্ব এসে পড়ার পর এটা নিশ্চয় একটা ইস্যু। প্রতিষ্ঠিত গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় সাধারণত সরকারী দলগুলোর পক্ষে প্রভাব বিস্তারসহ নানা ধরনের সুযোগ-সুবিধার পথ খোলা থাকে। কিন্তু এর সুযোগ নিয়ে আপনি যদি ক্ষমতা কেন্দ্রে একটি বিশেষ ধর্মীয় কিংবা নৈতিক প্রাধান্য তৈরি করতে চান, তাহলে এক ধরনের গণবিচ্ছিন্নতা (perception of exclusion) তৈরি হতে পারে। তিউনিশিয়ায় আন নাহদা ও মিশরে ব্রাদারহুড অল্প যে কয়েকদিন ক্ষমতায় ছিল, সে সময় নন-ইসলামিস্ট শিবিরে এ রকম ধারণাই ছড়িয়ে পড়েছিল। তাদের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রকে ‘ব্রাডারহুডকরণের’ অভিযোগ জোরালো হয়ে উঠেছিল। বিরোধীদের এই দাবি অনেক বেশি অতিরঞ্জিত হলেও তারা ছিল বরাবরই সক্রিয়। তাদের মধ্যে ভেতরে ভেতরে এমন ভীতি কাজ করেছে যে, ইসলামপন্থীরা অত্যন্ত গোঁড়া। তাদেরকে কিছু শোনানো যায় না। তারা অন্য যে কিছুর চেয়ে সাংগঠনিক স্বার্থকে বেশি  গুরুত্ব দেয়। যে কোনো গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় রাজনৈতিক দলগুলো দলের সদস্যদেরকে উচ্চ পদগুলোতে নিয়োগ দিয়ে থাকে। কিন্তু একটি রক্ষণশীল আন্দোলনের ক্ষেত্রে বিষয়টি একটু অন্য রকম। কেননা, এ ধরনের আন্দোলন দলীয় ব্যবস্থাকে ছাড়িয়ে যায়। তারা নিজেদের এমন সদস্যদেরকেই নিয়োগ দান করে, যারা সামষ্ঠিকভাবে আনুগত্যের সুগভীর বন্ধনে আবদ্ধ।

রেফারেন্স ও নোট

[1] লেখকের সাথে আলাপচারিতা, হাবিব আল লাউজ, ফেব্রুয়ারি ১৪, ২০১৩।

[2] লেখকের সাথে আলাপচারিতা, হাবিব আল লাউজ, ফেব্রুয়ারি ১০, ২০১৫।

[3] লেখকের সাথে আলাপচারিতা, আজ্জাম তামিমী, ফেব্রুয়ারি ২, ২০১৫।

[4] See Abdel Moneim Abul Futouh, interview, February 5, 2012, YouTube, http://www.youtube.com/watch?

v=hgWJRuVOyDc&list=UUQpLme0GRI0L8MRC_d2aSrA&index=9&feature=plcp&fb_source=message.

[5] আন নাহদার অন্যান্য নেতৃবৃন্দের মতো রশিদ ঘানুশী নিজেকে ‘ইসলামপন্থা’ কিংবা ‘ইসলামপন্থী’ থেকে আলাদা করেননি। তিনি নিজেকে বৃহত্তর ‘ইসলামী আন্দোলনের’ একজন নেতা হিসেবেই বিবেচনা করেন।

[6] লেখকের সাথে আলাপচারিতা, রিয়াদ শাইবি, ফেব্রুয়ারি ১০, ২০১৫।

[7] লেখকের সাথে আলাপচারিতা, নুরুদ্দীন আরবাউয়ী, ফেব্রুয়ারি ১১, ২০১৫।

আপনার মন্তব্য লিখুন