মঙ্গলবার, নভেম্বর ২১, ২০১৭
হোম > লেকচার অনুবাদ > ইসলামী চিন্তার সংস্কার: বিচ্যুতি, প্রগতি, নাকি সময়ের দাবি? (প্রশ্নোত্তর পর্ব ২)

ইসলামী চিন্তার সংস্কার: বিচ্যুতি, প্রগতি, নাকি সময়ের দাবি? (প্রশ্নোত্তর পর্ব ২)

এডিটর’স নোট:

ইসলামী চিন্তার সংস্কারের প্রসঙ্গ আসলে প্রায়শই একটা প্রশ্ন উত্থাপিত হয় – সংস্কারের ক্ষেত্রে কোন বিষয়গুলো বিবেচনাযোগ্য, আর কোনগুলো অপরিবর্তনীয়? এক্ষেত্রে অতি উদার কেউ কেউ শরীয়াহর খোলনলচে পাল্টে ফেলতে চান, আবার অতি রক্ষণশীল কেউ কেউ মনে করেন ইসলামে সংস্কারের কোনো ধরনের সুযোগ নেই। এই দুই প্রান্তিক অবস্থানের বাইরে সঠিক পথ কী হতে পারে?

২০১৪ সালের নভেম্বরে লন্ডনে প্রদত্ত দীর্ঘ দেড় ঘণ্টার এক বক্তৃতায় শায়খ ড. ইয়াসির ক্বাদী এ ব্যাপারে গভীর পাণ্ডিত্যপূর্ণ আলোচনা করেছেন। একটি গল্পের আশ্রয় নিয়ে পুরো বিষয়টিকে তিনি চমৎকারভাবে উপস্থাপন করেছেন। সিএসসিএস-এর পাঠকদের জন্যে বক্তৃতাটির অনুবাদ পাবলিশ করা হয়েছে। এখন প্রশ্নোত্তর পর্বের ধারাবাহিক অনুবাদ তুলে ধরা হচ্ছে। অনুবাদ করেছেন আইয়ুব আলী


বক্তৃতা: পর্ব ১, পর্ব ২, পর্ব ৩, পর্ব ৪, পর্ব ৫, পর্ব ৬ ||| প্রশ্নোত্তর: পর্ব ১, পর্ব ৩


প্রশ্ন ৩

এই প্রশ্নটা নারী-পুরুষের পারস্পরিক সম্পর্ক নিয়ে। এ ব্যাপারে রক্ষণশীলদের পরামর্শ যথেষ্ট সতর্কতামূলক। এক দৃষ্টিতে তা অবাস্তবও বটে। শরীয়াহর দিক থেকে এ ব্যাপারে আমাদের অবকাশ ও সীমাবদ্ধতা সম্পর্কে জানা দরকার। আপনি কর্মক্ষেত্রে নারী-পুরুষের সম্পর্ককে কীভাবে দেখেন? যেমন, নারীদের সাথে হ্যান্ডশেক করা ও চোখের দিকে তাকিয়ে কথা বলা একটা পেশাগত সৌজন্যতা। কিন্তু শরীয়াহর দিক থেকে এর বিপরীত ধারণাই আমরা পাই। এই দুটি বিষয়ের মধ্যে আপনি কীভাবে সমন্বয় করবেন?

উত্তর

বর্তমানে এই বিষয়টি যে কর্মক্ষেত্রের অন্যতম একটি সমস্যা, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। কর্মজগতে গিয়ে ঠিক কী ধরনের আচরণ করতে হবে – আমরা যারা এখনো কর্মক্ষেত্রে পা ফেলিনি তারা তা ভাবতেও পারি না। কোনো বিষয়ে কট্টর হওয়া খুব সহজ। কিন্তু যখন আপনি কর্পোরেট জগতে পা ফেলবেন, পেশাগত নানা পরিস্থিতির সম্মুখীন হবেন, এর ডাইনামিকস বুঝবেন; তখন কিছুটা হলেও আপনার মনোভাব পরিবর্তিত হবে।

বাস্তবতা হলো, এই সমস্যাটির মতো আরো জটিল বিষয় আমাদের সামনে রয়েছে। এর ফলে ডমিন্যান্ট ন্যারেটিভের বিরুদ্ধে প্রতিক্রিয়া তৈরি হচ্ছে। এটি করতে গিয়ে আমাদের অনেকে ইসলামকে এমন কঠোর বানিয়ে ফেলে, যা আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (সা) করেননি। পরিস্থিতি এমন দাঁড়িয়েছে যে, বিপরীত লিঙ্গের কারো সাথে যে কোনো ধরনের যোগাযোগই যেন হারাম!

যদিও ক্লাসরুম বা কোনো সভায় বিপরীত লিঙ্গের কারো সাথে আমাদের কোনো সমস্যা হয় না। এখানেই আপনারা নিজেদের প্রতি খেয়াল করে দেখুন, আপনারা একেকজন বিপরীত লিঙ্গের কত কাছাকাছি বসে আছেন! তাই না? … আপনারা এখানে আক্ষরিক অর্থেই সার্ডিন মাছের মতো জটলা বেঁধে আছেন। তবে আপনার পাশে – নারী বা পুরুষ – কে বসবেন, তা আপনি ঠিক করেননি। তাই না? কোনো বিশেষ ব্যক্তিগত সম্পর্ক না থাকলে একজন ভাই ও বোন পাশাপাশি বসতে পারেন। তবে ওই রকম কোনো সম্পর্ক থাকলে, সেটা একটা সমস্যা বটে।

তাহলে এখন প্রশ্ন হচ্ছে, আমরা কীভাবে একটি সন্তোষজনক সমাধানে পৌঁছাতে পারি? এটা একটা চলমান বিতর্ক, যার সমাধান আমার কাছে নেই। তবে আমরা দেখি, এ ব্যাপারটা নিয়ে দুটি প্রান্তিক অবস্থান তৈরি হয়েছে। একদিকে, আমাদের অনেক ইসলামিক সেন্টার এবং মসজিদ নারী-পুরুষের পৃথকীকরণের ব্যাপারে এতোই কঠোর, যা সাহাবী ও প্রথম যুগের মুসলমানরা কল্পনাও করতে পারতেন না। এই কঠোরতা স্বয়ং মহানবী (সা) ও সাহাবীদের চেয়েও বেশি। আশ্চয! শারীরিক প্রতিবন্ধকতাসহ সম্ভাব্য সকল উপায়ে এই কঠোরতা আরোপ করা হয়। আমি এ ধরনের কঠোরতার বিরোধী। এই বিচ্ছিন্নতা একেবারেই অবাস্তব। এটি শুধু ইসলামী শিক্ষা সমাবেশেই বজায় থাকে। এখান থেকে বের হয়ে যাওয়া মাত্রই এর কোনো অস্তিত্ব থাকে না। তাহলে এই কৃত্রিম বুদ্বুদ তৈরি করার মানে কী?

আমি আবারো পরিষ্কারভাবে কিছু কথা বলতে চাই। নারী-পুরুষ সম্পর্কের প্রসঙ্গটাই আমাদের জন্য একটা বিব্রতকর বড় সমস্যা। কারণ, পাপাচারের আশংকায় আমরা ইসলামী সার্কেলে সম্পূর্ণভাবে পৃথক থাকি। ফলে আমরা বিপরীত লিঙ্গের মুসলিম কারো সাথে ভদ্রতা ও শ্রদ্ধার সাথে কথা বলতে শিখি না।

অথচ বিপরীত লিঙ্গের অমুসলিম কারো সাথে কীভাবে কাজ করতে হয়, তা আমরা ঠিকই জানি। বিপরীত লিঙ্গের অমুসলিম কেউ এসে আপনাকে যখন বলে, ‘হ্যালো, শুভ বিকাল। দিনকাল কেমন যাচ্ছে?’ তখন আপনার কী বলা উচিত তা আপনি ঠিকই জানেন। কোনো ধরনের চটুলতা ছাড়াই ভদ্রোচিত ও সম্মানজনকভাবে জবাবও দেন। ঠিক কিনা? অথচ কোনো ইসলামী সম্মেলন বা অন্য কোথাও একজন হিজাবী বোন কোনো দাড়িওয়ালা মুসলিম ভাইকে সালাম দিলেও তিনি সাথে সাথে ভাবতে শুরু করেন, ‘সে কি আমাকে বিয়ের প্রস্তাব দিতে যাচ্ছে? সে কি বিবাহিত?’ ইত্যাদি ইত্যাদি।

এটা অবশ্যই একটা সমস্যা। যৌনতার চিন্তা ছাড়া এসব ক্ষেত্রে আপনি অন্যের সাথে উঠাবসা করতে পারছেন না। কেন? কারণ, আমরাই এই পরিস্থিতি তৈরি করেছি। পুরুষ ও মহিলা সাহাবীগণ এ রকম ছিলেন বলে কি সত্যিই আপনার মনে হয়? তাঁদের জীবনী পড়লে আপনার কাছে ব্যাপারটা একদম পরিষ্কার হয়ে যাবে। তাঁরা সম্মানের সাথে একে অপরকে সালাম দিতেন। তারা তাদের সীমারেখা সম্পর্কে সচেতন ছিলেন। অথচ আমাদের তরুণ প্রজন্মকে আমরা এগুলো শেখাই না। আমার মতে, যুগ যুগ ধরে চলমান ইসলামের অতি রক্ষণশীল চর্চা এক্ষেত্রে একটা বড় বাধা। শরীয়াহ যতটুকু চায়, আমরা তারচেয়েও বেশি কঠোর। এর ফলাফল স্বভাবতই নেতিবাচক হয়েছে।

আমরা যথাযথ আচরণ করতে জানি না। আমাদের ভাইয়েরা বোনদের সাথে সম্মানজনকভাবে আচরণ করতে জানে না। অথচ এটা তাদের প্রাপ্য। পাশাপাশি হাঁটতে থাকলেও তারা বোনদেরকে পুরোপুরি উপেক্ষা করে চলে, যেন তাদের কোনো অস্তিত্বই নেই। আপনার কোনো অমুসলিম সহকর্মী বা শিক্ষিকাকে যদি আপনি ‘শুভ সকাল’, ‘শুভ বিকেল’ বলে সম্ভাষণ জানাতে পারেন, কিংবা কোনো ক্যাশিয়ার বা বাস ড্রাইভারকে যদি আপনি ‘হ্যালো’ বলতে পারেন; তাহলে আপনার মুসলিম বোন কি এরচেয়েও বেশি সম্মানের উপযুক্ত নন? আপনি কি কোনো প্রকার কুচিন্তা ছাড়া তাকে সালামও দিতে পারেন না? যদিও তিনি আপনার পরিচিত। কোনো প্রয়োজন বা বিপদে কিংবা অনাকাঙ্খিত পরিস্থিতিতে তিনি আপনাকে কাছে পেয়ে সাহায্য চাইতে পারেন। কিন্তু না…! তাকে এমনভাবে উপেক্ষা করার জন্য আমাদেরকে শেখানো হয়, যেন তার কোনো অস্তিত্বই নেই। নারী-পুরুষ উভয় তরফ থেকেই এটা ঘটছে। সত্যিই এটা একটা সমস্যা।

আমরা যেভাবে নারী-পুরুষকে সম্পূর্ণ দুই গোলকের বাসিন্দা বানিয়ে রেখেছি, সীরাত অধ্যয়ন করলে এ ধরনের গোঁড়ামির কোনো অস্তিত্বই পাওয়া যায় না। এটা মাদানী যুগের কথা। এবার ইংল্যান্ডের কথা চিন্তা করুন, যেখানে নারী-পুরুষের কোনো বিভাজন নেই। এখানে আমরা যদি একটা কৃত্রিম বিভাজন তৈরি করি, তাহলে কী ঘটবে?

আমার এ কথা থেকে কেউ আবার এমনটা মনে করবেন না যে, আমি বুঝি বলতে চাচ্ছি – ‘মাশাআল্লাহ, তাবারাকাল্লাহ, চলুন নারী-পুরুষের সম্মিলিত একটা পার্টি হয়ে যাক!’ আমি মোটেও তেমন কিছু বুঝাচ্ছি না। কেউ যখন আমার মতো এ ধরনের কথাবার্তা বলতে শুরু করে, রক্ষণশীলরা তখন বেশ উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ে। তারা বলে ফেলে, ‘এসব কথাবার্তা বলে আপনি আমাদেরকে কোথায় নিয়ে যাচ্ছেন?’ এটা আরেকটা সমস্যা। আমি তাদের এই ভীতির কারণটা বুঝি। যুক্তিবিদ্যার ভাষায় একে ‘ফ্লাডগেট আর্গুমেন্ট’ বলা হয়। আমি যদি দরজাটা এক ইঞ্চি পরিমাণও খুলি, তাহলে ধরে নেয়া হয় অবশেষে আমি দরজাটা পুরোপুরিই খুলে দিতে যাচ্ছি – এটাই হলো ‘ফ্লাডগেট আর্গুমেন্ট’। কারো বক্তব্যকে খণ্ডন করার জন্যে এটা খুবই হালকা ও স্থূল পদ্ধতি।

আমি সীমাতিক্রম করতে বলছি না। তাহলে সীমারেখাটা কী? স্পষ্টতই হারাম সম্পর্ক হচ্ছে সেই সীমা। কিন্তু নারী-পুরুষ সম্পর্কের ঊর্ধ্বে ওঠে কীভাবে একে অপরকে শ্রদ্ধা করতে হয়, তা যদি উঠতি বয়সের ছেলেমেয়েদের না শেখাই; তাহলে আমরা কীভাবে একটা সুন্দর সমাজ গড়ে তুলবো?

আমাদেরকে একে অপরের নাম পর্যন্ত জানতে দেয়া হয় না। আমাদেরকে বলা হয়, ‘তার নাম বলা হারাম। সে শুধুই একজন অপরিচিত বোন।’ এভাবে কারো নাম পর্যন্ত নিষিদ্ধ বিষয়ে পরিণত হয়। অথচ সহীহ বুখারীর একটি হাদীসে বর্ণিত হয়েছে, জয়নব (রা) দরজায় কড়া নাড়ছিলেন। আয়েশা (রা) বললেন, ‘ইয়া রাসূলুল্লাহ (সা), জয়নব দরজায় কড়া নাড়ছে।’ তিনি জয়নবের নাম উল্লেখ করেছিলেন। তিনি কিন্তু বলেননি, ‘একজন বোন এসেছে।’ নবী (সা) জিজ্ঞেস করলেন, ‘কোন জয়নব? আমি তো অনেক জয়নবকেই চিনি। তুমি কোন জয়নবের কথা বলছো?’ তখন আয়েশা (রা) বুঝিয়ে বললেন যে, তিনি কোন জয়নবের কথা বলছেন।

আমার কথা হলো, ইসলাম আমাদেরকে যতটা না কঠোর হতে বলে, আমরা তারচেয়েও বেশি কঠোর হয়ে যাচ্ছি। এর ফলে আমরা প্রতিক্রিয়াশীল (backlash) জাতিতে পরিণত হচ্ছি। এটা সত্যিই আমাদের অন্যতম একটা বড় সমস্যা।

এই তো গেলো একদিকের কথা। আবার অন্যদিকে আরেকটি পক্ষ রয়েছে, যারা এসব বিষয়কে মোটেও পাত্তা দেয় না। আসলে, আপনি যদি সবসময় প্রতিটি ব্যাপারে প্রতিক্রিয়া দেখান, তাহলে কেউ না কেউ এর পাল্টা প্রতিক্রিয়া দেখাবেই। আর এ কারণে ইসলামের প্রায়োগিক ও বাস্তবসম্মত বোঝাপড়াই হলো এগিয়ে যাওয়ার একমাত্র উপায়। আমি এটি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি।

তাই, নারী-পুরুষের পারস্পরিক যোগাযোগ প্রসঙ্গে বলতে হয়, কর্মক্ষেত্রে সবসময় অবনত মস্তকে তাকিয়ে থাকা আমাদের পক্ষে সম্ভব নয়। তো আল্লাহ কোরআনে কী বলেছেন?

اتَّقُوا اللَّـهَ مَا اسْتَطَعْتُمْ

আল্লাহকে ভয় করো, যতটুকু তোমাদের পক্ষে সম্ভব। (সূরা তাগাবুন: ১৬)

সুতরাং, কর্মক্ষেত্রে প্রয়োজনে নারীর দিকে তাকাতে পারেন। কিন্তু তার দেহকে সৌন্দর্যের বস্তু মনে করে বড় বড় চোখে তাকিয়ে থাকবেন না। তার সাথে সম্মানজনক আচরণ করুন। একজন অমুসলিম মহিলার সাথে কীভাবে মর্যাদাপূর্ণ আচরণ করতে হয়, তা আমরা সবাই জানি। তাদের সাথে মর্যাদাপূর্ণ আচরণ করুন। কেউ যদি খোলামেলা পোশাক পরে, যার ফলে আপনার মনোযোগ নষ্ট হচ্ছে, তাহলে তার দেহের সংশ্লিষ্ট দিকে তাকাবেন না। আপনার দৃষ্টিকে নিয়ন্ত্রণ করুন। এটা খুবই কঠিন। দৃষ্টি নিয়ন্ত্রণে রাখলেও সে যেন উপলব্ধি করে, আপনি তাকে মানবিক মর্যাদার দৃষ্টিতেই দেখছেন।

আমি এক বয়োজ্যেষ্ঠ বোনকে জানি, যিনি ৩৫ বছর আগে মুসলিম হয়েছিলেন। তার ইসলাম গ্রহণ করার পেছনে একটি ঘটনা রয়েছে। একবার এক মুসলিম দেশ থেকে আগত এক যুবকের সাথে তার দেখা হয়। বোনটির বাড়ি ইংল্যান্ডে নয়, অন্য কোনো দেশে। যাইহোক, তিনি খুবই সুন্দরী ছিলেন। তার পরনে ছিল খোলামেলা পোশাক। তারপরও যুবকটি তার সাথে সম্মানজনক আচরণ করছিল। কোনো প্রকার কুরুচিপূর্ণ ও চটুল কথাবার্তা বলছিল না। এতে মহিলা খুবই অবাক হয়ে ভাবছিলেন, ‘আমি কত সুন্দরী! সবাই আমার দিকে হা করে তাকিয়ে থাকে, নানা ধরনের মন্তব্য করে। তাহলে এই যুবক আমার সাথে এ রকম সম্মানজনক আচরণ করছে কেন!’ এক পর্যায়ে তিনি যুবককে প্রশ্নটি করেই ফেললেন। যুবক জবাব দিলেন, ‘আমি মুসলমান। কোনো নারীর দিকে অপলক ও লোভাতুর দৃষ্টিতে তাকিয়ে না থাকতে আমাদেরকে শিক্ষা দেয়া হয়েছে।’ জবাব শুনে তিনি খুবই অভিভূত হলেন। তারপর ইসলাম নিয়ে পড়াশোনা শুরু করে দিলেন এবং পরবর্তীতে ইসলাম গ্রহণ করলেন। বর্তমানে তিনি খুবই সক্রিয়।

আমার কথা হলো, ‘নারীদের দিকে অপলক নেত্রে তাকিয়ে থেকো না’ আল্লাহর এই বাণীর তাৎপর্য আপনাকে বুঝতে হবে। তাই আপনি কামনা ও প্রেমভাব নিয়ে তাদের দিকে তাকিয়ে থাকবেন না। কিন্তু আমরা যে রকম করপোরেট পরিবেশে কাজ করছি সেখানে আপনি যদি কামনা ও প্রেমভাব না নিয়ে নারীদের দিকে তাকান, বিনা প্রয়োজনে না তাকান, শুধু প্রয়োজনীয় কথাবার্তাই বলেন এবং সম্মানজনক আচরণ করেন; তাহলে আমি কোনো সমস্যা দেখি না।

এ ব্যাপারে শরীয়াহতেও আমরা দৃষ্টান্ত খুঁজে পাই। আয়েশার (রা) ঘটনা উদাহরণ হিসেবে বলা যায়। একদা তিনি মসজিদে বর্শা খেলা দেখছিলেন। তিনি পুরুষদের দিকে তাকিয়ে থাকায় মহানবী (সা) কিছু মনে করেননি। কারণ, তিনি জানতেন আয়েশা (রা) সে ধরনের কোনো অনুভূতি নিয়ে তাদের দিকে তাকিয়ে ছিলেন না।

অতএব, ‘আল্লাহকে ভয় করুন, যতটুকু সম্ভব।’ মূল ব্যাপার হচ্ছে, আপনি আদবকায়দা ও শিষ্টাচার মেনে চলছেন কি না।

আর বিপরীত লিঙ্গের কারো সাথে হ্যান্ডশেক করাকে আমি নিরুৎসাহিতই করবো। একে উৎসাহিত করা উচিত নয় বলেই আমি মনে করি। হ্যান্ডশেক করাকে কমপক্ষে মাকরুহ বলা যায়। তাই একে নিরুৎসাহিত করা উচিত। এই রাস্তা খুলে দেয়া উচিত হবে না। আমি কিন্তু একে হালাল বলছি না। দয়া করে ভুল বুঝবেন না।

তবে শয়তানের প্ররোচনায় কখনো এই কাজটি করে ফেললে আল্লাহর কাছে ক্ষমা চান। প্রায়শ্চিত্ত হিসেবে কিছু সদকা করে দিন। এ জন্য নিজেকে দুনিয়ার সবচেয়ে খারাপ লোক ভাবার দরকার নেই। এর ফলে আপনি একেবারে ধ্বংস হয়ে যাননি। এরচেয়ে অনেক বড় বড় পাপও আছে। আমরা সকলেই পাপ থেকে বাঁচার চেষ্টা করছি। একটি পাপ যেন অন্যান্য ভালো কাজ থেকে আপনাকে দূরে সরিয়ে না নেয়, সেই চেষ্টা করুন।

শেষ কথা হলো, এই দেশে আপনাকে হয়তো এমন অনেক কিছুই করতে হচ্ছে যা আপনার অপছন্দনীয়। আল্লাহ ঠিকই তা জানেন। অবশ্য, এই দেশে এমন কিছু ভালো কাজও আপনি করতে পারছেন, যা হয়তো অন্য কোনো দেশে করতে পারতেন না। তাই, এখানকার ভালো-মন্দ উভয় দিকই বিবেচনায় রাখতে হবে। আল্লাহ তায়ালা আমাদের জন্য কঠিন সমস্যাগুলো সহজ করে দিন।



প্রশ্ন ৪

আপনি বলেছেন, সংস্কারের জন্য যোগ্য আলেমের সন্ধান পাওয়া জরুরি। এই দেশে যোগ্য আলেমের অভাব থাকায় আমাদের মতো সাধারণ মুসলমানরা কী করতে পারি? এ ধরনের পরিস্থিতিতে আমরা কি অন্য দেশ থেকে ভালো মানের আলেম নিয়ে আসবো?

দ্বিতীয়ত, সাধারণত আলেমগণ ও মাদ্রাসাসমূহ গতানুগতিক ধ্যানধারণা পোষণ করেন। বলাবাহুল্য, প্রচলিত ধ্যানধারণা যে কোনো পরিবর্তনের বিরোধী। এমতাবস্থায়, ইসলামিক রিফর্মের জন্য আমরা যোগ্য নেতৃত্ব কীভাবে পেতে পারি?

উত্তর

দয়া করে বুঝতে চেষ্টা করুন, রক্ষণশীল ধারার প্রতি আমি শ্রদ্ধাশীল। আমার বক্তব্যে স্পষ্টভাবেই বলেছি, তারা যা করছেন সে সম্পর্কে আমি পুরোপুরি অবগত। কোনো কোনো ক্ষেত্রে নিজেকে গুটিয়ে রাখার প্রয়োজন রয়েছে। তাই তাদেরকে অসম্মান করা কারোরই উচিত হবে না। ইসলামকে এ পর্যন্ত নিয়ে আসার পেছনে তাদেরও যথেষ্ট অবদান রয়েছে।

আমার বক্তব্য হচ্ছে, আমাদেরকে আরো সামনে এগুতে হবে। ইসলামের যে কোনো প্রকার সংস্কার প্রচেষ্টা রক্ষণশীল ধারার ভেতর থেকেই উঠে আসা প্রয়োজন। কারণ, তারাই সংখ্যাগরিষ্ঠ। যেমন, আমি নিজেই এর একটা উদাহরণ। স্পষ্টতই আমি একসময় এই ধারার একজন ছিলাম। আমার পুরাতন ভিডিওগুলোতে দেখবেন, আমি একসময় ‘সাওব’ ও টুপি পরতাম। আর এখন অবশ্য সবকিছু বদলে গেছে।

যাইহোক, আমরা আশা করি কিছু রক্ষণশীল আলেম এই ধারা থেকে বেরিয়ে আসবেন। তবে কেউ আসতে না চাইলেও সমস্যা নেই। তাদের জন্য সেটাই ভালো। তাদেরকে বলয়ের বাইরে টেনে আনার চেষ্টা করা উচিত হবে না।

এবার মূল কথায় আসা যাক। আমরা সাধারণত সমালোচনা করে থাকি, অনেক আলেমের চিন্তাভাবনা সেকেলে, বাস্তবতার সাথে তাদের সম্পর্ক নেই। এসব সমালোচনার কিছুটা ভিত্তি আছে বৈকি। কিন্তু আমি আপনাদের কাছে জানতে চাই, আমাদের অধিকাংশ আলেমদের এই অবস্থার পেছনে কী কারণ রয়েছে বলে আপনার মনে হয়? এর কারণ হলো, আমাদের মেধাবী, শিক্ষিত ও উচ্চবিত্তদের অধিকাংশই আলেম হতে আগ্রহী নয়। আমাদের যে সকল সহকর্মী ও বন্ধুবান্ধব স্বনামধন্য প্রতিষ্ঠান থেকে গ্র্যাজুয়েট হয়েছেন, তাদের কয়জন দারুল উলুম, আল আজহার কিংবা মদীনা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে গিয়েছেন? মাশাআল্লাহ, আমরা প্রায় সবাই ইঞ্জিনিয়ারিং, মেডিসিন, গণিত পড়তে নামিদামি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে যাচ্ছি।

অথচ একটা সময় ছিল, যখন আক্ষরিক অর্থেই আমাদের সবচেয়ে সেরা ও মেধাবী শিক্ষার্থীরা ইসলামী জ্ঞান অর্জন করতে যেতো। আর বর্তমানের বাস্তবতা হলো কিছু মুসলিম দেশের সরকার ঠিক করে দিচ্ছে কে কোন বিষয়ে পড়বে। পরীক্ষায় কেউ যদি ৯০ শতাংশ নম্বর পায় তাহলে সে মেডিকেল কলেজে পড়তে পারে। এভাবে ৮০ শতাংশ পেলে ইঞ্জিনিয়ারিং, আর ৭০ শতাংশ পেলে অ্যাকাউন্টিং পড়তে পারে। আর যদি ফেল করে তাহলে তার জন্য উপযুক্ত জায়গা হলো দ্বীনি শিক্ষা! এটাই হচ্ছে বাস্তবতা। আমি বানিয়ে বলছি না। আমি সেই দেশগুলোর নাম জানি, কিন্তু বলতে চাচ্ছি না। যদিও অনেক মুসলিম দেশে আইন করে এটা করা হচ্ছে না, তবে সামাজিক পারিপার্শ্বিকতা দ্বারা অনেকটা এ রকমই নির্ধারিত। মধ্যপ্রাচ্য, ভারত, পাকিস্তান, বাংলাদেশ – এসব দেশে মেধাবীরা নয়, বরং মুখস্ত বিদ্যায় পারদর্শীরাই আলেম হওয়ার জন্য পড়তে যায়। আমি কী বলছি, আপনারা কি তা বুঝতে পারছেন? নামিদামি প্রতিষ্ঠান থেকে পড়াশোনা শেষে মেধাবী শিক্ষার্থীরা উচ্চশিক্ষার জন্য কোথায় যায়? আমেরিকা, ইংল্যান্ড, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া।

সুতরাং, যে মানুষগুলো আধুনিকতার সাথে সবচেয়ে কম পরিচিত তারাই আলেম হয়। ফলে তাদের চিন্তাভাবনা বাস্তবতা থেকে বেশ দূরেই থেকে যায়। আলেমদের এই পরিস্থিতিতে যারা অবাক হয়, তাদের দৃষ্টিভঙ্গি ত্রুটিপূর্ণ। আমরা প্রত্যেকেই ব্যক্তিগতভাবে এই পরিস্থিতির জন্য দায়ী। তাই বলে ক্যারিয়ার ছেড়ে দিয়ে আলেম হওয়ার জন্য আপনাকে জোর করছি না। আমি বলছি, চলুন আমরা অন্তত আলোচনাটা শুরু করি।

আল্লাহ তায়ালা আপনাকে তিন-চারটি সন্তান দান করে থাকলে তাদের মধ্য থেকে অন্তত একজনকে আলেম হওয়ার জন্য উৎসাহিত করুন। আমাদের নিজেদের সামাজিক অবস্থানের সাথে খাপ খাইয়ে নিতে আলেমদেরকে উৎসাহিত করা উচিত। এ জন্য অর্থনৈতিক, সামাজিক, বুদ্ধিবৃত্তিক দিক থেকে ভিন্ন ভিন্ন অবস্থানের মানুষজনের আলেম হওয়ার প্রয়োজন রয়েছে। কিন্তু যদি মনে করেন, নির্দিষ্ট এক শ্রেণীর মানুষই কেবল আলেম হবে, তাহলে তাদের কাছ থেকে কীভাবে আপনি উচ্চমান প্রত্যাশা করেন?

এটা একটা জটিল সমস্যা। আমি এ ব্যাপারে পুরোপুরি সচেতন। কিন্ত তাদেরকে দোষারোপ বা নিন্দা করে এর সমাধান করা যাবে না। বরং আমাদের প্রত্যেকে এই পরিস্থিতি থেকে শিক্ষা নিয়ে পরবর্তী প্রজন্মকে সেভাবে গড়ে তুলতে পারলেই এর সমাধান হবে। আমি সবসময় বলি, ‘আপনি আলেম হতে না পারলেও অন্তত অজ্ঞ থাকবেন না।’ কিছু না কিছু শিখতে থাকুন। বিভিন্ন সেমিনারে অংশগ্রহণ করুন, লেকচার শুনুন। এতে করে আপনি হয়তো আলেম হয়ে যাবেন না, কিন্তু চলতি ইস্যুগুলো সম্পর্কে কিছুটা হলেও অবগত থাকতে পারবেন। ইতিহাসের কিছু বেসিক কোর্স করে ইতিহাসবিদ হতে না পারলেও দুনিয়ার চলমান ঘটনা সম্পর্কে মূল্যায়ন করা যায়। একইভাবে ইসলাম নিয়ে কিছু পড়াশোনা করলে আপনি হয়তো আলেম হতে পারবেন না, তবে সত্যিকারের আলেমদের চিনতে পারবেন, ইসলামের অন্যান্য ধারা চিনতে পারবেন।

আসলে এটি এমন একটি সমস্যা, যার সহজ কোনো সমাধান আমার জানা নেই। আমার এভাবে কথা বলার এটা একটা কারণ। আমার ব্যাপারে একটা সমালোচনা রয়েছে, ‘কোনো বিষয় নিয়ে এভাবে কথা বলে আপনি মানুষকে শুধু শুধু বিভ্রান্ত করেন।’ এর জবাবে আমি বলি, এভাবে কথা বলাই একমাত্র উপায়। আল্লাহ চাহে তো এর মাধ্যমেই আমাদের আলোচনা এগিয়ে যাবে। এ ধরনের আলোচনার মাধ্যমেই আপনার মধ্যে সন্তানকে আলেম বানানোর প্রকৃত আগ্রহ তৈরি হবে, যারা বাস্তবতাকে বুঝবে। এভাবে আপনি বিদ্যমান প্যারাডাইমের পরিবর্তন ঘটাতে পারবেন।

সে তো বেশ দীর্ঘ সময়ের ব্যাপার। আপনি জানতে চাইতে পারেন, ‘এই মুহূর্তে আমার করণীয় কী?’

প্রথমত, আমার মনে হয়, আপনি ব্রিটিশ আলেমদের পাণ্ডিত্যকে স্বীকার করতে চাচ্ছেন না। ব্রিটেনে কোনো আলেম নেই – এ ধরনের কথার সাথে আমি একমত নই। তবে আমি কারো নাম বলতে চাই না। কারণ, কারো কারো নাম বাদ পড়ে গেলে লোকজনের মধ্যে ভুল বুঝাবুঝি হবে। ব্রিটেনে যেসব আলেম রয়েছেন, তারা অনেক যোগ্য বলে আমি মনে করি। তাঁরা আপনাদের সমাজেরই অংশ। তাঁরা ইতোমধ্যে তাঁদের পাণ্ডিত্য, যোগ্যতা ও প্রতিভার স্বাক্ষর রেখেছেন। আমি সবসময় বলি, জ্ঞানের জন্য আমাদের বাইরের দিকে তাকিয়ে থাকা জরুরি নয়। একটা ফতোয়ার জন্য টিম্বাকটু কিংবা কোনো দূরদেশে যাওয়ার প্রয়োজন নেই। বরং এমন কারো কাছে যান যিনি আধুনিক চিন্তাচেতনার সাথে পরিচিত, যিনি আপনাদের মাঝেই বাস করেন। এ ধরনের আলেম বুঝতে পারবেন যে, কিছু কিছু ফতোয়া এ দেশের জন্য প্রযোজ্য নয়। আপনারা অনুসন্ধান করলে এ ধরনের আলেম এ দেশেই পাবেন।

তাই আমি আপনাদের এই অভিযোগের ব্যাপারে একমত নই যে, ‘আমাদের কোনো আলেম নেই। এ জন্য আমাদেরকে বাইরে যেতে হবে।’ ইউরোপ ও আমেরিকা মহাদেশের মধ্যে এই লন্ডনেই সবচেয়ে বেশি আলেম রয়েছেন। আপনারা কি সেটা জানেন? এমনকি মদীনা ও আল আজহার বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্র্যাজুয়েটদের থেকে শুরু করে পাশ্চাত্যের আলেমদের কথা যদি বলেন, তাহলে লন্ডনেই সবচেয়ে বেশি আলেম পাবেন। কারণ, আপনারা সবাইকে আকৃষ্ট করতে পেরেছেন। তাই অনেকেই একে ‘লন্ডনিস্তান’ বলা শুরু করেছেন। আপনাদের এখানেই অনেক আলেম বসবাস করেন। কিন্তু তারা যে আলেম শ্রেণীর মানুষ, সেটা প্রকাশ করতে ইচ্ছুক নন। আশপাশে জিজ্ঞেস করুন, তাহলে কাউকে না কাউকে পেয়ে যাবেন। ইচ্ছা থাকলে উপায় হয়।

দ্বিতীয়ত, দীর্ঘমেয়াদে আপনি কী কী করতে পারেন? পালাবদলের ক্ষেত্র ও মাত্রা নিয়ে চিন্তাভাবনা শুরু করুন। ভাবুন, ‘আমাকে কিছুটা হলেও ইসলাম সম্পর্কে জানতে হবে।’ অজ্ঞ হয়ে থাকবেন না। ফিকাহ, ধর্মতত্ত্ব ও তাফসীর সম্পর্কে বুঝতে চেষ্টা করুন। তাহলে আপনি বাস্তবতার সাথে মানিয়ে চলতে পারবেন এবং আপনার পরিবার ও আপনার এলাকার মসজিদে ইসলামের মর্মবাণী (ethos) তুলে ধরতে পারবেন। এভাবেই একটি নতুন প্রজন্ম গড়ে উঠবে, যারা আরো বেশি সচেতন হবে। আমাদের হাতে কোনো জাদুকরী সমাধান নেই। অতএব, ধীরে হলেও পরিবর্তন আসবে।

আইয়ুব আলী
আইয়ুব আলী
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগে অধ্যয়নরত

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *