মূল বক্তব্যের প্রথম অংশ এবং শেষ অংশ

*****

বক্তৃতা শেষে শায়খ ইয়াসির ক্বাদী অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণকারী নারী-পুরুষদের লিখিত প্রশ্নের জবাব দেন। সেগুলো এখানে তুলে ধরা হলো।

প্রশ্ন-১: আপনি পাঁচটি ধারার কথা বলেছেন। এরমধ্যে প্রগতিবাদীরা একটা ধারা। আমার জানার বিষয় হচ্ছে, পরিবার ও বন্ধুবান্ধবদের মধ্যে যারা এই ধারায় আছে, তাদের প্রতি আমাদের আচরণ কেমন হওয়া উচিত? এ ব্যাপারে আপনার পরামর্শ কী?

উত্তর: আমার দৃঢ় বিশ্বাস, প্রগতিবাদীরা কখনোই বেশি এগুতে পারবে না। তারা সবসময়ই একটা ক্ষুদ্র গোষ্ঠী হিসেবেই থাকবে। কারণ, আল্লাহ এই ধর্মকে রক্ষা করার ওয়াদা করেছেন। মহানবী (সা) তাঁর উম্মতের ব্যাপারে বলে গেছেন,

إن أمتي أمة مرحومة

আমার উম্মতের উপর আল্লাহর বিশেষ রহমত রয়েছে।

যে কোনো প্রগতিবাদী ধারার প্রতি লক্ষ্য করলে আপনি দেখবেন, তাদের অবস্থা এমন যেন ‘খালি কলস বাজে বেশি’। অর্থাৎ যদিও তাদেরকে সংখ্যায় অনেক মনে হয় কিন্তু আসলে মোটেও তা নয়।

পাশ্চাত্যের কয়টি মসজিদ সমকামী বিয়ের অনুমোদন দিচ্ছে? কিংবা এর পক্ষে প্রচারণা চালাচ্ছে? হাতেগোনা দুয়েকটা বাদে এরকম মসজিদ নেই বললেই চলে। তাদেরকে বাধা দেয়ার মতো কোনো আইন এখানে নেই। তাদের জীবনের উপর কোনো ধরনের হুমকিও বাস্তবে নেই। আজকে তারা যদি রাস্তার পাশে একটি মসজিদ খুলে বসে তাহলে সেটা একান্তই তাদের ব্যাপার। আমি মনে করি, তাদের উপর শারীরিক আক্রমণ চালানো আমাদের জন্য হারাম। এই দেশে তারা কী করবে সেটা তাদের ব্যক্তিগত ব্যাপার। এতকিছুর পরেও তাদের অবস্থান কোথায়? আপনি তাদেরকে তেমন একটা খুঁজে পাবেন না। তাই, আমি বিশ্বাস করি, প্রগতিবাদীরা সবসময় একটা ক্ষুদ্র গোষ্ঠী হিসেবেই থাকবে।

সাধারণ মুসলমানরা মনে করে, মুসলমান থাকতে চাইলে মদ খাওয়া যাবে না, আর খেলে নিজেকে ভালো মুসলমান দাবি করা যাবে না। আপনি মাদক গ্রহণ করবেন আবার বলবেন, ‘ইসলামই আমাকে এটা করতে বলেছে’, সেটা হতে পারে না। আর মাদক গ্রহণ করার পর যদি স্বীকার করেন, ‘হ্যা, আমি খারাপ মুসলমান’, তাহলে আপনি কিছুটা হলেও ইসলামের গণ্ডির মধ্যে থাকেন। দুনিয়াতে কেউই ভুলের ঊর্ধ্বে  নয়। কিন্তু আপনি কোনোক্রমেই অকাট্য হারাম বিষয়কে হালাল দাবি করতে পারেন না। প্রগতিবাদীরা ঠিক এই কাজটিই করে যাচ্ছে। আল্লাহর শুকরিয়া যে, তাদের সংখ্যা খুব বেশি নয়।

এখন প্রশ্ন হলো তাদের সাথে আপনি কেমন আচরণ করবেন? আমি সত্যি মনে করি, তাদের মানসিক সমস্যা রয়েছে। তারা হীনমন্যতায় ভোগে। ফলে তারা নির্দ্বিধায় ডমিন্যান্ট ন্যারেটিভের উপর আস্থা রাখে। এ ক্ষেত্রে আমার যে বক্তব্য রয়েছে তা ভুলও হতে পারে। তবে তারা মূলত যা বিশ্বাস করে তা খারিজ করার চেয়ে ডমিন্যান্ট প্যারাডাইমের বিচার-বিশ্লেষণ করাই (deconstruction) আমার মূল উদ্দেশ্য। যাইহোক, আমার বক্তব্যটি হলো– মানবতাবাদ নিয়ে পড়তে গেলে আপনি দেখবেন সেখানে এনলাইটেনমেন্ট, পোস্ট-এনলাইটেনমেন্ট, আধুনিকতা ও উত্তরাধুনিকতা নিয়ে কথাবার্তা রয়েছে। উত্তরাধুনিকতার মূল কথা হচ্ছে, মানুষের বিবেচনাবোধকে নিয়ন্ত্রণ করার জন্যে কোনো নৈতিক মানদণ্ড নেই। অথচ আমাদের কাছে নৈতিক মানদণ্ড হিসেবে কোরআন ও হাদীস রয়েছে। আমরা যদি এগুলোকে অনুসরণ না করি তাহলে সত্যিকার অর্থে আর কোনো নৈতিক মানদণ্ড অবশিষ্ট থাকে না।

তাই আমরা দেখি, পঞ্চাশ বছর আগে যে বিষয়গুলোকে মন্দ বলে বিবেচনা করা হতো, এই যুগে এসে সেগুলোকে বৈধ মনে করা হচ্ছে। আমাদের জীবদ্দশায়ই আমরা এসব দেখছি। অথচ আশির দশকে আমরা যখন  কিশোর ছিলাম, তখন এ ধরনের কিছু কিছু বিষয়কে নিষিদ্ধ হিসেবেই বিবেচনা করা হতো। আর এখন আপনি এই বিষয়গুলোর বিন্দুমাত্র সমালোচনা করলেও আপনাকে পশ্চাৎপদ মনে করা হবে।

অতএব, নাটকীয়ভাবে পরিস্থিতির পরিবর্তন ঘটছে। একটু গভীরভাবে চিন্তা করলেই যে কেউ ব্যাপারটা বুঝতে পারবে। আমরা যদি সাহসিকতার সাথে এমন কিছুর উপর অটল থাকি, যা অপরিবর্তনীয়; তাহলে আমাদের সামনে আর কোনো বাধা থাকবে না। আমাদের জন্য সবকিছু সহজ হয়ে যাবে। আর এই অপরিবর্তনীয় বিষয়টি হচ্ছে আল্লাহর বাণী। তাই আমি মনে করি, এসব ভাইবোনদের সাথে কথা বলার সময় নিছক যুক্তিখণ্ডন কিংবা ‘আল্লাহ এই বলেছেন, সেই বলেছেন’ এগুলো না বলাই উত্তম। কারণ, তাদের অন্তরে যথেষ্ট ঈমান নেই।

তাদেরকে দুইভাবে মোকাবেলা করা যায়। প্রথম উপায়টি হলো – আধুনিক চিন্তা এবং দর্শনের বিশ্লেষণ করা। অবশ্য এই কাজটা ইতোমধ্যেই এক প্রকারে সম্পন্ন হয়ে গেছে। আধুনিক জ্ঞানজগতের অসংখ্য চিন্তাবিদ উত্তরাধুনিকতাবাদ কিংবা উত্তর-কাঠামোবাদ নিয়ে কাজ করেছেন। উত্তরাধুনিকতাবাদ নিয়ে জানতে গুগল সার্চ করতে পারেন, অন্তত এ সংক্রান্ত উইকিপিডিয়ার পাতাটি পড়ুন। এভাবে কিছু ঘাটাঘাটি করলে আপনি এ ব্যাপারে খানিকটা ধারণা পাবেন। আপনি যদি সত্যিই এগুলো বুঝতে পারেন, তাহলে তাদেরকে মোকাবেলা করার একটা পথ পেয়ে যাবেন। দ্বিতীয় উপায়টি হলো – কোরআনের বাণী, আধ্যাত্মিকতা ও এ ধরনের আন্তরিকতাপূর্ণ নানা উপায়ে তাদের অন্তরে ঈমানের আলো প্রজ্জ্বলনে সহায়তা করা।

মোটকথা হলো, এটা একধরনের দ্বৈত প্রক্রিয়া। এর একদিকে ডমিন্যান্ট ন্যারাটিভগুলোর বিচার-বিশ্লেষণ করা হয়। তারপর অন্যদিকে, তারা যেন সত্যিকার অর্থে আল্লাহর প্রতি অনুগত হিসেবে গড়ে ওঠতে পারে, সে ব্যাপারে সহায়তা করা।

দেখুন, ইসলাম হচ্ছে একটা সামগ্রিক ব্যাপার। আপনি যদি  আল্লাহ ও কোরআনের উপর বিশ্বাস রাখেন, তাহলে আল্লাহর নাজিলকৃত গ্রন্থের আইন অনুযায়ী জীবনযাপন করাটাই হবে আপনার জন্যে সবচেয়ে যৌক্তিক কাজ। এমনকি আপনি যদি প্রতিটি আইন নাও বুঝে থাকেন।  যেহেতু আপনি বিশ্বাস করেন, এই আইন আল্লাহরই আইন তাই আপনাকে এর কাছে নিজেকে সমর্পণ করতে হবে।

এ বিষয়টি নিয়ে আমি আগেও কথা বলেছি। আপনারা চাইলে কয়েক বছর আগে অনুষ্ঠিত আমার ‘দোহা ডিবেট’ দেখতে পারেন। সেখানে একজন নারী প্রশ্ন করেছিলেন, ‘দুইজন নারীর পরস্পরকে বিয়ে করার বিধান ইসলামে থাকা উচিত। এখানে সমস্যাটা কোথায়? এটাকে অন্যায় বলার আপনি কে?’ তারপর আমরা সেই ইস্যুটি নিয়ে আলোচনা করেছি। এখান থেকে আপনারা বর্তমানকালের প্রগতিবাদী মুসলমানদের সম্পর্কে একটা ধারণা পাবেন। যাইহোক, এ বিষয়ে আমার বেশ কিছু আলোচনা এবং আর্টিকেল রয়েছে।

শেষ কথা হলো,  প্রগতিবাদীদেরকে আমি বড় কোনো হুমকি মনে করি না। আমি সবসময় বলার চেষ্টা করেছি, এদের দলে হাজার হাজার মুসলিম তরুণ কখনোই যোগ দেবে না। দিলেও বড়জোর এক শতাংশ। আল্লাহই সবচেয়ে ভালো জানেন।

*****

প্রশ্ন-২: আমাদের কমিউনিটির রাজনৈতিক ও আইনী স্বার্থ রক্ষার জন্য রক্ষণশীল আলেমদের দেয়া যুক্তিসম্মত মতামতগুলোকে সেলফ-সেন্সরশীপের মাধ্যমে আমরা কি নিজেদেরকে বিপদের মধ্যে ফেলে দিচ্ছি?

উত্তর: আমরা সেলফ-সেন্সরশীপ করছি বলে আমি মনে করি না। বরং এর উল্টোটাই হচ্ছে বাস্তবতা। আমি মনে করি, অধিকাংশ মানুষই অপ্রয়োজনীয় কথাবার্তা বলে থাকে। আমাদের সমস্যা হচ্ছে, আমরা প্রায়শ কোনো ন্যারাটিভের মূলকথাই ধরতে পারি না। আমরা কোনো সমস্যার গভীরে  না গিয়েই তা থেকে উত্তরণ পেতে চাই।

এই মুহূর্তে এ প্রসঙ্গে সবচেয়ে ভালো উদাহরণ  হচ্ছে সমকামী সম্পর্ক নিয়ে আমাদের মনোভাব। আমার বিনীত অভিমত হলো, এ ব্যাপারে বিচক্ষণতার পরিচয় দিতে না পারায় অনেক বিশিষ্ট ব্যক্তি নানা ধরনের প্রতিবন্ধকতার সম্মুখীন হয়েছেন। এ কথা থেকে আবার সমকামিতা নিয়ে আমার দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন হয়েছে বলে মনে করবেন না যেন। তবে আমি আমার মতামতকে ভদ্রোচিত ভাষায় ব্যক্ত করতে চাই। কোনোভাবেই অগ্রহণযোগ্য ভাষা ব্যবহার করা উচিত নয়। কোন বিষয়টি নৈতিকতার আওতাভুক্ত আর কোনটি আওতাবহির্ভূত, এককথায় নৈতিকতা প্রসঙ্গে আমাদের সুনির্দিষ্ট দৃষ্টিভঙ্গি রয়েছে। আমাদের মসজিদে আমরা এই দৃষ্টিভঙ্গির ব্যত্যয় ঘটাবো না। আমাদের বিয়েতেও আমরা সমকামিতাকে অনুমোদন করবো না। কিন্তু একইসাথে আমরা মসজিদের বাইরে এসব ইস্যুতে জড়িত হবো না।

ধরুন, দুইজন ব্যক্তি নিয়মিত পানশালায় যায়। আমরা কি পানশালায়  যাওয়ার বিরুদ্ধে বিদ্যমান আইনের কথা তাদেরকে শোনাই? না। একইভাবে তারা যদি অন্য এমন কিছু করে, যা অনৈতিক বলে আমরা মনে করি; সে ক্ষেত্রে তাদের ক্ষতি করা বা দুর্ব্যবহার করা উচিত হবে না। তারা যা করছে, তা একান্তই তাদের ব্যক্তিগত ব্যাপার। এই আর কি।

আমি একে সেলফ-সেন্সরশীপ হিসেবে দেখি না। বরং বিচক্ষণতা হিসেবেই দেখি। আপনি যা বিশ্বাস করেন, তা কীভাবে উপস্থাপন করবেন? অবশ্যই শালীনভাবে। তাতে তো কোনো সমস্যা নেই। মূর্তিপূজা নিয়ে কোরআনে আল্লাহ কী বলেছেন? তিনি বলেছেন, ‘তারা যে মূর্তির পূজা করে, সেগুলোকে গালমন্দ করো না।’ তারমানে কি আমরা সেগুলোকে সম্মান করি? আমরা সেগুলোর ওপর বিশ্বাস রাখি? না। কিন্তু আল্লাহ কী বলেছেন? তিনি বলেছেন,

وَلَا تَسُبُّوا الَّذِينَ يَدْعُونَ مِن دُونِ اللَّـهِ

তোমরা তাদেরকে মন্দ বলো না, আল্লাহকে বাদ দিয়ে তারা যাদের  উপাসনা করে (সূরা আনআম: ১০৮)

কেন? আপনি তাদের কাছ থেকে কী অর্জন করতে চাচ্ছেন? আপনার উদ্দেশ্য হচ্ছে, তারা যেন আপনার কথাগুলো বিবেচনা করে এবং তাদের কাজকর্মে এর প্রতিফলন ঘটায়। দেখুন, মুসাকে (আ) আল্লাহ তায়ালা উপদেশ দিয়েছিলেন এভাবে,

فَقُولَا لَهُ قَوْلًا لَّيِّنًا لَّعَلَّهُ يَتَذَكَّرُ‌

অতঃপর, তোমরা দুজনে তার সাথে নম্রভাবে কথা বলবে সম্ভবত সে উপদেশ গ্রহণ করবে (সূরা ত্বহা: ৪৪)

অর্থাৎ, এই বিনম্র কথাগুলো হয়তো তাকে নাড়া দিয়ে যাবে, যা তাকে ভালো চিন্তা করতে সহায়তা করবে।

যাইহোক, বর্তমানে মূর্তিপূজা কোনো ইস্যু নয়। আমি মূর্তিপূজা নিয়ে কথা বললেও আপনাদের বৃটিশ সরকার এতে গা করবে না। কিন্তু আমি যদি সমকামিতা নিয়ে কঠোর ভাষায় কিছু বলি, তাহলে এই দেশে এটাই আমার শেষ সফর হতে পারে। এটা একেবারেই ভিন্ন একটা ব্যাপার। তাই আমি যদি এ বিষয়টা একটু ভিন্নভাবে বলি, তাহলে তারা আশ্বস্ত থাকে। তাই না?

গার্ডিয়ান পত্রিকাসহ অনেকেই আমার সাক্ষাৎকার নিয়েছে। তারা আমার কাছে জানতে চায়, ‘অমুক ব্যাপারে আপনার অভিমত কী?’ আমি বলেছি, ‘দেখুন, ইসলামে বিবাহ-বহির্ভূত সম্পর্ক অনুমোদিত নয়।’ এ কথার সাথে তারাও একমত। ‘যেহেতু বিবাহ-বহির্ভূত যে কোনো সম্পর্ক অনৈতিক, তাই বিবাহ-পূর্ব সম্পর্ক বা সমকামী সম্পর্কও আমাদের জন্য অনৈতিক। কিন্তু কেউ যদি বিবাহ-বহির্ভূত সম্পর্কে জড়িয়ে পড়ে তাহলে আমরা তার কোনো ক্ষতি করি না। আমরা কোনো কিছুই চাপিয়ে দেই না। কোনো সমকামী মুসলমান আমাদের কমিউনিটিতে এলে আমরা তাকে স্বাগত জানাই।  আমরা তার ওপর হামলা করি না। মূলধারার অনেক খ্রিস্টান এবং ইহুদীদের অবস্থানও এ রকম। তাদের ব্যাপারে আপনি কী বলবেন?’ আমি বলতে চেয়েছি, মুসলমানরা তাদের ব্যাপারে কোনো বিদ্বেষ পোষণ করে না। মুসলমানদের সরল বক্তব্য হচ্ছে, ‘মদ্যপানকে আমরা যে কারণে সমর্থন করি না, একই কারণে সমকামিতাকেও সমর্থন করি না।’

আমি বিনয়ের সাথে বলতে চাই, আইনগত ও জ্ঞানগত উভয় ব্যাপারেই আমাদের ধর্মীয় ও রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দকে আরো বেশি প্রজ্ঞার পরিচয় দিতে হবে। আল্লাহ আমাদের জন্য যে সুন্দর ধর্ম মনোনীত করেছেন, তার দাবি হচ্ছে মানানসই ভাষায় কথা বলা। মহানবীর (সা) সীরাত অধ্যয়ন করে আমি দেখেছি, এটাই ছিল তাঁর সুন্নাহ। তিনি তাঁর বিশ্বাসে অটল ছিলেন এবং এ ব্যাপারে আপস করেননি। কিন্তু এসব ব্যাপারে তিনি সুন্দর ভাষা ও পদ্ধতি অবলম্বন করতেন। উদ্দেশ্যমূলকভাবে কাউকে অপমান বা হেয় করা উচিত নয়।

তাই সেলফ-সেন্সরশীপ নয়, বরং এর উল্টোটাই সত্য বলে আমি মনে করি। এ ধরনের বিষয়ে এখুনি আমাদের উন্মুক্ত আলাপ-আলোচনা শুরু করা উচিত। যাতে করে আমাদের ধর্মীয় ও রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ সুন্নাহর ভাষায় কথা বলার গুরুত্ব অনুধাবন করতে পারেন। আল্লাহই সবচেয়ে ভালো জানেন।

*****

প্রশ্ন-৩: এই প্রশ্নটা নারী-পুরুষের পারস্পরিক সম্পর্ক নিয়ে এ ব্যাপারে রক্ষণশীলদের পরামর্শ যথেষ্ট সতর্কতামূলক এক দৃষ্টিতে তা অবাস্তবও বটেশরীয়াহর দিক থেকে ব্যাপারে আমাদের অবকাশ সীমাবদ্ধতা সম্পর্কে জানা দরকারআপনি কর্মক্ষেত্রে নারী-পুরুষের সম্পর্ককে কীভাবে দেখেন? যেমন, নারীদের সাথে হ্যান্ডশেক করা ও চোখের দিকে তাকিয়ে কথা বলা একটা পেশাগত সৌজন্যতা কিন্তু শরীয়াহর দিক থেকে এর বিপরীত ধারণাই আমরা পাই এই দুটি বিষয়ের মধ্যে আপনি কীভাবে সমন্বয় করবেন?

উত্তর: বর্তমানে এই বিষয়টি যে কর্মক্ষেত্রের অন্যতম একটি সমস্যা, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। কর্মজগতে গিয়ে ঠিক কী ধরনের আচরণ করতে হবে – আমরা যারা এখনো কর্মক্ষেত্রে পা ফেলিনি তারা তা ভাবতেও পারি না। কোনো বিষয়ে কট্টর হওয়া খুব সহজ। কিন্তু যখন আপনি কর্পোরেট জগতে পা ফেলবেন, পেশাগত নানা পরিস্থিতির সম্মুখীন হবেন, এর ডাইনামিকস বুঝবেন; তখন কিছুটা হলেও আপনার মনোভাব পরিবর্তিত হবে।

বাস্তবতা হলো, এই সমস্যাটির মতো আরো জটিল বিষয় আমাদের সামনে রয়েছে। এর ফলে ডমিন্যান্ট ন্যারেটিভের বিরুদ্ধে প্রতিক্রিয়া তৈরি হচ্ছে। এটি করতে গিয়ে আমাদের অনেকে ইসলামকে এমন কঠোর বানিয়ে ফেলে, যা আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (সা) করেননি। পরিস্থিতি এমন দাঁড়িয়েছে যে, বিপরীত লিঙ্গের কারো সাথে যে কোনো ধরনের যোগাযোগই যেন হারাম!

যদিও ক্লাসরুম বা কোনো সভায় বিপরীত লিঙ্গের কারো সাথে আমাদের কোনো সমস্যা হয় না। এখানেই আপনারা নিজেদের প্রতি খেয়াল করে দেখুন, আপনারা একেকজন বিপরীত লিঙ্গের কত কাছাকাছি বসে আছেন! তাই না? … আপনারা এখানে আক্ষরিক অর্থেই সার্ডিন মাছের মতো জটলা বেঁধে আছেন। তবে আপনার পাশে – নারী বা পুরুষ – কে বসবেন, তা আপনি ঠিক করেননি। তাই না? কোনো বিশেষ ব্যক্তিগত সম্পর্ক না থাকলে একজন ভাই ও বোন পাশাপাশি বসতে পারেন। তবে ওই রকম কোনো সম্পর্ক থাকলে, সেটা একটা সমস্যা বটে।

তাহলে এখন প্রশ্ন হচ্ছে, আমরা কীভাবে একটি সন্তোষজনক সমাধানে পৌঁছাতে পারি? এটা একটা চলমান বিতর্ক, যার সমাধান আমার কাছে নেই। তবে আমরা দেখি, এ ব্যাপারটা নিয়ে দুটি প্রান্তিক অবস্থান তৈরি হয়েছে। একদিকে, আমাদের অনেক ইসলামিক সেন্টার এবং মসজিদ নারী-পুরুষের পৃথকীকরণের ব্যাপারে এতোই কঠোর,  যা সাহাবী ও প্রথম যুগের মুসলমানরা কল্পনাও করতে পারতেন না। এই কঠোরতা স্বয়ং মহানবী (সা) ও সাহাবীদের চেয়েও বেশি। আশ্চয! শারীরিক প্রতিবন্ধকতাসহ সম্ভাব্য সকল উপায়ে এই কঠোরতা আরোপ করা হয়। আমি এ ধরনের কঠোরতার বিরোধী। এই বিচ্ছিন্নতা একেবারেই অবাস্তব। এটি শুধু ইসলামী শিক্ষা সমাবেশেই বজায় থাকে। এখান থেকে বের হয়ে যাওয়া মাত্রই এর কোনো অস্তিত্ব থাকে না। তাহলে এই কৃত্রিম বুদ্বুদ তৈরি করার মানে কী?

আমি আবারো পরিষ্কারভাবে কিছু কথা বলতে চাই। নারী-পুরুষ সম্পর্কের প্রসঙ্গটাই আমাদের জন্য একটা বিব্রতকর বড় সমস্যা। কারণ, পাপাচারের আশংকায় আমরা ইসলামী সার্কেলে সম্পূর্ণভাবে পৃথক থাকি। ফলে আমরা বিপরীত লিঙ্গের মুসলিম কারো সাথে ভদ্রতা ও শ্রদ্ধার সাথে কথা বলতে শিখি না।

অথচ বিপরীত লিঙ্গের অমুসলিম কারো সাথে কীভাবে কাজ করতে হয়, তা আমরা ঠিকই জানি। বিপরীত লিঙ্গের অমুসলিম কেউ এসে আপনাকে যখন বলে, ‘হ্যালো, শুভ বিকাল। দিনকাল কেমন যাচ্ছে?’ তখন আপনার কী বলা উচিত তা আপনি ঠিকই জানেন। কোনো ধরনের চটুলতা ছাড়াই ভদ্রোচিত ও সম্মানজনকভাবে জবাবও দেন। ঠিক কিনা? অথচ কোনো ইসলামী সম্মেলন বা অন্য কোথাও একজন হিজাবী বোন কোনো দাড়িওয়ালা মুসলিম ভাইকে সালাম দিলেও তিনি সাথে সাথে ভাবতে শুরু করেন, ‘সে কি আমাকে বিয়ের প্রস্তাব দিতে যাচ্ছে? সে কি বিবাহিত?’ ইত্যাদি ইত্যাদি।

এটা অবশ্যই একটা সমস্যা। যৌনতার চিন্তা ছাড়া এসব ক্ষেত্রে আপনি অন্যের সাথে উঠাবসা করতে পারছেন না। কেন? কারণ, আমরাই এই পরিস্থিতি তৈরি করেছি। পুরুষ ও মহিলা সাহাবীগণ এ রকম ছিলেন বলে কি সত্যিই আপনার মনে হয়? তাঁদের জীবনী পড়লে আপনার কাছে ব্যাপারটা একদম পরিষ্কার হয়ে যাবে। তাঁরা সম্মানের সাথে একে অপরকে সালাম দিতেন। তারা তাদের সীমারেখা সম্পর্কে সচেতন ছিলেন। অথচ আমাদের তরুণ প্রজন্মকে আমরা এগুলো শেখাই না। আমার মতে, যুগ যুগ ধরে চলমান ইসলামের অতি রক্ষণশীল চর্চা এক্ষেত্রে একটা বড় বাধা। শরীয়াহ যতটুকু চায়, আমরা তারচেয়েও বেশি কঠোর। এর ফলাফল স্বভাবতই নেতিবাচক হয়েছে।

আমরা যথাযথ আচরণ করতে জানি না। আমাদের ভাইয়েরা বোনদের সাথে সম্মানজনকভাবে আচরণ করতে জানে না। অথচ এটা তাদের প্রাপ্য। পাশাপাশি হাঁটতে থাকলেও তারা বোনদেরকে পুরোপুরি উপেক্ষা করে চলে, যেন তাদের কোনো অস্তিত্বই নেই। আপনার কোনো অমুসলিম সহকর্মী বা শিক্ষিকাকে যদি আপনি ‘শুভ সকাল’, ‘শুভ বিকেল’ বলে সম্ভাষণ জানাতে পারেন, কিংবা কোনো ক্যাশিয়ার বা বাস ড্রাইভারকে যদি আপনি ‘হ্যালো’ বলতে পারেন; তাহলে আপনার মুসলিম বোন কি এরচেয়েও বেশি সম্মানের উপযুক্ত নন? আপনি কি কোনো প্রকার কুচিন্তা ছাড়া তাকে সালামও দিতে পারেন না? যদিও তিনি আপনার পরিচিত। কোনো প্রয়োজন বা বিপদে কিংবা অনাকাঙ্খিত পরিস্থিতিতে তিনি আপনাকে কাছে পেয়ে সাহায্য চাইতে পারেন। কিন্তু না…! তাকে এমনভাবে উপেক্ষা করার জন্য আমাদেরকে শেখানো হয়, যেন তার কোনো অস্তিত্বই নেই। নারী-পুরুষ উভয় তরফ থেকেই এটা ঘটছে। সত্যিই এটা একটা সমস্যা।

আমরা যেভাবে নারী-পুরুষকে সম্পূর্ণ দুই গোলকের বাসিন্দা বানিয়ে রেখেছি, সীরাত অধ্যয়ন করলে এ ধরনের গোঁড়ামির কোনো অস্তিত্বই পাওয়া যায় না। এটা মাদানী যুগের কথা। এবার ইংল্যান্ডের কথা চিন্তা করুন, যেখানে নারী-পুরুষের কোনো বিভাজন নেই। এখানে আমরা যদি একটা কৃত্রিম বিভাজন তৈরি করি, তাহলে কী ঘটবে?

আমার এ কথা থেকে কেউ আবার এমনটা মনে করবেন না যে, আমি বুঝি বলতে চাচ্ছি – ‘মাশাআল্লাহ, তাবারাকাল্লাহ, চলুন নারী-পুরুষের সম্মিলিত একটা পার্টি হয়ে যাক!’ আমি মোটেও তেমন কিছু বুঝাচ্ছি না। কেউ যখন আমার মতো এ ধরনের কথাবার্তা বলতে শুরু করে, রক্ষণশীলরা তখন বেশ উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ে। তারা বলে ফেলে, ‘এসব কথাবার্তা বলে আপনি আমাদেরকে কোথায় নিয়ে যাচ্ছেন?’ এটা আরেকটা সমস্যা। আমি তাদের এই ভীতির কারণটা বুঝি। যুক্তিবিদ্যার ভাষায় একে ‘ফ্লাডগেট আর্গুমেন্ট’ বলা হয়। আমি যদি দরজাটা এক ইঞ্চি পরিমাণও খুলি, তাহলে ধরে নেয়া হয় অবশেষে আমি দরজাটা পুরোপুরিই খুলে দিতে যাচ্ছি – এটাই হলো ‘ফ্লাডগেট আর্গুমেন্ট’। কারো বক্তব্যকে খণ্ডন করার জন্যে এটা খুবই হালকা ও স্থূল পদ্ধতি।

আমি সীমাতিক্রম করতে বলছি না। তাহলে সীমারেখাটা কী? স্পষ্টতই হারাম সম্পর্ক হচ্ছে সেই সীমা। কিন্তু নারী-পুরুষ সম্পর্কের ঊর্ধ্বে ওঠে কীভাবে একে অপরকে শ্রদ্ধা করতে হয়, তা যদি উঠতি বয়সের ছেলেমেয়েদের না শেখাই; তাহলে আমরা কীভাবে একটা সুন্দর সমাজ গড়ে তুলবো?

আমাদেরকে একে অপরের নাম পর্যন্ত জানতে দেয়া হয় না। আমাদেরকে বলা হয়, ‘তার নাম বলা হারাম। সে শুধুই একজন অপরিচিত বোন।’ এভাবে কারো নাম পর্যন্ত নিষিদ্ধ বিষয়ে পরিণত হয়। অথচ সহীহ বুখারীর একটি হাদীসে বর্ণিত হয়েছে, জয়নব (রা) দরজায় কড়া নাড়ছিলেন। আয়েশা (রা) বললেন, ‘ইয়া রাসূলুল্লাহ (সা), জয়নব দরজায় কড়া নাড়ছে।’ তিনি জয়নবের নাম উল্লেখ করেছিলেন। তিনি কিন্তু বলেননি, ‘একজন বোন এসেছে।’ নবী (সা) জিজ্ঞেস করলেন, ‘কোন জয়নব? আমি তো অনেক জয়নবকেই চিনি। তুমি কোন জয়নবের কথা বলছো?’ তখন আয়েশা (রা) বুঝিয়ে বললেন যে, তিনি কোন জয়নবের কথা বলছেন।

আমার কথা হলো, ইসলাম আমাদেরকে যতটা না কঠোর হতে বলে, আমরা তারচেয়েও বেশি কঠোর হয়ে যাচ্ছি। এর ফলে আমরা প্রতিক্রিয়াশীল (backlash) জাতিতে পরিণত হচ্ছি। এটা সত্যিই আমাদের অন্যতম একটা বড় সমস্যা।

এই তো গেলো একদিকের কথা। আবার অন্যদিকে আরেকটি পক্ষ রয়েছে, যারা এসব বিষয়কে মোটেও পাত্তা দেয় না। আসলে, আপনি যদি সবসময় প্রতিটি ব্যাপারে প্রতিক্রিয়া দেখান, তাহলে কেউ না কেউ এর পাল্টা প্রতিক্রিয়া দেখাবেই। আর এ কারণে ইসলামের প্রায়োগিক ও বাস্তবসম্মত বোঝাপড়াই হলো এগিয়ে যাওয়ার একমাত্র উপায়। আমি এটি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি।

তাই, নারী-পুরুষের পারস্পরিক যোগাযোগ প্রসঙ্গে বলতে হয়, কর্মক্ষেত্রে সবসময় অবনত মস্তকে তাকিয়ে থাকা আমাদের পক্ষে সম্ভব নয়। তো আল্লাহ কোরআনে কী বলেছেন?

اتَّقُوا اللَّـهَ مَا اسْتَطَعْتُمْ

আল্লাহকে ভয় করো, যতটুকু তোমাদের পক্ষে সম্ভব। (সূরা তাগাবুন: ১৬)

সুতরাং, কর্মক্ষেত্রে প্রয়োজনে নারীর দিকে তাকাতে পারেন। কিন্তু তার দেহকে সৌন্দর্যের বস্তু মনে করে বড় বড় চোখে তাকিয়ে থাকবেন না। তার সাথে সম্মানজনক আচরণ করুন। একজন অমুসলিম মহিলার সাথে কীভাবে মর্যাদাপূর্ণ আচরণ করতে হয়, তা আমরা সবাই জানি। তাদের সাথে মর্যাদাপূর্ণ আচরণ করুন। কেউ যদি খোলামেলা পোশাক পরে, যার ফলে আপনার মনোযোগ নষ্ট হচ্ছে, তাহলে তার দেহের সংশ্লিষ্ট দিকে তাকাবেন না। আপনার দৃষ্টিকে নিয়ন্ত্রণ করুন। এটা খুবই কঠিন। দৃষ্টি নিয়ন্ত্রণে রাখলেও সে যেন উপলব্ধি করে, আপনি তাকে মানবিক মর্যাদার দৃষ্টিতেই দেখছেন।

আমি এক বয়োজ্যেষ্ঠ বোনকে জানি, যিনি ৩৫ বছর আগে মুসলিম হয়েছিলেন। তার ইসলাম গ্রহণ করার পেছনে একটি ঘটনা রয়েছে। একবার এক মুসলিম দেশ থেকে আগত এক যুবকের সাথে তার দেখা হয়। বোনটির বাড়ি ইংল্যান্ডে নয়, অন্য কোনো দেশে। যাইহোক, তিনি খুবই সুন্দরী ছিলেন। তার পরনে ছিল খোলামেলা পোশাক। তারপরও যুবকটি তার সাথে সম্মানজনক আচরণ করছিল। কোনো প্রকার কুরুচিপূর্ণ ও চটুল কথাবার্তা বলছিল না। এতে মহিলা খুবই অবাক হয়ে ভাবছিলেন, ‘আমি কত সুন্দরী! সবাই আমার দিকে হা করে তাকিয়ে থাকে, নানা ধরনের মন্তব্য করে। তাহলে এই যুবক আমার সাথে এ রকম সম্মানজনক আচরণ করছে কেন!’ এক পর্যায়ে তিনি যুবককে প্রশ্নটি করেই ফেললেন। যুবক জবাব দিলেন, ‘আমি মুসলমান। কোনো নারীর দিকে অপলক ও লোভাতুর দৃষ্টিতে তাকিয়ে না থাকতে আমাদেরকে শিক্ষা দেয়া হয়েছে।’ জবাব শুনে তিনি খুবই অভিভূত হলেন। তারপর ইসলাম নিয়ে পড়াশোনা শুরু করে দিলেন এবং পরবর্তীতে ইসলাম গ্রহণ করলেন। বর্তমানে তিনি খুবই সক্রিয়।

আমার কথা হলো, ‘নারীদের দিকে অপলক নেত্রে তাকিয়ে থেকো না’ আল্লাহর এই বাণীর তাৎপর্য আপনাকে বুঝতে হবে। তাই আপনি কামনা ও প্রেমভাব নিয়ে তাদের দিকে তাকিয়ে থাকবেন না। কিন্তু আমরা যে রকম করপোরেট পরিবেশে কাজ করছি সেখানে আপনি যদি কামনা ও প্রেমভাব না নিয়ে নারীদের দিকে তাকান, বিনা প্রয়োজনে না তাকান, শুধু প্রয়োজনীয় কথাবার্তাই বলেন এবং সম্মানজনক আচরণ করেন; তাহলে আমি কোনো সমস্যা দেখি না।

এ ব্যাপারে শরীয়াহতেও আমরা দৃষ্টান্ত খুঁজে পাই। আয়েশার (রা) ঘটনা উদাহরণ হিসেবে বলা যায়। একদা তিনি মসজিদে বর্শা খেলা দেখছিলেন। তিনি পুরুষদের দিকে তাকিয়ে থাকায় মহানবী (সা) কিছু মনে করেননি। কারণ, তিনি জানতেন আয়েশা (রা) সে ধরনের কোনো অনুভূতি নিয়ে তাদের দিকে তাকিয়ে ছিলেন না।

অতএব, ‘আল্লাহকে ভয় করুন, যতটুকু সম্ভব।’ মূল ব্যাপার হচ্ছে, আপনি আদবকায়দা ও শিষ্টাচার মেনে চলছেন কি না।

আর বিপরীত লিঙ্গের কারো সাথে হ্যান্ডশেক করাকে আমি নিরুৎসাহিতই করবো। একে উৎসাহিত করা উচিত নয় বলেই আমি মনে করি। হ্যান্ডশেক করাকে কমপক্ষে মাকরুহ বলা যায়। তাই একে নিরুৎসাহিত করা উচিত। এই রাস্তা খুলে দেয়া উচিত হবে না। আমি কিন্তু একে হালাল বলছি না। দয়া করে ভুল বুঝবেন না।

তবে শয়তানের প্ররোচনায় কখনো এই কাজটি করে ফেললে আল্লাহর কাছে ক্ষমা চান। প্রায়শ্চিত্ত হিসেবে কিছু সদকা করে দিন। এ জন্য নিজেকে দুনিয়ার সবচেয়ে খারাপ লোক ভাবার দরকার নেই। এর ফলে আপনি একেবারে ধ্বংস হয়ে যাননি। এরচেয়ে অনেক বড় বড় পাপও আছে। আমরা সকলেই পাপ থেকে বাঁচার চেষ্টা করছি। একটি পাপ যেন অন্যান্য ভালো কাজ থেকে আপনাকে দূরে সরিয়ে না নেয়, সেই চেষ্টা করুন।

শেষ কথা হলো, এই দেশে আপনাকে হয়তো এমন অনেক কিছুই করতে হচ্ছে যা আপনার অপছন্দনীয়। আল্লাহ ঠিকই তা জানেন। অবশ্য, এই দেশে এমন কিছু ভালো কাজও আপনি করতে পারছেন, যা হয়তো অন্য কোনো দেশে করতে পারতেন না। তাই, এখানকার ভালো-মন্দ উভয় দিকই বিবেচনায় রাখতে হবে। আল্লাহ তায়ালা আমাদের জন্য কঠিন সমস্যাগুলো সহজ করে দিন।

*****

প্রশ্ন-৪: আপনি বলেছেন, সংস্কারের জন্য যোগ্য আলেমের সন্ধান পাওয়া জরুরি এই দেশে যোগ্য আলেমের অভাব থাকায় আমাদের মতো সাধারণ মুসলমানরা কী করতে পারি? এ ধরনের পরিস্থিতিতে আমরা কি অন্য দেশ থেকে ভালো মানের আলেম নিয়ে আসবো?

দ্বিতীয়ত, সাধারণত আলেমগণ ও মাদ্রাসাসমূহ গতানুগতিক ধ্যানধারণা পোষণ করেন বলাবাহুল্য, প্রচলিত ধ্যানধারণা যে কোনো পরিবর্তনের বিরোধী এমতাবস্থায়, ইসলামিক রিফর্মের জন্য আমরা যোগ্য নেতৃত্ব কীভাবে পেতে পারি?

উত্তর: দয়া করে বুঝতে চেষ্টা করুন, রক্ষণশীল ধারার প্রতি আমি শ্রদ্ধাশীল। আমার বক্তব্যে স্পষ্টভাবেই বলেছি, তারা যা করছেন সে সম্পর্কে আমি পুরোপুরি অবগত। কোনো কোনো ক্ষেত্রে নিজেকে গুটিয়ে রাখার প্রয়োজন রয়েছে। তাই তাদেরকে অসম্মান করা কারোরই উচিত হবে না। ইসলামকে এ পর্যন্ত নিয়ে আসার পেছনে তাদেরও যথেষ্ট অবদান রয়েছে।

আমার বক্তব্য হচ্ছে, আমাদেরকে আরো সামনে এগুতে হবে। ইসলামের যে কোনো প্রকার সংস্কার প্রচেষ্টা রক্ষণশীল ধারার ভেতর থেকেই উঠে আসা প্রয়োজন। কারণ, তারাই সংখ্যাগরিষ্ঠ। যেমন, আমি নিজেই এর একটা উদাহরণ। স্পষ্টতই আমি একসময় এই ধারার একজন ছিলাম। আমার পুরাতন ভিডিওগুলোতে দেখবেন, আমি একসময় ‘সাওব’ ও টুপি পরতাম। আর এখন অবশ্য সবকিছু বদলে গেছে।

যাইহোক, আমরা আশা করি কিছু রক্ষণশীল আলেম এই ধারা থেকে বেরিয়ে আসবেন। তবে কেউ আসতে না চাইলেও সমস্যা নেই। তাদের জন্য সেটাই ভালো। তাদেরকে বলয়ের বাইরে টেনে আনার চেষ্টা করা উচিত হবে না।

এবার মূল কথায় আসা যাক। আমরা সাধারণত সমালোচনা করে থাকি, অনেক আলেমের চিন্তাভাবনা সেকেলে, বাস্তবতার সাথে তাদের সম্পর্ক নেই। এসব সমালোচনার কিছুটা ভিত্তি আছে বৈকি। কিন্তু আমি আপনাদের কাছে জানতে চাই, আমাদের অধিকাংশ আলেমদের এই অবস্থার পেছনে কী কারণ রয়েছে বলে আপনার মনে হয়? এর কারণ হলো, আমাদের মেধাবী, শিক্ষিত ও উচ্চবিত্তদের অধিকাংশই আলেম হতে আগ্রহী নয়। আমাদের যে সকল সহকর্মী ও বন্ধুবান্ধব স্বনামধন্য প্রতিষ্ঠান থেকে গ্র্যাজুয়েট হয়েছেন, তাদের কয়জন দারুল উলুম, আল আজহার কিংবা মদীনা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে গিয়েছেন? মাশাআল্লাহ, আমরা প্রায় সবাই ইঞ্জিনিয়ারিং, মেডিসিন, গণিত পড়তে নামিদামি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে যাচ্ছি।

অথচ একটা সময় ছিল, যখন আক্ষরিক অর্থেই আমাদের সবচেয়ে সেরা ও মেধাবী শিক্ষার্থীরা ইসলামী জ্ঞান অর্জন করতে যেতো। আর বর্তমানের বাস্তবতা হলো কিছু মুসলিম দেশের সরকার ঠিক করে দিচ্ছে কে কোন বিষয়ে পড়বে। পরীক্ষায় কেউ যদি ৯০ শতাংশ নম্বর পায় তাহলে সে মেডিকেল কলেজে পড়তে পারে। এভাবে ৮০ শতাংশ পেলে ইঞ্জিনিয়ারিং, আর ৭০ শতাংশ পেলে অ্যাকাউন্টিং পড়তে পারে। আর যদি ফেল করে তাহলে তার জন্য উপযুক্ত জায়গা হলো দ্বীনি শিক্ষা! এটাই হচ্ছে বাস্তবতা। আমি বানিয়ে বলছি না। আমি সেই দেশগুলোর নাম জানি, কিন্তু বলতে চাচ্ছি না। যদিও অনেক মুসলিম দেশে আইন করে এটা করা হচ্ছে না, তবে সামাজিক পারিপার্শ্বিকতা দ্বারা অনেকটা এ রকমই নির্ধারিত। মধ্যপ্রাচ্য, ভারত, পাকিস্তান, বাংলাদেশ – এসব দেশে মেধাবীরা নয়, বরং মুখস্ত বিদ্যায় পারদর্শীরাই আলেম হওয়ার জন্য পড়তে যায়। আমি কী বলছি, আপনারা কি তা বুঝতে পারছেন? নামিদামি প্রতিষ্ঠান থেকে পড়াশোনা শেষে মেধাবী শিক্ষার্থীরা উচ্চশিক্ষার জন্য কোথায় যায়? আমেরিকা, ইংল্যান্ড, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া।

সুতরাং, যে মানুষগুলো আধুনিকতার সাথে সবচেয়ে কম পরিচিত তারাই আলেম হয়। ফলে তাদের চিন্তাভাবনা বাস্তবতা থেকে বেশ দূরেই থেকে যায়। আলেমদের এই পরিস্থিতিতে যারা অবাক হয়, তাদের দৃষ্টিভঙ্গি ত্রুটিপূর্ণ। আমরা প্রত্যেকেই ব্যক্তিগতভাবে এই পরিস্থিতির জন্য দায়ী। তাই বলে ক্যারিয়ার ছেড়ে দিয়ে আলেম হওয়ার জন্য আপনাকে জোর করছি না। আমি বলছি, চলুন আমরা অন্তত আলোচনাটা শুরু করি।

আল্লাহ তায়ালা আপনাকে তিন-চারটি সন্তান দান করে থাকলে তাদের মধ্য থেকে অন্তত একজনকে আলেম হওয়ার জন্য উৎসাহিত করুন। আমাদের নিজেদের সামাজিক অবস্থানের সাথে খাপ খাইয়ে নিতে আলেমদেরকে উৎসাহিত করা উচিত। এ জন্য অর্থনৈতিক, সামাজিক, বুদ্ধিবৃত্তিক দিক থেকে ভিন্ন ভিন্ন অবস্থানের মানুষজনের আলেম হওয়ার প্রয়োজন রয়েছে। কিন্তু যদি মনে করেন, নির্দিষ্ট এক শ্রেণীর মানুষই কেবল আলেম হবে, তাহলে তাদের কাছ থেকে কীভাবে আপনি উচ্চমান প্রত্যাশা করেন?

এটা একটা জটিল সমস্যা। আমি এ ব্যাপারে পুরোপুরি সচেতন। কিন্ত তাদেরকে দোষারোপ বা নিন্দা করে এর সমাধান করা যাবে না। বরং আমাদের প্রত্যেকে এই পরিস্থিতি থেকে শিক্ষা নিয়ে পরবর্তী প্রজন্মকে সেভাবে গড়ে তুলতে পারলেই এর সমাধান হবে। আমি সবসময় বলি, ‘আপনি আলেম হতে না পারলেও অন্তত অজ্ঞ থাকবেন না।’ কিছু না কিছু শিখতে থাকুন। বিভিন্ন সেমিনারে অংশগ্রহণ করুন, লেকচার শুনুন। এতে করে আপনি হয়তো আলেম হয়ে যাবেন না, কিন্তু চলতি ইস্যুগুলো সম্পর্কে কিছুটা হলেও অবগত থাকতে পারবেন। ইতিহাসের কিছু বেসিক কোর্স করে ইতিহাসবিদ হতে না পারলেও দুনিয়ার চলমান ঘটনা সম্পর্কে মূল্যায়ন করা যায়। একইভাবে ইসলাম নিয়ে কিছু পড়াশোনা করলে আপনি হয়তো আলেম হতে পারবেন না, তবে সত্যিকারের আলেমদের চিনতে পারবেন, ইসলামের অন্যান্য ধারা চিনতে পারবেন।

আসলে এটি এমন একটি সমস্যা, যার সহজ কোনো সমাধান আমার জানা নেই। আমার এভাবে কথা বলার এটা একটা কারণ। আমার ব্যাপারে একটা সমালোচনা রয়েছে, ‘কোনো বিষয় নিয়ে এভাবে কথা বলে আপনি মানুষকে শুধু শুধু বিভ্রান্ত করেন।’ এর জবাবে আমি বলি, এভাবে কথা বলাই একমাত্র উপায়। আল্লাহ চাহে তো এর মাধ্যমেই আমাদের আলোচনা এগিয়ে যাবে। এ ধরনের আলোচনার মাধ্যমেই আপনার মধ্যে সন্তানকে আলেম বানানোর প্রকৃত আগ্রহ তৈরি হবে, যারা বাস্তবতাকে বুঝবে। এভাবে আপনি বিদ্যমান প্যারাডাইমের পরিবর্তন ঘটাতে পারবেন।

সে তো বেশ দীর্ঘ সময়ের ব্যাপার। আপনি জানতে চাইতে পারেন, ‘এই মুহূর্তে আমার করণীয় কী?’

প্রথমত, আমার মনে হয়, আপনি ব্রিটিশ আলেমদের পাণ্ডিত্যকে স্বীকার করতে চাচ্ছেন না। ব্রিটেনে কোনো আলেম নেই – এ ধরনের কথার সাথে আমি একমত নই। তবে আমি কারো নাম বলতে চাই না। কারণ, কারো কারো নাম বাদ পড়ে গেলে লোকজনের মধ্যে ভুল বুঝাবুঝি হবে। ব্রিটেনে যেসব আলেম রয়েছেন, তারা অনেক যোগ্য বলে আমি মনে করি। তাঁরা আপনাদের সমাজেরই অংশ। তাঁরা ইতোমধ্যে তাঁদের পাণ্ডিত্য, যোগ্যতা ও প্রতিভার স্বাক্ষর রেখেছেন। আমি সবসময় বলি, জ্ঞানের জন্য আমাদের বাইরের দিকে তাকিয়ে থাকা জরুরি নয়। একটা ফতোয়ার জন্য টিম্বাকটু কিংবা কোনো দূরদেশে যাওয়ার প্রয়োজন নেই। বরং এমন কারো কাছে যান যিনি আধুনিক চিন্তাচেতনার সাথে পরিচিত, যিনি আপনাদের মাঝেই বাস করেন। এ ধরনের আলেম বুঝতে পারবেন যে, কিছু কিছু ফতোয়া এ দেশের জন্য প্রযোজ্য নয়। আপনারা অনুসন্ধান করলে এ ধরনের আলেম এ দেশেই পাবেন।

তাই আমি আপনাদের এই অভিযোগের ব্যাপারে একমত নই যে, ‘আমাদের কোনো আলেম নেই। এ জন্য আমাদেরকে বাইরে যেতে হবে।’ ইউরোপ ও আমেরিকা মহাদেশের মধ্যে এই লন্ডনেই সবচেয়ে বেশি আলেম রয়েছেন। আপনারা কি সেটা জানেন? এমনকি মদীনা ও আল আজহার বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্র্যাজুয়েটদের থেকে শুরু করে পাশ্চাত্যের আলেমদের কথা যদি বলেন, তাহলে লন্ডনেই সবচেয়ে বেশি আলেম পাবেন। কারণ, আপনারা সবাইকে আকৃষ্ট করতে পেরেছেন। তাই অনেকেই একে ‘লন্ডনিস্তান’ বলা শুরু করেছেন। আপনাদের এখানেই অনেক আলেম বসবাস করেন। কিন্তু তারা যে আলেম শ্রেণীর মানুষ, সেটা প্রকাশ করতে ইচ্ছুক নন। আশপাশে জিজ্ঞেস করুন, তাহলে কাউকে না কাউকে পেয়ে যাবেন। ইচ্ছা থাকলে উপায় হয়।

দ্বিতীয়ত, দীর্ঘমেয়াদে আপনি কী কী করতে পারেন? পালাবদলের ক্ষেত্র ও মাত্রা নিয়ে চিন্তাভাবনা শুরু করুন। ভাবুন, ‘আমাকে কিছুটা হলেও ইসলাম সম্পর্কে জানতে হবে।’ অজ্ঞ হয়ে থাকবেন না। ফিকাহ, ধর্মতত্ত্ব ও তাফসীর সম্পর্কে বুঝতে চেষ্টা করুন। তাহলে আপনি বাস্তবতার সাথে মানিয়ে চলতে পারবেন এবং আপনার পরিবার ও আপনার এলাকার মসজিদে ইসলামের মর্মবাণী (ethos) তুলে ধরতে পারবেন। এভাবেই একটি নতুন প্রজন্ম গড়ে উঠবে, যারা আরো বেশি সচেতন হবে। আমাদের হাতে কোনো জাদুকরী সমাধান নেই। অতএব, ধীরে হলেও পরিবর্তন আসবে।

*****

প্রশ্ন: ইসলামে সেসব ক্ষেত্রে সংস্কার দরকার, তারমধ্যে শিক্ষাক্ষেত্রের সংস্কার কি সর্বাধিক জরুরি? আলেমগণ যদি যথাযথভাবে প্রশিক্ষিত এবং উপযুক্ত হন, তাহলে তারা বর্তমান সময়ের নানাবিধ সমস্যা বাধা মোকাবেলায় সক্ষম হবেন

উত্তর: শিক্ষাক্ষেত্রকেই সংস্কারের একমাত্র জায়গা বলে আমি মনে করি না। অবশ্যই সংস্কারের আরো ক্ষেত্র রয়েছে। ইসলামী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর ভালো-মন্দ উভয় দিকই রয়েছে। একইভাবে পশ্চিমা প্রতিষ্ঠানগুলোরও ভালো-মন্দ রয়েছে। আমি দুই ধারার প্রতিষ্ঠানেই পড়াশোনা করেছি। পাশ্চাত্য প্রতিষ্ঠান থেকে আমি ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের উপর ডিগ্রি নিয়েছি, কলা ও মানববিদ্যায় পড়েছি। আবার মদীনা বিশ্ববিদ্যালয়ে ১০ বছর পড়াশোনা করেছি। সেখান থেকে পিএইচডি করেছি। সবমিলিয়ে আমি টানা ২২ বছর বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে পড়াশোনার সাথে সম্পৃক্ত ছিলাম। বিশ্বাস করুন, এর ফলে আমি নিছক দুইটা ব্যাচেলর, তিনটা মাস্টার্স এবং পিএইচডি ডিগ্রিই করেছি, তা নয়। বরং উভয় ব্যবস্থা থেকে আমি ব্যাপকভাবে উপকৃত হয়েছি, সেটা এখন বুঝতে পারি। ইসলামী শিক্ষা ব্যবস্থার সংস্কারের লক্ষ্যে পশ্চিমা বিশ্বে একটি প্রশিক্ষণ কলেজ স্থাপন করার যে স্বপ্ন আমি দেখি, তার পেছনে এই উপলব্ধিও একটা কারণ। সেই কলেজে আমরা আলেমদেরকে প্রশিক্ষণ দেবো। যেন তাঁরা অপেক্ষাকৃত অগ্রগামী চিন্তা করতে পারেন। যেন তাঁরা রাজনীতি, মিডিয়া এবং সমাজে আরো গঠনমূলক ভূমিকা রাখতে পারেন।

সংস্কার আমাদের জন্য জরুরি বটে। তবে সবার আগে এই দেশের প্রতি দায়িত্ব-কর্তব্যের ব্যাপারে আপনাদের প্রত্যেকের নিজস্ব চিন্তাভাবনার সংস্কার হওয়া দরকার। আমি এখানে এক ভাইয়ের সাথে কথা বলছিলাম। তাকে বললাম, আপনি আলেমদের অবস্থা নিয়ে ভাবছেন – এটা বেশ ভালো। কিন্তু আপনার নিজের খবর কী? ইতিবাচক পরিবর্তনের জন্য আপনি নিজে কী করছেন? আপনার নিজের জীবনের ভিশন কী? আপনার মসজিদ, কমিউনিটি, প্রতিবেশী এবং বন্ধুবান্ধবদের ব্যাপারে আপনার পরিকল্পনা কী? ব্যক্তি পর্যায়ে এগুলোই হচ্ছে আপনার জন্য সংস্কারের ক্ষেত্র।

আপনি নিজেও এই দেশ ও সংস্কৃতির অংশ – এই ব্যাপারটা আপনাদেরকে সহজে মেনে নিতে হবে। ‘আমরা’ বনাম ‘তারা’ – এই মানসিকতা থাকা উচিত নয়। আপনার মনমতো এমন কোনো দেশ নেই, এই দেশ ছেড়ে গিয়ে যেখানে আপনি বসবাস করতে পারবেন। বিশেষ করে, যারা এখানে জন্মেছেন, বড় হয়েছেন, তারা অন্য কোথাও গিয়ে এখানকার মতো স্বাচ্ছন্দ্যে বসবাস করতে পারবেন না। এই দেশে বসবাস করাটাই অন্যায় নয়। মনের মধ্যে এ ধরনের অপরাধবোধ থাকলে তা ঝেড়ে ফেলুন। এটা ঠিক, এ দেশের বেশিরভাগ বৈদেশিক নীতির ব্যাপারে যথেষ্ট অসন্তুষ্ট হওয়ার কারণ রয়েছে। তবে এই নীতিগুলোর পরিবর্তনের জন্য ভেতর থেকে আপনিই সবচেয়ে ভালো ভূমিকা রাখতে পারেন। জনমত, মিডিয়া বা এ জাতীয় অভ্যন্তরীণ ব্যাপার বাইরের কারো পক্ষে পরিবর্তন করা সম্ভব নয়।

আর দাওয়াতী কাজ তথা মানুষকে ইসলামের দিকে আহ্বান করার ক্ষেত্রেও এখানে আপনার স্বাধীনতা রয়েছে। তাই শুধু নেতিবাচক বিষয়গুলো দেখা উচিত নয়। এগুলো আমাদের জন্য তেমন কোনো সমস্যা নয়। অবশ্য মুসলমানদের ব্যাপারে একটা বাস্তবসম্মত অভিযোগ হচ্ছে – তারা ষড়যন্ত্রতত্ত্ব ভালোবাসে এবং অন্যকে দোষারোপ করতে পছন্দ করে। এটা আসলেই একটা সমস্যা। এটা মহানবীর (সা) সুন্নত নয়।

মনে রাখতে হবে, ইলুমিনাতি’রা দুনিয়া চালায় না। পবিত্র কাবা শরীফ যেভাবে মুসলমানদের একত্রিত হওয়ার কেন্দ্র, তাদের সে রকম কোনো গুপ্ত কেন্দ্র নেই, যার অদৃশ্য সুতার টানে সবাই নিয়ন্ত্রিত হয়। আল্লাহই সৃষ্টিজগতের পরিচালক। অন্য কেউ নয়। হ্যা, তারা শক্তিশালী বটে। কিন্তু তারা ব্ল্যাক ম্যাজিক বা এ রকম কোনো কিছুর মাধ্যমে শক্তিশালী হয়নি; অর্থ, প্রভাব-প্রতিপত্তি ইত্যাদির মাধ্যমেই হয়েছে। সত্য সবসময়ই ক্ষমতার উপর জয় লাভ করে। মুসা (আ) থেকে শুরু করে ইসলামের সকল নবী-রাসূলের জীবনীর উপর আলোকপাত করলে আমরা দেখতে পাই, সত্য সর্বদা মিথ্যার উপর জয় লাভ করেছে।

তাই আপনি আপনার কাজে মনোযোগ দিন। কোনো অযুহাত দেখাবেন না। এখনো অনেক কিছুই করার বাকি রয়েছে। নিজের জীবনে পরিবর্তন আনার মাধ্যমেই আপনাদের প্রত্যেকের সংস্কার কাজ শুরু করা উচিত। নিজেকে জিজ্ঞেস করুন – ‘নিজের, পরিবারের এবং কমিউনিটির ভবিষ্যত মঙ্গলের জন্য আমার ভিশন কী?’ এই ভিশনের যে বৈশ্বিক রূপ থাকতে হবে, এমন কোনো কথা নেই। ‘ফিলিস্তিন সংকট সমাধানে তুমি এককভাবে কী দায়িত্ব পালন করেছো?’ – আল্লাহ আপনাকে এই প্রশ্ন করবেন না। কিন্তু আপনি চাইলেই আপনার মসজিদের জন্য কিছু গঠনমূলক কাজ করতে পারেন। আপনি আপনার পরিবারের সদস্যদেরকে নামাজের জন্য উৎসাহ দিতে পারেন। ইবাদতমুখী, কর্মনিষ্ঠ ও ইতিবাচক মানসিকতা তৈরির মাধ্যমে তাদেরকে পরিবর্তন করার চেষ্টা করতে পারেন। ঘনিষ্ট বন্ধুমহলের মধ্যে পরিবর্তনের কাজ শুরু করতে পারেন। সবাই যদি তার অমুসলিম প্রতিবেশী ও সহকর্মীর সাথে সদ্ভাব বজায় রাখে, তাহলে কী ব্যাপার ঘটবে – আপনি কি তা ভাবতে পারছেন? নিশ্চয় খুব ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।

ইসলামের জন্য কাজ করার একমাত্র উপায় হলো আলেম হওয়া – এমনটা মনে করবেন না। নিঃসন্দেহে এটা একটা ভালো উপায়। কিন্তু সবাই আলেম হয়ে গেলে দুনিয়া চলবে কীভাবে? সাহাবীদের সবাই আলেম ছিলেন না। আবু হুরায়রা (রা) আলেম ছিলেন, কিন্তু খালিদ বিন ওয়ালিদ (রা) ছিলেন না। কোরআন-হাদীসের বিশেষায়িত জ্ঞান তাঁর ছিল না। মুয়াজ ইবনে জাবাল (রা), ওসমান ইবনে আফফানের (রা) ক্ষেত্রেও এই কথা খাটে। ওসমান (রা) আর্থিক সহায়তা করার দিক থেকে এগিয়ে ছিলেন। তখন আমাদের জন্য ওসমানের (রা) মতো সফল ব্যবসায়ীর প্রয়োজন ছিল। তাই আল্লাহ তায়ালা আর্থিকভাবে অনেক কিছু করার সামর্থ্য তাঁকে দিয়েছিলেন।

সুতরাং, আমি মনে করি, আপনাদের প্রত্যেকেরই কোনো না কোনো ভূমিকা পালন করার সুযোগ রয়েছে। নিজের সামর্থ্যকে তুচ্ছ ভাববেন না। আপনার কাজে আপনার বিকল্প কেউ নেই। আপনার বন্ধুবান্ধব, সহকর্মীসহ যারা এখানে উপস্থিত নেই, তাদেরকে আপনিই প্রভাবিত করতে পারবেন। আমার পক্ষে তা সম্ভব নয়। আপনার কাজটা অন্য কেউ করে দিবে না। তাই আল্লাহ আপনাকে যে মেধা, দক্ষতা, প্রভাব-প্রতিপত্তি এবং উদ্যম দিয়েছেন, সে অনুযায়ী আপনার নির্দিষ্ট দায়িত্ব রয়েছে। আপনারা প্রত্যেকেই যদি যার যার দায়িত্ব পালন করেন, তাহলে নিশ্চয়ই পৃথিবীটা অনেক সুন্দর হয়ে ওঠবে। পরিবার, সহকর্মী ও সর্বোপরি নিজের জন্য একটি সুন্দর সমাজ গড়ে তোলার চেষ্টা করে যাওয়াই আপনার কাজ। তাহলেই ইনশাআল্লাহ, শেষ বিচারের দিন আল্লাহর সামনে দাঁড়িয়ে বলতে পারবেন, ‘হে আল্লাহ, আপনি আমাকে যেসব নেয়ামত দিয়েছেন, আমি সেগুলোর সর্বোচ্চ ব্যবহার করার চেষ্টা করেছি।’ এর ফলেই আপনি জান্নাতুল ফেরদাউস পেয়ে যেতে পারেন। এটাই আমাদের ধর্মের সৌন্দর্য।

*****

প্রশ্ন-৬: আপনি বলেছেন, কেউ যত বেশি স্বাতন্ত্র্য বজায় রাখবে, সে তত বেশি কোনঠাসা হয়ে পড়বে পুরুষদের ক্ষেত্রে এটা খুবই সত্য কিন্তু এমন একজন বোনের অবস্থা কেমন হবে যিনি শালীনতার দাবি পূরণ করতে গিয়ে হিজাব পরিধান করছেন, এমনকি নিকাবও পরছেন, যেটি তার দৃষ্টিতে ফরজ? আমাদের প্রবীণদের মতেও এটি এমন হওয়া উচিত এমতাবস্থায় বৃটিশ সমাজে এটাকে কীভাবে মানিয়ে নেয়া যাবে?

উত্তর: আমি স্পষ্টভাবেই বলেছি, শরীয়াহ যতটুকু অনুমোদন করে, প্রচলিত সংস্কৃতির ততটুকুই আমরা গ্রহণ করবো। এটাই করা উচিত। তাই বলে সমাজের ডমিন্যান্ট ন্যারেটিভ হওয়া সত্বেও আমরা নিশ্চয় পানশালায় যাবো না। শরীয়াহ এটা অনুমোদন করে না। অর্থাৎ এ জায়গায় এসে আমাদের সীমারেখা টানতে হবে। নারীদের মাথা ঢাকার প্রসঙ্গেও একই কথা প্রযোজ্য। কোরআনে এ ব্যাপারে পরিষ্কারভাবেই বলা আছে। এটা মধ্যযুগের কয়েকজন আলেমের ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ মাত্র নয়। কেউ যদি কোরআনের এই স্পষ্ট বক্তব্যকে অস্বীকার করে তাহলে বুঝতে হবে, তিনি আসলে সাধারণ আরবী ভাষাই বুঝেন না। কারণ, আরবীতে মাথা ঢাকার কাপড় বুঝাতে যে শব্দ রয়েছে, সেটাই আল্লাহ তায়ালা ব্যবহার করেছেন।

وَلْيَضْرِ‌بْنَ بِخُمُرِ‌هِنَّ عَلَىٰ جُيُوبِهِنَّ

তারা যেন তাদের বক্ষদেশের উপর মাথার উড়না ফেলে রাখে (সূরা নূর: ৩১)

অর্থাৎ, শব্দটি হচ্ছে ‘খুমুর’ বা ‘খিমার’, যাকে আমরা হিজাব বলে থাকি। ‘খিমার’ শব্দটির আক্ষরিক অর্থই হচ্ছে মাথা ঢেকে রাখার চাদর বা ওড়না (head scarf)। কোরআনে এই শব্দটি ব্যবহার করা হয়েছে। তাই, একজন নারীর ‘আওরা’, যার মধ্যে মাথাও অন্তর্ভুক্ত, ঢেকে রাখার ব্যাপারে সর্বসম্মতভাবে ঐক্যমত রয়েছে।

পক্ষান্তরে, এ ব্যাপারটাকেই আমরা আমরা সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় বানিয়ে ফেলেছি। মাথা ঢেকে হিজাব পরিধান করা কিংবা দাড়ি রাখা মানেই কেউ ভালো মুসলমান – এমনটা মনে করা রক্ষণশীলদের অন্যতম একটা সমস্যা। দুঃখজনকভাবে, অনেকেই অবচেতনভাবে এই মানসিকতা দ্বারা আচ্ছন্ন। আমরা সত্যি সত্যিই তাৎক্ষণিকভাবে কাউকে এ বিষয়গুলোর আলোকে বিচার করা শুরু করি। অথচ আমরা এগুলোকে যতটা অপরিহার্য মনে করি, এগুলো ততটা গুরুত্বপূর্ণ নয়। তারমানে, আমি এগুলোকে মোটেও অগুরুত্বপূর্ণ বলছি না। কিন্তু এগুলো নামাজ আদায়ের মতো অপরিহার্য নয়। এমন অনেক দাড়িওয়ালা ভাই আছেন, যারা প্রতিদিন পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়েন না। আবার, এমন অনেক বোন আছেন, যারা হিজাব না পরলেও আখলাকের দিক থেকে ভালো, গীবত করেন না, ‘এটা-সেটা’ করে বেড়ান না। হিজাব না পরার চাইতেও গীবত করা বেশি গুনাহর কাজ। অথচ অনেক হিজাবী বোনই গীবত করে বেড়ান!

মূল কথা হচ্ছে, এমন কিছু বাহ্যিক বিষয়ের আলোকে অন্যদের ধার্মিকতা যাচাইয়ের সংস্কৃতি আমাদের মধ্যে চালু হয়ে গেছে, যেগুলো আসলে অপেক্ষাকৃত নমনীয় ব্যাপার। বিরিয়ানী খাওয়া যদিও হালাল, কিন্তু এটা নিশ্চয় ইসলামের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নয়। আমাকে কেউ ভুল বুঝবেন না ধরে নিয়েই বলছি – হিজাব পরিধান করা অবশ্যই ওয়াজিব। কিন্তু আপনারা কি জানেন, হিজাবের বিধান সংক্রান্ত আয়াত কখন নাজিল হয়েছিল? পঞ্চম হিজরীর শেষ দিকে। নামাজ, রোজা, জাকাত, উত্তরাধিকার, বিয়ে এবং তালাক সংক্রান্ত মৌলিক বিধানগুলো নাজিলের পরে নবুওয়তের শেষ দিকে যেসব বিধান নাজিল হয়, তারমধ্যে একটি হলো হিজাব। এমনকি হিজাব সংক্রান্ত সূরা আহযাবের আয়াতটি আল্লাহ তায়ালা শেষ করেছেন এভাবে, ‘আল্লাহ ক্ষমাশীল ও পরম দয়ালু’।

অতএব, আমরা যে ধরনের সমাজ ও সংস্কৃতির মধ্যে বাস করছি, সেখানে যে বোনেরা হিজাব পরার জন্য সংগ্রাম করে যাচ্ছেন, তাদের প্রতি আমার হৃদয় নিংড়ানো সহানুভূতি রয়েছে। আল্লাহ চান নারীরা হিজাব পরিধান করুক। তাই আমি কখনোই এই বিধানকে পরিবর্তন করার কথা বলবো না। তবে তাদেরকে আমি বলতে চাই, শুধুমাত্র হেডস্কার্ফ পরতে না পারার কারণে নিষ্ঠাবান মুসলমান হতে পারছেন না – এমনটা ভাববেন না।

আমাদের আরেকটি সমস্যা হচ্ছে দাড়ি নিয়ে ভাইদেরকে লজ্জা দেয়া। যেমন আমরা বলে থাকি, ‘ভাই, দাড়ি না থাকলে আমাদের ইসলামী কেন্দ্রের সাথে সম্পৃক্ত হতে আসবেন না।’ সুবহানাল্লাহ! এভাবে আপনি ভালো কাজের দরজাগুলো বন্ধ করে দিচ্ছেন! ঠিক আছে, বড় কোনো গুনাহর কাজ করলে কোনো ব্যক্তির পক্ষে ইসলামী কেন্দ্রের সভাপতি হওয়া উচিত নয় – তা না হয় বুঝলাম। কিন্তু সেই ব্যক্তি কি কোনো ইসলামী কেন্দ্রের সাথে সম্পৃক্তও থাকতে পারবে না! গুনাহর কাজ ও উত্তম আমলের তালিকা তৈরি করে, তার আলোকে লোকজনকে ইসলামী কেন্দ্রের সদস্য বানানো কি উপযুক্ত পন্থা? না। বরং প্রত্যেক মুসলিম নারী-পুরুষের জন্যই ইসলামী কেন্দ্রের সাথে সম্পৃক্ত হওয়ার দরজা খোলা রাখা উচিত। সভাপতি ও মুখ্য দায়িত্বপালনকারী সদস্যদেরকে ইসলামী মূল্যবোধসম্পন্ন হওয়া উচিত, এটা বোধগম্য ব্যাপার। কিন্তু সমাজসেবা, ফান্ড রাইজিং কিংবা ইসলামী সচেতনতামূলক কর্মসূচিতে থাকতে চাইলেও কি এ রকম উচ্চ নৈতিকতাসম্পন্ন হতে হবে? না। অবশ্যই প্রত্যেক মুসলিম নারী-পুরুষের জন্য সমাজে ও ইসলামী কেন্দ্রগুলোতে একটা স্পেস থাকা জরুরি; কেউ হিজাব করুক বা না করুক, দাড়ি রাখুক বা না রাখুক।

হ্যাঁ, বোন, হিজাব পরিধানের কারণে বাস্তবিকই আপনি মনোযোগের কারণ হয়ে দাঁড়াবেন, এটা ঠিক। এবং এ ব্যাপারে কোরআন-হাদীসের বর্ণনা সুস্পষ্ট, যা আমরা ইতোমধ্যেই বলেছি। আমরা প্রগতিবাদী নই। এ ব্যাপারে স্পষ্ট দলীল রয়েছে, যা আমরা কোনোভাবেই অস্বীকার করতে পারি না। তবে হিজাবের ধরন, স্টাইল, কাপড়ের রং – এসব ব্যাপারে আমাদের সৃজনশীল ও শিল্পানুরাগী প্র্যাকটিসিং মুসলিম বোনেরা কাজ করতে পারেন। আপনারা হিজাবের এমন ডিজাইনের কথা ভাবুন, যা একইসাথে শালীন হবে এবং আমরা যেখানে বাস করছি, সেখানকার সংস্কৃতি ও ড্রেসকোডের প্রতিফলনও যাতে ঘটবে।

একটা সহজ উদাহরণ দিয়ে বিষয়টি পরিষ্কার করা যাক। পাকিস্তানী বোনেরা সাধারণত খুব ঢিলেঢালা সালোয়ার-কামিজ পরে থাকেন। সাথে বড় শাল গায়ে দেন। আবার, মালয়েশিয়ান বোনেরা বেশ উজ্জ্বল রংয়ের হিজাব পরিধান করেন, মাশাআল্লাহ। তাদের হিজাবে চমৎকার কারুকাজ করা থাকে। তারা এতেই অভ্যস্ত। তাই নয় কি? অন্যদিকে, নাইজেরিয়ান বোনদের হিজাবের নকশা বেশ জটিল। তাদের হিজাবও যথেষ্ট শালীন।

পোশাকটি শালীন কি না, তা খেয়াল রাখুন। আঁটোসাঁটো পোশাক পরা উচিত নয়। অবশ্য আমরা সবাই তা বুঝি। হিজাবের কাপড়, রং, স্টাইল ইত্যাদি ব্যাপার শরীয়াহ ঠিক করে দেয় না। এটা হতে পারে মার্জিত কোনো টু-পিস পোশাক, যেমন বিজনেস স্যুট। তবে সেটা অবশ্যই ঢিলা হতে হবে, আঁটোসাঁটো হওয়া যাবে না।

আর কেউ যদি জিলবাব পরতে চায়, তাহলে তো কথাই নেই। মূল পোশাকের উপরে বাড়তি যে পোশাক পরা হয়, আরবীতে তাকে জিলবাব বলে। কিন্তু আমার মতে, জিলবাব পরাটা বাধ্যতামূলক নয়। এটা পরতে শুধু উৎসাহিত করা হয়েছে, এর বেশি কিছু নয়। এটাকে উৎসাহিত করার কারণ হচ্ছে, জিলবাব শব্দটা কোরআনের পরিভাষা। ‘লিসানুল আরাবিয়্যাহ’সহ আরবী ভাষাতত্ত্বের বিভিন্ন বইয়ে জিলবাব শব্দটির ভাষাতাত্ত্বিক অর্থ খেয়াল করলে আপনি দেখতে পাবেন, ‘জিলবাব হচ্ছে কোনো বড় আচ্ছাদন, যা নারীরা পরিধান করে।’ কেউ যদি বড় হেডস্কার্ফ পরে, তাহলে সেটাও জিলবাব হিসেবে বিবেচিত হবে। জিলবাব অবশ্যই উত্তম। আমাদের যেসব বোন জিলবাব পরেন, তাদের জন্য সেটাই ভালো। যারা হিজাব করার চেষ্টা করে যাচ্ছেন, আমরা তাদেরকে উৎসাহিত করি। আমরা তাদেরকে বলতে চাই, শুরু করে দিন। আপনার পক্ষে যতটুকু সম্ভব ততটুকু জিলবাব পরতে চেষ্টা করুন।

মনোযোগ দিয়ে শুনুন। দয়া করে পরবর্তীতে আমার কথাকে ভুলভাবে উদ্বৃত করবেন না। কোনো বোন হয়ত হেডস্কার্ফ পরেন; কিন্তু একইসাথে আঁটোসাঁটো শার্ট-জিন্স প্যান্ট পরিধান করেন। তিনি আসলে হিজাব থেকে অনেক দূরে রয়েছেন। অন্যদিকে, কোনো বোন হয়তো মাথা ঢাকেন না; কিন্তু ঢিলেঢালা পোশাক পরেন। হিজাবের উদ্দেশ্যের দিক তিনি আগের জন থেকে কাছাকাছি রয়েছেন। আমরা অনেকেই আসলে বুঝি না হিজাব বলতে কী বুঝায়? হেডস্কার্ফ পরাকেই অনেকে হিজাব মনে করেন। এটা আমাদের একটা সমস্যা। আবারো বলছি, আমাকে ভুলভাবে উদ্বৃত করবেন না। মাথা খোলা রাখাকে আমি হালাল বলিনি। আমি আসলে বলতে চেয়েছি, যে বোনটি হেডস্কার্ফ পরলেও আঁটোসাঁটো জিন্স প্যান্ট ও শার্ট পরেন (দুঃখজনকভাবে আমেরিকা ও ইংল্যান্ডে এই প্রবণতা বেশি), তার তুলনায় যিনি মাথা না ঢাকলেও অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ ঢেকে রাখে এমন ঢিলেঢালা পোশাক করেন, তার পোশাক হিজাবের আদর্শ রূপের বেশি কাছাকাছি। আঁটোসাঁটো পোশাক পরে মাথা ঢেকে রেখে আর কী লাভ? তাই আমি বলেছি, শুধু মাথা ঢাকার চেয়ে ঢিলেঢালা পোশাক পরা হিজাবের অধিকতর নিকটবর্তী।

যাইহোক, যে বোনেরা হিজাবে পুরোপুরি অভ্যস্ত হওয়ার চেষ্টা করছেন তাদেরকে বলবো, আপনারা এগিয়ে যান। হাত-পা ঢাকা ও ঢিলেঢালা পোশাক দিয়ে শুরু করুন। ইনশাআল্লাহ, ধীরে ধীরে মাথা ঢেকে চলার ব্যাপারেও হয়ত আপনি অভ্যস্ত হয়ে যাবেন। তারপর আপনি যদি জিলবাব পরতে চান, তাহলে তো সেটা খুবই ভালো। যদিও তা পরা বাধ্যতামূলক নয়। আমরা বোনদের উৎসাহিত করতে চাই। আর এ ধরনের কথাবার্তা তাদেরকে নিরুৎসাহিত করার চেয়ে উৎসাহিত করবে বলেই আমি মনে করি।

আর ভাইদেরকে বলছি, আপনাদের ব্যাপারটা আরো সহজ। কারণ, দাড়ি থাকলেও আপনি সহজেই আর দশজনের মাঝে মিশে যেতে পারেন। কিন্তু আশি-নব্বইয়ের দশকে ব্যাপারটা এমন ছিল না। এখন তো কারো মুখে দাড়ি আর চোখে সানগ্লাস থাকলে তাকে বেশ স্মার্ট ও সুপুরুষ মনে হয়। তাই এখন আর কোনো সমস্যায় পড়তে হয় না। কিন্তু আমাদের বোনেরা সত্যিই অনেক ভোগান্তিতে পড়েন। আমি সত্যিই হিজাবী বোনদের তারিফ করতে চাই। আপনারাই আমাদের ঈমানী অ্যাম্বাসাডর, প্রতিনিধি। আমরা দাড়ি রেখেও সহজে লোকজনের সাথে চলতে পারি। কেউ হয়ত আমাদের মুসলিম হিসেবে চিনতে পারলেও তাদের সাথে আমাদের পোশাকের মিল দেখে হয়তবা কিছুটা স্বস্তিবোধ করে। অবশ্য বোনদের বেলায় এমনটা সচরাচর ঘটে না।

তাই আমাদের বোনদেরকে সম্মান করা উচিত। এমনকি যারা হিজাব পরে না, তাদেরকেও সম্মান করা উচিত। হিজাব করার জন্য এখানে রীতিমত যুদ্ধ করতে হয়। তাই তাদের ব্যাপারে চূড়ান্ত মন্তব্য করবেন না। আপনি তা করতে পারেন না। কোনো বোন যদি যথাযথভাবে পোশাক না পরেন, তাহলে অন্য কোনো বোনকেই এ ব্যাপারে তার সাথে কথা বলতে দিন। তারাই ব্যাপারটার সমাধান করুক। তাদের ব্যাপারে মতামত দেয়া আপনার কাজ নয়। কিংবা ‘তিনি কেন এটা করছেন না’ ধরনের কোনো চিন্তা করাও আপনার কাজ নয়। বাস্তবতা হচ্ছে তিনি মসজিদে কিংবা কোনো ইসলামী কেন্দ্রে আসছেন। ইংল্যান্ড বা আমেরিকার মতো দেশে বাস করে তিনি এসব জায়গায় আসার প্রয়োজনবোধ নাও করতে পারতেন। কিন্তু এই আধুনিক সমাজে বাস করেও তো তিনি আসছেন। তাই তিনি যেমন পোশাক পরেই আসুন না কেন, তাকে ফিরিয়ে দেবেন না।

আর যে বোনেরা ব্যাপারটা সামাল দেবেন, তারা খুবই ভদ্রভাবে তা করবেন। নতুন কোনো বোনকে আপনি যদি বলেন, ‘কেন তু্মি এ ধরনের পোশাক পরে এসেছ?’ তাহলে তা ভদ্র আচরণ হবে না। বরং আপনি হাসি মুখে সালাম দিয়ে তাকে বলতে পারেন, ‘বোন, আপনার নাম কি?’ ‘আমি ফাতেমা। আপনি?’ … এভাবে তার সাথে সম্পর্ক গড়ে তুলুন। এভাবে পাঁচ-দশ বার আপনাদের মধ্যে দেখা-সাক্ষাতের মাধ্যমে ঘনিষ্টতা তৈরি হওয়ার পর হিজাব নিয়ে কথা বলুন। কিন্তু প্রথম সাক্ষাতেই যদি তার সাথে কঠোর ও বাজে আচরণ করেন, তাহলে কীভাবে তার কাছ থেকে ভালো কিছু আশা করতে পারেন? আসলে সবকিছুই নির্ভর করে আমাদের মানসিকতার উপর।

টিকে থাকা নিয়ে আমরা এখন সত্যিই চিন্তিত। তাছাড়া কঠোর ও বাজে আচরণ করা কোনোক্রমেই ইসলামসম্মত নয়। বিশেষত আমরা যেখানে সংখ্যালঘু এবং আমাদের তরুণ প্রজন্ম যেখানে ধর্মবিশ্বাস ত্যাগ করছে, সে পরিবেশে কঠোর ও আল্ট্রা-ইসলামিক হওয়া আমাদের জন্য বুদ্ধিমানের কাজ নয়। তাহলে এই ইস্যুটার সমাধান আপনি কীভাবে করবেন? এ ব্যাপারে কথা বলতে আমি আগ্রহী।

আমার আগের কথা থেকে এটা পরিষ্কার যে, বোনদের মাথা ঢাকার ব্যাপারটি কোরআনেরই বিধান। আমরা তা পরিবর্তন করতে পারি না। তাহলে আমরা কী করতে পারি? আমি আগেই বলেছি, উগ্র এবং আঁটোসাঁটো না হওয়ার শর্তে আপনি পোশাকের স্টাইল, প্যাটার্ন ইত্যাদি পরিবর্তন করতে পারেন। বাজারে প্রচলিত হিজাবগুলো খুব জমকালো নয়। আপনারা সেগুলো পরতে পারেন।

বোনদেরকে আমি আরেকটা কথা বলতে চাই। হিজাবের ফ্যাশন বা এ জাতীয় ব্যাপারগুলো নিয়ে আপনাদেরকেই ভাবতে হবে। ফ্যাশন বলতে আমি পাশ্চাত্য মূল্যবোধকে বুঝাচ্ছি না। বরং শরীয়াহর উপাদানগুলো বজায় রেখে প্রচলিত সংস্কৃতি থেকে যথাসম্ভব গ্রহণ করার কথা বলছি। আলহামদুলিল্লাহ, আমার অভিজ্ঞতায় এ ধরনের বেশকিছু ভালো ডিজাইন রয়েছে।

বোনদেরকে সর্বশেষ বলতে চাই, পোশাকের ব্যাপারে পুরুষদের তুলনায় আপনাদের জন্য শর্ত বেশি থাকায় আপনারা পুরস্কারও বেশি পাবেন। কারণ, ভাইদের তুলনায় আপনারা বেশি কষ্ট করছেন। মহান আল্লাহ আপনাদেরকে তওফিক ও উত্তম পুরস্কার দান করুন। আপনারা নিশ্চয় তা প্রাপ্য। আমীন।

উপস্থাপক: আল্লাহ আপনাকে উত্তম প্রতিদান দান করুন। সমাপনী বক্তব্যের মাধ্যমে আপনি আজকের আলোচনা শেষ করুন।

ইয়াসির ক্বাদী: বিশেষ কোনো সমাপনী বক্তব্য নেই। আমি শুধু এ কথাটি বলতে চাই, আমরা খুবই কঠিন ও সংকটময় সময়ে বাস করছি। এই সময়টাতে বিশ্বজুড়ে ও স্থানীয়ভাবে, এমনকি আপনার নিজস্ব কমিউনিটিতেও প্রতিনিয়ত অনেক কিছু ঘটে যাচ্ছে। মুসলমানদের ব্যাপারে সরকারসমূহের কথাবার্তাগুলো যথেষ্ট আশংকাজনক হয়ে ওঠছে। তাই নিজেকে খোলসে লুকিয়ে রাখার সময় এখন নয়, বরং একজন গর্বিত মুসলমান হিসেবে গঠনমূলক চিন্তাভাবনা করার সময়। নিজের পরিবার, পরিচিত মহল, বন্ধুবান্ধব ও কমিউনিটির মধ্যে ইসলাম সম্পর্কে ইতিবাচক চিত্র তুলে ধরা করা দরকার। ঠিক এ কারণেই আমি এই ইস্যুটি নিয়ে কাজ করার ব্যাপারে এত বেশি আগ্রহী হয়েছি। এ সংক্রান্ত আলাপ-আলোচনাকে আমি আরো এগিয়ে নিতে চাই। অবশ্য শেষ পর্যন্ত আল্লাহর পক্ষ থেকেই কেবল সফলতা আসে। তাই আল্লাহর সাথে ঘনিষ্ট সম্পর্ক গড়ে তুলুন। তাঁর সাথে সম্পর্ক না থাকলে কোনোকিছুই সফল হবে না। মহান আল্লাহ আমাদের সহায় হোন।

[মূল: ইয়াসির ক্বাদী, অনুবাদ: আইয়ুব আলী]

ইয়াসির ক্বাদী
ইয়াসির ক্বাদী একজন প্রভাবশালী আমেরিকান স্কলার ও জনপ্রিয় বক্তা। তিনি হিউস্টন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে বিএসসি ডিগ্রি লাভ করেন। তারপর মদীনা বিশ্ববিদ্যালয় হাদীস শাস্ত্রে বিএ এবং ধর্মতত্ত্বের উপর মাস্টার্স ডিগ্রি সম্পন্ন করেন। তারপর ২০০৫ সালে আমেরিকায় ফিরে গিয়ে ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মাস্টার্স ও এমফিল করার পর ইসলামিক স্টাডিজের উপর পিএইচডি করেন। কর্মজীবনে তিনি ইসলামিক স্টাডিজের উপর অগ্রসর পড়াশোনার জন্য উত্তর আমেরিকার সবচেয়ে বড় প্রতিষ্ঠান আল-মাগরিব ইনস্টিটিউটের অ্যাকাডেমিক অ্যাফেয়ার্সের ডিন। পাশাপাশি টিনেসি রাজ্যের মেমফিসে অবস্থিত রডস কলেজের রিলিজিয়াস স্টাডিজের অধ্যাপক হিসেবে কর্মরত।

আপনার মন্তব্য লিখুন

দয়া করে আপনার মন্তব্য লিখুন!
দয়া করে এখানে আপনার নাম লিখুন