মঙ্গলবার, নভেম্বর ২১, ২০১৭
হোম > লেকচার অনুবাদ > ইসলামী চিন্তার সংস্কার: বিচ্যুতি, প্রগতি, নাকি সময়ের দাবি? (পর্ব ৬)

ইসলামী চিন্তার সংস্কার: বিচ্যুতি, প্রগতি, নাকি সময়ের দাবি? (পর্ব ৬)

এডিটর’স নোট:

ইসলামী চিন্তার সংস্কারের প্রসঙ্গ আসলে প্রায়শই একটা প্রশ্ন উত্থাপিত হয় – সংস্কারের ক্ষেত্রে কোন বিষয়গুলো বিবেচনাযোগ্য, আর কোনগুলো অপরিবর্তনীয়? এক্ষেত্রে অতি উদার কেউ কেউ শরীয়াহর খোলনলচে পাল্টে ফেলতে চান, আবার অতি রক্ষণশীল কেউ কেউ মনে করেন ইসলামে সংস্কারের কোনো ধরনের সুযোগ নেই। এই দুই প্রান্তিক অবস্থানের বাইরে সঠিক পথ কী হতে পারে?

২০১৪ সালের নভেম্বরে লন্ডনে প্রদত্ত দীর্ঘ দেড় ঘণ্টার এক বক্তৃতায় শায়খ ড. ইয়াসির ক্বাদী এ ব্যাপারে গভীর পাণ্ডিত্যপূর্ণ আলোচনা করেছেন। একটি গল্পের আশ্রয় নিয়ে পুরো বিষয়টিকে তিনি চমৎকারভাবে উপস্থাপন করেছেন। সিএসসিএস-এর পাঠকদের জন্যে বক্তৃতাটি ধারাবাহিকভাবে অনুবাদ করা হচ্ছে। অনুবাদ করেছেন আইয়ুব আলী


বক্তৃতা পর্ব: পর্ব ১, পর্ব ২, পর্ব ৩, পর্ব ৪, পর্ব ৫,পর্ব ৬ ||| প্রশ্নোত্তর পর্ব: পর্ব ১, পর্ব ২, পর্ব ৩


সংস্কারের দিকনির্দেশনা

বক্তব্য শেষ করার আগে সংস্কারের জন্য কিছু দিকনির্দেশনা তথা ইসলামে সংস্কারের পদ্ধতি, মাত্রা ও পরিধি নিয়ে আলোচনা করা যাক। আমার মতে, ইসলামী সংস্কারের ক্ষেত্রে আমাদেরকে পাঁচটি বিষয় মাথায় রাখা উচিত।

খেলা একই শুধু মাঠ আলাদা
আমাদেরকে বুঝতে হবে, এই পাঁচটি ধারা সবসময়ই ছিল। এগুলোর কোনোটাই নতুন কিছু নয়। কোনো কোনো ইস্যু হয়তো নতুন হতে পারে। ভেগানিজম নয়, আমাদের ইস্যু হচ্ছে সমকামিতা, নারী-পুরুষের ভূমিকা ইত্যাদি। একইভাবে, সহস্র বছর আগে একটি গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু ছিল আল্লাহর সত্ত্বা ও তাঁর গুণাবলির সম্পর্ক।

এই যুগেও আপনি কি গ্রিক সংস্কৃতিকে গ্রহণ করবেন বা গ্রিক সভ্যতার ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ করবেন? কিংবা কোরআন ও সুন্নাহর বক্তব্য আক্ষরিক অর্থে গ্রহণ করবেন? এটা বোধহয় ঠিক হবে না। কারণ, ইতোমধ্যে ইস্যুর পরিবর্তন ঘটে গেছে। এই পরিবর্তনে মানুষ কীভাবে সাড়া দেয়? মানুষের চিন্তাভাবনার পরিসর বেশ সীমিতই বলতে হবে। আসল কথা হচ্ছে, খেলা আগেরটাই আছে, কিন্তু মাঠের পরিবর্তন হয়েছে। খেলার নিয়মনীতিও আগের মতোই আছে, শুধু স্থান-কাল-পাত্রের পরিবর্তন ঘটেছে।

সুতরাং, যে পাঁচটি ধারার কথা বলেছি এর কোনোটাই নতুন নয়। মহানবীর (সা) যুগ থেকে শুরু করে এখন পর্যন্ত এই ধারাগুলো ছিল এবং আছে। তবে এর মানে এই নয় যে, পাঁচটি ধারাই সঠিক। আমি অকপটে বলতে চাই, মুরতাদ ও প্রগতিবাদী ধারার প্রতি আমার কোনো শ্রদ্ধাবোধ নেই। প্রগতিবাদীদেরকে আমি হিসেবের মধ্যে ধরি না। তারা যতটা স্মার্ট হিসেবে নিজেদের দেখায়, আসলে ততটা নয়। তারা নিজেদেরকে উঁচুমানের বুদ্ধিবৃত্তিসম্পন্ন মনে করে, যদিও তারা তা নয়।

রক্ষণশীলদের প্রতি আমার যথেষ্ট শ্রদ্ধা রয়েছে। এক দশক আগে আমি নিজেও এই ধারার সাথে যুক্ত ছিলাম। আমি মনে করি এটা ইসলামের অত্যন্ত শক্তিশালী একটি ধারা। আমি এখনো মসজিদে তাদের সাথে সময় কাটাই। তাদের প্রতি আমার ভালোবাসা রয়েছে। অকৃত্রিম শ্রদ্ধা ও সহমর্মিতা নিয়েই আমি তাদেরকে বলতে চাই, আপনাদের পালিত ইসলাম আপনাদের উত্তরসুরীদের পক্ষে পালন করা হয়তো সম্ভব হবে না। প্রভাবশালী সংস্কৃতিরই অংশ অথচ গঠনমূলক – এমন কোনো উপাদানকে গ্রহণ করা অন্যায় কিছু নয়। এতে বরং আপনার পরবর্তী প্রজন্মের পক্ষে ইসলাম পালন করা সহজতর হবে।

এই হচ্ছে আমার প্রথম কথা। আমি আবারো বলছি, এই পাঁচটি ধারার বাইরেও আরো অনেক ধারা থাকতে পারে। আমি সেসব সম্ভাব্য প্যারাডাইমের কথা আলোচনা করছি না। বরং আমি সেগুলো নিয়ে কথা বলছি যেগুলো সুবিদিত।

আলেমদের দায়িত্ব
প্রতিটি ইস্যুকে কোরআন-হাদীস এবং আধুনিক ইতিহাসের আলোকে পর্যালোচনা করা আলেমদের দায়িত্ব। এটা সাধারণ মুসলমানদের কাজ নয়। আমি সবসময় বক্তব্যকে যথাসম্ভব স্পষ্ট করে তুলে ধরার চেষ্টা করি। তারপরও শ্রদ্ধেয় অনেক আলেম এই বলে সমালোচনা করেন, ‘ইয়াসির, তুমি সাধারণ মুসলমানদেরকে মুজতাহিদ হতে বলছ!’

এই অভিযোগটি মোটেও সত্য নয়। ইংরেজি ভাষায় যতটা পারা যায়, আমি ততটা পরিষ্কারভাবে তাদেরকে প্রশ্ন করতে চাই – পোশাক, জন্মদিন, ভোটাধিকার প্রয়োগসহ যে কোনো ইস্যুর পর্যালোচনা করা কাদের দায়িত্ব? সুন্নাহ নিয়ে যাদের গভীর অধ্যয়ন রয়েছে এমন অভিজ্ঞ আলেমদেরই এটা দায়িত্ব।

আমি ঠিক এই কাজটাই করছি। কোনো একটা বিষয়ে বিভিন্ন মাজহাবে যা বলা হয়েছে, আমি সেগুলো তুলে ধরি। যেন আপনারা সংশ্লিষ্ট বিষয় ভালোভাবে বুঝতে পারেন। পাশাপাশি এটাও যেন বুঝতে পারেন – মতামতের এতো বৈচিত্র্য (spectrum of opinion) কেন। এটা কোনো সাধারণ মুসলমানের দায়িত্ব নয়। দুয়েকটা লেকচার, একটা সাপ্তাহিক সেমিনার, এমনকি অনেকগুলো সাপ্তাহিক সেমিনারে অংশগ্রহণ করলেই একজন আলেম হওয়া যায় না।

সেমিনার ও লেকচারগুলো নিছক সাধারণ শিক্ষার জন্যে হলেও এগুলোর মাধ্যমে কোনো একটি বিষয় আরো ভালোভাবে হৃদয়াঙ্গম করা যায়। আমি আশা করি, আপনারা কেউ যদি আজকের এই একটা লেকচারই শুনে থাকেন তাহলে সংশ্লিষ্ট বিষয়ে আগের চেয়ে কিছুটা হলেও বেশি ওয়াকিবহাল হয়ে থাকবেন।

৩। মতামতের বৈচিত্র্য
বিদ্বান ব্যক্তিদের মধ্যে সর্বদা মতপার্থক্য হয়। সবাই মিলে একটি একক মতামত (uniformity of opinion) গ্রহণ করতে হবে, এমন কোনো কথা নেই। এর ভালো একটা উদাহরণ হচ্ছে ‘ওমর সিরিজ’। ছয়জন স্কলার এই সিরিজ নিয়ে কাজ করতে চুক্তিবদ্ধ হয়েছিলেন এবং পর্বের শেষে প্রদর্শিত নামের তালিকায় তাঁদের নাম দেয়ার জন্য অনুমোদন দিয়েছিলেন। তাঁদের দুই তিনজনের সাথে আমার ব্যক্তিগত সম্পর্ক রয়েছে। আমি সত্যিই তাদেরকে শ্রদ্ধা করি।

কিন্তু বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে অন্যান্য স্কলারগণ তাদের সমালোচনা করেছেন, ‘আপনাদের সাহস তো কম নয়!’ এই ধরনের সমালোচনার প্রবল চাপে তাঁদের কেউ কেউ ‘ভুল’ স্বীকার করেন এবং ‘আমরা আসলে বুঝতে পারিনি’ – এ জাতীয় বিবৃতি দিয়ে নিজেদেরকে বিতর্ক থেকে সরিয়ে নেন।

অতএব, স্কলারদের মাঝে, বিশেষ করে রক্ষণশীল ও সংস্কারপন্হী স্কলারদের মাঝে মতানৈক্য হতেই পারে। আমি পরিষ্কারভাবে বলতে চাই – প্রতিটি অগ্রগামী চিন্তা বা উদার মতামতই যে সঠিক, তা নয়। একইভাবে প্রতিটি রক্ষণশীল মতামতই যে পশ্চাৎপদ, তাও নয়। মাঝেমধ্যে ব্যতিক্রমও হতে পারে। কখনো কখনো রক্ষণশীল মতামত তুলনামূলক ভালো হয়। এমনকি সংস্কারপন্থীদের জন্যেও তা ভালো। আবার কখনো কখনো অগ্রগামী চিন্তাই তুলনামূলক ভালো হিসেবে প্রতীয়মান হয়।

সুতরাং, প্রতিটি পরিবর্তনই ইতিবাচক, তা নয়। সংস্কারপন্হীরাও তেমনটা দাবি করছেন না। আমিও তা বলছি না। প্রতিটি বিষয়েই আলেমগণ বিচার-বিশ্লেষণ করে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবেন। এটা করতে গিয়ে তাদের মাঝে কিছু বিষয়ে মতের ভিন্নতা তৈরি হওয়াটই স্বাভাবিক। ইসলামের ইতিহাসে দেখা যায়, আলেমরা কখনোই ঐক্যবদ্ধ ছিলেন না।

আরেকটি বিষয় বলা দরকার। সেটি হলো, স্কলারগণ যেসব বিষয়ে সর্বসম্মতভাবে একমত হয়েছেন, সে সব সিদ্ধান্তের মাধ্যমেই আল্লাহ তায়ালা এই ধর্মকে টিকিয়ে রেখেছেন। কোনো বিষয়ে যদি স্কলারদের সর্বসম্মত মতামত থাকে, তাহলে তাতে সত্যিই আপনার আস্থা রাখা উচিত। আর যদি মতামতের ভিন্নতা থাকে, ভিন্নমত পোষণকারী স্কলারগণ সংখ্যায় কম হলেও আপনি যে কোনো একটা মতামত বেছে নিতে পারেন। ওমর সিরিজের ক্ষেত্রে এমনটাই ঘটেছে। ছয়জন স্কলার একে অনুমোদন দিয়েছেন। আর মূলধারার সুন্নী ফতোয়া কমিটিগুলো এর বিপরীত মতামত দিয়েছেন। তারপরেও এ সম্পর্কিত ইখতিলাফ তথা মতানৈক্যের বৈধতা রয়ে গিয়েছে। এর ফলেই চতুর্থ বিষয়টি প্রাসঙ্গিক হয়ে দাঁড়িয়েছে।

প্রকৃত আলেমের অনুসরণ করা
অন্তত ১৫-২০ বছর অধ্যয়ন করতে না চাইলে আলেম হওয়া আপনার কাজ নয়। তাহলে আপনার কাজ কী হবে? আপনার কাজ হবে এমন একজন আলেমকে বেছে নেওয়া, যার মধ্যে নিম্নোক্ত দুইটি গুণ রয়েছে –

. তিনি হবেন পূর্ণ ঐকান্তিক ও তাকওয়াসম্পন্ন। কে এ ধরনের ব্যক্তি – তা হয়তো আপনি নিশ্চিতভাবে জানতে পারবেন না, তবে উপলব্ধি করতে পারবেন। এ ধরনের ব্যক্তি আল্লাহকে ভয় করে চলেন, টাকার বিনিময়ে ফতোয়া দেন না এবং যথেষ্ট বিবেকবান হয়ে থাকেন।

. এ ধরনের ব্যক্তি ইসলামী বিষয়ে যোগ্যতাসম্পন্ন হবেন। এর অর্থ হচ্ছে তিনি আলেমদের দ্বারা প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত এবং ইসলামের পর্যাপ্ত জ্ঞানসম্পন্ন।

যোগ্য আলেম চেনার উপায়
আপনার চিকিৎসার জন্য কীভাবে ডাক্তার ঠিক করেন? শুধু যোগ্যতা থাকলেই তার কাছে আপনি চিকিৎসা নিতে যান না। বরং যে ডাক্তার আপনার কথা আগ্রহ নিয়ে শোনে, তার কাছেই আপনি যান। শরীয়াহর ক্ষেত্রেও ব্যাপারটি প্রযোজ্য। নিজে ডাক্তার না হওয়া সত্বেও আমরা কীভাবে একজন ডাক্তারকে বেছে নেই? সুবিধার কথা চিন্তা করে? নাকি কম খরচের কথা চিন্তা করে? এটা জীবন মরণের প্রশ্ন। কোন ডাক্তার কার চেয়ে বেশি টাকা নিচ্ছে, আমরা কি তা বিবেচনা করি? অবশ্যই না।

কারণ, ‘শায়খ গুগল’ থেকে ডাক্তারি শেখা কোনো ডাক্তার টাকা কম নিলেও যেমন আপনি তার কাছে যান না, তেমনিভাবে শুধু নিজের সুবিধাজনক ফতোয়ার জন্য আপনি কোনো আলেমের কাছে যেতে পারেন না। যিনি যোগ্যতাসম্পন্ন এবং আপনার সমস্যার ব্যাপারে যিনি আন্তরিক বলে আপনি মনে করেন, তেমন ডাক্তারের কাছেই তো আপনি যান। তাই নয় কি? তাহলে শরীয়াহর ক্ষেত্রে একই ব্যাপার মানতে পারবেন না কেন? এ ক্ষেত্রে তো বরং এই নীতি আরো বেশি করে মানা উচিত। সুতরাং এমন আলেমের কাছে আপনার যাওয়া উচিত, যিনি যোগ্যতাসম্পন্ন, প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত এবং খোদাভীরু বলে আপনি মনে করেন।

সাধারণ মুসলমানদের অযুহাত
আপনার এবং আমাদের সকলের কর্তব্য হচ্ছে এমন একজন মুজতাহিদ আলেম খুঁজে বের করা যিনি যথেষ্ট জানেন। একজন সাধারণ মুসলমানদের জন্য এটাই চূড়ান্ত ইজতিহাদ। এর ফলে কেয়ামতের দিন আমরা আল্লাহর কাছে এই বলে কৈফিয়ত দিতে পারবো, ‘হে আল্লাহ! আমি কোনো ফিকাহবিদ নই। তবে আমি অমুক আলেমকে অনুসরণ করেছিলাম, যিনি একে হালাল বলেছিলেন।’ আপনি যদি আন্তরিক হন এবং এমন একজন আলেমকে অনুসরণ করেন যাকে সত্যিকার অর্থেই আপনার কাছে আলেম বলে মনে হয়, তাহলে অবশ্যই আপনি মুক্তি লাভ করবেন। কারণ, তখন আপনি বলতে পারবেন, “হে আল্লাহ! আমি কোনো আলেম নই। আমি অমুক আলেমকে বিশ্বাস করেছিলাম, যিনি বলেছিলেন, ‘এইগুলো হালাল আর ওইগুলো হারাম’। আমি তার কথা অনুযায়ী আমল করেছিলাম।”

তাহলে আপনার দায়িত্ব কী? আপনার কাজ হচ্ছে ধর্মীয় বিষয়ে এমন কাউকে বেছে নেওয়া যাকে আপনি সবচেয়ে বিশ্বস্ত বলে মনে করেন। আর যদি আপনি রক্ষণশীল কিংবা সংস্কারপন্হীদের সাথে থাকেন, তাহলেও সমস্যা নেই।

প্রখ্যাত আলেমদের অবস্থান
এটি নিশ্চিত যে, মুরতাদদের মধ্যে কোনো আলেম নেই। প্রগতিবাদীদের মাঝেও কোনো আলেম নেই। আর সত্যি বলতে কি, উগ্রপন্থী বা জিহাদী দল হিসেবে পরিচিত গ্রুপগুলোর মাঝে অল্প কয়েকজন আলেম থাকলেও তারা এসব ক্যাম্পে যোগ দেয়ার পরেই বিখ্যাত হয়েছেন। সেখানে এমন একজন আলেমও নেই, যিনি এসব গ্রুপে যোগ দেয়ার আগে থেকেই বিখ্যাত ছিলেন। তারা কেউই প্রকৃত আলেম নন, তাদের পাণ্ডিত্য সর্বজন স্বীকৃত নেই। রক্ষণশীল ও সংস্কারপন্থী ধারার আলেমরাই কেবলমাত্র সর্বজন স্বীকৃত।

যথাসম্ভব কম সমালোচনা করা
আপনাদের কাছে আমার শেষ পরামর্শ হলো – অন্যদের যুক্তিখণ্ডন ও সমালোচনা যথাসম্ভব সর্বনিম্ন মাত্রায় রাখার চেষ্টা করবেন। এই অভ্যাস পুরোপুরি দূর করতে পারলে সবচেয়ে ভালো। অন্য মুসলমানরা যদি এমন কিছু করে, তাদের আলেমগণ যার বৈধতা দিয়েছেন; তাহলে এটা আল্লাহ তায়ালা ও তাদের মধ্যকার ব্যাপার। আপনি বড়জোর নতুন ধারার চিন্তাভাবনা কিংবা অন্য কোনো আলেমের সাথে পরিচয় করিয়ে দিয়ে তাদেরকে এ ব্যাপারে পড়াশোনার সুযোগ করে দিতে পারেন। ব্যস, এটুকুই আপনার দায়িত্ব। একজন সাধারণ মুসলমান হিসেবে কারো সাথে তর্কবিতর্কে জড়িয়ে পড়া আপনার উচিত হবে না। যে কোনো বিষয়েই মতামতের বৈচিত্র্য থাকতে পারে।

ফেরকার চেয়ে নিয়তই বেশি গুরুত্বপূর্ণ
কেউ যদি ইসলামের কোনো নির্দিষ্ট ধারা অনুসরণ করতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে, তাহলে তা খারাপ কিছু নয়। একান্ত আন্তরিকতার সাথে কিছুটা রক্ষণশীল কিংবা কিছুটা উদার ধারা কেউ অনুসরণ করলে এ জন্য শেষ বিচারের দিন আল্লাহ তাকে শাস্তি দেবেন না।

আন্তরিক নিয়তের সাথে কেউ যদি কোনো কিছুকে হালাল মনে করে তা মেনে চলে, তাহলে তা নিয়ে শংকার কিছু নেই। যে কোনো ফেরকা, দল বা জামায়াতের চেয়ে আল্লাহ তায়ালার ক্ষমাশীলতার পরিধি অনেক বেশি বিস্তৃত। শুধুমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভ ও রাসূলের (সা) অনুসরণ করাই যদি আপনার নিয়ত হয়ে থাকে, তাহলে কিছু ত্রুটিবিচ্যুতি হয়ে গেলেও দুনিয়া উল্টে যাবে না।

প্রকৃত ধার্মিকতা
আপনার ইবাদত, নামাজ, জাকাত – এগুলোর বিনিময়েই ইনশাআল্লাহ আল্লাহ আপনাকে ক্ষমা করবেন। আশাবাদী মনোভাব থাকতে হবে। কোনো ছোটখাটো বিষয়ে আপনার সাথে কোনো মুসলমানের মতপার্থক্য হলেই সে জাহান্নামী হয়ে যাবে, ব্যাপারটা তা নয়। এটা বিরিয়ানীর পরিবর্তে শর্মা খাওয়ার মতোই নগণ্য ব্যাপার। সত্যিকারের তাকওয়ার সাথে আল্লাহর ইবাদত করা এবং রাসূলকে (সা) সম্মান করাই প্রকৃত ধার্মিকতা।

এর মানে অবশ্য সবাই যে সমপরিমাণে সঠিক তা নয়। বরং এর মানে হচ্ছে, কারো সাথে বাকবিতণ্ডায় জড়িয়ে পড়া আপনার কাজ নয়। যারা কোনো বিষয় সম্পর্কে জানতে চান তাদের উচিত কোনো আলেমের শরণাপন্ন হওয়া। তখন আলেমগণ নিজেদের মাঝে এ ব্যাপারে আলাপ-আলোচনা করবেন।



উপসংহার

প্রিয় ভাই ও বোনেরা! শেষ করার আগে কিছু কথা বলতে চাই। নিরামিষ ভোজন তথা ভেগানিজম কিংবা মাংস খাওয়া আমাদের ইস্যু নয়। আপনার প্রাসঙ্গিক ইস্যু হচ্ছে কীভাবে একজন বৃটিশ মুসলিম হওয়া যায়। অন্যদিকে কীভাবে একজন পশ্চিমা আমেরিকান মুসলিম হওয়া যায়, তা আমার জন্যে প্রাসঙ্গিক। কিন্তু সত্যিকার অর্থেই এটা বেশ কঠিন ব্যাপার।

কচ্ছপের মতো নিজেকে গুটিয়ে রাখা
কচ্ছপ ভয় পেলে কী করে? খোলসের ভেতর নিজেকে গুটিয়ে নেয়। আমরা মনে করি এটা ভালো এবং কার্যকর। আমার বিনীত মতামত হলো, বেশিরভাগ রক্ষণশীল আন্দোলনই এ রকম। নিজেকে গুটিয়ে নেয়ার এই প্রবণতা এক ধরনের ভীতি থেকেই সৃষ্ট। কিন্তু গুটিয়ে নেয়ার এই প্রচেষ্টা প্রকৃতপক্ষে কোনো রকমে টিকে থাকার সংগ্রাম ছাড়া কিছু নয়। পরিণতিতে, আপনি সামনে এগিয়ে যেতে পারছেন না। কিন্তু এটা তো আপনার কিংবা পরবর্তী প্রজন্মের জন্যে নিরাপদ নয়, মুক্তির পথও নয়।

আপনারা জানেন, আপনাদের সংস্কৃতি বিলুপ্তির পথে, আপনার ভাষা কালের গর্ভে হারিয়ে যাচ্ছে। আমরা কয়জনইবা আমাদের পূর্বপুরুষের ভাষায় অনর্গল কথা বলতে পারি!

নতুন দৃষ্টিভঙ্গি
কোনো কিছু নতুন দৃষ্টিভঙ্গির আলোকে দেখতে কোনো সমস্যা নেই। ডমিন্যান্ট ন্যারেটিভ থেকে কিছু কিছু উপাদান গ্রহণ করাও এই নতুন দৃষ্টিভঙ্গির আওতাভুক্ত। যেমন, আমরা তাদের ভাষা গ্রহণ করেছি। আমি উর্দু বা আরবির চেয়ে ইংরেজিতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করি। আমরা সবাই জানি, এটা অন্যায় কিছু নয়।

সম্ভাব্য ক্ষেত্রে সমঝোতা
ডমিন্যান্ট ন্যারেটিভের ভাষা গ্রহণ করতে সমস্যা না থাকলে অন্যান্য উপাদান গ্রহণ করা কেন অন্যায় হবে, যেসব ব্যাপারে ইসলামে হ্যাঁ কিংবা না বলা নেই? এসব ক্ষেত্রে আমাদের কিছুটা সাহস দেখানো প্রয়োজন।

আগেও বলেছি, রক্ষণশীলদের প্রতি আমার সহানুভূতি রয়েছে। জীবনের একটা উল্লেখযোগ্য সময় তাদের সাথে কাটাতেই আমি সবচেয়ে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেছি। কিন্তু যখন থেকে আমি তরুণদের সাথে মিশতে শুরু করলাম এবং ধর্মীয় বিষয়গুলোর প্রচার ও শিক্ষকতার সাথে যুক্ত হলাম, তখন থেকে মুক্তভাবে চিন্তা করা শুরু করেছি।

খোলস ছেড়ে বেরিয়ে আসুন
পরবর্তী প্রজন্মের স্বার্থেই আমাদের খোলস ছেড়ে বেরিয়ে আসা উচিত বলে আমি মনে করি। এখনই এর উপযুক্ত সময়। আমরা হয়তো মাঝপথে হারিয়েও যেতে পারি। কারণ, আমাদের কাছে কোনো প্রতিষ্ঠিত প্যারাডাইম নেই। যখন আমার ডানে মোড় নেয়া উচিত, তখন হয়তো বামে মোড় নিয়ে ফেলবো। কিন্তু লক্ষ্য অর্জন করতে গিয়ে যদি আমি কোনো ভুল করেও ফেলি, তাহলে পেছনের লোকেরা নিশ্চয় তা দেখে থাকবে। ফলে তারা এই বিপদ হতে নিরাপদ থেকে সামনে এগিয়ে যেতে পারবে।

ব্রিটিশ ইসলাম
অনেকের মতে, আমরা ভুল পথে যাচ্ছি এবং রক্ষণশীল ধারাই সঠিক। তাদের বক্তব্য – ‘আপনারা জানেন না আপনারা কোন পথে যাচ্ছেন।’ তাদের কথার যৌক্তিকতা আছে বটে। কারণ, আমরা এখনো চূড়ান্ত গন্তব্যে পৌঁছতে পারিনি।

তবে ‘ব্রিটিশ ইসলাম’ পরিভাষাটি কোনোভাবেই ভুল নয়। আপনারা সবাই ব্রিটিশ এবং একইসাথে মুসলমান। একইসাথে ব্রিটিশ ও মুসলিম পরিচয়কে ধারণ করা অসম্ভব নয়। এতদুভয়ের মধ্যে সুসমন্বয় সম্ভব। তবে এটি কীভাবে এবং কতটুকু মাত্রায় সম্পন্ন হবে, আমরা এখন সেটি নির্ধারণ করার মূলনীতি নিয়ে আলাপ-আলোচনা করছি। এই সংলাপ অর্থবহ করার জন্যে আমরা যথেষ্ট আন্তরিক।

উত্তরাধিকার ও ঐতিহ্যই শেষ কথা নয়
প্রিয় ভাই ও বোনেরা! সর্বশেষ কথা হচ্ছে, আমরা পূর্বপুরুষদের চেয়ে ভিন্ন যুগ ও অঞ্চলে বাস করছি। আমরা ঐতিহ্যকে সম্মান করি। আমরা উপলব্ধি করি, আমরা যে ঐতিহ্যের উত্তরাধিকারী, তা সমৃদ্ধ ও সুন্দর। তারমানে সেই উত্তরাধিকার ও ঐতিহ্যকে সম্পূর্ণভাবে গ্রহণ করতে হবে, তা নয়। এ ব্যাপারগুলো নিয়ে আমাদের নতুন করে ভাবতে হবে।

আমরা তা-ই গ্রহণ করবো, যা আমাদের প্রয়োজন। আমরা সেটাই পরিবর্তন করবো, যার অনুমোদন আমাদের রয়েছে। আর আমরা তা পরিত্যাগ করবো, যা পরিত্যাজ্য। এগুলো আসলে ধারাবাহিক আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে সিদ্ধান্ত নেয়ার ব্যাপার এবং এ ধরনের আলোচনা কখনোই পুরোপুরি শেষ হয় না। বরং আলেমগণ সদাসর্বদাই এসব বিষয়ে আলোচনা চালিয়ে যাবেন।

বিভিন্ন বিতর্কিত বিষয়ে আপনারা ইউটিউবে প্রচুর কথাবার্তা ও ভিডিও পাবেন। এসব ক্ষেত্রে আপনার কাজ হচ্ছে, যে আলেমের উপর আপনার আস্থা রয়েছে, আপনি তার কথার ওপর অটল থাকবেন। আপনি যদি আন্তরিক হয়ে থাকেন, আল্লাহকেই কেবল সন্তুষ্ট করতে চান এবং এর জন্যে সর্বোচ্চ চেষ্টা করে যান; তাহলে জেনে রাখুন, মহান আল্লাহর দয়া আমাদের সবাইকে ঘিরে রয়েছে।

মহান আল্লাহ আমাদেরকে সৎপথের রোল মডেল হিসেবে গড়ে ওঠার তওফিক দান করুন। তিনি আমাদেরকে সঠিক পথে চলার নির্দেশনা দিন। তিনি আমাদেরকে জান্নাতিদের পথে চলার তওফিক দিন। আমরা যেন মুসলমান হিসেবে জীবনযাপন ও মুমিন হিসেবে মৃত্যুবরণ করতে পারি এবং মহানবী (সা) ও শহীদদের সাথে কেয়ামতের ময়দানে হাজির হতে পারি, তিনি আমাদেরকে সে তওফিক দান করুন। আসসালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহ।

আইয়ুব আলী
আইয়ুব আলী
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগে অধ্যয়নরত

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *