রবিবার, নভেম্বর ১৯, ২০১৭
হোম > পর্যালোচনা > ইসলামপন্থার সাথে বোঝাপড়া (পর্ব–২)

ইসলামপন্থার সাথে বোঝাপড়া (পর্ব–২)

এডিটর’স নোট:

ব্রাসেলসভিত্তিক থিংকট্যাংক ‘ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপ’ নানা বিষয়ে নিয়মিত গবেষণামূলক প্রতিবেদন প্রকাশ করে থাকে। পাশ্চাত্যের নীতি-নির্ধারণী মহল কর্তৃক সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষেত্রে এসব গবেষণা যেন সহায়ক ভূমিকা পালন করে, এই হলো তাদের উদ্দেশ্য। ২০০৫ সালের ২ মার্চ তারা ‘আন্ডারস্ট্যান্ডিং ইসলামিজম’ শিরোনামে একটি গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশ করে। পাশ্চাত্যের একটি থিংকট্যাংক ইসলামপন্থাকে কোন দৃষ্টিতে দেখে, তা এই প্রতিবেদনে ফুটে ওঠেছে। নানা কারণেই বাংলাদেশে এখন ইসলামপন্থা নিয়ে নতুন করে আগ্রহ তৈরি হওয়ার পরিস্থিতি দাঁড়িয়েছে। তাই সিএসসিএস-এর পাঠকদের জন্য প্রতিবেদনটির নির্বাচিত অংশ ধারাবাহিকভাবে অনুবাদ করছেন আইয়ুব আলী


সারসংক্ষেপ

১. ইসলাম, ইসলামপন্থা এবং ইসলামিক এক্টিভিজম

২. সুন্নী এক্টিভিজমের প্রধান প্রধান ধারা

৩. সুন্নী রাজনৈতিক ইসলামপন্থা: ‘হারাকাত’ ও ‘হিজব’


. ইসলাম, ইসলামপন্থা এবং ইসলামিক এক্টিভিজম

ক্রাইসিস গ্রুপ এই প্রতিবেদনে ইসলামপন্থাকে ‘ইসলামিক এক্টিভিজমে’র সমার্থক হিসেবেই সংজ্ঞায়িত করছে এবং আগামীতেও করবে। ইসলামিক এক্টিভিজম বলতে এমন কোনো বিশ্বাস, নির্দেশনা, বিধান বা পলিসির প্রতি জোরালো সমর্থন ও প্রচারকে বুঝায়, যা বৈশিষ্ট্যের দিক থেকে ইসলামী।[1] এই দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে ইসলামপন্থার অনেকগুলো ধারা লক্ষ করা যায়। কিন্তু প্রায় সকল ধারার মধ্যে একটি অভিন্ন ব্যাপার রয়েছে। সেটা হচ্ছে, তারা সকলেই মনে করে তাদের কর্মকাণ্ড কোরআন-হাদীস ও প্রামাণ্য ব্যাখ্যাগ্রন্থসমূহে বিদ্যমান ইসলামী শিক্ষা এবং ঐতিহ্যের আলোকেই পরিচালিত হচ্ছে।

পশ্চিমা ডিসকোর্সে যে কোনো ধরনের ইসলামিক এক্টিভিজমকে ‘ইসলামপন্থা’, বা ‘রাজনৈতিক ইসলাম’, কিংবা ‘ইসলামী মৌলবাদ’ হিসেবে চিহ্নিত করে কমবেশি একমাত্রিক হিসেবে তুলে ধরা হয়। তারপর ধর্মীয় বিশ্বাস হিসেবে ‘সাধারণ মুসলমানগণ’ ইসলামকে যেভাবে মেনে চলে, তার বিপরীত হিসেবে এগুলোকে উপস্থাপন করা হয়। ৯/১১’র হামলার প্রতিক্রিয়ায় যুক্তরাষ্ট্র কর্তৃক তথাকথিত ‘সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ’ ঘোষণার প্রেক্ষিতে এই প্রবণতা আরো প্রবল হয়ে ওঠে।

আমেরিকায় এই হামলার পর আফ্রিকা ও এশিয়ায় গত তিন বছর ধরে যেসব হামলা সংঘটিত হচ্ছে, তাতে ইসলামিক এক্টিভিজমের ক্ষেত্রে অনেক ‘আশংকাজনক’ পরিবর্তন এসেছে বলে মনে করা হচ্ছে। এ পরিবর্তন ব্যাপক মাত্রায় সহিংসতার দিকে মোড় নিচ্ছে এবং এর পরিণতিতে পাশ্চাত্যের পাশাপাশি অন্যান্য দেশগুলোতেও হামলা হচ্ছে। পাশ্চাত্যের এই একপেশে ধারণা সম্পূর্ণ ভুল। তাদের অকার্যকর পলিসি গ্রহণের পেছনেও এই ভুল ধারণা দায়ী।

সকল ধারার ইসলামিক এক্টিভিজমকে একই দৃষ্টিতে  দেখার এই চরম প্রবণতা এসেছে মূলত ‘সভ্যতার সংঘাত’ তত্ত্ব  থেকে। এই তত্ত্বে সমগ্র মুসলিম বিশ্ব তথা ইসলামকে একটা ‘আধা সভ্যতা’ হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। অর্থাৎ, মনে করা হচ্ছে, সভ্যতা হিসেবে ইসলাম স্বভাবজাতভাবেই একটি একক সমস্যা। অতএব, একে টার্গেট করতে হবে।

এই একই প্রবণতা সাধারণত পাশ্চাত্যের অন্যান্য জটিল তত্ত্বগুলোর ক্ষেত্রেও পরিলক্ষিত হয়। সবক্ষেত্রেই একটি সাধারণ ব্যাপার হলো, পশ্চিমা নেতৃবৃন্দ মুসলমানদেরকে দুটি পক্ষে (dichotomy) ভাগ করে থাকে। এর এক পক্ষে আছে, ‘আধা সভ্য’ ধর্ম হিসেবে ইসলাম ও তার অনুসারী সেই গোবেচারা মুসলমানরা; যাদের নিকট ‘ইসলাম’ আত্মশুদ্ধি অর্জনের উপায়, রাজনৈতিক লক্ষ্য হাসিলের উপায় নয়। আর অপর পক্ষটি হচ্ছে ‘ইসলামপন্থা’ এবং ‘রাজনৈতিক ইসলামে’র অনুসারীরা। যারা মুসলমানদের বিশ্বাসকে ব্যবহার করে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ইসলামকে মুষ্ঠিমেয় আন্দোলনকারীর স্বার্থে কাজে লাগাচ্ছে। পাশ্চাত্যের স্বার্থ, এমনকি মুসলিম রাষ্ট্রগুলোর স্বার্থের বিরুদ্ধে পর্যন্ত ক্ষোভ উসকে দিচ্ছে এবং সমস্যা তৈরি করছে।

নানা কারণেই এই দ্বি-বিভাজন ((dichotomy) যথেষ্ট বিভ্রান্তিকর। প্রথমত, যেসব ধ্যানধারণার (premise) উপর দাঁড়িয়ে ইসলামকে দেখা হয়, তা আসলে অবাস্তব। ইসলাম যতটা শান্তির ধর্ম,[2] তারচেয়েও বেশি আইননির্ভর ধর্ম[3] (religion of law)। এই দৃষ্টিকোণ থেকে খ্রিস্টধর্মের সাথে ইসলামের তেমন মিল নেই, বরং ইহুদী ধর্মের সাথেই এর মিল বেশি। ইসলাম ও খ্রিস্টধর্মের বার্তাবাহক ভিন্ন হলেও ঐশীবাণী একই – এই ধারণা থেকে ইসলামকে একটি অরাজনৈতিক শান্তির ধর্ম হিসেবে উপস্থাপন করার প্রচেষ্টা করা হয়। অথচ এটি মূলত খ্রিষ্টধর্মের একান্ত স্বভাবজাত বৈশিষ্ট্য। এই বৈশিষ্ট্য অন্যান্য ধর্মবিশ্বাসে নাও থাকতে পারে এবং ইসলামে তা মোটেও নেই।[4] আইনী ধর্ম (religion of law) হওয়ায় ইসলাম স্বভাবতই সরকারব্যবস্থার সাথে সম্পর্কিত এবং রাজনীতি-সংশ্লিষ্ট।

দ্বিতীয়ত, ধর্মীয় বিশ্বাসকে নিতান্তই এক ধরনের ব্যক্তিগত বিষয় হিসেবে ‘সাধারণ মুসলমান’দের উপর চাপিয়ে দেয়া হয়।[5] কিন্তু এই দৃষ্টিভঙ্গি মোটেও বাস্তবসম্মত নয়। বরং অধিকাংশ মুসলমানই ইসলামকে ‘একটি সহজাত সামাজিক ব্যাপার’ (an intrinsically public matter) বিবেচনা করে। এটি স্বীকার করে নেয়াটাই অধিক যুক্তিসংগত। কারণ, ইসলাম নিছক মুসলিম উম্মাহর ব্যাপার নয়। ইসলাম অন্যান্যদের নিকটও তার আইনী নির্দেশনা ও নৈতিক মূল্যবোধগুলো প্রচার করার কথা বলে। ফলে এটি ‘সমাজব্যবস্থার একটি রূপরেখা’ হয়ে উঠেছে।[6] এই কারণে অধিকাংশ ‘সাধারণ মুসলমাদের’ মধ্যে একটা অদৃশ্য, কিন্তু শক্তিশালী, প্রবণতা লক্ষ্য করা যায়। সেটা হচ্ছে, সংখ্যালঘু ইসলামপন্থী এক্টিভিস্টদের প্রতি তারা ইতিবাচক মনোভাব পোষণ করে। যেই এক্টিভিস্টদের লক্ষ্য হলো – তারা যেখানে বাস করে সেখানে ধর্মীয় নির্দেশনা অনুযায়ী সামাজিক রীতিনীতি, আইনকানুন এবং সরকারব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা।

এভাবে ‘সাধারণ মুসলমান’ ও ইসলামী এক্টিভিস্টদের মাঝে কল্পিত দ্বন্দ্ব বেশ দুর্বল হয়ে পড়ছে, যা চাপের মুখে ভেঙ্গে পড়তে বাধ্য। আর সবাই না হলেও অধিকাংশ মুসলমানই যে এখন ব্যাপক অস্থিরতার মধ্যে বসবাস করছে, তা বলাও অত্যুক্তি হবে না।

তৃতীয়ত, এ দ্বি-বিভাজনে ‘রাজনৈতিক ইসলামে’র ধারণাকে যেভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে, তা ঐতিহাসিক তো নয়ই; বরং উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। ‘রাজনৈতিক ইসলাম’ আমেরিকারই উদ্ভাবিত একটি পরিভাষা। ইরান বিপ্লবের সময় থেকে এর ব্যবহার শুরু হয়। ধরেই নেয়া হয়েছে, ‘অরাজনৈতিক ইসলাম’ই মূল ধারা। যেন খোমেনী এসেই ধারাটিকে একদম উল্টে দিয়েছেন। অথচ বাস্তবতা হচ্ছে, ১৯৭৯ সালের বহু আগে থেকেই ইসলাম একটি শক্তিশালী রাজনৈতিক ধর্ম হিসেবে প্রচলিত। ১৯৪৫ থেকে ১৯৭০ সালের মাঝের ক্ষণস্থায়ী সেক্যুলার আরব জাতীয়তাবাদের সময়টুকু ছাড়া ইতিহাসের খুব কম সময়েই ইসলাম অরাজনৈতিক প্রকৃতির ছিল। ওই সময়টুকুতেও যে ইসলাম পুরোপুরি অরাজনৈতিক ছিল, সে কথাও হলফ করে বলা যায় না।

ধর্মীয় ক্ষেত্রকে নিয়ন্ত্রণ করার পাশাপাশি ইসলামের মধ্যকার আধুনিকতাপন্থী ও জাতীয়তাবাদী ধারাগুলোকে শুধু আরব জাতীয়তাবাদী সরকারগুলোই সমর্থন করতো না, পাশ্চাত্যও করতো। আরব জাতীয়তাবাদের বিরোধিতার অংশ হিসেবে গত শতাব্দীর পঞ্চাশের দশকের শুরু থেকে পাশ্চাত্য (বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র) সৌদি আরব ও পাকিস্তানের নেতৃত্বে রক্ষণশীল মুসলিম রাষ্ট্রগুলোকে একটি জোট গঠন করতে সমর্থন ও উৎসাহ দিতে থাকে। এর উদ্দেশ্য ছিল পাশ্চাত্যপন্থী প্যান-ইসলামিজমের একটি ধারণা প্রতিষ্ঠা করা, যা জামাল নাসেরের মিশর এবং এর মিত্র দেশগুলোতে (আলজেরিয়া, ইরাক, লিবিয়া, সিরিয়া ও দক্ষিণ সুদান) গড়ে ওঠা আরব জাতীয়তাবাদের বিরোধিতা করবে।

‘রাজনৈতিক ইসলাম’ ও এর সংজ্ঞা নিয়ে তখনই সমস্যা তৈরি হয়েছে, যখন ইসলামী রাজনীতি পশ্চিমাবিরোধী – এবং আরো স্পষ্ট করে বলতে গেলে আমেরিকাবিরোধী – দৃষ্টিভঙ্গি লালন করতে শুরু করে। যাইহোক, এখানে একটা বিভ্রান্তি রয়েছে। সেটা হলো, একদিকে তারা এই ধারণা আরোপ করে – ‘রাজনৈতিক ইসলাম’ হলো অরাজনৈতিক ইসলামের একটি বিচ্যুত রূপ (যদিও ঐতিহাসিকভাবে এটি সঠিক নয়); আবার তারা এটাও বুঝতে পারে (তবে এই উপলব্ধি গোপন রাখে) – আসলে রাজনৈতিক ইসলামের সাথে পাশ্চাত্যপন্থী রাজনীতির পার্থক্য রয়েছে। এই বিভ্রান্তির ফলে, ‘ইসলাম’কে যখন পাশ্চাত্যের জন্য হুমকি মনে করা হয়েছে, তখনই কেবল একে রাজনৈতিক হিসেবে বিবেচনা করা শুরু হয়েছে।

সবশেষে বলা যায়, ‘রাজনৈতিক ইসলাম’, ‘ইসলামপন্থা’ এবং ‘ইসলামী মৌলবাদ’ – এগুলোকে বাস্তব ক্ষেত্রে এক ও অভিন্ন হিসেবেই এই দ্বি-বিভাজনে ধরে নেয়া হয়। এই অনুমানের মাধ্যমে ইসলামিক এক্টিভিজমে বিদ্যমান চিন্তাধারা, উদ্দেশ্য ও কর্মপদ্ধতির বৈচিত্র্যকে পুরোপুরি এড়িয়ে যাওয়া হয়। ‘চরমপন্থী’ এবং ‘উদারপন্থী’ হিসেবে যে দুটি বিভাজন করা হয়, তা প্রকৃতপক্ষে একই ধরনের চিন্তাধারা থেকে উদ্ভূত। এ দুই ধারার মধ্যে উদ্দেশ্য ও পলিসিগত মতপার্থক্যের চেয়েও অভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গিই অধিকতর শক্তিশালী।

বাস্তবে, এই দ্বি-বিভাজন মুসলমানদেরকে দুই ভাগে ভাগ করতে চায়। এক ভাগ হচ্ছে মডারেট, যাদের ব্যাপারে পাশ্চাত্যের সরকারগুলোর কোনো মাথাব্যাথা নেই। আর অন্য ভাগের ব্যাপারে তাদের আপত্তি রয়েছে। এই প্রবণতাকে এভাবেও বলা যায় – পাশ্চাত্যের চোখে, একটি ধারা তাদের সাথে তাল মিলিয়ে চলতে পারে। আর অন্য ধারাটি নিজেদের ধর্মবিশ্বাসকে সবচেয়ে বেশি প্রাধান্য দিয়ে থাকে। তাদেরকে প্রভাবিত করা যায় না। এদের ব্যাপারে সাধারণত পাশ্চাত্যের অনুমান হলো, তাদেরকে কোনোভাবেই ছাড় দেয়া যাবে না, অবশ্যই মোকাবেলা করতে হবে।[7]

এই বিশ্লেষণমূলক তত্ত্বের একটি মৌলিক দুর্বলতা হলো, এটি ইসলামী এক্টিভিজমের ধারাগুলোর স্বাতন্ত্র্য বা বৈচিত্র্যতার কারণগুলো নির্ণয় করতে ব্যর্থ হয়েছে। এই ধারাগুলো কট্টরপন্থা কিংবা উদারপন্থা দ্বারা প্রভাবিত না হয়ে নিজস্ব পরিস্থিতি ও চিন্তাধারার আলোকেই গড়ে ওঠেছে। এরমধ্যে মুসলিম সমাজে বিরাজমান সমস্যাগুলোর সমাধানে ভিন্ন ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি ও ইসলামী আইনের বিভিন্ন ধরনের ব্যাখ্যার উপস্থিতি রয়েছে। এছাড়া কাজের আসল ক্ষেত্রগুলো (রাজনৈতিক, ধর্মীয়, সামরিক ইত্যাদি) কী এবং সে ক্ষেত্রগুলোতে কাজ করার বৈধ ও উপযুক্ত পন্থা কী – এই উভয় ব্যাপার নিয়ে ভিন্ন ভিন্ন ধারণা বিদ্যমান রয়েছে। এসব কারণে ইসলামী এক্টিভিজমের ধারাগুলোর মধ্যে স্বাতন্ত্র্য এবং প্রতিদ্বন্দ্বিতা লক্ষ্য করা যায়।

শিয়া[8]-সুন্নী বিভাজনের স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্যগুলো থেকে এসব ধারার বৈশিষ্ট্যের ভিন্নতা রয়েছে। এই ধারাগুলো যতটা না ধর্মীয় ঐতিহ্যের সাথে সম্পর্কিত, তারচেয়েও সমসাময়িক ইসলামী এক্টিভিজমের সাথে বেশি সম্পর্কিত। এই ধারাগুলো মূলত সুন্নী ধারার ভেতরে সাম্প্রতিক সময়ে গড়ে ওঠেছে। এগুলো এখন পর্যন্ত স্বয়ংসম্পূর্ণ হয়ে ওঠতে না পারলেও ধীরে ধীরে বিকশিত হচ্ছে।

রেফারেন্স ও নোট:

[1] ক্রাইসিস গ্রুপের আগের প্রতিবেদনগুলোতে ইসলামপন্থাকে আরো সংকীর্ণভাবে ‘রাজনৈতিক রূপে ইসলাম’ (Islam in political mode) হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছিল। কিন্তু এই গবেষণা প্রতিবেদন থেকে এটা স্পষ্ট বুঝা গেছে, ইসলামপন্থা নিয়ে আগের সংজ্ঞাটির দুটি সমস্যা ছিল। প্রথমত, ধরে নেওয়া হয়েছিল, ইসলাম স্বভাবতই রাজনৈতিক নয়। অথচ এখন পর্যন্ত দেখা গেছে, ইসলাম স্বভাবতই শাসনকার্য সম্পর্কিত ব্যাপারগুলো নিয়ে আগ্রহী। তারমানে, ইসলাম আসলে রাজনৈতিক। দ্বিতীয়ত, আগের প্রতিবেদনগুলোতে ধরে নেওয়া হয়েছিলো, ইসলামপন্থার সকল ধারাই রাজনৈতিক। কিন্তু ব্যাপারটি আসলে তা নয়। রাজনৈতিক, দাওয়াতী ও সহিংস ধারাগুলো তাৎপর্যপূর্ণভাবে একে অপরের থেকে আলাদা। ক্রাইসিস গ্রুপের আগের প্রতিবেদনগুলোতে, বিশেষ করে উত্তর আফ্রিকার প্রেক্ষাপটে, ইসলামপন্থার নানান ধারার প্রভাব এবং তাদের মধ্যকার বিবর্তনের যে বাস্তব চিত্র উপস্থাপন করা হয়েছিল, সে সম্পর্কে বর্তমান প্রতিবেদনে আরো বিস্তারিত বিশ্লেষণ তুলে ধরা হয়েছে। মধ্যপ্রাচ্য এবং উত্তর আফ্রিকা নিয়ে ক্রাইসিস গ্রুপের পূর্ববর্তী প্রতিবেদনগুলোর জন্য দ্রষ্টব্য: Islamism in North Africa I: The Legacies of History, 20 April 2004; Islamism in North Africa II: Egypt’s Opportunity, 20 April 2004; Crisis Group Middle East and North Africa Report N°29, Islamism, Violence and Reform in Algeria: Turning the Page, 30 July 2004; also, Crisis Group Asia Report N°83, Indonesia Backgrounder: Why Salafism and Terrorism Mostly Don’t Mix, 13 September 2004, and Crisis Group Middle East Report N°31, Saudi Arabia Backgrounder: Who Are the Islamists?, 21 September 2004.

[2] ২০০১ সালের ২১ সেপ্টেম্বর কংগ্রেসের এক যৌথ অধিবেশনে প্রেসিডেন্ট বুশ এই পরিভাষাগুলো ব্যবহার করেছিলেন। ‘ইসলামের শান্তিপূর্ণ শিক্ষার’ প্রতি নির্দেশ করে তিনি বার বার বলছিলেন, ‘ইসলামের মর্মবাণী মানুষকে ভালো এবং শান্তিপূর্ণ’ হতে শেখায়। এ বক্তব্য দেয়ার পর খ্রিষ্টান মৌলবাদীরা তার কড়া সমালোচনা করে। তারা বরং উল্টো দাবি করে, ইসলাম কার্যত ও স্বভাবতই একটি আগ্রাসী ও যুদ্ধপ্রবণ ধর্ম। ইসলাম নিয়ে এই দুই প্রকার বক্তব্যের উভয়টিই ভুল ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। ধর্ম হিসেবে ইসলাম খ্রিষ্টান ধর্মের চেয়ে কোনো মাত্রায় কম বা বেশি ‘শান্তিপূর্ণ’ – এমনটা বলা যাবে না। উভয় ধর্মই ভালো-মন্দের লড়াইয়ের ব্যাপারে আপসহীন ধারণা পোষণ করে। উভয় ধর্মই স্রষ্টার নামে পরিচালিত অসংখ্য যুদ্ধকে বৈধতা দিয়েছে। ধর্ম দুটির মধ্যে ধর্মতাত্ত্বিক দ্বন্দ্ব যেমন রয়েছে, আইনী কাঠামোগত দ্বন্দ্বও রয়েছে। খ্রিষ্টধর্ম ত্রিত্ববাদ ও যিশুখ্রিষ্টের ঐশ্বরিক ক্ষমতার উপর বিশ্বাস করে, অন্যদিকে ইসলাম একত্ববাদের উপর দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করে। আবার, এ দুটি ধর্মের আরেকটি মৌলিক পার্থক্য হচ্ছে – ইসলামের একটি পরিপূর্ণ আইনী কাঠামো রয়েছে, যা সরাসরি আল্লাহর কাছ থেকে প্রেরিত, যেগুলো সকল মুসলমান মেনে চলতে বাধ্য। অন্যদিকে খ্রিষ্টান ধর্মেও ‘দশটি বিধান’ (Ten Commandments) রয়েছে, যা স্রষ্টা কর্তৃক প্রেরিত বলে মনে করা হয় এবং যে ব্যাপারে খ্রিষ্টধর্মে কোনো দ্বিমত নেই।

[3] এটা ইসলামের নিজস্ব সংজ্ঞা নয়। বাস্তবতার আলোকে এটা ধরে নেওয়া হয়েছে। এ ব্যাপারে সার্বজনীন কোনো সংজ্ঞা নেই। বাস্তবে মুসলমানরা তাদের ধর্মকে কীভাবে দেখে, সেটাই গুরুত্বপূর্ণ। আর মুসলমানদের এ উপলব্ধির ব্যাপারটি সময় ও পরিস্থিতি ভেদে পরিবর্তিত হয়। সাম্প্রতিককালে অনেক মুসলমানই ইসলামকে নিছক একটি আইনী ধর্ম (religion of law) হিসেবে সংজ্ঞায়িত করার ব্যাপারে আপত্তি করছে। কিছু মুসলিম চিন্তাবিদ ধর্মগ্রন্থে বিদ্যমান আইনী নির্দেশগুলোর তাৎপর্যকে কিছুটা কম গুরুত্বপূর্ণ মনে করছেন, এমনকি অগ্রাহ্য করার চেষ্টা করছেন (এ নিয়ে পড়ুন: নাজিহ আইয়ুবীর Political Islam: Religion and Politics in the Arab World (London and New York , 1991), pp. 201-213 )। তবে খুব কম সংখ্যক  মুসলমানই এরকম মনোভাব পোষণ করে। ইসলামের জনপ্রিয় সুফী ধারায় ধর্মের আধ্যাত্মিক দিককে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়। দুনিয়াবী আইন ও রীতিনীতির চেয়ে  স্রষ্টা সম্পর্কিত জ্ঞানের (প্রায়শই যা গুপ্ত ও আধ্যাত্মিক) সন্ধান করাকেই সুফি ধারায় ব্যক্তির জন্য বেশি গুরুত্বপূর্ণ মনে করা হয়। কিছু আধুনিকতাবাদী মুসলিম চিন্তাবিদ ধর্মগ্রন্থের আইনী বিষয়গুলো নিয়ে প্রশ্ন তুললেও সুফীরা তা করে না। আর এ কারণেই অনেক প্রসিদ্ধ আলেম সুফী ধারার সমর্থক হওয়া সত্ত্বেও তাদের পক্ষে ফিকাহর উপর পাণ্ডিত্য অর্জন করা সম্ভব হয়েছে।

[4] রোমান সাম্রাজ্যের রাজনৈতিক কাঠামোতে খ্রিষ্টর্ধমের যাত্রা শুরু হয়েছিল। যেখানে চার্চ ছিল কমবেশি নিপীড়িত। খ্রিষ্টধর্ম এই অবস্থা থেকে বেরিয়ে আসতে পারেনি। অন্যদিকে এমন একদল মুসলমান নিয়ে ইসলামের যাত্রা শুরু হয়েছিল, যাদের মাধ্যমে ইসলাম নিজেই একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ রাজনৈতিক ব্যবস্থা হিসেবে গড়ে ওঠতে চেয়েছে। এই চাওয়া বেশ দ্রুত বাস্তবায়িত হয়। তারপর আরো দ্রুততার সাথে তা প্রসার লাভ করে। আশেপাশের ভূখণ্ড ও মানুষকে ইসলামের আইনী কাঠামো ও সরকারব্যবস্থার অধীনে নিয়ে আসার পাশাপাশি তাদেরকে ইসলাম ধর্মেও দীক্ষিত করে। ঈশ্বর ও সিজারকে পৃথকীকরণ করাই ছিল রাজনীতি সম্পর্কে খ্রিষ্টধর্মের মৌলিক দৃষ্টিভঙ্গি। খ্রিষ্টধর্মের জন্মলগ্ন থেকে প্রথম তিন শতক পর্যন্ত এই দৃষ্টিভঙ্গি বহাল ছিল। অন্যদিকে, ইসলামের প্রাথমিক কাল থেকেই এ ধরনের কোনো ধারণা মুসলমানদের মধ্যে সম্পূর্ণরূপে অনুপস্থিত ছিল।

[5] ‘সাধারণ মুসলমানদের’ দৃষ্টিভঙ্গির ব্যাপারে এমন ভ্রান্ত ধারণা মূলত স্বয়ং ইসলাম সম্পর্কে ভুল ধারণারই পরিণতি। যা ইতোমধ্যে উল্লেখ করা  হয়েছে।

[6] Ernest Gellner, Muslim Society (Cambridge, 1981), p. 1.

[7] ফাওয়াজ জর্জেসের মতে, ৯/১১-র আগে আমেরিকায় ‘রাজনৈতিক ইসলাম’ সংক্রান্ত বিতর্কে এর পক্ষে-বিপক্ষে আমরা দুটি শ্রেণীকে দেখতে পাই – উদারপন্থী (the accommodationists) এবং উগ্রপন্থী (the confrontationalists); দেখুন জার্জেসের লেখা বই America and Political Islam: Clash of Cultures or Clash of Interests? (Cambridge, 1999), chapter 2। মজার ব্যাপার হলো, ইসলাম স্বয়ং ঈমানদার ও মুনাফেক তথা ভালো-মন্দের যে ধরনের মৌলিক পার্থক্য করেছে, পাশ্চাত্যের সরকারগুলো র‍্যাডিক্যাল ও মডারেট ভাগ করার মাধ্যমে একই ধরনের দ্বি-বিভাজন করছে।

[8] শিয়া এক্টিভিজম সম্পর্কে জানতে সেকশন ৬ দেখুন।

আইয়ুব আলী
আইয়ুব আলী
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগে অধ্যয়নরত

One thought on “ইসলামপন্থার সাথে বোঝাপড়া (পর্ব–২)

  1. আসসালামু আলাইকুম ভাই, আপনার লেখাগুলো বেশ চমৎকার ও সময়োপযোগী। আমি আপনার সাথে এ লেখাগুলো ও এ সম্পর্কিত লেখাগুলো নিতে চাই, ইংলিশেই। আপনি কি আমাকে আপনার ইমেইল আইডি দিতে পারেন?

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *