ধারাগুলোর বিশ্লেষণ

ধর্মত্যাগী ধারার বৈশিষ্ট্য

প্রথম ধারাটির অনুসারীরা ধর্মবিশ্বাস ত্যাগ করেছে। এদেরকে মুরতাদ বলা হয়। মুরতাদরা বলে – ‘দেখো, কোরআন কত সেকেলে একটি বই! আধুনিক যুগের জন্য এটি উপযুক্ত নয়। কোরআনে দৈহিক শাস্তির কথা বলা হয়েছে। কোরআনের আইন অত্যন্ত পশ্চাৎপদ। উত্তরাধিকার সম্পত্তিতে নারীকে পুরুষের অর্ধেক দেয়া হয়েছে… ইত্যাদি ইত্যাদি।’

ভেগানিজমের সমতুল্য আধুনিক বিষয়গুলোর তালিকা করলে দেখা যাবে এসব বিষয়ে মুরতাদদের কোনো আপত্তি নাই। এটাই হলো মুরতাদদের সমস্যা। ভেগানিজম নিজেই যে একেবারেই সাময়িক একটি মানবীয় ব্যাপার হতে পারে, এটা যে কালোত্তীর্ণ কোনো ব্যাপার নয় – সেই দিকটা তারা কখনোই বিবেচনা করে না। তারা কখনোই এ ব্যাপারে কোনো প্রশ্ন করে না।

নারী-পুরুষের সম্পর্ক নিয়ে সাম্প্রতিক আলোচনা

আমাদের সময়ের অন্যতম আলোচিত বিষয় হিসেবে নারী-পুরুষের ভূমিকা নিয়েই কথাই বলা যাক। নারী-পুরুষের ভূমিকা নিয়ে গত পঞ্চাশ বছরে – আরো সুনির্দিষ্ট করে বললে গত ত্রিশ বছরে – যত বেশি আলোচনা হয়েছে, মানবজাতির সমগ্র ইতিহাসেও তা হয়নি। সমাজে নারী-পুরুষের ভূমিকা একইরকম হবে এবং এক্ষেত্রে কোনো পার্থক্য থাকা উচিত নয় – এই ধারণাটি খুবই সাম্প্রতিককালের। স্পষ্টতই, ইসলাম এই ধারণাকে সমর্থন করে না। তাই নয় কি?

দণ্ডবিধি

একজন অপরাধীর শাস্তি কী হওয়া উচিত – এটা বর্তমান সময়ের খুব আলোচিত একটি প্রশ্ন। আইনজীবী ও আইন বিশেষজ্ঞরা এটি নিয়ে বিতর্ক করে যাচ্ছেন। কথা হচ্ছে, আপনাদের রাষ্ট্র মৃত্যুদণ্ডকে পশ্চাৎপদ প্রথা মনে করে। তাহলে এবার আমার দেশ আমেরিকার কথাই ধরুন। মাদকসহ যেসব ছোটখাটো অপরাধে আমেরিকায় মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয়, শরীয়াহ আইনেও সেগুলোর ক্ষেত্রে এত কঠোর শাস্তির বিধান নেই।

আপনারা জানেন, শরীয়াহ আইনে খুব সুনির্দিষ্ট কিছু অপরাধের জন্যেই কেবল মৃত্যুদণ্ডের বিধান রয়েছে। তাছাড়া, মৃত্যুদণ্ড একটা পশ্চাৎপদ প্রথা হওয়ার ব্যাপারে বিশ্বের সকল বিচারক সর্বসম্মতিক্রমে সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছেন, ব্যাপারটা তাও নয়।

কিন্তু মুরতাদ তথা ধর্মত্যাগীদের সমস্যা হলো তাদের কখনোই মনে হয় না যে, প্রভাবশালী ন্যারেটিভও ভুল হতে পারে। হীনমন্যতাবোধ (যা আজকাল খুবই সাধারণ ব্যাপার) কিংবা বিদ্যমান প্রভাবশালী সংস্কৃতির প্রভাবে তারা ধরেই নেয় – যা কিছু প্রভাবশালী, সেটাই সঠিক। লোকপ্রিয় ও চটকদার কথাবার্তা দ্বারা তারা এতোটাই আচ্ছন্ন যে, প্রভাবশালী ন্যারেটিভের যথার্থতা ছাড়া আর কিছুই দেখতে পায় না। তাই এ ধরনের লোকেরা ধর্মত্যাগ করে এবং এর পক্ষে যুক্তি দেয়, ‘দেখো, ইসলাম মৃত্যুদণ্ডের কথা বলে। তাই আমার পক্ষে মুসলমান থাকার কোনো উপায় নেই। ইসলাম নারী-পুরুষের মধ্যে ফিকাহগত পার্থক্যের কথা বলে।’

সমান বণ্টন নয়, বরং ন্যায়সঙ্গত বণ্টন

হ্যা, ইসলামে এমনটা আছে। উত্তরাধিকার আইন, বিবাহ আইনসহ কিছু বিষয়ে নারী-পুরুষের মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। আমরা তা অস্বীকার করি না। আপনি যদি মনেপ্রাণে বিশ্বাস করেন, নারী-পুরুষের মধ্যে কোনো পার্থক্য থাকা উচিত নয়; তাহলে ইসলাম আপনার এই আধুনিক বুঝজ্ঞানকে খণ্ডন করতে যাবে না।

এই শ্রেণীর লোকেরা প্রথম গ্রুপের অনুসারী। আমাদের সমাজে এই শ্রেণীর প্রচুর মানুষ আছে। এদের মধ্যে কেউ কেউ বিখ্যাত হয়ে গেছে। তারা বই লেখে, টেলিভিশনে সাক্ষাৎকার দেয় ইত্যাদি ইত্যাদি।

আপসকামী ধারার বৈশিষ্ট্য

এই ধারাকে আমরা আপসকামী হিসেবে অভিহিত করেছি। তারা প্রথম গ্রুপের মতো ইসলামী ঐতিহ্যকে খারিজ না করলেও তারা ইসলামকে যেভাবে চর্চা করে সেটাকে ‘আধুনিক বা প্রগতিবাদী ইসলাম’ বলা যায়। মৌলিক বৈশিষ্ট্যের দিক থেকে প্রথম দলটির মতো তাদেরও একই ধরনের সমস্যা রয়েছে। অর্থাৎ তারাও প্রভাবশালী ন্যারেটিভকে প্রতিষ্ঠিত সত্য হিসেবে মেনে নেয়, যাকে কোনো প্রশ্ন করা যাবে না।

বর্তমান সময়ের প্রেক্ষাপটে যৌনতা কিংবা একটু আগে বলা নারী-পুরুষের সম্পর্ক নিয়ে তাদের সম্ভাব্য বক্তব্য হচ্ছে, ‘চিরায়ত ঐতিহ্য ভুলে যান। নারী-পুরুষের সম্মিলিত জুমার নামাজে নারীরা ইমামতি করতে পারবে না – এটা কোরআনের কোথায় বলা আছে? বরং এ ধরনের নামাজে নারীদেরকে ইমামতি করতে আমাদের উৎসাহ প্রদান করা উচিত।’

এটা খুবই প্রগতিশীল দৃষ্টিভঙ্গি। তাই না? কিংবা তারা এমনটাও বলতে পারে – ‘নৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে সমকামী সম্পর্ক অনুমোদনযোগ্য। এ ধরনের সম্পর্ককে মসজিদগুলোর অনুমোদন দেয়া উচিত।’

সমাজের প্রভাবশালী ন্যারেটিভ যেহেতু এ জাতীয় সম্পর্ককে ইচ্ছার স্বাধীনতা হিসেবে বিবেচনা করছে, তাই এইসব আপসকামী মুসলমানরা মনে করে, ইসলামেরও উচিত এগুলোকে অনুমোদন করা। ফলে তারা বলছে, ‘এ জাতীয় সম্পর্ক নিষিদ্ধ হওয়ার ব্যাপারে কোরআনে কিছুই বলা হয়নি।’ অথচ কোরআনে এ ব্যাপারে বলা হয়েছে। তারা মিথ্যা দাবি করছে।

নিজেদের মূল্যবোধ কোরআনের উপর চাপিয়ে দেয়া

এক্ষেত্রেও তারা নিজেদের মূল্যবোধকে কোরআনের উপর চাপিয়ে দিতে চাচ্ছে। নিজেদের বিকৃত ব্যাখ্যাকে তারা নানা কৌশলে ও গায়ের জোরে কোরআনের উপর এমনভাবে চাপিয়ে দেয়, যেন তাদের কথাটা কোরআনেরই কথা। এ ধরনের লোকেরা হাদীসকে সাধারণত পুরোপুরি অস্বীকার করে থাকে। তবে কোনো নির্দিষ্ট বিষয়ের জন্যে ব্যবহৃত বিশেষ কোনো পরিভাষাকে সাধারণীকরণ করে ফেলতে তারা ঠিকই হাদীসের অপব্যবহার করে। যেসব হাদীস উদ্ধৃত করলে তাদের উদ্দেশ্য হাসিল হয়, তারা শুধু সেগুলোই ব্যবহার করে।

এই গ্রুপটির জন্য আমার তেমন সহানুভূতি নেই। এরা আসলেই হীনমন্যতায় ভুগছে। এই ধারার অনুসারীরা ইসলাম ও ইসলামের শিক্ষার প্রতি বিশ্বস্ত নয়। তারপরও তারা কেন নিজেদেরকে মুসলিম দাবি করে – তা সত্যিই বিস্ময়কর!

সত্যি বলতে কি, মুরতাদরা স্পষ্টভাবে প্রত্যাখ্যানকারী হওয়া সত্বেও প্রগতিবাদীদের চেয়ে বেশি যুক্তিবোধ ও বিচারবুদ্ধিসম্পন্ন। ব্যাপারটা নিয়ে ভেবে দেখুন। আমি বলছি না যে, মুরতাদরা তুলনামূলকভাবে ভালো। বরং আমি বলেছি, তারা তুলনামূলকভাবে যুক্তিবোধসম্পন্ন। একটা উদাহরণ দিলে ব্যাপারটা পরিষ্কার হবে। যেমন, মুরতাদ ব্যক্তি বলে থাকে, “ইসলাম ‘ক’-বিষয়কে মেনে চলতে বলে। আমি এটা পছন্দ করি না, তাই আমি মুসলমান নই।”

এক্ষেত্রে আপনি খুব সাধারণ একটা লজিক অনুসরণ করতে পারেন।

‘ক’ প্রসঙ্গে সারাবিশ্বের মুসলিম স্কলারগণ একমত অর্থাৎ তারাও এটা মেনে চলতে বলেন। দীর্ঘদিনের পরিক্রমায় এটা যখন প্রতিষ্ঠিত একটা ব্যাপার হয়ে গেছে, তখন এই প্রগতিবাদীদের কেউ বলবে, ‘এ ব্যাপারে আমার কাছে একটি ইউনিক ব্যাখ্যা আছে। আমি কোরআনের অন্তর্গত রহস্যের চাবিকাঠি পেয়ে গেছি। এ ব্যাপারে সম্পূর্ণ নতুন ফিকাহ ও নতুন ব্যাখ্যা রয়েছে।’

এ ধরনের কোনো ব্যক্তির কাজ-কারবার দেখলে মনে হয় যেন তিনি নতুন একজন নবী, যিনি নতুন বাণী নিয়ে আবির্ভূত হয়েছেন! তাই নয় কি? আসলে এসব ব্যাখ্যা দেয়ার মাধ্যমে প্রগতিবাদীরা এমনসব বিষয়ে জড়িয়ে পড়ছে, যেগুলোকে তারা আসলে অস্বীকার করে। তারা ফিকাহ ও হাদীসকে পরোয়া করে না। কোরআন যেন ডমিন্যান্ট ন্যারেটিভকে মেনে নেয় – এই হলো তাদের চাওয়া।

সত্যি কথা হলো, উপরের দুটি গ্রুপের কোনোটির প্রতি আমার কোনো প্রকার শ্রদ্ধাবোধ নাই।

রক্ষণশীল ধারার বৈশিষ্ট্য

এবার তৃতীয় অর্থাৎ রক্ষণশীল ধারা নিয়ে আলোচনা করা যাক। ভেগানিজমের গল্পে এই গ্রুপটি মাংস খাওয়াকে ইসলামের ‘বিধিবদ্ধ’ ব্যাপার ও ধর্মীয় রীতি বানিয়ে ফেলেছিল, যা আদতে ইসলাম বলেনি। এই গ্রুপে ইতিবাচক ও নেতিবাচক উভয় দিকই রয়েছে।

সোজা কথায়, এই ধারার মুসলমানরা ইসলামী আন্দোলন এবং দেশের মসজিদ লাইব্রেরির বইগুলো অনুসরণ করে থাকে। এটাই হচ্ছে বাস্তবতা। আমি তাদের প্রতি শ্রদ্ধা রেখেই এ কথা বলছি, তাদেরকে কোনোভাবে হেয় করা আমার উদ্দেশ্য নয়।

ভবিষ্যৎ নিয়ে রক্ষণশীলদের ভীতি

রক্ষণশীল ধারা সম্পর্কে সামগ্রিকভাবে এটাই হচ্ছে সত্য যে, দ্বিতীয়, তৃতীয় ও চতুর্থ প্রজন্ম ইসলাম থেকে বিচ্যুত হয়ে পড়ার ব্যাপারে তাদের মধ্যে প্রচণ্ড ভীতি কাজ করে। হ্যা, নীতিগতভাবে সবারই এ ব্যাপারে সচেতন থাকা উচিত। যাইহোক, এই ভীতির ফলে তারা কী প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করছে? ইসলাম সম্পর্কে তাদের যদ্দুর ধারণা আছে, ততটুকুকেই তারা আইনসিদ্ধ মনে করছে। ইসলামের যে ব্যাখ্যা তাদের স্ব স্ব অঞ্চলে প্রচলিত এবং যে সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলে তারা বেড়ে ওঠেছে, তাকেই তারা একমাত্র সঠিক ইসলাম মনে করে। এই ধারাটি বেশ জনপ্রিয়। কারণ ডমিন্যান্ট ন্যারেটিভে তাদেরই প্রথম আগমন ঘটেছে।

স্থানীয় সংস্কৃতি ও ধর্মীয় বিধান

বিশ্বের অনেক অঞ্চলে বিরিয়ানী খুব জনপ্রিয় খাবার। একইভাবে শর্মাও জনপ্রিয়। উভয় খাবারেই মাংস থাকায় ওইসব অঞ্চলের মুসলমানরা মাংস খেয়ে অভ্যস্ত। অতএব, তারা যখন এ দুটি খাবার এই দেশে প্রচলন করে তখন তারা ভাবে, এটা বুঝি ইসলামেরই একটা প্রতীক। এভাবে তারা কোনো মুসলিম অঞ্চলের একটা বিশেষ সাংস্কৃতিক উপাদানকে নিয়ে আসে এবং একে ইসলামের অন্যতম মূল ব্যাপার হিসেবে অনুসরণ করে।

কেউ বিরিয়ানী বা শর্মা খাওয়া নিয়ে প্রশ্ন করলে তারা এমনভাবে প্রতিক্রিয়া দেখায় যেন ইসলামকেই প্রশ্নবিদ্ধ করা হচ্ছে। এর কারণ হচ্ছে, তারা পূর্বপুরুষদের থেকে যা পেয়েছে তাকেই সত্যিকার অর্থে ইসলামের অংশ মনে করে। হ্যা, এর কিছু ভালো দিক রয়েছে বটে। কারণ, বিশ্বের প্রচুর মানুষ এ ধরনের খাবার খায়। মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশগুলোতেও সাধারণত এসব খাবার প্রচলিত। তাই যখনই আপনি এ ধরনের রক্ষণশীল কোনো ধারায় যোগ দিবেন, তখন আপনার মনে হবে যেন বিশ্বের একটা বৃহৎ অংশে এ ধরনের ইসলামই রয়েছে।

কিন্তু এই রক্ষণশীল ধারাটির প্রতিক্রিয়াশীলতা ও নিছক ভীতি থেকে উদ্ভূত কার্যকলাপের ফলে কিছু সমস্যা তৈরি হচ্ছে। তরুণ প্রজন্মের অনেকে ইসলাম পালন করাকে অনেক কঠিন মনে করছে। বিশেষত, কোরআন ও সুন্নাহ কোনো বিশেষ ধরনের খাদ্যের কথা বলেনি। অথচ এখানে ইসলামের নামে বাধ্যতামূলকভাবে এ ধরনের খাদ্যাভ্যাস প্রচলিত থাকায় তরুণ প্রজন্মের জন্য তা কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। কারণ এটা এমন ইসলাম, যা কোরআন-হাদীস থেকে উৎসারিত নয়। বরং ইউনাইটেড কিংডম অব ভেগানোপোলিসে বসবাসরত মুসলমানদের আচরিত সংস্কৃতি থেকে এর উদ্ভব হয়েছে।

বিরিয়ানী খাওয়া কোনো নির্দিষ্ট সময়, স্থান ও সংস্কৃতিতে জনপ্রিয় হয়েছিল। প্রকৃতপক্ষে, এর মধ্যে ইসলামের কিছুই নেই। কিন্তু রক্ষণশীল মুসলমানরা এই ব্যাপারটা অনুধাবন করতে পারেনি। আর তাই, ইউকেভির কোনো মুসলমান ফিশ অ্যান্ড চিপস খেলে কাফের হয়ে যাবে, ব্যাপারটা তেমন নয়। যদিও এটি ইউকেভি সংস্কৃতিতে জনপ্রিয় খাবার। বিরিয়ানী ও ফিশ অ্যান্ড চিপস – এ দুটির কোনোটিরই একটির উপর আরেকটির বিশেষ কোনো ধর্মীয় তাৎপর্য নেই।

ড্রেস কোড

বিরিয়ানী কিংবা ফিশ অ্যান্ড চিপস আমাদের ইস্যু নয়। অবশ্য কিছু ক্ষেত্রে তা হতেও পারে, তবে বাস্তবে এটা কোনো প্রধান ইস্যু নয়। সরল মনের কারো চিন্তায় আসতে পারে – কীভাবে পোশাক পরিধান করতে হবে? একজন আলেম তার নিজের জন্য কী ধরনের পোশাক পছন্দ করেন? রক্ষণশীল ধারার আলেমগণ কীভাবে পোশাক পরিধান করেন? এটা একটা ইস্যু বটে।

এক্ষেত্রে সরল সত্যটা হলো – তারা সবাই কোনো বিশেষ মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ অঞ্চল, শতাব্দী বা যুগে প্রচলিত ইসলামী ঐতিহ্য অনুযায়ী পোশাক পরিধান করেছেন। এটি ছিল তাদের ধর্মবোধের পরিচায়ক। আপনারা কি বুঝতে পারছেন, আমি কী বলতে চাচ্ছি?

সুতরাং, আপনি যদি রক্ষণশীল ধারার কোনো সমাজে যান, তাহলে আপনার সাদা শাল-কোর্তা পরিধান করা উচিত। আমার অভিজ্ঞতা থেকে বলছি, তা না করলে আপনি তাদের মসজিদে খোতবা দিতে পারবেন না। একইভাবে, রক্ষণশীল ধারার অন্য কোনো এলাকায় গেলে আপনাকে ‘সাওব’ পরিধান করতে হবে। আবার, অন্য কেউ আপনাকে ‘জালাবিয়্যাহ’ পরতে বলবে। এভাবে চলতেই থাকবে। কারণ তারা স্ব স্ব ন্যারেটিভের সাথে পুরোপুরি অভ্যস্ত। তাই ভিন্ন পোশাকে তাদের নিকট কেউ যাওয়া মাত্রই অবশ্যম্ভাবীভাবে তিনি প্রত্যাখ্যাত হবেন। শুরুতেই তারা ধরে নিবে, বিদ্বান সমাজের একজন হওয়া এই ব্যক্তির পক্ষে সম্ভব নয়। কারণ তাদের বিদ্বান সমাজে এ ধরনের কোনো ব্যক্তিকে তারা দেখেনি।

স্থানীয় সংস্কৃতির সাথে মানিয়ে নেওয়াই সুন্নতের আদর্শ

পোশাকের সুন্নত নিয়ে বাস্তবসম্মত কথা হলো, শরীয়াহর আওতার মধ্যে থেকে স্থানীয় সংস্কৃতির সাথে যতটুক সম্ভব মানিয়ে নিয়ে পোশাক পরিধান করা উচিত। এটা শুধু আমার মতামত নয়। ইমাম ইবনে কাইয়ুমসহ অনেক আলেম এই মত দিয়েছেন।

ফ্যাশন বিপ্লব করার জন্যে মোহাম্মদ (সা) আসেননি। আবু জাহেল, উতবা, উমাইয়া ইবনে খালফসহ মক্কার মুশরিকরা যে ধরনের পোশাক পরত, আল্লাহর রাসূল (সা) ঠিক সে ধরনের পোশাকই পরতেন। কারণ, তাঁর সময়ে সে ধরনের পোশাক পরিধান করাই ছিল প্রচলিত সংস্কৃতি।

অতএব, পোশাক পরিধানের ক্ষেত্রে কেউ একটি বিশেষ সংস্কৃতিকে অনুসরণ করতে পারে। বিভিন্ন সংস্কৃতিতে এমন অনেক ধরনের কাপড় রয়েছে, যেগুলো মহানবী (সা) কখনোই দেখেননি। এরমধ্যে ‘সাওব’ও রয়েছে। অথচ একে আমরা সুন্নতের খুব কাছাকাছি মনে করি। সত্যিই এটা খুব চমৎকার পোশাক। এতে জাঁকজমকপূর্ণ বিভিন্ন উপাদান ও সুন্দর বোতাম লাগানো থাকে এবং পোশাকের মাপ থাকে পুরোপুরি নিখুঁত!

তবে আপনি যদি সত্যিই সুন্নত অনুসরণ করতে চান, তাহলে খুবই খসখসে ভেড়ার চামড়া জোগাড় করে পোশাক বানান। এই পোশাক কোনোভাবেই নিখুঁত হয় না। এটা হচ্ছে সুন্নত। তবে এটা সেই সুন্নত নয়, যা আমাদের অনুসরণ করা রাসূলের (সা) কাম্য ছিল। আমাদের মহানবী (সা) কখনোই বলেননি – ‘এই ধরনের পোশাক পরিধান করো।’

ব্রিটিশ হিজাব

আরেকটি উদাহরণ হচ্ছে মুসলিম বোনদের হিজাব। ইন্দোনেশিয়া ও মালয়েশিয়ার নারীরা যুগ যুগ ধরে যেভাবে হিজাব পরিধান করে আসছেন, নাইজেরীয় বোনদের পদ্ধতি থেকে তা বেশ আলাদা। আবার নাইজেরীয় নারীদের হিজাব মরোক্কান ও সৌদি বোনদের হিজাব থেকে আলাদা। আবার আফগান বোনদের হিজাব ভিন্নরকম।

তাই আমরা যদি সৌদি আরবের হিজাবকে একমাত্র গ্রহণযোগ্য মনে করি, তাহলে তা ভুল হবে। অপেক্ষা করুন, ‘বৃটিশ হিজাবে’র যে ধারা গড়ে ওঠছে, তাতেও কোনো সমস্যা নেই। আমি আপনাদের কাছে জানতে চাই – নাইজেরীয় বোনদের জন্য নাইজেরীয় হিজাব, একইভাবে ইন্দোনেশীয়, মরোক্কান, পাকিস্তানীসহ অন্যান্য অঞ্চলের বোনদের জন্য যদি স্ব স্ব সংস্কৃতির হিজাব পরিধান হালাল হয়; তাহলে অন্য আরেকটি সাংস্কৃতিক ভূখণ্ডের মুসলমানরা ইসলামের সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলের ভেতরে থেকে যদি একই কাজ করে, সেটা হারাম হবে কেন?

এখানেই সংস্কারপন্থী এবং রক্ষণশীল ধারার মধ্যে পার্থক্য। হ্যা, রক্ষণশীল মুসলমানদের মধ্যেও অনেক ভালো কিছু রয়েছে। ইসলামের নিদর্শন বলে মনে করা হয় এমন দৃশ্যমান প্রতীক, যেমন – কোর্তা, সাওব ইত্যাদি তারা পরিধান করে। বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে এটি তাদের মুসলিম পরিচিতি তুলে ধরে। এতে তারা স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে। যদিও এটি কোনো অপরিহার্য বিষয় নয়। এটা ধর্মের এমন কোনো বিষয় নয়, যা আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (সা) সবাইকে অনুসরণ করতে বলেছেন।

সংস্কারপন্থী ধারার বিশ্লেষণ

এবার আসুন সংস্কারপন্থী ধারা নিয়ে কিছু কথা বলা যাক। সংস্কারপন্থীরা ঐতিহ্যের প্রতি সহানুভূতিশীল। বিদ্যমান প্রভাবশালী সংস্কৃতি নিয়ে তাদের কোনো ধরনের হীনমন্যতা নেই। তারা ভালো করেই জানে, ভেগানিজম নিতান্তই ক্ষণস্থায়ী ব্যাপার। বছর বিশেক আগে ভেগানিজম যেভাবে চালু হয়েছিল, এখন থেকে পনের বছর পর হয়তো এর আকর্ষণ ফুরিয়ে যাবে। আবার তারা ভেগানিজমকে পুরোপুরি বাতিলও করে না। ইউকেভি রাষ্ট্র ভেগান হওয়ার কারণেই ভেগানিজম এবং এর সকল উপাদান বাতিল বলে তারা মনে করে না। ভেগানিজমের মাঝেও ভালো কিছু থাকতে পারে। আমাদের পূর্বপুরুষরা ভেগান ছিলেন না বলেই ভেগানিজম ভুল – ব্যাপারটা তা নয়। চলুন বিষয়টির দিকে আরেকটু দৃষ্টি দেওয়া যাক।

ভেগানিজম ও ইসলামের মাঝে সমন্বয়

সংস্কারপন্থীরা মতে, আমাদের খাদ্যাভ্যাসে বেশি পরিমাণ ফলমূল ও শাকসবজি থাকা স্বাস্থ্যের জন্য উপকারী। মাংস কম খাওয়া স্বাস্থ্যের জন্য ভালো। প্রাণীদেরকে যথাযথভাবে প্রতিপালন ও যত্ম করা আমাদের কর্তব্য। আর জবেহ করার সময়ে মানবিক মূল্যবোধ বজায় রাখতে আমাদের ধর্ম নির্দেশ দেয়।

সত্যি কথা হলো, সংস্কারপন্থীরা ভেগানিজমের কিছু কিছু উপাদান গ্রহণ করে। যদিও সেগুলো তাদের পূর্বপুরুষরা বিবেচনা করেনি এবং গতানুগতিক ঐতিহ্যেও সেসব অনুপস্থিত। এসব ব্যাপারে তাদের মত হচ্ছে, ‘ভেগানিজমের ইতিবাচক সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্যগুলো গ্রহণ করতে আমাদের কোনো সমস্যা নেই।’

সাংস্কৃতিক প্রেক্ষাপট বিবেচনা

হিজাব ইস্যুটি এখানে আবারো প্রাসঙ্গিক হিসেবে বিবেচনা করা যেতে পারে। সংস্কারপন্থীরা ব্যক্তির প্রতিটি কাজকর্ম, রক্ষণশীলদের পালিত প্রতিটি রীতিনীতিকে সেগুলোর প্রেক্ষাপট অনুযায়ী বিবেচনা করে। কোর্তা পরিধান করা আপনার কাছে এত গুরুত্বপূর্ণ মনে হয় কেন? কারণ, এর একটি ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট রয়েছে। ব্রিটিশ শাসিত ভারতে ১৮৫৭ সালে সংঘটিত বিদ্রোহে সেখানকার মুসলমানরা বিভক্ত হয়ে পড়েছিল। তৎকালীন সময়ে কোনো ব্যক্তির পরিধেয় পোশাক-পরিচ্ছদের স্টাইল থেকেই বুঝা যেত তিনি ব্রিটিশ বিরোধী নাকি তাদের সমর্থক। একইভাবে, ‘সাওব’ কেন আপনার কাছে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ পোশাক? এর পেছনের কারণটা সংস্কারপন্থীরা তুলে ধরে।

এভাবে সংস্কারপন্থীরা প্রতিটি কাজকর্ম ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটের আলোকে বিচার-বিশ্লেষণের মাধ্যমে এগুলোর ইতিবাচক ও নেতিবাচক দিক তুলে ধরে। বলাবাহুল্য, সংস্কারপন্থীরা সবচেয়ে কম জনপ্রিয়। কেননা, অপরাপর সকল পক্ষই তাদের ব্যাপারে সমালোচনামুখর।

সংস্কারপন্থীদের বিরুদ্ধে অভিযোগ

রক্ষণশীলরা সংস্কারপন্থাকে সমস্যা মনে করে। কারণ ঐতিহ্যের ব্যাপারে রক্ষণশীলদের যে বুঝজ্ঞান, সেই অর্থে সংস্কারপন্থীরা ঐতিহ্যের প্রতি অনুগত নয়। ব্যাপারটা পরিষ্কার। তাই না? আপনি বিরিয়ানীর সমালোচনা করলে, তারা একে সুন্নতের সমালোচনা হিসেবে বিবেচনা করবে। আপনারা কি পয়েন্টটা ধরতে পারছেন? একই কথা সাওব কিংবা কোর্তার ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। আমি মতে, এটা সুন্নাহ বিরোধী। কেউ লন্ডনের মতো শহরে সালোয়ার-কামিজ পরিধান করাকে অধিক ইসলামী রীতি মনে করলে তা হবে সুন্নতের খেলাফ।

নিছক নিজস্ব সংস্কৃতির অংশ হিসেবে এ ধরনের পোশাক পরিধান করা নিশ্চয়ই অনুমোদনযোগ্য। তবে একে ইসলামী ব্যাপার মনে করাটা ঠিক নয়। সাওব বা কোর্তার সাথে ইসলামের কোনো সম্পর্ক নেই। এগুলোতে ইসলাম খুঁজতে যাওয়া একগুঁয়েমি ছাড়া কিছুই নয়।  

মহানবীর (সা) রীতি

আমাদের মহানবী (সা) যতটা সম্ভব স্থানীয় সংস্কৃতির সাথে খাপ খাইয়ে চলতেন। যেমন, ভিন্ন অঞ্চলের কোনো মেহমান মহানবীর (সা) সাথে দেখা করতে আসলে, হাদীসের বর্ণনা অনুযায়ী, ‘তিনি ইয়েমেনী শাল পরিধান করতেন’। কে তাকে বলেছিল বিশেষ উপলক্ষ্যে ইয়েমেনী শাল পরিধান করাই হলো সপ্তম শতাব্দীর আরবীয় রীতি? এটা কি তিনিই উদ্ভাবন করেছিলেন? নাকি কোনো অনুষ্ঠানের জন্য বিশেষ পোশাক পরিধান করতে হলে ইয়েমেনী শাল পরিধান করাই তাঁর সময়ের প্রচলিত রীতি ছিল? হ্যা, এটাই ছিল তখনকার রীতি। তখন ভালো পোশাকে সজ্জিত হওয়ার মানে ছিল চমৎকার ইয়েমেনী শাল পরিধান করা।

স্থানীয় সংস্কৃতির সাথে মানিয়ে চলা

আমাদের সময়ে ইয়েমেনী শাল নয়, বরং স্যুট পরিধান করাই হচ্ছে প্রচলিত রীতি। মহানবী (সা) যখন বিভিন্ন প্রতিনিধি দলকে দাওয়াত দিতেন, তখন তাঁর সময়ের প্রচলিত উৎকৃষ্ট পোশাকই পরিধান করতেন। তাহলে আমাদের দাওয়াতী কাজের অবস্থা কী? আমরা এসব ক্ষেত্রে কী করি?… এটাই হলো ব্যাপার।

আপনি যখন সমাজের লোকদের চেয়ে ভিন্ন পোশাক পরিধান করবেন এবং ভিন্নতর ধর্মীয় বক্তব্য নিয়ে তাদের কাছে হাজির হবেন, তখন আপনার প্রত্যাখ্যাত হওয়াটাই স্বাভাবিক। অথচ আপনি তো তাদের সাথে একই ভাষায় কথা বলেন! আল্লাহ তায়ালা কেন প্রত্যেক নবীকে সংশ্লিষ্ট অঞ্চলের স্থানীয় ভাষায় বাণী দিয়ে পাঠিয়েছিলেন? আপনি যখন একই রকম পোশাক পরিধান করবেন, তখনই কেবল আপনি ওই সমাজের একজন হিসেবে বিবেচিত হবেন।

قَالَ يَا قَوْمِ أَرَ‌أَيْتُمْ إِن كُنتُ عَلَىٰ بَيِّنَةٍ مِّن رَّ‌بِّي وَآتَانِي رَ‌حْمَةً مِّنْ عِندِهِ فَعُمِّيَتْ عَلَيْكُمْ أَنُلْزِمُكُمُوهَا وَأَنتُمْ لَهَا كَارِ‌هُونَ

সে বললো, হে আমার জাতি! তোমরা কি ভেবে দেখেছো, আমি যদি আমার মালিকের পাঠানো একটি সুস্পষ্ট প্রমাণের ওপর প্রতিষ্ঠিত থাকি, তারপর তিনি যদি আমাকে তাঁর বিশেষ রহমত দান করে থাকেন, তারপরেও যদি তা তোমাদের চোখে না পড়ে, তাহলে তোমরা অপছন্দ করা সত্বেও আমি কি তা তোমার উপর চাপিয়ে দিতে পারি? (সূরা হুদ: ২৮)

কেউ যদি সমাজের লোকদের পরিচিত হয়, তারা যদি তাকে নিজেদের ঘনিষ্ট মনে করে, এরপর সে ব্যক্তি যদি ভিন্ন একটা ধর্মীয় বক্তব্য তাদের সামনে উপস্থাপন করে, তখন তারা তার ব্যাপারে ততটা বিরোপ মনোভাব পোষণ করবে না। আমার মতে, এটিই হলো ইসলামের লক্ষ্য। তাই আমি যদি বলি, ‘অমুসলিম শ্রোতাদের সামনে বক্তব্য রাখার সময় আলেমদের উচিত আমাদের যুগের প্রচলিত মানদণ্ড অনুযায়ী পোশাক পরিধান করা।’ তখন অনেকেই সমালোচনা করে বলবে, ‘এই লোকটাকে দেখো, সে এখনো প্যান্ট-শার্ট পরে আছে। এই ব্যক্তি কোন ধরনের আলেম!’ তাই না?

টুপি পরিধান

আপনারা জানেন, আমি সাধারণত টুপি পরি না। যদিও হজ্বের পর থেকে আমার মাথা কামানো। এ ব্যাপারে আমার বিনম্র মত হচ্ছে, মাথা ঢেকে রাখা পুরোপুরিই সাংস্কৃতিক একটি ব্যাপার। হ্যা, আমাদের মহানবী (সা) মাথা ঢাকতেন; কিন্তু তিনি কখনোই কাউকে এটা করার জন্য নির্দেশ দেননি। তিনি এটা করতে বলেছেন বলে বিশুদ্ধ কোনো হাদীস নেই। এটা ছিল তখনকার একটি সামাজিক প্রথা। মুসলিম-অমুসলিম নির্বিশেষে সবাই তখন মাথা ঢাকতো। শতাধিক বছর আগে ইংল্যান্ড-আমেরিকার লোকজনও তো তাদের মাথা ঢাকতো। তাই না? লোকজনের এই অভ্যাসটা একটা সাংস্কৃতিক ব্যাপার। আপনি চাইলে মাথা ঢাকতেই পারেন। কিন্তু একে ইসলামী রীতি মনে করলে এই দেশে তা অহেতুক জটিলতা তৈরি করবে বলে আমার মনে হয়। নিজের দেশ (অর্থাৎ যেখানে এটি প্রচলিত) হলে অবশ্য ভিন্ন কথা।

সমকামী বিবাহ

রক্ষণশীলরা সংস্কারপন্থার ব্যাপারে রীতিমতো আতঙ্কগ্রস্ত। তাদের দৃষ্টিতে, সংস্কারপন্থীরাই আধুনিকতাপন্থী ও প্রগতিবাদীদের উত্থানে সহায়ক ভূমিকা পালন করছে। ‘আপনি যদি স্যুট-টাই পরাকে অনুমোদন দেন, তাহলে এরপর কী অনুমোদন দিবেন? সমকামী বিবাহ?’ রক্ষণশীলরা এভাবে স্যুট-টাই থেকে একলাফে সমকামী বিবাহ ইস্যুতে চলে যায়। এটা রক্ষণশীলদের এক ধরনের ভীতি। আপনারা হাসছেন? আল্লাহকে সাক্ষী রেখে বলছি, আমাকে এ ধরনের প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হয়েছে।

নিতান্তই সাংস্কৃতিক কিছু রীতিকে রক্ষণশীলরা হারাম বলে থাকে। আপনি যদি যুক্তি সহকারে এগুলোকে হালাল বলেন, তাহলে তাদের গড়ে তোলা ইসলাম ভেঙে পড়ে। ফলে স্বভাবতই এটা তাদের ভয়ের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। ‘ও আল্লাহ, এরপর আর কী দেখার বাকি আছে! কোত্থেকে আপনি এইসব বলছেন?’ তারা সবসময় এক অজানা ভয়ে কুঁকড়ে থাকে।

নতুন প্যারাডাইমের প্রয়োজন কেন?

রক্ষণশীলদের একটি শক্তিশালী প্যারাডাইম রয়েছে। সেটা হচ্ছে ইসলামের মূলনীতির দিকে ফিরে যাওয়া। একইভাবে প্রগতিশীলদেরও নিজস্ব শক্তিশালী প্যারাডাইম আছে। যার বৈশিষ্ট্য হচ্ছে ডমিন্যান্ট পশ্চিমা সংস্কৃতিকে গ্রহণ করা। এর বিপরীতে, সংস্কারপন্থীরা একটা নতুন প্যারাডাইম গড়ে তুলছে, যেটা অন্যদের কাছে আশংকার ব্যাপার। সংস্কারপন্থীদের হারানোর কিছু নেই। তারা নতুন স্থান, কাল ও প্রেক্ষিতকে বিবেচনায় রেখে একটি নতুন মডেল গড়ে তুলছে।

এর ফলে স্বভাবতই রক্ষণশীলরা সংস্কারপন্থীদের প্রচুর সমালোচনা করছে। প্রগতিবাদীরাও তাদের বিরোধিতা করে। কারণ তাদের দৃষ্টিতে – সংস্কারপন্থীরা যথেষ্ট প্রগতিশীল নয়, বরং তারা শেষ পর্যন্ত কোরআন-সুন্নাহর উপরই অটল থাকে।

ওমর সিরিজ নিয়ে বিতর্ক

পোশাক থেকে শুরু করে নানা বিষয়ে এতক্ষণ আমি উদাহরণ দিয়েছি। ইস্যুগুলো নিয়ে প্রশ্নোত্তর পর্বে হয়তো আমরা আরো বিস্তারিত আলোচনার সুযোগ পাবো। এখন আমি একটি সহজ উদাহরণ দেবো। রক্ষণশীলদের প্রতি শ্রদ্ধা রেখেই বলছি, তারা এই ব্যাপারটি নিয়ে ভুল বুঝেছেন বলে আমার ধারণা। আমাদের সার্কেলে গত বছর এটা বোধহয় সবচেয়ে বেশি কৌতুহলের বিষয় ছিল।

বিষয়টি হলো, ওমর ইবনে খাত্তাবের (রা) জীবনীর উপর মিডলইস্ট ব্রডকাস্টিং করপোরেশন (এমবিসি) একটি সিরিজ নির্মাণ করেছে। বিশ্বের একদল প্রাজ্ঞ আলেমের নির্দেশনা অনুসারেই ত্রিশ পর্বের এই সিরিজটি নির্মাণ করা হয়েছে। আমার জানা মতে, মধ্যপ্রাচ্যের সর্ববৃহৎ স্যাটেলাইট প্রতিষ্ঠান এমবিসি এই প্রথম কোনো বিষয়ে খ্যাতিসম্পন্ন আলেমদের সাথে যোগাযোগ করেছে। এদের মধ্যে শায়খ সালমান আল আওদা, আলী সালাবীসহ আরো বিখ্যাত আলেম ও ইতিহাসবিদগণ রয়েছেন। সীরাত ও ইতিহাস সম্পর্কে বিশেষজ্ঞ এই ব্যক্তিগণ সিরিজটির প্রতিটি সংলাপ ও ঘটনার সত্যতা যাচাই করে দেখেছেন। ওমর ইবনে খাত্তাবের (রা) জীবনী অত্যন্ত দক্ষতার সাথে ফুটিয়ে তুলতে তারা কয়েক মিলিয়ন ডলার খরচ করেছে।

তারপর সিরিজটি যখন সবার জন্য উন্মুক্ত করা হলো তখন পৃথিবীর প্রতিটি রক্ষণশীল ক্যাম্পের আলেমগণ এর বিরোধিতা করেছেন। সালাফী থেকে শুরু করে দেওবন্দী, এমনকি সুফীরা পর্যন্ত এর তীব্র সমালোচনা করেছেন। কোনো বিষয়ে আল আজহার এবং সৌদি আলেমদের একমত হওয়া বিরল ঘটনা। কিন্তু এ ব্যাপারে তারা সবাই একমত। তাদের কথা হলো, ‘না, আপনি এর চিত্রায়ণ করতে পারেন না। এটা হারাম।’

তারা হারাম বিষয়গুলোর একটি দীর্ঘ তালিকা দিয়েছেন। কিন্তু সে তালিকার অধিকাংশ বিষয়গুলোই আসলে হালাল। তবে আমি তাদের প্রতি সহানুভূতিশীল। তারা অনায়াসেই এই সমালোচনা করেছেন। তাদের কথা হচ্ছে, ‘কেউ কখনো যা করেনি, আপনি কীভাবে তা করতে পারেন? আপনি তো সাহাবীদের অনুকরণ করেছেন! তাই নয় কি?’

গঠনমূলক চলচ্চিত্র ঈমানকে মজবুত করে

এখানে উপস্থিত সবাইকে আমি চ্যালেন্জ করে বলতে পারি, ওমর সিরিজের কয়েকটা পর্ব দেখে আপনি না কেঁদে পারবেন না। এতে অবশ্যই আপনার ঈমান বৃদ্ধি পাবে। আমি একজন সীরাত বিশেষজ্ঞ, তাই আমি সিরিজটির সংলাপগুলো হৃদয়ের গভীর থেকে উপলব্ধি করেছি। সিরিজটি দেখার সময় পেছনের সংলাপগুলো বার বার উদ্ধৃত করায় আমার স্ত্রী বিরক্ত হচ্ছিল। আমার কোট করা সংলাপ শোনার চেয়ে সিরিজটি দেখে যাওয়াকেই সে পছন্দ করছিল। এটি না দেখা পর্যন্ত আপনি এ সম্পর্কিত আবেগকে ঠিক বুঝতে পারবেন না। আপনারা কি জানেন, আমিও কেঁদেছি! আমার ঈমান অনেক মজবুত হয়েছে। আপনারা কি ভাবতে পারেন, সাধারণ মুসলমানরা এই সিরিজের প্রতিটি পর্ব দেখছে! একেকটি পর্ব বেরুচ্ছে আর লোকজন সিনেমা হলের দিকে ছুটছে!

এখানে এমন কে আছেন, যিনি ‘ব্যাটমান’, ‘রিটার্ন অব দ্য ডার্ক এজেস’ কিংবা ‘লর্ড অব দ্য রিংস’ দেখেন নাই? আমার পয়েন্ট হচ্ছে সেটাই। এগুলো এখন আমাদের সংস্কৃতির অংশ হয়ে গেছে। বাস্তবতা হচ্ছে, উম্মাহর ৯৯ শতাংশ মানুষ পর্দায় আপত্তিকর কিছু না কিছু দেখছে। অথচ তারা ওমর ইবনে খাত্তাবের (রা) জীবনী পড়ছে না। এই যখন অবস্থা, তখন সংস্কারপন্থীরা এগিয়ে এসে বলে, ‘ভাইয়েরা, এই মানুষগুলোর কল্যাণের জন্যই ওমর ইবনে খাত্তাবের (রা) জীবনীর উপর একটি ধারাবাহিক মুভি তৈরি করা প্রয়োজন।’

চিত্রায়ণের মাত্রা

সংস্কারপন্থীদেরকে অবশ্যই একটি সীমারেখা মেনে কাজ করতে হবে। আমার মতে, এই সীমারেখা হলো মহানবীকে (সা) প্রত্যক্ষভাবে কোথাও চিত্রায়িত না করা। এই সীমারেখা আমরা কোনোভাবেই লঙ্ঘন করতে পারি না। এ ব্যাপারে সহীহ হাদীসে মোহাম্মদ (সা) বলেছেন, ‘শয়তান আমার চেহারা অনুকরণ করতে পারবে না।’ এই হাদিসের মর্মার্থ হলো – যে কারো জন্যই মহানবীর (সা) চেহারা অনুকরণ করা হারাম। তাই কোনো অভিনেতাই আমাদের মহানবীর (সা) চরিত্রে অভিনয় করে না। আমার মতে, এটাই হলো সীমারেখা। এই সিরিজ মুভিতে যেহেতু মাত্রা অতিক্রম করা হচ্ছে না, তাই গড়পরতায় এটা অনুমোদনযোগ্য। এটা একটা ভালো মুভি।

সময়ের প্রয়োজন

ওমর সিরিজের সবকিছুই অকাট্য, আমি তা বলছি না। আমার কথা হচ্ছে, এটা মন্দের ভালো। কারো বিন্দুমাত্র কাণ্ডজ্ঞান থাকলে সে বিষয়টি বুঝতে পারবে। তারমানে লোকজনকে তাহাজ্জুদের নামাজের পরিবর্তে ওমর সিরিজ বেছে নিতে বলা হচ্ছে না। বরং এখানে দর্শকরা সমাজপতি ‘সিটিজেন কেইন’[1] ও হজরত ওমরের (রা) মধ্য থেকে একজনকে বেছে নেবেন। আপনি কোনটা দেখবেন? কোনটা দেখা আপনার জন্য উপকারী? এখানে সেই অপশনটা দেয়া হচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে সংস্কারপন্থীদের কথা হলো, ‘দেখুন, আমাদেরকে বর্তমান যুগের কথা বিবেচনা করতে হবে। মহানবী (সা) হাসান বিন সাবিতের (রা) কবিতার প্রশংসা করেছেন। তাঁর সময়টা ছিল কাব্যের। অন্যদিকে, আমাদের সময়টা হচ্ছে মিডিয়া ও সিনেমার।’

কাব্যচর্চা প্রসঙ্গে

এক অর্থে, ইসলাম কাব্যচর্চাকে উৎসাহিত করে না। কোরআনে স্পষ্ট বলা হয়েছে,

وَالشُّعَرَ‌اءُ يَتَّبِعُهُمُ الْغَاوُونَ

 বিভ্রান্ত লোকেরাই কবিদের অনুসরণ করে। (আশ শোয়ারা: ২২৪)

সর্বদা কাব্যচর্চা ভালো কিছু নয়। কিন্তু সমাজে এর প্রচলন থাকায় গঠনমূলক কাব্যচর্চা এবং তা প্রচার করা যেতে পারে। এ বিষয়ে আল্লাহ তায়ালা বলছেন,

إِلَّا الَّذِينَ آمَنُوا وَعَمِلُوا الصَّالِحَاتِ وَذَكَرُ‌وا اللَّـهَ كَثِيرً‌ا

তবে তাদের কথা ভিন্ন, যারা ঈমান আনে, সৎকর্ম করে এবং আল্লাহকে বেশি বেশি স্মরণ করে (আশ শোয়ারা: ২২৭)

ইসলামের সাংস্কৃতিক বোধ

ইসলামকে পরিবর্তন করা সংস্কারপন্হীদের উদ্দেশ্য নয়। কিন্তু সংস্কৃতি সম্পর্কে ইসলামের বোধকে তারা গুরুত্ব দেয়। আমরা কখনোই সাহাবীদেরকে নাট্যমঞ্চ কিংবা মুভিতে চিত্রায়িত করিনি। এমন কোনো নাটক-সিনেমা করা হয়নি যেখানে আবু বকর (রা) কিংবা ওমরকে (রা) সরাসরি চিত্রায়িত করা হয়েছে। হয়েছে কি? না, হয়নি। কিন্তু কোরআন-হাদীসে কি এ ব্যাপারে সরাসরি নিষেধাজ্ঞা আছে? না, নেই।

ইতিবাচক ফলাফলের জন্যে পরিবর্তনকে গ্রহণ করার ক্ষেত্রে সংস্কারপন্হীরা বেশ উদার মানসিকতার পরিচয় দিচ্ছে। এভাবে প্রচুর উদাহরণ দেয়া যাবে, যার মধ্যে কিছু মামুলি উদাহরণও রয়েছে। আমার পরিষ্কার কথা হলো, ছোটবেলা থেকেই আমরা কিছু ব্যাপারে শুনে আসছি যে, এগুলো হচ্ছে – হারাম, হারাম, হারাম। অথচ এগুলোর কোনোটাই হারাম নয়!

বার্ষিকী পালন

এ সংক্রান্ত খুব সহজ একটা উদাহরণ হলো জন্মদিন কিংবা বিভিন্ন বার্ষিকী উদযাপন। এসবের কোনোটাই ইসলামে নিষিদ্ধ নয়। বরং ইসলাম বিভিন্ন বার্ষিকী পালনকে উৎসাহিত করে। কারণ, কাজ স্বামী-স্ত্রীর মাঝে ভালোবাসা বাড়িয়ে দেয়, এমন সবকিছুকেই ইসলাম উৎসাহ দেয়। কথা হচ্ছে, আমাদের বাপ-দাদারা বিবাহ বার্ষিকী ও জন্মদিন পালন করেনি বলেই আমাদের জন্যে তা অনৈসলামী হয়ে যাবে না। প্রকৃতিগতভাবেও এগুলোতে অনৈসলামী কোনো উপাদান নেই।

এ প্রসঙ্গে বিস্তারিত ফিকহী আলোচনা করতে আমি আগ্রহী। কারো কারো মতে, এগুলো পালন করার মাধ্যমে লোকজন বিধর্মীদের রীতি অনুকরণ করছে। এগুলো এক ধরনের ডমিন্যান্ট কালচারাল ন্যারেটিভ। তবে এটা ফিকাহর অনেকগুলো ব্যাখ্যার একটা ব্যাখ্যা মাত্র। তবে অন্যপক্ষের মতে, এই ধরনের অনুষ্ঠান উদযাপনকে ইসলাম নিষিদ্ধ করেনি। এ বিষয়ে পরবর্তীতে বিস্তারিত বলবো

হ্যাঁ, বড়দিন বা দেওয়ালি – এগুলো অন্যদের ধর্মীয় উৎসব। আমরা এসবের অনুসরণ করতে পারি না। কারণ, অন্য ধর্মাবলম্বীদের উৎসবগুলো আমাদের জন্যে হারাম। আমাদের নিজস্ব উৎসব রয়েছে। কিন্তু ব্যক্তিগত বা ঘরোয়া – এমন যে কোনো উৎসব উদযাপনের ক্ষেত্রে শরীয়াহ সুনির্দিষ্টভাবে কিছু বলেনি। এসব ক্ষেত্রে অনুষ্ঠানের কার্যকলাপ হালাল হলে অনুষ্ঠানটিও হালাল হিসেবে গণ্য হবে। বিশ্ববিদ্যালয় থেকে গ্রাজুয়েশন প্রাপ্তি উপলক্ষ্যে কেউ পার্টির আয়োজন করলে শরীয়াহর দৃষ্টিতে তা কি হারাম? না। এমনকি আপনি চাইলে কোনো বাৎসরিক অনুষ্ঠান আয়োজন করতে পারেন অথবা যে কোনো অনুষ্ঠান আয়োজন করতে পারেন। এ ধরনের কোনো উদযাপন সম্পর্কে শরীয়াহ সরাসরি হ্যাঁ-না কিছু বলে না।

একটি স্পর্শকাতর বিষয়ের পুনর্মূল্যায়ন

আরেকটি ইস্যু নিয়ে আমরা এখন কথা বলবো। এটি বেশ বিতর্কিত একটি বিষয়। তবে এই আলোচনা আমাদের মধ্যে ভাবনার খোরাক জোগাবে। আপনারা আমার সাথে একমত বা দ্বিমত যাই পোষণ করুন না কেন, চলুন আগে আলোচনাটা শুরু করা যাক। সমকামী সম্পর্কের ব্যাপারে মুসলমানদের বক্তব্য কী হওয়া উচিত? এ ব্যাপারে এখন খুব বিতর্ক চলছে।

এ প্রসঙ্গে প্রগতিবাদীদের বক্তব্য হলো – ‘কোনো সমস্যা নেই, এগিয়ে যাও। আমাদের উচিত একে অনুমোদন দেয়া।’ রক্ষণশীলরাও তাদের পূর্বপুরুষদের কাছ থেকে শোনা কথাই বলতে থাকে।

এটি করতে গিয়ে রক্ষণশীলরা নিজেরাই ব্যাপক সমস্যার মধ্যে পড়ে। এর ফলে তাদের বক্তাগণ এ দেশে নিষেধাজ্ঞারও সম্মুখীন হন। তাই না? কারণ তারা স্বভাবতই পর্যাপ্ত সহযোগিতা পায় না।

আমি মনে করি, সমকামীদের উপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা ইসলামসম্মত নয়। তারমানে, আমরা কি তাহলে সমকামী সম্পর্ককে অনুমোদন করছি? অবশ্যই নয়। তা যদি না করি, তাহলে কি দেশের সমকামীদের সাথে অপ্রীতিকর, জঘন্য ও নিষ্ঠুর আচরণ করতে হবে? না। এটা তাদের দেশ। তারা চাইলে এটা করতে পারে। আমরা নৈতিকতার জায়গা থেকে তাদেরকে অনুমোদন না দিলেও রাজনৈতিক ও আইনগত দিক থেকে এটি ভিন্ন ব্যাপার।

বিচ্যুত মুসলমানের সাথে ব্যবহারের আদব

সমকামিতা থেকে বেরিয়ে আসতে চেষ্টা করছে এমন কোনো মুসলমানের সাথে দেখা হলে অধিকাংশ রক্ষণশীল মুসলমান খুবই নির্দয় ও কঠোর আচরণ করে। এমনও বলে, ‘আমাদের মসজিদ থেকে বেরিয়ে যান, আপনাকে আমাদের কোনো প্রয়োজন নেই।’

আমি বলতে চাই, এই ব্যক্তি একজন মুসলিম। তিনি এই সম্পর্ক থেকে বের হয়ে আসার চেষ্টা করছেন, একজন ভালো মুসলমান হতে চাচ্ছেন। অথচ তিনি তো প্রগতিবাদীদের মতো নিজেকে সঠিক দাবি করছেন না। তিনি তো আর বলছেন না – ‘সমকামিতা তো হালাল। আপনি কেন আমাকে এটা হারাম বলছেন? আমি একে মসজিদে প্রকাশ্যে উদযাপনের আয়োজন করবো।’ তিনি যদি এটা না বলে থাকেন, বরং তার কথা যদি হয় এমন – ‘দেখুন, আমি এটা সহজে ছাড়তে পারছি না। তবে চেষ্টা করে যাচ্ছি।’ এভাবে তিনি যাই বলুন না কেন, তিনি যদি তার ভুল স্বীকার করে বলেন – ‘আমি জানি এটা একটা সমস্যা। আমি এই অভ্যাস থেকে বেরুতে চেষ্টা করছি।’

একজন মাদকাসক্ত ব্যক্তির – যিনি তা ছেড়ে দেওয়ার জন্যে চেষ্টা করছেন – সাথে আমরা যে রকম আচরণ করি, উপরোল্লিখিত ধরনের সমকামী মুসলিমের সাথে আমরা কেন এরচেয়ে ভিন্ন আচরণ করি? মসজিদে আগত মুসল্লীদের জনে জনে গিয়ে আপনি কি জিজ্ঞাসা করেন – ‘এই যে ভাই, আপনি কি কখনো মদপান করেছেন? আপনি কি কখনো ড্রাগস নিয়েছেন?’ অথবা, আপনি জানেন এক ব্যক্তি মদপান করে। আপনি তাকে পানশালায়ও দেখেছেন। সেই লোকটি জুমার নামাজ পড়তে এলো। আপনি কি তখন বলা শুরু করেন, ‘ভাইয়েরা, এই লোকটি স্থানীয় পানশালায় মদপান করে।’ আপনি কি এভাবে সিন ক্রিয়েট করেন? নিশ্চয় না। বরং আপনার বা আমার বলা উচিত ‘আলহামদুলিল্লাহ, লোকটি অবশেষে জুমার নামাজ আদায় করতে এসেছে।’ তাই না? সুতরাং, যে ব্যক্তি একটা সমস্যা থেকে নিজেই বেরিয়ে আসার চেষ্টা করছে, আমরা কেন তাকে বুঝতে পারি না এবং তার প্রতি সহানুভূতিশীল হতে পারি না?

গঠনমূলক দৃষ্টিভঙ্গিই কি আপসকামী মনোভাব?

আমি কি এখানে ইসলামী আইনের পরিবর্তন করেছি? না। আমি মোটেও সমকামিতাকে অনুমোদন করার কথা বলছি না। আমি বলছি না, ‘আমরা একে আইনসম্মত করে নিচ্ছি। আমরা একে উদযাপন করবো। তাই গরু-ভেড়া জবাই করে ভোজের আয়োজন করো।’ এভাবে ভেগান ইস্যুতে ফিরে যাওয়ার কথা আমি বলছি না। তবে আমি বলতে চেয়েছি, এসব লোকদের সাথে আমরা যে ধরনের আচরণ করি, তা পুনর্বিবেচনা করতে ডমিন্যান্ট ন্যারেটিভ আমাদেরকে বাধ্য করেছে। অবশ্যই বাধ্য করেছে।

ভালো আচরণ করতে অসুবিধা কি? আমার চেয়ে একটু ভিন্নতর সমস্যায় নিমজ্জিত একজন মুসলিম ভাইয়ের প্রতি আমরা কি একটু সহানুভূতিশীল হতে পারি না? এই সমস্যায় হয়তো আমি নাও পড়তে পারি, তাই বলে তার আপ্রাণ চেষ্টার প্রতি কি আমি সহানুভূতি প্রকাশ করবো না? তার সাথে কি আমার জঘন্য ও অপ্রীতিকর আচরণ করতে হবে? তার সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করতে হবে? তাকে যাচ্ছেতাই বলতে হবে? কখোনোই না। অন্য আর দশটা গোনাহগার মুসলিমের মতো তাকে আমি বড়জোর বলতে পারি, ‘ভাই, আল্লাহ সকল পাপই ক্ষমা করে দেন। মসজিদে চলুন। বেশি বেশি কোরআন পাঠ করুন। আপনি যদি এখনো এই অভ্যাস থেকে পুরোপুরি বেরিয়ে আসতে না পারেন, তাহলে তা আমাদেরকে বলার দরকার নেই। এটা আল্লাহ এবং আপনার মধ্যে গোপন রাখুন। কাউকে বলার দরকার নেই। আল্লাহর কাছে অনুশোচনা করুন এবং একজন ভালো মুসলমান হওয়ার চেষ্টা করুন।’

সহযোগিতামূলক হওয়া মানে আপসকামিতা নয়

উপরোক্ত পরামর্শগুলোই আমাদের দেওয়া উচিত। আমি কী বলতে চাইছি, আপনারা নিশ্চয় তা বুঝতে পারছেন। আমরা ইসলামী আইনকে পরিবর্তন করার কথা বলছি না। আসলে আমার বলা উচিত, ইসলামের কোনো আইনকে আমরা পরিবর্তন করছি না। বরং ইসলামী আইনের প্রচলিত ব্যাখ্যার পুনর্মূল্যায়ন করতে আমরা আগ্রহী।

মুসলমানদের এই পাঁচটি প্যারাডাইম সম্পর্কে আমি যা বলতে চেয়েছি, এতক্ষণে বোধহয় তা আপনাদের সামনে পরিষ্কার করতে পেরেছি।

সংস্কারের দিকনির্দেশনা

বক্তব্য শেষ করার আগে সংস্কারের জন্য কিছু দিকনির্দেশনা তথা ইসলামে সংস্কারের পদ্ধতি, মাত্রা ও পরিধি নিয়ে আলোচনা করা যাক। আমার মতে, ইসলামী সংস্কারের ক্ষেত্রে আমাদেরকে পাঁচটি বিষয় মাথায় রাখা উচিত।

খেলা একই শুধু মাঠ আলাদা

আমাদেরকে বুঝতে হবে, এই পাঁচটি ধারা সবসময়ই ছিল। এগুলোর কোনোটাই নতুন কিছু নয়। কোনো কোনো ইস্যু হয়তো নতুন হতে পারে। ভেগানিজম নয়, আমাদের ইস্যু হচ্ছে সমকামিতা, নারী-পুরুষের ভূমিকা ইত্যাদি। একইভাবে, সহস্র বছর আগে একটি গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু ছিল আল্লাহর সত্ত্বা ও তাঁর গুণাবলির সম্পর্ক।

এই যুগেও আপনি কি গ্রিক সংস্কৃতিকে গ্রহণ করবেন বা গ্রিক সভ্যতার ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ করবেন? কিংবা কোরআন ও সুন্নাহর বক্তব্য আক্ষরিক অর্থে গ্রহণ করবেন? এটা বোধহয় ঠিক হবে না। কারণ, ইতোমধ্যে ইস্যুর পরিবর্তন ঘটে গেছে। এই পরিবর্তনে মানুষ কীভাবে সাড়া দেয়? মানুষের চিন্তাভাবনার পরিসর বেশ সীমিতই বলতে হবে। আসল কথা হচ্ছে, খেলা আগেরটাই আছে, কিন্তু মাঠের পরিবর্তন হয়েছে। খেলার নিয়মনীতিও আগের মতোই আছে, শুধু স্থান-কাল-পাত্রের পরিবর্তন ঘটেছে।

সুতরাং, যে পাঁচটি ধারার কথা বলেছি এর কোনোটাই নতুন নয়। মহানবীর (সা) যুগ থেকে শুরু করে এখন পর্যন্ত এই ধারাগুলো ছিল এবং আছে। তবে এর মানে এই নয় যে, পাঁচটি ধারাই সঠিক। আমি অকপটে বলতে চাই, মুরতাদ ও প্রগতিবাদী ধারার প্রতি আমার কোনো শ্রদ্ধাবোধ নেই। প্রগতিবাদীদেরকে আমি হিসেবের মধ্যে ধরি না। তারা যতটা স্মার্ট হিসেবে নিজেদের দেখায়, আসলে ততটা নয়। তারা নিজেদেরকে উঁচুমানের বুদ্ধিবৃত্তিসম্পন্ন মনে করে, যদিও তারা তা নয়।

রক্ষণশীলদের প্রতি আমার যথেষ্ট শ্রদ্ধা রয়েছে। এক দশক আগে আমি নিজেও এই ধারার সাথে যুক্ত ছিলাম। আমি মনে করি এটা ইসলামের অত্যন্ত শক্তিশালী একটি ধারা। আমি এখনো মসজিদে তাদের সাথে সময় কাটাই। তাদের প্রতি আমার ভালোবাসা রয়েছে। অকৃত্রিম শ্রদ্ধা ও সহমর্মিতা নিয়েই আমি তাদেরকে বলতে চাই, আপনাদের পালিত ইসলাম আপনাদের উত্তরসুরীদের পক্ষে পালন করা হয়তো সম্ভব হবে না। প্রভাবশালী সংস্কৃতিরই অংশ অথচ গঠনমূলক – এমন কোনো উপাদানকে গ্রহণ করা অন্যায় কিছু নয়। এতে বরং আপনার পরবর্তী প্রজন্মের পক্ষে ইসলাম পালন করা সহজতর হবে।

এই হচ্ছে আমার প্রথম কথা। আমি আবারো বলছি, এই পাঁচটি ধারার বাইরেও আরো অনেক ধারা থাকতে পারে। আমি সেসব সম্ভাব্য প্যারাডাইমের কথা আলোচনা করছি না। বরং আমি সেগুলো নিয়ে কথা বলছি যেগুলো সুবিদিত।

আলেমদের দায়িত্ব

প্রতিটি ইস্যুকে কোরআন-হাদীস এবং আধুনিক ইতিহাসের আলোকে পর্যালোচনা করা আলেমদের দায়িত্ব। এটা সাধারণ মুসলমানদের কাজ নয়। আমি সবসময় বক্তব্যকে যথাসম্ভব স্পষ্ট করে তুলে ধরার চেষ্টা করি। তারপরও শ্রদ্ধেয় অনেক আলেম এই বলে সমালোচনা করেন, ‘ইয়াসির, তুমি সাধারণ মুসলমানদেরকে মুজতাহিদ হতে বলছ!’

এই অভিযোগটি মোটেও সত্য নয়। ইংরেজি ভাষায় যতটা পারা যায়, আমি ততটা পরিষ্কারভাবে তাদেরকে প্রশ্ন করতে চাই – পোশাক, জন্মদিন, ভোটাধিকার প্রয়োগসহ যে কোনো ইস্যুর পর্যালোচনা করা কাদের দায়িত্ব? সুন্নাহ নিয়ে যাদের গভীর অধ্যয়ন রয়েছে এমন অভিজ্ঞ আলেমদেরই এটা দায়িত্ব।

আমি ঠিক এই কাজটাই করছি। কোনো একটা বিষয়ে বিভিন্ন মাজহাবে যা বলা হয়েছে, আমি সেগুলো তুলে ধরি। যেন আপনারা সংশ্লিষ্ট বিষয় ভালোভাবে বুঝতে পারেন। পাশাপাশি এটাও যেন বুঝতে পারেন – মতামতের এতো বৈচিত্র্য (spectrum of opinion) কেন। এটা কোনো সাধারণ মুসলমানের দায়িত্ব নয়। দুয়েকটা লেকচার, একটা সাপ্তাহিক সেমিনার, এমনকি অনেকগুলো সাপ্তাহিক সেমিনারে অংশগ্রহণ করলেই একজন আলেম হওয়া যায় না।

সেমিনার ও লেকচারগুলো নিছক সাধারণ শিক্ষার জন্যে হলেও এগুলোর মাধ্যমে কোনো একটি বিষয় আরো ভালোভাবে হৃদয়াঙ্গম করা যায়। আমি আশা করি, আপনারা কেউ যদি আজকের এই একটা লেকচারই শুনে থাকেন তাহলে সংশ্লিষ্ট বিষয়ে আগের চেয়ে কিছুটা হলেও বেশি ওয়াকিবহাল হয়ে থাকবেন।

মতামতের বৈচিত্র্য

বিদ্বান ব্যক্তিদের মধ্যে সর্বদা মতপার্থক্য হয়। সবাই মিলে একটি একক মতামত (uniformity of opinion) গ্রহণ করতে হবে, এমন কোনো কথা নেই। এর ভালো একটা উদাহরণ হচ্ছে ‘ওমর সিরিজ’। ছয়জন স্কলার এই সিরিজ নিয়ে কাজ করতে চুক্তিবদ্ধ হয়েছিলেন এবং পর্বের শেষে প্রদর্শিত নামের তালিকায় তাঁদের নাম দেয়ার জন্য অনুমোদন দিয়েছিলেন। তাঁদের দুই তিনজনের সাথে আমার ব্যক্তিগত সম্পর্ক রয়েছে। আমি সত্যিই তাদেরকে শ্রদ্ধা করি।

কিন্তু বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে অন্যান্য স্কলারগণ তাদের সমালোচনা করেছেন, ‘আপনাদের সাহস তো কম নয়!’ এই ধরনের সমালোচনার প্রবল চাপে তাঁদের কেউ কেউ ‘ভুল’ স্বীকার করেন এবং ‘আমরা আসলে বুঝতে পারিনি’ – এ জাতীয় বিবৃতি দিয়ে নিজেদেরকে বিতর্ক থেকে সরিয়ে নেন।

অতএব, স্কলারদের মাঝে, বিশেষ করে রক্ষণশীল ও সংস্কারপন্হী স্কলারদের মাঝে মতানৈক্য হতেই পারে। আমি পরিষ্কারভাবে বলতে চাই – প্রতিটি অগ্রগামী চিন্তা বা উদার মতামতই যে সঠিক, তা নয়। একইভাবে প্রতিটি রক্ষণশীল মতামতই যে পশ্চাৎপদ, তাও নয়। মাঝেমধ্যে ব্যতিক্রমও হতে পারে। কখনো কখনো রক্ষণশীল মতামত তুলনামূলক ভালো হয়। এমনকি সংস্কারপন্থীদের জন্যেও তা ভালো। আবার কখনো কখনো অগ্রগামী চিন্তাই তুলনামূলক ভালো হিসেবে প্রতীয়মান হয়।

সুতরাং, প্রতিটি পরিবর্তনই ইতিবাচক, তা নয়। সংস্কারপন্হীরাও তেমনটা দাবি করছেন না। আমিও তা বলছি না। প্রতিটি বিষয়েই আলেমগণ বিচার-বিশ্লেষণ করে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবেন। এটা করতে গিয়ে তাদের মাঝে কিছু বিষয়ে মতের ভিন্নতা তৈরি হওয়াটই স্বাভাবিক। ইসলামের ইতিহাসে দেখা যায়, আলেমরা কখনোই ঐক্যবদ্ধ ছিলেন না।

আরেকটি বিষয় বলা দরকার। সেটি হলো, স্কলারগণ যেসব বিষয়ে সর্বসম্মতভাবে একমত হয়েছেন, সে সব সিদ্ধান্তের মাধ্যমেই আল্লাহ তায়ালা এই ধর্মকে টিকিয়ে রেখেছেন। কোনো বিষয়ে যদি স্কলারদের সর্বসম্মত মতামত থাকে, তাহলে তাতে সত্যিই আপনার আস্থা রাখা উচিত। আর যদি মতামতের ভিন্নতা থাকে, ভিন্নমত পোষণকারী স্কলারগণ সংখ্যায় কম হলেও আপনি যে কোনো একটা মতামত বেছে নিতে পারেন। ওমর সিরিজের ক্ষেত্রে এমনটাই ঘটেছে। ছয়জন স্কলার একে অনুমোদন দিয়েছেন। আর মূলধারার সুন্নী ফতোয়া কমিটিগুলো এর বিপরীত মতামত দিয়েছেন। তারপরেও এ সম্পর্কিত ইখতিলাফ তথা মতানৈক্যের বৈধতা রয়ে গিয়েছে। এর ফলেই চতুর্থ বিষয়টি প্রাসঙ্গিক হয়ে দাঁড়িয়েছে।

প্রকৃত আলেমের অনুসরণ করা

অন্তত ১৫-২০ বছর অধ্যয়ন করতে না চাইলে আলেম হওয়া আপনার কাজ নয়। তাহলে আপনার কাজ কী হবে? আপনার কাজ হবে এমন একজন আলেমকে বেছে নেওয়া, যার মধ্যে নিম্নোক্ত দুইটি গুণ রয়েছে –

. তিনি হবেন পূর্ণ ঐকান্তিক ও তাকওয়াসম্পন্ন। কে এ ধরনের ব্যক্তি – তা হয়তো আপনি নিশ্চিতভাবে জানতে পারবেন না, তবে উপলব্ধি করতে পারবেন। এ ধরনের ব্যক্তি আল্লাহকে ভয় করে চলেন, টাকার বিনিময়ে ফতোয়া দেন না এবং যথেষ্ট বিবেকবান হয়ে থাকেন।

. এ ধরনের ব্যক্তি ইসলামী বিষয়ে যোগ্যতাসম্পন্ন হবেন। এর অর্থ হচ্ছে তিনি আলেমদের দ্বারা প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত এবং ইসলামের পর্যাপ্ত জ্ঞানসম্পন্ন।

যোগ্য আলেম চেনার উপায়

আপনার চিকিৎসার জন্য কীভাবে ডাক্তার ঠিক করেন? শুধু যোগ্যতা থাকলেই তার কাছে আপনি চিকিৎসা নিতে যান না। বরং যে ডাক্তার আপনার কথা আগ্রহ নিয়ে শোনে, তার কাছেই আপনি যান। শরীয়াহর ক্ষেত্রেও ব্যাপারটি প্রযোজ্য। নিজে ডাক্তার না হওয়া সত্বেও আমরা কীভাবে একজন ডাক্তারকে বেছে নেই? সুবিধার কথা চিন্তা করে? নাকি কম খরচের কথা চিন্তা করে? এটা জীবন মরণের প্রশ্ন। কোন ডাক্তার কার চেয়ে বেশি টাকা নিচ্ছে, আমরা কি তা বিবেচনা করি? অবশ্যই না।

কারণ, ‘শায়খ গুগল’ থেকে ডাক্তারি শেখা কোনো ডাক্তার টাকা কম নিলেও যেমন আপনি তার কাছে যান না, তেমনিভাবে শুধু নিজের সুবিধাজনক ফতোয়ার জন্য আপনি কোনো আলেমের কাছে যেতে পারেন না। যিনি যোগ্যতাসম্পন্ন এবং আপনার সমস্যার ব্যাপারে যিনি আন্তরিক বলে আপনি মনে করেন, তেমন ডাক্তারের কাছেই তো আপনি যান। তাই নয় কি? তাহলে শরীয়াহর ক্ষেত্রে একই ব্যাপার মানতে পারবেন না কেন? এ ক্ষেত্রে তো বরং এই নীতি আরো বেশি করে মানা উচিত। সুতরাং এমন আলেমের কাছে আপনার যাওয়া উচিত, যিনি যোগ্যতাসম্পন্ন, প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত এবং খোদাভীরু বলে আপনি মনে করেন।

সাধারণ মুসলমানদের অযুহাত

আপনার এবং আমাদের সকলের কর্তব্য হচ্ছে এমন একজন মুজতাহিদ আলেম খুঁজে বের করা যিনি যথেষ্ট জানেন। একজন সাধারণ মুসলমানদের জন্য এটাই চূড়ান্ত ইজতিহাদ। এর ফলে কেয়ামতের দিন আমরা আল্লাহর কাছে এই বলে কৈফিয়ত দিতে পারবো, ‘হে আল্লাহ! আমি কোনো ফিকাহবিদ নই। তবে আমি অমুক আলেমকে অনুসরণ করেছিলাম, যিনি একে হালাল বলেছিলেন।’ আপনি যদি আন্তরিক হন এবং এমন একজন আলেমকে অনুসরণ করেন যাকে সত্যিকার অর্থেই আপনার কাছে আলেম বলে মনে হয়, তাহলে অবশ্যই আপনি মুক্তি লাভ করবেন। কারণ, তখন আপনি বলতে পারবেন, “হে আল্লাহ! আমি কোনো আলেম নই। আমি অমুক আলেমকে বিশ্বাস করেছিলাম, যিনি বলেছিলেন, ‘এইগুলো হালাল আর ওইগুলো হারাম’। আমি তার কথা অনুযায়ী আমল করেছিলাম।”

তাহলে আপনার দায়িত্ব কী? আপনার কাজ হচ্ছে ধর্মীয় বিষয়ে এমন কাউকে বেছে নেওয়া যাকে আপনি সবচেয়ে বিশ্বস্ত বলে মনে করেন। আর যদি আপনি রক্ষণশীল কিংবা সংস্কারপন্হীদের সাথে থাকেন, তাহলেও সমস্যা নেই।

প্রখ্যাত আলেমদের অবস্থান

এটি নিশ্চিত যে, মুরতাদদের মধ্যে কোনো আলেম নেই। প্রগতিবাদীদের মাঝেও কোনো আলেম নেই। আর সত্যি বলতে কি, উগ্রপন্থী বা জিহাদী দল হিসেবে পরিচিত গ্রুপগুলোর মাঝে অল্প কয়েকজন আলেম থাকলেও তারা এসব ক্যাম্পে যোগ দেয়ার পরেই বিখ্যাত হয়েছেন। সেখানে এমন একজন আলেমও নেই, যিনি এসব গ্রুপে যোগ দেয়ার আগে থেকেই বিখ্যাত ছিলেন। তারা কেউই প্রকৃত আলেম নন, তাদের পাণ্ডিত্য সর্বজন স্বীকৃত নেই। রক্ষণশীল ও সংস্কারপন্থী ধারার আলেমরাই কেবলমাত্র সর্বজন স্বীকৃত।

যথাসম্ভব কম সমালোচনা করা

আপনাদের কাছে আমার শেষ পরামর্শ হলো – অন্যদের যুক্তিখণ্ডন ও সমালোচনা যথাসম্ভব সর্বনিম্ন মাত্রায় রাখার চেষ্টা করবেন। এই অভ্যাস পুরোপুরি দূর করতে পারলে সবচেয়ে ভালো। অন্য মুসলমানরা যদি এমন কিছু করে, তাদের আলেমগণ যার বৈধতা দিয়েছেন; তাহলে এটা আল্লাহ তায়ালা ও তাদের মধ্যকার ব্যাপার। আপনি বড়জোর নতুন ধারার চিন্তাভাবনা কিংবা অন্য কোনো আলেমের সাথে পরিচয় করিয়ে দিয়ে তাদেরকে এ ব্যাপারে পড়াশোনার সুযোগ করে দিতে পারেন। ব্যস, এটুকুই আপনার দায়িত্ব। একজন সাধারণ মুসলমান হিসেবে কারো সাথে তর্কবিতর্কে জড়িয়ে পড়া আপনার উচিত হবে না। যে কোনো বিষয়েই মতামতের বৈচিত্র্য থাকতে পারে।

ফেরকার চেয়ে নিয়তই বেশি গুরুত্বপূর্ণ

কেউ যদি ইসলামের কোনো নির্দিষ্ট ধারা অনুসরণ করতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে, তাহলে তা খারাপ কিছু নয়। একান্ত আন্তরিকতার সাথে কিছুটা রক্ষণশীল কিংবা কিছুটা উদার ধারা কেউ অনুসরণ করলে এ জন্য শেষ বিচারের দিন আল্লাহ তাকে শাস্তি দেবেন না।

আন্তরিক নিয়তের সাথে কেউ যদি কোনো কিছুকে হালাল মনে করে তা মেনে চলে, তাহলে তা নিয়ে শংকার কিছু নেই। যে কোনো ফেরকা, দল বা জামায়াতের চেয়ে আল্লাহ তায়ালার ক্ষমাশীলতার পরিধি অনেক বেশি বিস্তৃত। শুধুমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভ ও রাসূলের (সা) অনুসরণ করাই যদি আপনার নিয়ত হয়ে থাকে, তাহলে কিছু ত্রুটিবিচ্যুতি হয়ে গেলেও দুনিয়া উল্টে যাবে না।

প্রকৃত ধার্মিকতা

আপনার ইবাদত, নামাজ, জাকাত – এগুলোর বিনিময়েই ইনশাআল্লাহ আল্লাহ আপনাকে ক্ষমা করবেন। আশাবাদী মনোভাব থাকতে হবে। কোনো ছোটখাটো বিষয়ে আপনার সাথে কোনো মুসলমানের মতপার্থক্য হলেই সে জাহান্নামী হয়ে যাবে, ব্যাপারটা তা নয়। এটা বিরিয়ানীর পরিবর্তে শর্মা খাওয়ার মতোই নগণ্য ব্যাপার। সত্যিকারের তাকওয়ার সাথে আল্লাহর ইবাদত করা এবং রাসূলকে (সা) সম্মান করাই প্রকৃত ধার্মিকতা।

এর মানে অবশ্য সবাই যে সমপরিমাণে সঠিক তা নয়। বরং এর মানে হচ্ছে, কারো সাথে বাকবিতণ্ডায় জড়িয়ে পড়া আপনার কাজ নয়। যারা কোনো বিষয় সম্পর্কে জানতে চান তাদের উচিত কোনো আলেমের শরণাপন্ন হওয়া। তখন আলেমগণ নিজেদের মাঝে এ ব্যাপারে আলাপ-আলোচনা করবেন।

উপসংহার

প্রিয় ভাই ও বোনেরা! শেষ করার আগে কিছু কথা বলতে চাই। নিরামিষ ভোজন তথা ভেগানিজম কিংবা মাংস খাওয়া আমাদের ইস্যু নয়। আপনার প্রাসঙ্গিক ইস্যু হচ্ছে কীভাবে একজন বৃটিশ মুসলিম হওয়া যায়। অন্যদিকে কীভাবে একজন পশ্চিমা আমেরিকান মুসলিম হওয়া যায়, তা আমার জন্যে প্রাসঙ্গিক। কিন্তু সত্যিকার অর্থেই এটা বেশ কঠিন ব্যাপার।

কচ্ছপের মতো নিজেকে গুটিয়ে রাখা

কচ্ছপ ভয় পেলে কী করে? খোলসের ভেতর নিজেকে গুটিয়ে নেয়। আমরা মনে করি এটা ভালো এবং কার্যকর। আমার বিনীত মতামত হলো, বেশিরভাগ রক্ষণশীল আন্দোলনই এ রকম। নিজেকে গুটিয়ে নেয়ার এই প্রবণতা এক ধরনের ভীতি থেকেই সৃষ্ট। কিন্তু গুটিয়ে নেয়ার এই প্রচেষ্টা প্রকৃতপক্ষে কোনো রকমে টিকে থাকার সংগ্রাম ছাড়া কিছু নয়। পরিণতিতে, আপনি সামনে এগিয়ে যেতে পারছেন না। কিন্তু এটা তো আপনার কিংবা পরবর্তী প্রজন্মের জন্যে নিরাপদ নয়, মুক্তির পথও নয়।

আপনারা জানেন, আপনাদের সংস্কৃতি বিলুপ্তির পথে, আপনার ভাষা কালের গর্ভে হারিয়ে যাচ্ছে। আমরা কয়জনইবা আমাদের পূর্বপুরুষের ভাষায় অনর্গল কথা বলতে পারি! 

নতুন দৃষ্টিভঙ্গি

কোনো কিছু নতুন দৃষ্টিভঙ্গির আলোকে দেখতে কোনো সমস্যা নেই। ডমিন্যান্ট ন্যারেটিভ থেকে কিছু কিছু উপাদান গ্রহণ করাও এই নতুন দৃষ্টিভঙ্গির আওতাভুক্ত। যেমন, আমরা তাদের ভাষা গ্রহণ করেছি। আমি উর্দু বা আরবির চেয়ে ইংরেজিতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করি। আমরা সবাই জানি, এটা অন্যায় কিছু নয়।

সম্ভাব্য ক্ষেত্রে সমঝোতা

ডমিন্যান্ট ন্যারেটিভের ভাষা গ্রহণ করতে সমস্যা না থাকলে অন্যান্য উপাদান গ্রহণ করা কেন অন্যায় হবে, যেসব ব্যাপারে ইসলামে হ্যাঁ কিংবা না বলা নেই? এসব ক্ষেত্রে আমাদের কিছুটা সাহস দেখানো প্রয়োজন।

আগেও বলেছি, রক্ষণশীলদের প্রতি আমার সহানুভূতি রয়েছে। জীবনের একটা উল্লেখযোগ্য সময় তাদের সাথে কাটাতেই আমি সবচেয়ে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেছি। কিন্তু যখন থেকে আমি তরুণদের সাথে মিশতে শুরু করলাম এবং ধর্মীয় বিষয়গুলোর প্রচার ও শিক্ষকতার সাথে যুক্ত হলাম, তখন থেকে মুক্তভাবে চিন্তা করা শুরু করেছি।

খোলস ছেড়ে বেরিয়ে আসুন

পরবর্তী প্রজন্মের স্বার্থেই আমাদের খোলস ছেড়ে বেরিয়ে আসা উচিত বলে আমি মনে করি। এখনই এর উপযুক্ত সময়। আমরা হয়তো মাঝপথে হারিয়েও যেতে পারি। কারণ, আমাদের কাছে কোনো প্রতিষ্ঠিত প্যারাডাইম নেই। যখন আমার ডানে মোড় নেয়া উচিত, তখন হয়তো বামে মোড় নিয়ে ফেলবো। কিন্তু লক্ষ্য অর্জন করতে গিয়ে যদি আমি কোনো ভুল করেও ফেলি, তাহলে পেছনের লোকেরা নিশ্চয় তা দেখে থাকবে। ফলে তারা এই বিপদ হতে নিরাপদ থেকে সামনে এগিয়ে যেতে পারবে।

ব্রিটিশ ইসলাম

অনেকের মতে, আমরা ভুল পথে যাচ্ছি এবং রক্ষণশীল ধারাই সঠিক। তাদের বক্তব্য – ‘আপনারা জানেন না আপনারা কোন পথে যাচ্ছেন।’ তাদের কথার যৌক্তিকতা আছে বটে। কারণ, আমরা এখনো চূড়ান্ত গন্তব্যে পৌঁছতে পারিনি।

তবে ‘ব্রিটিশ ইসলাম’ পরিভাষাটি কোনোভাবেই ভুল নয়। আপনারা সবাই ব্রিটিশ এবং একইসাথে মুসলমান। একইসাথে ব্রিটিশ ও মুসলিম পরিচয়কে ধারণ করা অসম্ভব নয়। এতদুভয়ের মধ্যে সুসমন্বয় সম্ভব। তবে এটি কীভাবে এবং কতটুকু মাত্রায় সম্পন্ন হবে, আমরা এখন সেটি নির্ধারণ করার মূলনীতি নিয়ে আলাপ-আলোচনা করছি। এই সংলাপ অর্থবহ করার জন্যে আমরা যথেষ্ট আন্তরিক।

উত্তরাধিকার ও ঐতিহ্যই শেষ কথা নয়

প্রিয় ভাই ও বোনেরা! সর্বশেষ কথা হচ্ছে, আমরা পূর্বপুরুষদের চেয়ে ভিন্ন যুগ ও অঞ্চলে বাস করছি। আমরা ঐতিহ্যকে সম্মান করি। আমরা উপলব্ধি করি, আমরা যে ঐতিহ্যের উত্তরাধিকারী, তা সমৃদ্ধ ও সুন্দর। তারমানে সেই উত্তরাধিকার ও ঐতিহ্যকে সম্পূর্ণভাবে গ্রহণ করতে হবে, তা নয়। এ ব্যাপারগুলো নিয়ে আমাদের নতুন করে ভাবতে হবে।

আমরা তা-ই গ্রহণ করবো, যা আমাদের প্রয়োজন। আমরা সেটাই পরিবর্তন করবো, যার অনুমোদন আমাদের রয়েছে। আর আমরা তা পরিত্যাগ করবো, যা পরিত্যাজ্য। এগুলো আসলে ধারাবাহিক আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে সিদ্ধান্ত নেয়ার ব্যাপার এবং এ ধরনের আলোচনা কখনোই পুরোপুরি শেষ হয় না। বরং আলেমগণ সদাসর্বদাই এসব বিষয়ে আলোচনা চালিয়ে যাবেন।

বিভিন্ন বিতর্কিত বিষয়ে আপনারা ইউটিউবে প্রচুর কথাবার্তা ও ভিডিও পাবেন। এসব ক্ষেত্রে আপনার কাজ হচ্ছে, যে আলেমের উপর আপনার আস্থা রয়েছে, আপনি তার কথার ওপর অটল থাকবেন। আপনি যদি আন্তরিক হয়ে থাকেন, আল্লাহকেই কেবল সন্তুষ্ট করতে চান এবং এর জন্যে সর্বোচ্চ চেষ্টা করে যান; তাহলে জেনে রাখুন, মহান আল্লাহর দয়া আমাদের সবাইকে ঘিরে রয়েছে।

মহান আল্লাহ আমাদেরকে সৎপথের রোল মডেল হিসেবে গড়ে ওঠার তওফিক দান করুন। তিনি আমাদেরকে সঠিক পথে চলার নির্দেশনা দিন। তিনি আমাদেরকে জান্নাতিদের পথে চলার তওফিক দিন। আমরা যেন মুসলমান হিসেবে জীবনযাপন ও মুমিন হিসেবে মৃত্যুবরণ করতে পারি এবং মহানবী (সা) ও শহীদদের সাথে কেয়ামতের ময়দানে হাজির হতে পারি, তিনি আমাদেরকে সে তওফিক দান করুন। আসসালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহ।

[মূল: ইয়াসির ক্বাদী, অনুবাদ: আইয়ুব আলী]

নোট:

[1] ১৯৪১ সালে নির্মিত জনপ্রিয় একটি আমেরিকান ড্রামা মুভি। যেখানে সিটিজেন কেইন একজন সমাজপতি।

*****

প্রথম অংশ পড়ুন | প্রশ্নোত্তর পর্ব

ইয়াসির ক্বাদী
ইয়াসির ক্বাদী একজন প্রভাবশালী আমেরিকান স্কলার ও জনপ্রিয় বক্তা। তিনি হিউস্টন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে বিএসসি ডিগ্রি লাভ করেন। তারপর মদীনা বিশ্ববিদ্যালয় হাদীস শাস্ত্রে বিএ এবং ধর্মতত্ত্বের উপর মাস্টার্স ডিগ্রি সম্পন্ন করেন। তারপর ২০০৫ সালে আমেরিকায় ফিরে গিয়ে ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মাস্টার্স ও এমফিল করার পর ইসলামিক স্টাডিজের উপর পিএইচডি করেন। কর্মজীবনে তিনি ইসলামিক স্টাডিজের উপর অগ্রসর পড়াশোনার জন্য উত্তর আমেরিকার সবচেয়ে বড় প্রতিষ্ঠান আল-মাগরিব ইনস্টিটিউটের অ্যাকাডেমিক অ্যাফেয়ার্সের ডিন। পাশাপাশি টিনেসি রাজ্যের মেমফিসে অবস্থিত রডস কলেজের রিলিজিয়াস স্টাডিজের অধ্যাপক হিসেবে কর্মরত।

আপনার মন্তব্য লিখুন

দয়া করে আপনার মন্তব্য লিখুন!
দয়া করে এখানে আপনার নাম লিখুন