শনিবার, সেপ্টেম্বর ২৩, ২০১৭
হোম > পর্যালোচনা > ইসলামপন্থার সাথে বোঝাপড়া (পর্ব–৩)

ইসলামপন্থার সাথে বোঝাপড়া (পর্ব–৩)

এডিটর’স নোট:

ব্রাসেলসভিত্তিক থিংকট্যাংক ‘ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপ’ নানা বিষয়ে নিয়মিত গবেষণামূলক প্রতিবেদন প্রকাশ করে থাকে। পাশ্চাত্যের নীতি-নির্ধারণী মহল কর্তৃক সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষেত্রে এসব গবেষণা যেন সহায়ক ভূমিকা পালন করে, এই হলো তাদের উদ্দেশ্য। ২০০৫ সালের ২ মার্চ তারা ‘আন্ডারস্ট্যান্ডিং ইসলামিজম’ শিরোনামে একটি গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশ করে। পাশ্চাত্যের একটি থিংকট্যাংক ইসলামপন্থাকে কোন দৃষ্টিতে দেখে, তা এই প্রতিবেদনে ফুটে ওঠেছে। নানা কারণেই বাংলাদেশে এখন ইসলামপন্থা নিয়ে নতুন করে আগ্রহ তৈরি হওয়ার পরিস্থিতি দাঁড়িয়েছে। তাই সিএসসিএস-এর পাঠকদের জন্য প্রতিবেদনটির নির্বাচিত অংশ ধারাবাহিকভাবে অনুবাদ করছেন আইয়ুব আলী


সারসংক্ষেপ

১. ইসলাম, ইসলামপন্থা এবং ইসলামিক এক্টিভিজম

২. সুন্নী এক্টিভিজমের প্রধান প্রধান ধারা

৩. সুন্নী রাজনৈতিক ইসলামপন্থা: ‘হারাকাত’ ও ‘হিজব’


. সুন্নী এক্টিভিজমের প্রধান প্রধান ধারা

এক দশক আগেও সুন্নী এক্টিভিজমের ধারাগুলোকে একসাথে গুলিয়ে ফেলা হতো। এখন এই ধারাগুলোকে আলাদা হিসেবে বিবেচনা করা দরকার। অতীতে কিছু মৌলিক উদ্দেশ্য ও নীতির আলোকে এই ধারাগুলোকে চিহ্নিত করা গেলেও বর্তমানে সেগুলো পরিবর্তিত হয়ে গেছে। এই ধারাগুলো এখন নানা ধরনের পরিস্থিতির চাপ ও নতুন অভিজ্ঞতার আলোকে তাদের কৌশলগত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে থাকে। ফলে এগুলোর মাঝে বিদ্যমান পার্থক্য এখন স্পষ্টভাবে বুঝা যায়। আমরা যদি তাদেরকে বুঝতে চাই এবং নীতিগত অবস্থানকে সঠিকভাবে বিশ্লেষণ করতে চাই, তাহলে কাজের ধরন অনুযায়ী এদেরকে কয়েকটি শ্রেণীতে ভাগ করা দরকার।

স্থানীয় জটিল পরিস্থিতি এবং ধারাগুলোর পারস্পরিক সূক্ষ্ম পার্থক্যগুলো বিবেচনা করে সমসাময়িক সুন্নী এক্টিভিজমকে আমরা তিনটি প্রধান ভাগে ভাগ করতে পারি।[1]

এগুলোর মাঝে প্রথম ধারাটিকে বলা যায়, ‘রাজনৈতিক ইসলাম’ (৩ নং সেকশনে এ সংক্রান্ত বিস্তারিত আলোচনা করা হবে)। রাজনৈতিক ইসলামপন্থী আন্দোলনগুলোর প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো – ধর্মান্তরকরণ প্রচেষ্টার চাইতে রাজনৈতিক পদক্ষেপের প্রতি তারা বেশি গুরুত্ব আরোপ করে থাকে। তারা সহিংসতার পরিবর্তে রাজনৈতিক উপায়ে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার অধিকারী হতে চায়। তাই তারা রাজনৈতিক দল হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে।

উদাহরণ হিসেবে মিশরের মুসলিম ব্রাদারহুড এবং এর  সাথে সম্পর্কিত কিংবা এর প্রভাবে গড়ে ওঠা দলগুলোর কথা কথা বলা যায়। বিশেষত, জর্ডান ও আলজেরিয়ায় এ ধরনের দল রয়েছে। এছাড়া ইন্দোনেশিয়ায় ‘প্রসপারাস জাস্টিস পার্টি’কেও (Partai Keadilan Sejahtera) এই ধারার দল হিসেবে গণ্য করা যায়। রাজনৈতিক ইসলামের আরেকটু ভিন্ন ধারার দল হিসেবে পাকিস্তানের জামায়াতে ইসলামী, তুরস্কের একেপি এবং মরক্কোর পিজেডি’র কথা বলা যায়। এই দলগুলো মুসলিম ব্রাদারহুডের কাঠামোর বাইরে স্বাধীনভাবে গড়ে ওঠেছে। রাজনৈতিক ইসলামপন্থী আন্দোলনগুলোর একটি সাধারণ নীতি হচ্ছে সহিংস উপায় অবলম্বন না করা। তবে বৈদেশিক দখলদারিত্বের মধ্যে থাকলে এর ব্যতিক্রম দেখা যায়। সে ক্ষেত্রে তারা সশস্ত্র প্রতিরোধসহ নানাভাবে তা মোকাবেলা করে। এর অন্যতম উদাহরণ হচ্ছে ফিলিস্তিনের আন্দোলন হামাস।[2]

দ্বিতীয় ধারাটিকে বলা যায় ‘দাওয়াতী তৎপরতা’ (৪নং সেকশনে এ সংক্রান্ত বিস্তারিত আলোচনা করা হবে)। এই ধারাটি একইসাথে পুনর্জাগরণবাদী ও মৌলবাদী। এই ধারার আন্দোলনগুলো সাধারণত রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড এড়িয়ে চলে। তারা রাজনৈতিক ক্ষমতা লাভে যেমন ইচ্ছুক নয়, তেমনি নিজেদেরকে কোনো দলীয় পরিচয়েও আবদ্ধ করে না। ঈমানের মজবুতি অর্জন এবং নৈতিক শৃঙ্খলা মেনে চলার মাধ্যমে মুসলিম উম্মাহর ঐক্যবদ্ধতা বজায় রাখার লক্ষ্যে দাওয়াতী কাজ পরিচালনা করাই এই ধারার লক্ষ্য।

বর্তমানকালে এই ধারার একটি অন্যতম উদাহরণ হচ্ছে সালাফী আন্দোলন। এর উৎপত্তি আরব বিশ্বে হলেও বর্তমানে এটি বৈশ্বিক রূপ লাভ করেছে। সাব-সাহারা আফ্রিকা, দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়াতে এই ধারার কার্যক্রম রয়েছে। ইউরোপেও এর তৎপরতা বাড়ছে।

এই ধারার আরেকটি উদাহরণ হচ্ছে তাবলীগ জামায়াত। ১৯২৬ সালে ভারতে এর উৎপত্তি হয়। তারপর এটি সারাবিশ্বে ছড়িয়ে পড়ে। এখন পর্যন্ত তাবলীগের যথেষ্ট জনপ্রিয়তা থাকলেও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সালাফীদের তুলনায় তাদের ঔজ্জ্বল্য ম্লান হয়ে পড়েছে।

তৃতীয়টি হচ্ছে জিহাদী ধারা (৫ নং সেকশনে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে)। এই ধারার অনুসারীরা সহিংসতায় বিশ্বাসী। কারণ তারা মনে করে, দারুল ইসলামকে (ইসলামী অঞ্চল – বিশ্বের যেসব অঞ্চল ঐতিহাসিকভাবে মুসলিম শাসিত) সামরিক প্রতিরক্ষা প্রদান করা (কিংবা, প্রয়োজনে দারুল ইসলামের ভূখণ্ড সম্প্রসারণ করা) তাদের দায়িত্ব। তারা আরো মনে করে, কাফের মাত্রই উম্মাহর শত্রু।[3] এই ধারাটির মধ্যে আবার দুইটি প্রধান উপধারা রয়েছে:

১. তথাকথিত সালাফীপন্থী ‘জিহাদী’ ধারা (আল-সালাফিয়্যাহ আল-জিহাদিয়্যাহ): এ ধারার অনুসারীদেরকে আপাতদৃষ্টিতে সালাফী মনে হলেও তারা আসলে উগ্রপন্থী। তারা অহিংস ধারার দাওয়াতী তৎপরতা পরিত্যাগ করে সশস্ত্র জিহাদী তৎপরতায় শামিল হয়েছে।

২. তথাকথিত কুতুবপন্থী এক্টিভিস্ট (আল-কুতুবিয়্যিন): এরা মিশরের সাইয়েদ কুতুবের (১৯০৬–১৯৬৬)[4] র‍্যাডিক্যাল চিন্তাভাবনা দ্বারা প্রভাবিত। তাদের কথা হচ্ছে, ‘দূরের শত্রু’ তথা ইসরাইল ও পাশ্চাত্যের (বিশেষত যুক্তরাষ্ট্রের) বিরুদ্ধে বৈশ্বিক জিহাদ শুরু করার আগে ‘কাছের শত্রু’র অর্থাৎ, ‘কাফের’ হিসেবে বিবেচিত স্থানীয় শাসকদের (যেমন, মিশরের শাসকগোষ্ঠী) বিরুদ্ধে জিহাদ করতে হবে।

গত প্রায় পনের বছর ধরে গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রবণতা লক্ষ করা যাচ্ছে। সেটি হলো, এই দুই ধারার জিহাদী গোষ্ঠী দৃষ্টিভঙ্গির দিক থেকে পরস্পরের অধিকতর নিকটবর্তী হচ্ছে। এই প্রক্রিয়ায় ওসামা বিন লাদেনের আল কায়েদা নেটওয়ার্কটি সালাফীপন্থী জিহাদী ও কুতুবপন্থী চিন্তাধারার সমন্বয়ে নতুনভাবে পরিচিতি লাভ করেছে। বিন লাদেনের প্রধান সহযোগী আইমান আল জাওয়াহিরীর হাত ধরে আল কায়েদায় কুতুবপন্থী চিন্তাধারার প্রবেশ ঘটেছে। জাওয়াহিরী এক সময় মিশরের কুতুবপন্থী গ্রুপ ‘তানজিম আল-জিহাদে’র নেতা ছিলেন। এই দলটি ১৯৭৬ থেকে ১৯৯৭ সাল পর্যন্ত মিশর সরকারের বিরুদ্ধে বিচ্ছিন্ন সন্ত্রাসী তৎপরতা পরিচালনা করতো।[5]

এই সকল ধারার মাঝে একমাত্র তাবলীগ জামায়াতই হলো সবচেয়ে শান্ত প্রকৃতির। অন্য ধারাগুলো তাবলীগের মতো প্রচারবিমুখ নয়। বাকি সবগুলো ধারারই রাজনীতির সাথে সংযোগ রয়েছে।

সুন্নী এক্টিভিজমের এই তিনটি ধারার প্রায় সবাই মুসলিম সরকার ও সরকারের অনুগত আলেম এবং একইসাথে আমেরিকা ও অন্যান্য পশ্চিমা সরকারের বিভিন্ন নীতির কঠোর সমালোচনা করে থাকে। তবে তারা স্ব স্ব অবস্থান থেকে এ জাতীয় সমালোচনা করলেও সবার দৃষ্টিভঙ্গিই খুব সংকীর্ণ।

কোনো বিশেষ পরিস্থিতিতে সহিংসতা বৈধ নাকি অবৈধ – তা নিয়ে ইসলামপন্থী আন্দোলনগুলোর সাথে মুসলিম বিশ্বের সেক্যুলারদের মধ্যে যত বিতর্ক রয়েছে, তারচেয়েও বেশি বিতর্ক রয়েছে এসব আন্দোলনগুলোর নিজেদের মধ্যেই। অন্যদিকে, মুসলিম বিশ্ব ও পাশ্চাত্যের মধ্যে এ সংক্রান্ত বিতর্ক আরো কম। মুসলমানদের বিদ্যমান সংকট নিয়ে সুন্নী ইসলামপন্থার তিনটি ধারার মধ্যে ভিন্ন ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি রয়েছে। এই ভিন্নতার কারণে সংকট উত্তরণের উপায় নিয়ে তাদের প্রস্তাবনাগুলোও আলাদা। ফলে এগুলো নিয়ে তাদের নিজেদের মধ্যে যথেষ্ট দ্বন্দ্ব রয়েছে করে। এগুলো নিম্নরূপ:

  • রাজনৈতিক ইসলামপন্থীরা সালাফীদের সমালোচনা করে থাকে, কিংবা তাদের থেকে অন্তত দূরত্ব বজায় রেখে চলে। তাদের সমালোচনার মূল কথা হচ্ছে, সালাফীরা ব্যক্তিগত আচার-আচরণ নিয়ে খুব বেশি ব্যস্ত থাকে (যেমন, যথাযথ ইসলামী পোশাক, খাওয়া-দাওয়া, উঠা-বসা এবং ঘুমের মতো ছোটখাট বিষয়ের আদব নিয়ে ব্যস্ত থাকা)। এসব নিয়ে ব্যস্ত থাকায় অধিক গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুগুলো থেকে মুসলমানদের দৃষ্টি অন্যদিকে সরে যায়।
  • রাজনৈতিক ইসলামপন্থীরা তাদের প্রতিদ্বন্দী কট্টর জিহাদীদেরও তীব্র সমালোচনা করে থাকে। উদাহরণ হিসেবে মিশরের মুসলিম ব্রাদারহুডের কথা বলা যায়। এ দলটি ইসলামী-জাতীয়তাবাদী চেতনাকে ধারণ করে এবং সনাতনী ধারার জিহাদকে সমর্থন করে; যেমন – ফিলিস্তিনের হামাসের জিহাদ। তবে তারা সালাফপন্থী জিহাদী এবং সাইয়েদ কুতুবের জিহাদী প্রবণতাকে সমর্থন করে না। সর্বোপরি, মুসলিম ব্রাদারহুড ও অন্যান্য রাজনৈতিক ইসলামপন্থীরা জিহাদী ধারা থেকে দূরত্ব বজায় রেখে চলে। এর কারণ হচ্ছে, জিহাদীরা আইন সংক্রান্ত ব্যাপারে সালাফীদের মতো (যে দৃষ্টিভঙ্গি মুসলিম ব্রাদারহুডের সাম্প্রতিক দৃষ্টিভঙ্গির সম্পূর্ণ বিপরীত) এবং রাষ্ট্র সম্পর্কে কুতুবপন্থীদের মতো দৃষ্টিভঙ্গি পোষণ করে।
  • জিহাদীরা ‘কাছের শত্রু’র বিরুদ্ধে যুদ্ধে লিপ্ত হলে সালাফী ধার্মিক ইসলামপন্থীরা তাদের সমালোচনা করে বলে, জিহাদীরা আসলে কুতুবপন্থীদের মতো কাজ করছে। এভাবে সালাফীরা অধঃপতিত মুসলিম শাসকদেরকে উগ্র জিহাদী ও কুতুবপন্থীদের কোপানল থেকে রক্ষা করে। কিন্তু ‘দূরের শত্রু’র বিরুদ্ধে জিহাদের ব্যাপারে সালাফীদের তেমন কোনো আপত্তি নেই; যেমন – কাফেরদের আগ্রাসন থেকে উম্মাহকে রক্ষা করার জন্য জিহাদ। তবে এক্ষেত্রে বিরোধিতা করলেও বাস্তব কারণেই করে থাকে, কোনো তাত্ত্বিক কারণে নয়। এসব ক্ষেত্রে যেসব মুসলিম সরকারের সাথে সালাফীদের সম্পর্ক রয়েছে সেই সরকারের পলিসির উপর ভিত্তি করে তাদের বিরোধিতা করা বা না করা নির্ভর করে। ফলে সরকারের যেসব পলিসি জনগণের চোখে সন্দেহজনক, সেগুলো আপাত হয়তো ‘বৈধতা’ পায়, তবে জিহাদীদের সম্পর্কে সালাফীদের এসব সমালোচনার কোনো নৈতিক ভিত্তি নেই।
  • রাজনৈতিক ও দলীয় উদ্দেশ্যে ধর্মকে ব্যবহার করা এবং মুসলিম শাসকদের সাথে দ্বন্দ্বে জড়ানোর জন্য সালাফীরা রাজনৈতিক ইসলামপন্থী, বিশেষত মুসলিম ব্রাদারহুডের তীব্র সমালোচনা করে থাকে। সালাফীদের সাম্প্রতিক অভিধানে সংযুক্ত ‘ইখওয়ানী’ (এর অর্থ হচ্ছে, ইখওয়ানুল মুসলিমিন তথা মুসলিম ব্রাদারহুডের সদস্য) শব্দটি এক ধরনের গালি হিসেবেই ব্যবহৃত হয়। রাজনৈতিক ইসলামপন্থীদের সমালোচক সালাফীরা এই ক্ষেত্রে রক্ষণশীল সুন্নীদের মতোই মুসলিম শাসকদেরকে (তারা যতো খারাপই হোক না কেন) ভিন্ন চোখে দেখে থাকে। অন্যদিকে, তারা ‘পশ্চিমা’ রাজনৈতিক ধারণাগুলোর (যেমন – নির্বাচন, রাজনৈতিক দল ইত্যাদি) প্রতি বৈরি মনোভাব পোষণ করে। ‘রাজনৈতিক ইসলামে’র ব্যাপারে পাশ্চাত্যের সমসাময়িক বিশ্লেষণগুলোকে তারা ধর্মের এক প্রকার বিকৃতি বলে মনে করে।
  • সালাফীদের মতো জিহাদীরাও একই কায়দায় রাজনৈতিক ইসলামপন্থীদের সমালোচনা করে। অর্থাৎ, তাদের মতে, রাজনৈতিক ইসলামপন্থীরা রাজনৈতিক ও দলীয় উদ্দেশ্যে ধর্মকে ব্যবহার করে এবং পশ্চিমা (‘কোনো কিছু পশ্চিমা হওয়া মানেই তা অনৈসলামী’ বলে তারা মনে করে) রাজনৈতিক মডেলের অন্ধ অনুকরণ করে। তবে জিহাদীরা সাধারণত রাজনৈতিক ইসলামপন্থীদের সাথে দ্বন্দ্বে না গিয়ে পাশ কাটিয়ে যায়।
  • কোনো কোনো জিহাদী গোষ্ঠী বৃহত্তর সালাফী আন্দোলনের অভ্যন্তরীণ বিতর্কে বেশ ভালোভাবেই জড়িয়ে পড়ে। তারা সরকারী সালাফী আলেমদের (যেমন – সৌদি আরবের সরকারী আলেমগণ) পরিবর্তে ভিন্নমতাবলম্বী সালাফী আলেমদের ধারাকে শক্তিশালী করার প্রয়াস চালায়। তবে এই ধরনের প্রচেষ্টাকে ভিন্নমতাবলম্বী সালাফী আলেমদের কেউ কেউ প্রত্যাশা করেন না। এই প্রচেষ্টার ফলে তারা উল্টো বিব্রতবোধ করেন।

এই পরিস্থিতিতে যেটা বেশ লক্ষ্যণীয় এবং বিশেষত পশ্চিমাদের জন্য বেশ গুরুত্বপূর্ণ, সেটা হচ্ছে, ‘ইসলামী মৌলবাদ’ ও ‘চরমপন্থা’র সাথে ‘রাজনৈতিক ইসলাম’কে একই দৃষ্টিতে দেখা হলেও বাস্তবে এটি একটি রাজনৈতিক ব্যাপার। মিশরের মুসলিম ব্রাদারহুড, মরক্কোর জাস্টিস এন্ড ডেভেলপমেন্ট পার্টি (পিজেডি) এবং তুরস্কের জাস্টিস এন্ড ডেভেলপমেন্ট পার্টি (একেপি) – এই দলগুলো অনেক বেশি রাজনৈতিক এবং খুবই কম মাত্রার মৌলবাদী চরিত্রের। এই দলগুলো গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ ও রীতিনীতি মেনে নেয়ার ক্ষেত্রে অনেক দূর এগিয়ে গিয়েছে, অতীতে যেগুলোকে ‘অনৈসলামী’ মনে করে এড়িয়ে চলা হতো। একইসাথে তারা ইসলামী আইনের ব্যাপারে আধুনিক দৃষ্টিভঙ্গিকে গ্রহণ করে নিচ্ছে।

এই দলগুলোর রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গির প্রেক্ষিত বিবেচনা করলে স্পষ্টতই বুঝা যায়, ঐক্য গড়ে তোলা এবং জনমতকে পক্ষে নিয়ে আসার উদ্দেশ্যে এ ধরনের রাজনৈতিক কৌশল গ্রহণ করা হয়। ইসলামী ঐতিহ্যের ভেতর থেকেই এই ব্যাপারগুলোকে সমকালীন বাস্তবতার সাথে খাপ খাইয়ে নেয়াও এর একটা উদ্দেশ্য।

সালাফীরা রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে আগ্রহী নয়। নিজস্ব আলেমদের প্রদত্ত ধর্মগ্রন্থের আক্ষরিক ব্যাখ্যার উপর তারা পুরোপুরি নির্ভরশীল। এটাকে তারা তাদের আলেমদের বায়বীয় কর্তৃত্ব বলেই ধরে নেয়। সালাফী আলেমগণ সাধারণ রাজনৈতিক বিষয়ে আগ্রহ দেখান না (যদিও সাম্প্রতিককালে সৌদী আলেমদের মধ্য থেকে ‘সাহওয়া’ নামে পরিচিত একদল তরুণ প্রজন্মের কিছু বৈশিষ্ট্যকে বিবেচনায় নিলে বুঝা যায়, তাদের মাঝে এক ধরনের পরিবর্তন শুরু হয়েছে)।

তাই এ কথা বলাই যথার্থ হবে, রাজনৈতিক ইসলামপন্থীরা নয় বরং ধর্মীয় কিংবা দাওয়াতী এক্টিভিস্টরাই বর্তমানে আসল মৌলবাদী। আফগান জিহাদ, ফিলিস্তিন ইস্যু এবং সাম্প্রতিককালের ইরাক আগ্রাসনের ফলে সৃষ্ট বিপর্যয় দেখে তারা সালাফী মতাদর্শের উগ্র অনুসারী হয়ে ওঠে; যদিও আধুনিক ধারার রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড সম্পর্কে তাদের কোনো অভিজ্ঞতা নেই। এ ব্যাপারে তাদের কোনো আগ্রহও নেই। ফলে তারা সোজা ‘জিহাদী ফর্মুলা’য় আকৃষ্ট হয়ে পড়ে।

মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদে এই প্রধান তিনটি ধারার কোনটি টিকে থাকবে, তা অনুমান করা বেশ দুরূহ ব্যাপার। মরক্কো ও তুরস্কে সাম্প্রতিককালে ইসলামী রাজনৈতিক আন্দোলনগুলো উল্লেখযোগ্য সফলতা অর্জন করেছে। তবে মিশরে এখন পর্যন্ত মুসলিম ব্রাদারহুড নিষিদ্ধ রয়েছে এবং আলজেরিয়া ও জর্ডানেও তাদের রাজনৈতিক প্রভাব কমে যাচ্ছে (যদিও ফিলিস্তিনে এখন পর্যন্ত তাদের প্রভাব অক্ষুন্ন রয়েছে এবং ইউরোপের মুসলিম অভিবাসীদের মাঝেও সম্ভবত তাদের প্রভাব বাড়ছে)।

আশির দশক পর্যন্ত সালাফী ধারার প্রভাব-প্রতিপত্তি ছিল শীর্ষে। তখন এর প্রাসঙ্গিকতাও ছিল। পরবর্তীকালে এই ধারাটি ওয়াহাবী মতাদর্শনির্ভর হয়ে পড়ে। ১৯৯০-১৯৯১ সালের দিকে সৌদি ওয়াহাবিজমে মারাত্মক ভাঙ্গন ধরে এবং পরবর্তীতে তা অব্যাহত থাকে। উপরন্তু, সাম্প্রতিককালে তাদের বুদ্ধিবৃত্তিক ও আধ্যাত্মিক নেতৃত্বে এক ধরনের শূন্যতা তৈরি হয়েছে। তাই বলা যায়, আরব বিশ্বে ইতোমধ্যে সালাফী আন্দোলনের পতন শুরু হয়েছে। তবে সাব-সাহারা আফ্রিকা, দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া এবং ইউরোপে তারা এখন পর্যন্ত বেশ ভালোভাবেই বিস্তৃতি লাভ করছে।

মুসলিম বিশ্বের আনাচে-কানাচে এবং অভিবাসী মুসলমানদের মাঝে সালাফী আন্দোলন ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছে। তরুণদের মধ্যে এর প্রভাব এতো বেশি বিস্তৃত ও গভীর যে, সালাফি-জিহাদপন্থা থেকে এর পার্থক্য করা দিন দিন কঠিন হয়ে পড়ছে। এই জটিলতা ক্রমে বেড়েই চলছে।

মুসলিম দেশগুলোর রাজনৈতিক সংস্কারের সম্ভাবনা, পাশ্চাত্য ও মুসলিম বিশ্বের মধ্যকার সম্পর্ক, পাশ্চাত্যের দেশগুলোর জাতীয় নিরাপত্তা এবং ইউরোপীয় দেশগুলোতে মুসলিম অভিবাসীদের ইন্টিগ্রেশনের সম্ভাবনার ক্ষেত্রে উপরোল্লিখিত ধারাগুলোর পারস্পরিক দ্বন্দ্বের ফলাফল যে বেশ গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলবে, তা নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই। এই প্রভাবগুলো কী কী এবং এসব ক্ষেত্রে পাশ্চাত্য কী ভূমিকা রাখতে পারে, সে সংক্রান্ত আলোচনা এই প্রতিবেদনের সর্বশেষ সেকশনে (৭নং সেকশন) আলোচনা করা হয়েছে।

রেফারেন্স ও নোট:

[1] পৃথিবীর অধিকাংশ (প্রায় ৮০ থেকে ৯০ ভাগ) মুসলমানই সুন্নী। বাকীদের মধ্যে অধিকাংশই শিয়া ধারার অনুসারী। এরমধ্যে একমাত্র ইরানে শিয়ারা সংখ্যাগরিষ্ট। এছাড়া আজারবাইজান, বাহরাইন ও ইরাকে সর্বাধিক সংখ্যক শিয়া মুসলমানদের বাস। বর্তমানে লেবানন, কুয়েত, সৌদি আরব, আফগানিস্তান, পাকিস্তান এবং ভারতে কিছু শিয়া মুসলমান বসবাস করছে।

[2] মুসলিম ব্রাদারহুডের ফিলিস্তিনি সংগঠন হামাস জিহাদী ক্যাটাগরির পরিবর্তে ‘রাজনৈতিক ইসলামে’র অন্তর্ভুক্ত। তারা ব্রাদারহুডের ‘আধুনিকতাবাদী ইসলামী’ চিন্তাধারাকে গ্রহণ করে। এ কারণে তারা সাইয়েদ কুতুবপন্থী জিহাদী এবং সালাফী জিহাদী আন্দোলনগুলো থেকে বেশ আলাদা। তাদের সশস্ত্র প্রতিরোধকে অবশ্যই জিহাদ বলা যায়, যেহেতু তারা মনে করে (সেটা সঠিক বা ভুল যাই হোক না কেন) পরিস্থিতি (অর্থাৎ ইসরাইলী দখলদারিত্ব) তাদেরকে বাধ্য করেছে। কুতবপন্থী জিহাদী ও সালাফী জিহাদীরা অহিংস রাজনৈতিক তৎপরতার পরিবর্তে সশস্ত্র জিহাদকে যেমন প্রাধান্য দেয়, হামাসের ক্ষেত্রে ব্যপারটা তেমন নয়। ইসলামপন্থীদের বাইরে অন্যান্য শক্তির সাথেও হামাস মিত্রতা স্থাপন করতে আগ্রহী। অমুসলিম ফিলিস্তিনীদের প্রতি তাদের কোনো প্রকাশ্য সাম্প্রদায়িক দৃষ্টিভঙ্গি নেই (যদিও ইহুদীবাদ ও ইসরাইলবিরোধী প্রবণতা তাদের মধ্যে পুরোমাত্রায় বিদ্যমান)। জিহাদীদের মাঝে এ ধরনের উদারতা দেখা যায় না।

[3] এখানে উল্লেখিত তিন ক্যাটাগরির কোনোটাতেই যে ধারাটি পড়ে না সেটা হচ্ছে ‘হিজবুত তাহরীর আল ইসলামী’। গোপনে তৎপরতা চালানোর লেনিনীয় মডেল দ্বারা দলটি অনুপ্রাণিত হলেও একে প্রচলিত ধারার রাজনৈতিক গোষ্ঠী বলা যায় না। আবার এটি ধর্মীয় দাওয়াতী তৎপরতার সাথেও যুক্ত নয়, এমনকি জিহাদী গ্রুপও নয়। দলটি ১৯৫২ সালে জেরুজালেমে প্রতিষ্ঠিত হয়। শুরু থেকেই ফিলিস্তিনের স্বাধীনতা সংগ্রামের সাথে দলটির কার্যকর কোনো যোগাযোগ নেই। এই দলটি এমন এক ধরনের আন্দোলন গড়ে তুলেছে, যার কর্মকাণ্ড মুসলমানদের কোনো নির্দিষ্ট ভূখণ্ডে সীমাবদ্ধ নয়। এদিক দিয়ে এটা অনেকটা তাবলীগ জামায়াতের মতো। দলটি বিশ্বব্যাপী তাদের কর্মকাণ্ড বিস্তার করতে চায়। ইসলামী খেলাফত পুনঃপ্রতিষ্ঠা করার জন্য তারা প্রচারণা চালায়। জিহাদী গ্রুপগুলোরও একই ধরনের উদ্দেশ্য রয়েছে। তবে হিজবুত তাহরীর জিহাদীদের মতো সহিংস তৎপরতা থেকে বিরত থাকে। ব্রিটেন ও অন্যান্য ইউরোপীয় বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মুসলিম শিক্ষার্থীদের মাঝে এরা বেশ জনপ্রিয়। সম্প্রতি মধ্য এশিয়াতেও এদের কর্মকাণ্ড লক্ষ করা যাচ্ছে। এ ব্যাপারে বিস্তারিত দেখুন: Crisis Group Asia Report N°58, Radical Islam in Central Asia: Responding to Hizb ut-Tahrir, 30 June 2003.

[4] সাইয়েদ কুতুবের চিন্তা ও প্রভাব সম্পর্কিত আলোচনার জন্য দেখুন: Crisis Group Briefing, Islamism in North Africa I, op. cit.

[5] দেখুন ক্রাইসিস গ্রুপের ব্রিফিং: Islamism in North Africa II, op. cit.

আইয়ুব আলী
আইয়ুব আলী
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগে অধ্যয়নরত

One thought on “ইসলামপন্থার সাথে বোঝাপড়া (পর্ব–৩)

আপনার মন্তব্য লিখুন