ইসলামপন্থার সাথে বোঝাপড়া (পর্ব–৪)

এডিটর’স নোট:

ব্রাসেলসভিত্তিক থিংকট্যাংক ‘ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপ’ নানা বিষয়ে নিয়মিত গবেষণামূলক প্রতিবেদন প্রকাশ করে থাকে। পাশ্চাত্যের নীতি-নির্ধারণী মহল কর্তৃক সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষেত্রে এসব গবেষণা যেন সহায়ক ভূমিকা পালন করে, এই হলো তাদের উদ্দেশ্য। ২০০৫ সালের ২ মার্চ তারা ‘আন্ডারস্ট্যান্ডিং ইসলামিজম’ শিরোনামে একটি গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশ করে। পাশ্চাত্যের একটি থিংকট্যাংক ইসলামপন্থাকে কোন দৃষ্টিতে দেখে, তা এই প্রতিবেদনে ফুটে ওঠেছে। নানা কারণেই বাংলাদেশে এখন ইসলামপন্থা নিয়ে নতুন করে আগ্রহ তৈরি হওয়ার পরিস্থিতি দাঁড়িয়েছে। তাই সিএসসিএস-এর পাঠকদের জন্য প্রতিবেদনটির নির্বাচিত অংশ ধারাবাহিকভাবে অনুবাদ করছেন আইয়ুব আলী


সারসংক্ষেপ 

১. ইসলাম, ইসলামপন্থা এবং ইসলামিক এক্টিভিজম 

২. সুন্নী এক্টিভিজমের প্রধান প্রধান ধারা

৩. সুন্নী রাজনৈতিক ইসলামপন্থা: ‘হারাকাত’ ও ‘হিজব’


. সুন্নী রাজনৈতিক ইসলামপন্থা: হারাকাত হিজব

বর্তমানের শীর্ষ রাজনৈতিক ইসলামপন্থী দলগুলো প্রথমদিকে (মোটামুটি ১৯২০ থেকে ১৯৭০ এর দশক) ইসলামী দাওয়াতী কাজের পুনর্জাগরণবাদী আন্দোলন[1] হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছিল। তখন এ আন্দোলনগুলো মোটাদাগে মৌলবাদী দৃষ্টিভঙ্গি পোষণ করতো। এক পর্যায়ে এই আন্দোলনগুলো রাজনীতিসচেতন হয়ে ওঠে। এর ফলে ধর্মীয় ও রাজনৈতিক কার্যক্রমের মধ্যে পার্থক্য তৈরি হয়। রাজনৈতিক তৎপরতায় মনোযোগ দেওয়ার ফলে তারা সংগঠনব্যবস্থার সমসাময়িক মডেলগুলো (মূলত ইউরোপীয় মডেল) গ্রহণ করে। অর্থাৎ, রাজনৈতিক দল (আরবীতে একে ‘হিজব’ বলা হয়) গঠন করে। তারপর তারা স্ব স্ব দেশের রাষ্ট্রক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হওয়ার জন্য প্রচেষ্টা চালাতে থাকে। সেই লক্ষ্যে তারা তাদের লক্ষ্য-উদ্দেশ্য ও কর্মপদ্ধতি নতুনভাবে গড়ে তোলে।

সময়ের পরিক্রমায় এই বিবর্তনের বেশ গুরুত্বপূর্ণ তাৎপর্য রয়েছে। রাজনৈতিক ক্ষমতা অর্জনের লক্ষ্যে এই আন্দোলনগুলো নিজেদের স্থানীয় রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটের সাথে খাপ খাইয়ে নিয়েছে। সংক্ষেপে ব্যাপারগুলো এ রকম:

  • ধর্মসহ অন্যান্য ক্ষেত্রগুলো থেকে রাজনীতিকে তারা আলাদা হিসেবে বিবেচনা করে এবং রাজনৈতিক ক্ষেত্রে নিজেদেরকে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য তারা প্রচেষ্টা চালায়। এভাবে তারা ধর্ম ও রাজনীতির প্রচলিত পার্থক্যকে ক্রমান্বয়ে উপেক্ষা করার ক্ষেত্রে ভূমিকা পালন করছে।
  • এরা (আলজেরিয়া, মিশর, জর্ডান, মরক্কেো, পাকিস্তান, তুরস্ক প্রভৃতি দেশের আন্দোলনগুলো) ‘জাতিরাষ্ট্র’ ধারণাকে তাদের তৎপরতার অন্যতম প্রধান কাঠামো হিসেবে শুধু গ্রহণই করেনি, বরং এ ধারণাকে তারা (ইসলামের দৃষ্টিতে) বৈধ বলেও মনে করে।[2] এর মাধ্যমে তারা রক্ষণশীল দৃষ্টিভঙ্গিকে পরিত্যাগ করে। রক্ষণশীলরা জাতীয়তাবাদকে (nation) অগ্রহণযোগ্য মনে করে। কারণ তাদের দৃষ্টিতে, এটি উম্মাহ ধারণার বিরোধী।
  • বিদ্যমান শাসনব্যবস্থা উৎখাত করে সম্পূর্ণ ভিন্নধারার ‘ইসলামী রাষ্ট্র’ (দাওলাহ আল-ইসলামিয়্যাহ) গড়ে তোলার মতো বৈপ্লবিক চিন্তাভাবনা তারা এড়িয়ে চলে। যদিও প্রায়শই তারা সাংবিধানিক সংস্কারের প্রস্তাব করে, তবুও নিজেদের রাজনৈতিক তৎপরতার আইনী বৈধতার কৌশলগত স্বার্থে তারা বিদ্যমান সংবিধানকে মেনে নেয়।

উপরোক্ত তিনটি পয়েন্টের মধ্যে শেষেরটি সবচেয়ে বেশি তাৎপর্যপূর্ণ। অনেক মুসলিম রাষ্ট্রেই এখন ইসলামপন্থী রাজনৈতিক দলগুলোর গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান তৈরি হয়েছে। তবে যেসব রাষ্ট্রে তাদের কার্যক্রমের বৈধতা কমবেশি চ্যালেঞ্জের মধ্যে পড়েছে সেখানে এই শেষোক্ত অবস্থানটি লক্ষ্য করা যায়। কিংবা এটাও বলা যায়, এই অবস্থান হলো তাদের সংস্কারবাদী দৃষ্টিভঙ্গির প্রতিফলন। মুসলিম ব্রাদারহুড কর্তৃক জর্ডানে প্রতিষ্ঠিত ‘ইসলামিক অ্যাকশন ফ্রন্ট’ হাশেমী রাজতন্ত্রকে শুধু মেনেই নেয়নি, বরং ইসলামী দৃষ্টিকোণ থেকেই রাজতন্ত্রকে তারা বৈধ মনে করে।[3] মরক্কোর পিজেডি’র ক্ষেত্রেও একই ব্যাপার দেখা গেছে। সেখানকার রাজার ‘আমীরুল মুমেনীন’ পদবীকে স্বীকৃতি দিয়ে ‘রাজকীয়’ কর্তৃত্বের প্রতি পিজেডি সুস্পষ্ট সমর্থন দেখিয়েছে।[4] অন্যদিকে, মুসলিম ব্রাদারহুড ইসলামী দৃষ্টিকোণ থেকে নিছক ‘প্রজাতান্ত্রিক’ মিশরকেই স্বীকৃতি দেয়নি, সরকারব্যবস্থাকেও স্বীকার করে নিয়েছে।[5] তুরস্কের বর্তমান ক্ষমতাসীন দল একেপি’ও একইভাবে কামালপন্থী সংবিধানের সেক্যুলার ও প্রজাতান্ত্রিক দিকগুলোকে স্পষ্টতই মেনে নিয়েছে।[6]

এর ফলাফল এই দাঁড়িয়েছে, মুসলিম বিশ্বের বিদ্যমান রাষ্ট্রব্যবস্থার বিপরীতে ইসলামী রাজনৈতিক আন্দোলনগুলো একসময় যে ধরনের সুনির্দিষ্ট ও কাঙ্খিত ‘ইসলামী রাষ্ট্রব্যবস্থা’র ধারণা প্রস্তাব করতো, এখন তারা আর সেই অবস্থানে নেই। বরং তারা স্বীকার করে নিচ্ছে, কোরআন-হাদীসে ‘ইসলামী রাষ্ট্রে’র স্পষ্ট কোনো সংজ্ঞা নেই। ফলে ইসলামী রাষ্ট্রের নানাবিধ রূপরেখা থাকতে পারে। পাশাপাশি, ধর্মগ্রন্থের এই সীমাবদ্ধতা উপলব্ধি করার ফলে এই আন্দোলনগুলো ‘ইসলাম হচ্ছে সমাধান’, ‘কোরআন আমাদের সংবিধান’ জাতীয় জনপ্রিয় শ্লোগানগুলো এখন আর ব্যবহার করছে না। প্রথম হিজরী শতাব্দীর তৎকালীন আরবের ইসলামী সমাজের অনুরূপ রাজনৈতিক মডেল বাস্তবায়ন করার যে সেকেলে ধ্যানধারণা রক্ষণশীল ইসলামপন্থী আন্দোলনগুলো পোষণ করে, রাজনৈতিক ইসলামপন্থীরা তা করে না।

এর পরিণতিতে, রক্ষণশীল দৃষ্টিভঙ্গির সাথে এই আন্দোলনগুলোর প্রকাশ্য বিরোধ দিন দিন বেড়েই চলছে। ‘দাওলাহ আল-ইসলামিয়্যাহ’ (ইসলামী রাষ্ট্র) প্রতিষ্ঠার বৈপ্লবিক ও ইউটোপিয়ান প্রকল্প পরিত্যাগ করার পর তারা ন্যায়বিচার (আদল), মুক্তি (আল-হুররিয়্যাহ) – এ জাতীয় বিষয়গুলোর উপর জোর দিচ্ছে। তাদের দাবি অনুযায়ী, শরীয়াহ সম্পর্কিত বুঝজ্ঞানই তাদেরকে এ বিষয়গুলোর উপর জোর দেয়ার পেছনে ভূমিকা রাখছে। অর্থাৎ, শরীয়াহকে ভিত্তি ধরেই এখন পর্যন্ত ইসলামপন্থী রাজনৈতিক এজেন্ডা ও বক্তব্য নির্মিত হচ্ছে। তবে শরীয়াহ সম্পর্কে এই দৃষ্টিভঙ্গি এখন দুটি বিষয়ের আলোকে তৈরি হচ্ছে।

প্রথমত, এই আন্দোলনগুলো স্বীকার করে নিয়েছে – সপ্তম শতাব্দীর মদীনায় যে ধরনের ইসলামী সমাজ ছিল, হুবহু সে ধরনের সমাজ গড়ার প্রচেষ্টার চেয়ে মুসলমানদের এখন দরকার ‘বর্তমান সময়ে বসবাস উপযোগী’[7] সমাজ গঠন। এই উপলব্ধির ফলে তারা ইজতিহাদের প্রয়োজনীয়তার উপর জোর দিচ্ছে। অর্থাৎ, মুসলিম দেশগুলোর জন্য আইন হিসেবে শরীয়াহর মূলনীতিগুলোই সর্বোৎকৃষ্ট – এই বক্তব্য তুলে ধরাকে তারা গুরুত্ব দিচ্ছে।[8]

দ্বিতীয়ত, ইজতিহাদের গুরুত্বকে স্বীকার করে নেয়ায় তারা স্বভাবতই আলাপ-আলোচনার প্রয়োজনীয়তাকেও স্বীকার করে নিয়েছে। এর ফলে আইন প্রণয়নের ক্ষেত্রে বিভিন্ন শ্রেণীর প্রতিনিধিদের (যেমন – সংসদ সদস্য) কাছ থেকে মতামত গ্রহণ করাকে তারা গুরুত্বপূর্ণ মনে করে। ইসলামপন্থী রাজনৈতিক আন্দোলনগুলোর রাজনৈতিক চিন্তার এই বিবর্তন মুসলমানদের রাজনৈতিক চিন্তাধারায় বিদ্যমান ধর্মতাত্ত্বিক ধারণা থেকে একদম আলাদা। ধর্মতত্ত্ব অনুযায়ী, আল্লাহই কেবল সার্বভৌম ক্ষমতার অধিকারী। সে তুলনায় ইসলামপন্থী রাজনৈতিক আন্দোলনগুলো কমবেশি গণতান্ত্রিক ধ্যানধারণা পোষণ করে। গণতন্ত্রে সার্বভৌম ক্ষমতার অধিকারী হলো জনগণ।[9]

মিশরের মুসলিম ব্রাদারহুড এবং ব্রাদারহুডের সাথে সংযুক্ত কিংবা নিদেনপক্ষে তাদের দ্বারা প্রভাবিত বিশ্বের অন্যান্য আন্দোলন ও রাজনৈতিক দলগুলোর সবাই স্বীকার না করলেও অনেকের ক্ষেত্রেই এই বিবর্তনকে একটি ঐতিহাসিক ‘ইউ-টার্ন’ হিসেবে বিবেচনা করা যায়।

১৯২৮ সালে হাসান আল বান্নার (১৯০৬–১৯৪৯) হাত ধরে মুসলিম ব্রাদারহুড প্রতিষ্ঠা লাভ করে। তার দৃষ্টিভঙ্গি ছিল পাশ্চাত্যবিরোধী, রক্ষণশীল এবং অনুদার। ইসলামের রাজনৈতিক ধারণাকে তিনি গণতন্ত্রের বিপরীতে দাঁড় করিয়েছিলেন। তিনি মনে করতেন, অন্তর্নিহিতভাবেই গণতন্ত্র একটি পাশ্চাত্য ধারণা, ফলে এটি অনৈসলামী।

সাইয়েদ কুতুবের চিন্তাধারায় প্রভাবিত হয়ে পঞ্চাশ ও ষাটের দশকে মুসলিম ব্রাদারহুডের দৃষ্টিভঙ্গি আরো বেশি সংকীর্ণ হয়ে পড়ে। তিনি ব্রাদারহুডকে তৎকালীন জাতীয়তাবাদী শাসক জামাল আব্দেল নাসেরের বিরোধিতায় মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দেন। সাইয়েদ কুতুব যুক্তি দেখিয়েছেন, মুসলিম বিশ্ব এক নতুন ধরনের জাহেলিয়াতে পতিত হয়েছে। প্রাক-ইসলামী যুগের ঐতিহাসিক জাহেলিয়াতের চেয়ে এটা একটু ভিন্ন ধরনের। জাতীয়তাবাদের মতো মতাদর্শ মুসলিম বিশ্বে জাহেলিয়াতের প্রসার ঘটাচ্ছে। জাতীয়তাবাদ আল্লাহর সার্বভৌমত্বের পরিবর্তে জনগণের সার্বভৌমত্বকে প্রতিস্থাপিত করেছে। আর তাই জাতীয়তাবাদী শাসনব্যবস্থা ইসলামসম্মত নয়।[10] সে কারণে জাতীয়তাবাদের বিরুদ্ধে জিহাদ করা বাধ্যতামূলক না হলেও অবৈধ নয়।

সাইয়েদ কুতুবের মৃত্যুর পর ব্রাদারহুডের নেতাকর্মীরা তার অতি বৈপ্লবিক ধ্যানধারণা পরিত্যাগ করে পুনরায় হাসান আল বান্নার তুলনামূলক কম বৈপ্লবিক চিন্তাধারায় ফিরে আসে এবং অহিংস ও ধীরে চলার নীতি অবলম্বন করে।[11] এর মাধ্যমে তারা মিশর রাষ্ট্রের সাথে এক ধরনের অস্থায়ী সমঝোতামূলক অবস্থানে পৌঁছার চেষ্টা করে যাচ্ছে। বিগত তিন দশক ধরে তাদের এই প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে।

মুসলিম ব্রাদারহুড হাসান আল বান্নাকে সাধারণত তাদের অন্যতম তাত্ত্বিক গুরু হিসেবে মেনে চলে। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে তারা বান্নার চিন্তাধারার কিছু মৌলিক দিককে নীরবে পরিত্যাগ করে পাশ্চাত্যের গণতান্ত্রিক মূল্যবোধকে গ্রহণ করার ব্যাপারে ইতিবাচক মনোভাব পোষণ  করছে।[12] এটা তাদের একটি চলমান প্রক্রিয়া, যা তারা প্রকাশ্যে স্বীকারও করে। বান্নার চিন্তাধারার অনুদার (illiberal) দিকগুলো নিয়ে তারা একটা মীমাংসায় পৌঁছার চেষ্টা করছে। অবশ্য আন্দোলনের প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে বান্নার অসামান্য অবস্থানের কারণে এ ধরনের পদক্ষেপ গ্রহণ বেশ জটিল হয়ে দাঁড়িয়েছে।

পাশ্চাত্য ধ্যানধারণায় ‘রাজনৈতিক ইসলাম’কে মোটাদাগে মৌলবাদী ও গণতন্ত্রবিরোধী দৃষ্টিভঙ্গির সমতুল্য মনে করা হলেও বাস্তবচিত্র ভিন্ন। মূলধারার রাজনৈতিক ইসলামিক এক্টিভিজমগুলো আধুনিক ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধগুলোর সাথে নিজেদেরকে খাপ খাইয়ে নেয়া কিংবা এগুলোকে অন্তত বিবেচনা করার বিষয়টি প্রমাণ করতে পেরেছে। একটি বিমূর্ত ধারণা হিসেবে ইসলাম ও গণতন্ত্রের মূলনীতিগুলোর মধ্যে কোনো ধরনের সাদৃশ্য থাকা কিংবা না থাকার সাথে এর কোনো সম্পর্ক নেই। মূলত তিনটি বাস্তব কারণে তাদের মধ্যে এই পরিবর্তন এসেছে। সেগুলো হলো:

১. সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রভাব বজায় রাখার পাশাপাশি যথাসম্ভব তা আরো বৃদ্ধি করা।

২. যেসব রাষ্ট্রে এ আন্দোলনগুলোর কার্যক্রম রয়েছে সেখানকার রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটের সাথে মানিয়ে চলা।

৩. অতীত অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে পলিসি ঠিক করা (এরমধ্যে রয়েছে তাদের অতীতের গণতন্ত্রবিরোধী দৃষ্টিভঙ্গির ব্যাপারে পাশ্চাত্যের নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া। অন্যদিকে, ইসলামপন্থীদের রাজনৈতিক অধিকার রক্ষায় গণতান্ত্রিক মানবাধিকার সংস্থাগুলোর ইতিবাচক অবদান)।

তবে অতীতে কোনো কোনো রাজনৈতিক ইসলামী আন্দোলন যে কিছু অগণতান্ত্রিক কৌশল ও অবস্থান গ্রহণ করেছিল, তা ভুলে গেলে চলবে না। এ প্রসঙ্গে স্মরণ করা যেতে পারে, ১৯৭৭ সালে সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে জুলফিকার আলী ভুট্টোকে ক্ষমতাচ্যুত করার পর জেনারেল জিয়াউল হক যে কঠোর সামরিক শাসন কায়েম করেছিলেন, জামায়াতে ইসলামী সেটাকে সমর্থন ও বৈধতা দিয়েছিল।[13] একইভাবে, সুদানের ন্যাশনাল ইসলামিক ফ্রন্টের নেতা হাসান আল তুরাবী একদল সেনা কর্মকর্তার সাথে হাত মেলান এবং ১৯৮৯ সালে জেনারেল ওমর আল বশির ও তার অনুগত কর্মকর্তাদের সাথে জোট বেঁধে ক্ষমতায় আসেন।[14] 

সেনাবাহিনীর সাথে অগণতান্ত্রিক জোট বাঁধার এই কৌশলগুলোর ব্যর্থতার ফলেই সম্ভবত অন্যান্য দেশের ইসলামী রাজনৈতিক আন্দোলনগুলো গণতান্ত্রিক ধ্যানধারণাকে গ্রহণ করে নিতে উদ্বুদ্ধ হয়েছে। তবে এ ধরনের অগণতান্ত্রিক জোট গঠনের পেছনে যে আকাঙ্খা কাজ করেছিল, পরিস্থিতি তৈরি হলে তা পুনরায় ঘটবে না – এমনটা আশা করাও নিশ্চয় উচিত হবে না।

রেফারেন্স ও নোট:

[1] আন্দোলন শব্দের আরবি হচ্ছে ‘হারাকা’, যার বহুবচন ‘হারাকাত’। এই পরিভাষাটি সাধারণত ইসলামী রাজনৈতিক আন্দোলন ও দলগুলো (বিশেষ করে মিশরের মুসলিম ব্রাদারহুডের আদর্শে উদ্বুদ্ধ দলগুলো) ব্যবহার করে থাকে। উদাহরণ হিসেবে আলজেরিয়ার ‘হারাকাত আল-মুজতামাস সিলম’ (Movement of Society for Peace, MSP), ‘হারাকাত আন-নাহদা’ (Movement of the Renaissance, MN) ও ‘হারাকাত আল-ইসলাহ আল-ওয়াতানী’ (Movement for National Reform, MRN) এবং ফিলিস্তিনের ‘হারাকাত আল-মুকাওয়ামাহ আল-ইসলামিয়্যাহ’র (Islamic Resistance Movement) কথা বলা যায়। শেষোক্তটি এর আরবি সংক্ষিপ্তরূপ ‘হামাস’ হিসেবেই অধিক পরিচিত। অন্যান্য ইসলামপন্থী রাজনৈতিক দলগুলো জাতীয়তাবাধী ও সেক্যুলারদের মতো ‘হিজব’ (পার্টি) শব্দটি ব্যবহার করে থাকে। কোনো কোনো দল ‘জাবহা’ (ফ্রন্ট) শব্দটিও ব্যবহার করে।

[2] এই দিক থেকে বলা যায়, এই আন্দোলনগুলো ইসলামপন্থা ও জাতীয়তাবাদের মাঝে ঐতিহাসিক সমঝোতার একটি নিছক পরিণতি মাত্র নয়। বরং আন্দোলনগুলো স্বয়ং নিজেদেরকে জাতীয়তাবাদী ধারার উত্তরাধিকারী হিসেবে দাবি করে। ইতোমধ্যে তারা জাতীয়তাবাদী ধ্যানধারণা ও চেতনার প্রকাশ ঘটাতে শুরু করেছে। দেখুন Olivier Roy, Globalised Islam: The Search for a New Ummah (New York, 2004), pp. 62-65: “From Islamism to nationalism”.

[3] দেখুন Jennifer Noyon, Islam, Politics and Pluralism: Theory and Practice in Turkey, Jordan, Tunisia and Algeria (London, 2004), chapter 7: “Islam and the Jordanian monarchy”, আরো দেখুন Gilles Kepel, Jihad: Expansion et Déclin de l’Islamisme (Paris, 2000), pp. 326 ff.

[4] ক্রাইসিস গ্রুপের সাথে পিজেডি’র সহ-সাধারণ সম্পাদক সাদ উদ্দীন আল-উসমানীর সাক্ষাৎকার, রাবাত, ২৩ জুলাই ২০০৩।

[5] দেখুন ক্রাইসিস গ্রুপের ব্রিফিং Islamism in North Africa II, op. cit.

[6] দেখুন Kepel, op. cit., part 3, chapter 11: “Du salut à la prospérité: la laïcisation contrainte des islamistes turcs”, and Noyon, op. cit., chapter 6: “Islam and secularism in Turkey”. আরো দেখুন “The AKP, Turkey and Islamic Politics”, The Estimate: Political and Security Intelligence Analysis of the Islamic World and its Neighbours), Vol. XIV, No. 20, 4 November 2002.

[7] ক্রাইসিস গ্রুপের প্রতিবেদন Islamism, Violence and Reform in Algeria, op. cit..

[8] এ ধরনের দৃষ্টিভঙ্গির মাধ্যমে ইসলামপন্থী রাজনৈতিক আন্দোলনগুলো কোরআন-হাদীসের আক্ষরিক অর্থ গ্রহণ করার প্রবণতা থেকে বের হয়ে আসছে এবং ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষ ও বিংশ শতাব্দীর শুরুর দিকে চালু হওয়া ‘ইসলামিক-মডার্নিস্ট’ আন্দোলনে প্রত্যাবর্তন করছে। এই আন্দোলনের শীর্ষ তাত্ত্বিক ছিলেন মিশরের মোহাম্মদ আব্দুহ (১৮৪৯–১৯০৫)। আধুনিক সময়ে ইসলামী আইন প্রয়োগের সমস্যাগুলো নিয়ে তিনি তখনই ভেবেছিলেন। ‘ইসলামিক-মডার্নিস্ট’ আন্দোলন ও আব্দুহ সম্পর্কে আরো জানতে দেখুন ক্রাইসিস গ্রুপের ব্রিফিং Islamism in North Africa I, op. cit.

[9] দেখুন ক্রাইসিস গ্রুপের প্রতিবেদন Islamism, Violence and Reform in Algeria, op. cit.

[10] সাইয়েদ কুতুবের চিন্তা দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়ে মিশরসহ নানা দেশে কিছু উগ্রপন্থী ধারা ও গ্রুপ গড়ে ওঠে। তাদের কাছে ‘তাকফীর’ ধারণাটি বেশ জনপ্রিয়। ‘তাকফীর’ হচ্ছে কাউকে বা কোনোকিছুকে ‘কুফর’ হিসেবে সাব্যস্ত করে তাকে বাতিল ঘোষণা করা।

[11] ব্রাদারহুড প্রভাবিত ফিলিস্তিনী সংগঠন হামাসের ক্ষেত্রে এটি প্রযোজ্য নয়।

[12] এই নতুন দৃষ্টিভঙ্গি প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পূর্ববর্তী সময়ের ‘ইসলামিক-মডার্নিস্ট’ আন্দোনকে একটি অবয়ব দান করেছে।

[13] Mumtaz Ahmad, “Islamic Fundamentalism in South Asia: the Jamaat-i-Islami and the Tablighi Jamaat of South Asia”, in Martin E. Marty and R. Scott Appleby (eds.), Fundamentalisms Observed (Chicago and London, 1991), pp. 457-530: 479-485.

[14] Gilles Kepel, op. cit., part 2, chapter 6: “Le putsch militaire des islamistes soudanais”.

Leave a Reply