শনিবার, সেপ্টেম্বর ২৩, ২০১৭
হোম > সমসাময়িক > তিউনিশিয়ায় ইসলামপন্থীদের মতাদর্শিক সমঝোতা (পর্ব-২)

তিউনিশিয়ায় ইসলামপন্থীদের মতাদর্শিক সমঝোতা (পর্ব-২)

এডিটরস নোট:

বিশ্বব্যাপী ইসলামপন্থা একটি পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। ব্রুকিংস ইন্সটিটিউশনের সিনিয়র রিসার্চ ফেলো শাদি হামিদ তার Islamic Exceptionalism: How the Struggle Over Islam Is Reshaping the World শীর্ষক বইয়ে এই পরিবর্তনের একটি চিত্র এঁকেছেন। Tunisia: Islamists Conceding Their Islamism শিরোনামে বইটিতে একটি চ্যাপ্টার রয়েছে। তিউনিশিয়ার রাজনীতি, বিশেষত সেখানকার ইসলামপন্থীদের কর্মকৌশল বোঝাপড়ার একটা চেষ্টা আমরা করে যাচ্ছি। এরই অংশ হিসেবে সিএসসিএস-এর পাঠকদের জন্য এই চ্যাপ্টারটির ধারাবাহিক অনুবাদ করছেন মাসউদুল আলম। আজ ছাপা হলো দ্বিতীয় পর্ব।


প্রথম পর্ব | তৃতীয় পর্ব | শেষ পর্ব


আন নাহদার এই কৌশল কি দূরদর্শী রাজনীতির অংশ, নাকি উচ্চাকাঙ্খী চিন্তা– তা নির্ভর করছে আপনি ব্যাপারটাকে কীভাবে দেখছেন। কারো পক্ষে যতটুকু স্বচ্ছতার কথা কল্পনা করা সম্ভব, ২০১৪ সালের নির্বাচনী প্রচারণায় আন নাহদা ততটুকু স্বচ্ছতাই দেখিয়েছে। যদিও অধিকাংশ দলই তা করেনি। দলটি ইসলামপন্থার উপর কম গুরুত্ব দিয়েছে এবং নিজেদেরকে জাতীয় ঐক্যের ‘মধ্যমনি’ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। আন নাহদার প্রথম সারির মুখপাত্রগণ বয়সে মূলত তরুণ। তাদের দাড়িবিহীন কর্মকর্তাদেরকে আপনার সহজেই নজরে পড়বে। দেশের অর্থনৈতিক সমস্যার সমাধান নিয়ে তারা বিরতিহীনভাবে কথা বলে যেতে পারেন। তারা যে একটি ইসলামপন্থী দলের সদস্য, নিছক কথাবার্তা শুনে তা বুঝার কোনো উপায় নেই। একজন ক্যাম্পেইন অর্গানাইজার আমাকে বলেছেন, তাদের এই আচরণ ও আত্মসচেতনতা আন নাহদার ‘নয়া দৃষ্টিভঙ্গির’ প্রতিফলন। ধর্মীয় রেটরিকের ব্যবহার ছেড়ে দলটি সতর্ক পদক্ষেপ গ্রহণ করতে পারায় তারা গর্বিত।[1]

আদর্শিক বিভাজনের প্রশ্নে আন নাহদা যেখানে সুর নরম করছে, নিদা তিউনেস সেখানে ইসলামপন্থী বনাম সেক্যুলার প্রশ্নে সুর চড়াচ্ছে। যা স্পষ্টতই সংঘাতের উসকানি। পতিত শাসকগোষ্ঠী, বামপন্থী এবং নিও-লিবারেল ব্যবসায়ীরা মিলে নিদা তিউনেস গঠন করেছে। দলটির এই গ্রুপগুলো অন্যসব বিষয়ে খুব একটা একমত হতে না পারলেও ইসলামপন্থী ও ইসলামপন্থার অস্তিত্বই যে একটা হুমকি এবং একে যে পরাজিত করা প্রয়োজন, সে ব্যাপারে পুরোপুরি একমত। তিউনিশীয় সেক্যুলারদের নিয়ে যে কয়েকজনের গভীর জানাশোনা আছে, তাদের একজন হলেন অ্যানি উলফ। তিনি লিখেছেন, “ইসলামপন্থার বিরোধিতাকে গুরুত্বপূর্ণ মনে করা (নিদা তিউনেসের) অন্যতম দুর্বলতা।”[2] তাত্ত্বিকভাবে হয়তো এটি সত্য। তবে নির্বাচনী রাজনীতির জন্য মেরুকরণ, মতাদর্শ এবং ব্যক্তি আক্রমণ আপাতদৃষ্টিতে সুফল বয়ে আনে বলেই মনে হয়। ২০১১ সালে যে দলটির অস্তিত্বই ছিল না, সেই নিদা তিউনেস ৩৭.৫ শতাংশ ভোট এবং ৮৬টি আসন পেয়ে নির্বাচনে প্রথম স্থান লাভ করেছে। এছাড়া দলটির প্রধান নেতা ৮৮ বছর বয়সী বেজি সাইদ এসেবসি প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে সহজেই জয় লাভ করেছেন। অন্যদিকে, ঘানুশী আরো বেশি সমঝোতার মনোভাবসম্পন্ন হয়ে ওঠেছেন। সংঘাত এড়িয়ে তিনি মধ্যপন্থী পথে এগিয়ে গেছেন। এভাবে তিনি এক অর্থে ফাউন্ডার ফাদার হিসেবে নিজের ইমেজ প্রতিষ্ঠা করেছেন, নিজের জনপ্রিয়তার উচ্চমান প্রতিষ্ঠা করেছেন।[3]

সমালোচকদের মতে, এসেবসির উত্থান বিপ্লবের প্রতি এক ধরনের আঘাত। এসেবসি ছিলেন বেন আলী প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি। হাবিব বুরগিবার আমলেও তিনি স্বরাষ্ট্র ও প্রতিরক্ষা মন্ত্রী ছিলেন। অবশ্য, তিউনিশীয় সেক্যুলারদের অনেকে এমনটা মনে করেন না। নির্বাচনের আগে পিউ রিসার্চের এক জরিপের ফলাফল এমনটাই ইঙ্গিত করে। দেখা গেছে, একনায়কতন্ত্রের প্রত্যাবর্তনকে সমর্থনের প্রশ্নে ধর্মানুরাগীদের চেয়ে ধর্মীয় আচার কম মানা তিউনিশীয়রাই বেশি এগিয়ে। জরিপে অংশগ্রহণ করা ৪১ শতাংশ মানুষ একনায়কতন্ত্রকে সমর্থন করেছেন। এরা অনিয়মিতভাবে নামাজ পড়েন। অন্যদিকে, ৫২ শতাংশ মানুষের মতামত হলো, ‘একজন শক্তিশালী নেতার’ কাছে গণতন্ত্রই অধিকতর পছন্দনীয়। এই মতামত প্রদানকারীরা প্রতিদিন পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়েন।[4] ২০১২ সালের আরেক জরিপে ৭৮ শতাংশ তিউনিশীয় মত দিয়েছিলেন, তাদের জীবনে ধর্ম ‘খুব গুরুত্বপূর্ণ’। জরিপে অংশগ্রহণকারীদের ৬৩ শতাংশ জানিয়েছেন, তারা প্রতিদিন পাঁচ ওয়াক্ত  নামাজ পড়েন এবং ৯৬ শতাংশ মানুষ জানিয়েছেন, তারা রমজানে রোজা রাখেন।[5]

মধ্যপন্থার দিকে আমাদের যাত্রা

তুরস্কের দিকে তাকালে আমরা দেখতে পাই, প্রচণ্ডভাবে বিভক্ত তুর্কি সমাজে ইসলামপন্থীদের পক্ষে ও বিপক্ষে শক্ত অবস্থান রয়েছে। মাঝামাঝি কোনো অবস্থান সেখানে টিকতে পারে না। তাই একটা শক্ত অবস্থান তৈরি  ও গণভিত্তি পেতে হলে এই বাস্তবতা বিবেচনায় রাখা সেখানে অনেক গুরুত্বপূর্ণ। তবে তুরস্কের এই প্রেক্ষাপটের আলোকে কেউ যদি আন নাহদার নির্বাচনী কৌশলকে ব্যর্থ মনে করে (যদিও তা ব্যর্থই বটে), তাহলে একটা বিষয় এড়িয়ে যাওয়া হয়। মধ্যপন্থার দিকে এগিয়ে যাওয়া মানেই নির্বাচনে জয়ী হওয়া নয়­– আন নাহদার শীর্ষ নেতৃত্ব এই সত্যটা মেনে নিতে প্রস্তুত। তারা মনে করেন– তারা যা করছেন, পরিণতির কথা না ভেবেই সেগুলো করে যেতে হবে। ওয়ানিসি আমাকে যেমনটা বলেছিলেন, “আমরা এই মুহূর্তে নির্বাচনী কৌশল নিয়ে ভাবছি না। বরং তিউনিশিয়ার সামগ্রিক ভালোমন্দ মাথায় রেখেই কাজ করছি। এটাকেই বেশি গুরুত্বপূর্ণ মনে করছি। এর ফলে আমরা যদি নির্বাচনে দ্বিতীয় অবস্থানেও চলে যাই, তাহলে আমরা তা নিয়েই সন্তুষ্ট।” এ প্রসঙ্গে মেহেরজিয়া লাবিদীর কথাও বলা যেতে পারে। তিনি বলেছিলেন, মধ্যপন্থার দিকে যেতে হলে মূল্য দিতে হয়। নির্বাচনে হেরে যাওয়া হচ্ছে আমাদের সেই প্রদেয় মূল্য।” 

আন নাহদার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব ও শীর্ষস্থানীয় তাত্ত্বিক নুরুদ্দীন আরবাউয়ীর মতো কেউ কেউ স্বীকার করেছেন, বিভিন্ন পলিসির খুঁটিনাটি বিষয়ের উপর অত্যাধিক গুরুত্বারোপ এবং দক্ষ বিশেষজ্ঞদের নিয়োগের মাধ্যমে আন নাহদার উচ্চাকাঙ্খার প্রতিফলন ঘটেছে বলা যায়। আরবাউয়ী আমাকে বলেছেন, “আমরা যদি বাস্তববাদী হই (অবশ্য এখন পর্যন্ত আমরা বাস্তববাদী) তাহলে বলতে হয়, দলের প্রকৃত কর্মসূচি মূল্যায়ন করে কেউ ভোট দেয় না। এমন একজনও নেই, যে ব্যালট বাক্সের নিকট গিয়ে মনে করেছে, এদের কর্মসূচি যেহেতু উদার, তাই এদেরকেই আমি ভোট দিলাম। বরং আমরা যেহেতু আন নাহদা, সে জন্যই সমর্থকরা আমাদেরকে ভোট দিয়েছে। আর অন্যরা নিদা তিউনেসকে ভোট দিয়েছে, যেহেতু তারা আন নাহদার বিরোধী।”[6]

ভালো-মন্দ যাই হোক, তিউনিশিয়ার গণতান্ত্রিক উত্তরণের দায়িত্ব আন নাহদা নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছে। আরেকটু এগিয়ে আমরা ‘তিউনিশীয় মডেলের’ কথা বলতে পারি। সেটা হলো: ইসলামপন্থীরা তাদের ইসলামপন্থার ব্যাপারে এক ধরনের আপস করেছে। কারণ তারা তাদের চারপাশে যেসব বিকল্প পদক্ষেপ দেখেছে, তার সবগুলোতেই গণতন্ত্রের পতন ঘটেছে। আন নাহদা হয়তো অযথা ভয় পেয়েছিল, তাই সুযোগ থাকা সত্ত্বেও ঝুঁকি নেয়নি। তাছাড়া লিবিয়া, সিরিয়া ও ইয়েমেনের উত্তেজনা দরজার উপর কড়া নাড়ছিল, সে কারণেও হয়তো তারা সুযোগটি গ্রহণ করেনি। এ ব্যাপারে ঘানুশীর ব্যাখ্যা হচ্ছে, “হ্যাঁ, আমরা ছাড় দিয়েছি, এটা সত্য। কিন্তু এটি আমাদের জন্য লোকসানী নয়। আমাদের ন্যায্যতা থাকা সত্ত্বেও ২০১৩ সালে আমরা যদি সরকারে থাকতাম, তাহলে দেশ হয়তো ধ্বংস হয়ে যেত।”[7]

এটা নিছক কথার কথা নয়। মধ্যপন্থার দিকে আমাদের এই যাত্রা সংগঠনের জন্য তাৎপর্যপূর্ণ ফলাফল বয়ে এনেছে – ঘানুশী আমাকে এমনটাই বলেছেন।[8] আরব বসন্তের শুরু থেকেই আন নাহদার নেতৃবৃন্দ একটি সংকটের মোকাবেলা করতে না করতেই আরেকটা সংকটের মুখোমুখি হচ্ছেন। প্রত্যেকবারই মতাদর্শিক বা বিপ্লবী দাবি থেকে বিরত থাকার জন্য সমর্থকদেরকে নানাভাবে বুঝাতে হয়েছে। সংবিধানের খসড়া প্রণয়নের সময় শরীয়াহ, লিঙ্গ সমতা এবং ব্লাসফেমি সংক্রান্ত তিনটি বিতর্কিত ধারা থেকে দলটি সরে আসে।[9] আন নাহদার সংসদীয় ব্লক শরীয়াহকে আইনের ‘উৎসসমূহের উৎস’ হিসেবে প্রস্তাব করেছিল।[10] আরব দেশগুলোর রীতি অনুসারে যা ছিল খুব স্বাভাবিক ব্যাপার। যে কোনো ইসলামপন্থী মাত্রই মনে করে থাকেন, শরীয়াহকে যে যেভাবেই ব্যাখ্যা করুক না কেন, জনজীবনে এর একটা ভূমিকা থাকবে। তা সত্ত্বেও একটি ইসলামপন্থী দল শরীয়াহর উল্লেখ পর্যন্ত না করে একটি সংবিধান অনুমোদন করেছে। যদিও সংবিধান সভায় আন নাহদার প্রাধান্য ছিল। তারচেয়েও বড় কথা হলো, তিউনিশীয় সমাজে ধর্মের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। এসব কিছুর পরও আন নাহদা এই ছাড় দিয়েছে। ২০১৪ সালে পিউ রিসার্চ পরিচালিত এক জরিপে দেখা গেছে, ৫৩ শতাংশ তিউনিশীয় মনে করেন, আইন প্রণয়নে ইসলামী মূল্যবোধ ও নীতিমালা মেনে চলা উচিত। এরমধ্যে আবার ৩০ শতাংশ আরেক ধাপ এগিয়ে বলেছেন, আইন প্রণয়নে পুরোপুরিভাবে কোরআনের বিধান অনুসরণ করা উচিত।[11] শরীয়াহকে সংবিধানের একটি অনুচ্ছেদ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করার যে বিশেষ কোনো প্রয়োজন নেই, আন নাহদার রক্ষণশীল এক্টিভিস্টদেরকে তা বুঝাতে চেষ্টা করেছিলেন দলটির বিশিষ্ট নেতা রিয়াদ শাইবি। যিনি পরে পদত্যাগ করেছেন। সে কথা স্মরণ করে তিনি বলেন, “তাদেরকে বুঝানো ছিল দুঃসাধ্য। এতে কেউ কেউ এতটা ক্রুদ্ধ হতেন, যা প্রায় ঘৃণার পর্যায়ে চলে যেতো।”[12]

তবে ঘানুশীর ক্যারিশমা ও দূরদর্শিতার ফলে দলটির নেতৃবৃন্দ সঠিক পথেই এগিয়েছে। শরীয়াহর উপর গুরুত্বারোপ করলে কেন অনাহুত হাঙ্গামা তৈরি হতে পারে, সেই ব্যাপারটি তারা তাদের জনশক্তির কাছে ব্যাখ্যা করেছে। দলীয় শৃঙ্খলা ঠিক রাখার দিকে মনোযোগ দিলেও আন নাহদা বৃহত্তর সমাজের নিকট শরীয়াহর ব্যাপারে নিজেদের অবস্থান ব্যাখ্যা করার ব্যাপারে কম মনোযোগ দিয়েছে। এর ফলে দলটির প্রকৃত উদ্দেশ্য নিয়ে বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছে। আবার তাদের নিকট যখন বৈপ্লবিক দাবি-দাওয়ার প্রসঙ্গ উত্থাপিত হয়, তখনো তাদেরকে একই ধরনের সমস্যায় পড়তে দেখা যায়। ২০১৩ সালে মাত্র এক ভোটের ব্যবধানে প্রস্তাবিত ‘এক্সক্লুশন ল’ সংসদে পাশ হতে পারেনি। এই আইন পাশ হলে ১৯৮৭ সাল থেকে ২০১১ সাল পর্যন্ত বেন আলী সরকারে কর্মরত সকল কর্মকর্তার পাশাপাশি পূর্ববর্তী শাসক দলের সকল সিনিয়র সদস্যসহ তিউনিশিয়ার হাজার হাজার মানুষের উপর সরকারী পদে বহাল থাকার উপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ হয়ে যেত।[13] এই বিল ঠেকানোর লক্ষ্যে আন নাহদার প্রয়োজনীয় সংখ্যক প্রতিনিধি যেন সর্বশেষ মিনিটে তাদের ভোট প্রদান করে, এ বিষয়ে রাজি করাতে ঘানুশী তার মূল্যবান রাজনৈতিক পুঁজির অনেকটা ব্যয় করেছেন। যে কোনো সংগঠনেরই সামর্থ্য থাকে সীমিত। তারপরেও বাস্তবতা হলো অভ্যন্তরীণ বিতর্কের সমাধান করতেই দলের রাজনৈতিক সামর্থ্যের অনেকটা খরচ হয়ে যায়।

যেসব ইসলামপন্থী আন্দোলন প্রতিনিয়ত নতুন নতুন পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়, সে দলগুলোর মধ্যে ভারসাম্যপূর্ণভাবে কাজ করার ক্ষমতাসম্পন্ন দলের সর্বোচ্চ একটি উদাহরণ হলো আন নাহদা। সেক্যুলার এলিট, নানাবিধ আন্তর্জাতিক শক্তি কিংবা কৌতুহলী যে কারো কাছে এই আন্দোলনগুলোকে নিশ্চিতভাবে ‘মধ্যপন্থী’ বলে মনে হবে। আবার, তাদের রক্ষণশীল অংশ এক ধরনের আত্মপরিচয়, মতাদর্শ ও ধর্মীয় মান বজায় রাখতে চায়। সেটি সম্ভব না হলে অন্ততপক্ষে এ ব্যাপারগুলোকে আন্দোলনের ‘চেতনা’ হিসেবে ধরে রাখতে চায়। দুই কূল রক্ষার এই অন্তহীন প্রচেষ্টা এক ধরনের আত্মপরিচয়ের সংকট তৈরি করে। একজন সিভিল সোসাইটি অ্যাক্টিভিস্ট আমাকে বলেছেন, “আন নাহদা অন্য কারো মতো নয়। এমনকি, অন্যরা তাদের ব্যাপারে যা অনুমান করে, তারা তেমনও নয়।”[14] ২০১৫ সালের এপ্রিলে একজন ফরাসী সাংবাদিকের সাথে সাক্ষাৎকারে ঘানুশী নিজেকে একটি ঝুলন্ত রশির উপর দিয়ে হাঁটা ব্যক্তির সাথে তুলনা করেছেন। ব্লাসফেমির বিরুদ্ধে ইসলামপন্থীদের গতানুগতিক অবস্থান এবং উত্তরাধিকার ও জেন্ডার সমতার ব্যাপারে প্রচলিত দৃষ্টিভঙ্গিই তিনি বার বার আওড়ে যাচ্ছিলেন। কিন্তু আশ্চর্যজনকভাবে সমকামীদের ব্যাপারে তিনি সহনশীলতা দেখিয়েছেন। এ ব্যাপারে তার যুক্তি হলো, ‘কোনো ব্যক্তির উপর গোপনে নজরদারি’ করার কথা ইসলাম বলে না।[15]

আন নাহদার এই মধ্যপন্থী অবস্থান কতটা ‘কৌশলগত’ এবং কতটা খাঁটি আদর্শিক বিবর্তনের ফসল? তিউনিশিয়ার রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট, অর্থাৎ দুর্বল পরিবর্তন প্রক্রিয়া ও দমনপীড়নের নেতিবাচক ফলাফলের দিকে যদি নজর দেই, তাহলে আন নাহদার সতর্ক পদক্ষেপ ও সমঝোতার নীতিকে আমরা সহজে বুঝতে পারবো। এই অতীত অভিজ্ঞতার কারণেই তাদের বিশ্বাস ও কাজের মধ্যে সম্পর্ক খুব কম। এটি নিশ্চিত, বিশ্বাস কর্মকে প্রভাবিত করে। কিন্তু দীর্ঘসময় ধরে কোনো কিছু ক্রমাগত বলতে থাকলে এবং করতে থাকলে তা উল্টোভাবে আপনার বিশ্বাসকেই পরিবর্তন করে ফেলতে পারে। যদিও শুরুতে আপনি এ ব্যাপারে মোটেও সচেতন থাকেন না।

রেফারেন্স ও নোট:

[1] লেখকের সাথে আলাপচারিতা, আন নাহদার একজন ক্যাম্পেইন অর্গানাইজার, ফেব্রুয়ারি ১২, ২০১৫।

[2] Anne Wolf, “Can Secular Parties Lead the New Tunisia?” Carnegie Endowment for International Peace, April 30, 2014, http://carnegieendowment.org/2014/04/30/can-secular-parties-lead-new-tunisia.

[3] Pew Research Center, spring 2014 survey, topline results, http://www.pewglobal.org/files/2014/10/Pew-Research-Center-Tunisia-Report-TOPLINE-October-15-2014.pdf, p. 17.

[4] “Tunisian Confidence in Democracy Wanes,” Pew Research Center, October 15, 2014, http://www.pewglobal.org/2014/10/15/tunisian-confidence-in-democracy-wanes/.

[5] “The World’s Muslims: Religion, Politics and Society,” Pew Research Center, April 30, 2013.

[6] লেখকের সাথে আলাপচারিতা, নুরুদ্দীন আরবাউয়ী, ফেব্রুয়ারি ১১, ২০১৫।

[7] লেখকের সাথে আলাপচারিতা, রশিদ ঘানুশী, ফেব্রুয়ারি ১৩, ২০১৫।

[8] Ibid.

[9] Monica Marks, “Convince, Coerce, or Compromise? Ennahda’s Approach to Tunisia’s Constitution,” Brookings Doha Center Analysis Paper, February 10, 2014, http://www.brookings.edu/research/papers/2014/02/10-ennahda-tunisia-constitution-marks.

[10] Duncan Pickard, “The Current Status of Constitution Making in Tunisia,” Carnegie Endowment for International Peace, April 19, 2012, http://carnegieendowment.org/2012/04/19/current-status-of-constitution-making-in-tunisia.

[11] “Tunisian Confidence.”

[12] লেখকের সাথে আলাপচারিতা, রিয়াদ শাইবি, ফেব্রুয়ারি ১০, ২০১৫।

[13] Human Rights Watch, “Tunisia: Sweeping Political Exclusion Law,” June 15, 2013, http://www.hrw.org/news/2013/06/15/tunisia-sweeping-political-exclusion-law.

[14] লেখকের সাথে আলাপচারিতা, একজন সিভিল সোসাইটি এক্টিভিস্ট, ফেব্রুয়ারি ৬, ২০১৫।

[15] Ursula Lindsey, “Tunisia’s Rachid Ghannouchi on Blasphemy, Homosexuality, Equality,” Arabist, April 6, 2015, http://arabist.net/blog/2015/4/6/tunisias-rachid-ghannouchi-on-blasphemy-homosexuality-equality.

আপনার মন্তব্য লিখুন