মঙ্গলবার, নভেম্বর ২১, ২০১৭
হোম > লেকচার অনুবাদ > ইসলামী চিন্তার সংস্কার: বিচ্যুতি, প্রগতি, নাকি সময়ের দাবি? (পর্ব ৪)

ইসলামী চিন্তার সংস্কার: বিচ্যুতি, প্রগতি, নাকি সময়ের দাবি? (পর্ব ৪)

এডিটর’স নোট:

ইসলামী চিন্তার সংস্কারের প্রসঙ্গ আসলে প্রায়শই একটা প্রশ্ন উত্থাপিত হয় – সংস্কারের ক্ষেত্রে কোন বিষয়গুলো বিবেচনাযোগ্য, আর কোনগুলো অপরিবর্তনীয়? এক্ষেত্রে অতি উদার কেউ কেউ শরীয়াহর খোলনলচে পাল্টে ফেলতে চান, আবার অতি রক্ষণশীল কেউ কেউ মনে করেন ইসলামে সংস্কারের কোনো ধরনের সুযোগ নেই। এই দুই প্রান্তিক অবস্থানের বাইরে সঠিক পথ কী হতে পারে?

২০১৪ সালের নভেম্বরে লন্ডনে প্রদত্ত দীর্ঘ দেড় ঘণ্টার এক বক্তৃতায় শায়খ ড. ইয়াসির ক্বাদী এ ব্যাপারে গভীর পাণ্ডিত্যপূর্ণ আলোচনা করেছেন। একটি গল্পের আশ্রয় নিয়ে পুরো বিষয়টিকে তিনি চমৎকারভাবে উপস্থাপন করেছেন। সিএসসিএস-এর পাঠকদের জন্যে বক্তৃতাটি ধারাবাহিকভাবে অনুবাদ করা হচ্ছে। অনুবাদ করেছেন আইয়ুব আলী


বক্তৃতা পর্ব: পর্ব ১, পর্ব ২, পর্ব ৩, পর্ব ৪, পর্ব ৫,পর্ব ৬ ||| প্রশ্নোত্তর পর্ব: পর্ব ১, পর্ব ২, পর্ব ৩


পাঁচটি ধারার বিশ্লেষণ

ধর্মত্যাগী ধারার বৈশিষ্ট্য

প্রথম ধারাটির অনুসারীরা ধর্মবিশ্বাস ত্যাগ করেছে। এদেরকে মুরতাদ বলা হয়। মুরতাদরা বলে – ‘দেখো, কোরআন কত সেকেলে একটি বই! আধুনিক যুগের জন্য এটি উপযুক্ত নয়। কোরআনে দৈহিক শাস্তির কথা বলা হয়েছে। কোরআনের আইন অত্যন্ত পশ্চাৎপদ। উত্তরাধিকার সম্পত্তিতে নারীকে পুরুষের অর্ধেক দেয়া হয়েছে… ইত্যাদি ইত্যাদি।’

ভেগানিজমের সমতুল্য আধুনিক বিষয়গুলোর তালিকা করলে দেখা যাবে এসব বিষয়ে মুরতাদদের কোনো আপত্তি নাই। এটাই হলো মুরতাদদের সমস্যা। ভেগানিজম নিজেই যে একেবারেই সাময়িক একটি মানবীয় ব্যাপার হতে পারে, এটা যে কালোত্তীর্ণ কোনো ব্যাপার নয় – সেই দিকটা তারা কখনোই বিবেচনা করে না। তারা কখনোই এ ব্যাপারে কোনো প্রশ্ন করে না।

নারী-পুরুষের সম্পর্ক নিয়ে সাম্প্রতিক আলোচনা
আমাদের সময়ের অন্যতম আলোচিত বিষয় হিসেবে নারী-পুরুষের ভূমিকা নিয়েই কথাই বলা যাক। নারী-পুরুষের ভূমিকা নিয়ে গত পঞ্চাশ বছরে – আরো সুনির্দিষ্ট করে বললে গত ত্রিশ বছরে – যত বেশি আলোচনা হয়েছে, মানবজাতির সমগ্র ইতিহাসেও তা হয়নি। সমাজে নারী-পুরুষের ভূমিকা একইরকম হবে এবং এক্ষেত্রে কোনো পার্থক্য থাকা উচিত নয় – এই ধারণাটি খুবই সাম্প্রতিককালের। স্পষ্টতই, ইসলাম এই ধারণাকে সমর্থন করে না। তাই নয় কি?

দণ্ডবিধি
একজন অপরাধীর শাস্তি কী হওয়া উচিত – এটা বর্তমান সময়ের খুব আলোচিত একটি প্রশ্ন। আইনজীবী ও আইন বিশেষজ্ঞরা এটি নিয়ে বিতর্ক করে যাচ্ছেন। কথা হচ্ছে, আপনাদের রাষ্ট্র মৃত্যুদণ্ডকে পশ্চাৎপদ প্রথা মনে করে। তাহলে এবার আমার দেশ আমেরিকার কথাই ধরুন। মাদকসহ যেসব ছোটখাটো অপরাধে আমেরিকায় মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয়, শরীয়াহ আইনেও সেগুলোর ক্ষেত্রে এত কঠোর শাস্তির বিধান নেই।

আপনারা জানেন, শরীয়াহ আইনে খুব সুনির্দিষ্ট কিছু অপরাধের জন্যেই কেবল মৃত্যুদণ্ডের বিধান রয়েছে। তাছাড়া, মৃত্যুদণ্ড একটা পশ্চাৎপদ প্রথা হওয়ার ব্যাপারে বিশ্বের সকল বিচারক সর্বসম্মতিক্রমে সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছেন, ব্যাপারটা তাও নয়।

কিন্তু মুরতাদ তথা ধর্মত্যাগীদের সমস্যা হলো তাদের কখনোই মনে হয় না যে, প্রভাবশালী ন্যারেটিভও ভুল হতে পারে। হীনমন্যতাবোধ (যা আজকাল খুবই সাধারণ ব্যাপার) কিংবা বিদ্যমান প্রভাবশালী সংস্কৃতির প্রভাবে তারা ধরেই নেয় – যা কিছু প্রভাবশালী, সেটাই সঠিক। লোকপ্রিয় ও চটকদার কথাবার্তা দ্বারা তারা এতোটাই আচ্ছন্ন যে, প্রভাবশালী ন্যারেটিভের যথার্থতা ছাড়া আর কিছুই দেখতে পায় না। তাই এ ধরনের লোকেরা ধর্মত্যাগ করে এবং এর পক্ষে যুক্তি দেয়, ‘দেখো, ইসলাম মৃত্যুদণ্ডের কথা বলে। তাই আমার পক্ষে মুসলমান থাকার কোনো উপায় নেই। ইসলাম নারী-পুরুষের মধ্যে ফিকাহগত পার্থক্যের কথা বলে।’

সমান বণ্টন নয়, বরং ন্যায়সঙ্গত বণ্টন
হ্যা, ইসলামে এমনটা আছে। উত্তরাধিকার আইন, বিবাহ আইনসহ কিছু বিষয়ে নারী-পুরুষের মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। আমরা তা অস্বীকার করি না। আপনি যদি মনেপ্রাণে বিশ্বাস করেন, নারী-পুরুষের মধ্যে কোনো পার্থক্য থাকা উচিত নয়; তাহলে ইসলাম আপনার এই আধুনিক বুঝজ্ঞানকে খণ্ডন করতে যাবে না।

এই শ্রেণীর লোকেরা প্রথম গ্রুপের অনুসারী। আমাদের সমাজে এই শ্রেণীর প্রচুর মানুষ আছে। এদের মধ্যে কেউ কেউ বিখ্যাত হয়ে গেছে। তারা বই লেখে, টেলিভিশনে সাক্ষাৎকার দেয় ইত্যাদি ইত্যাদি।

আপসকামী ধারার বৈশিষ্ট্য

এই ধারাকে আমরা আপসকামী হিসেবে অভিহিত করেছি। তারা প্রথম গ্রুপের মতো ইসলামী ঐতিহ্যকে খারিজ না করলেও তারা ইসলামকে যেভাবে চর্চা করে সেটাকে ‘আধুনিক বা প্রগতিবাদী ইসলাম’ বলা যায়। মৌলিক বৈশিষ্ট্যের দিক থেকে প্রথম দলটির মতো তাদেরও একই ধরনের সমস্যা রয়েছে। অর্থাৎ তারাও প্রভাবশালী ন্যারেটিভকে প্রতিষ্ঠিত সত্য হিসেবে মেনে নেয়, যাকে কোনো প্রশ্ন করা যাবে না।

বর্তমান সময়ের প্রেক্ষাপটে যৌনতা কিংবা একটু আগে বলা নারী-পুরুষের সম্পর্ক নিয়ে তাদের সম্ভাব্য বক্তব্য হচ্ছে, ‘চিরায়ত ঐতিহ্য ভুলে যান। নারী-পুরুষের সম্মিলিত জুমার নামাজে নারীরা ইমামতি করতে পারবে না – এটা কোরআনের কোথায় বলা আছে? বরং এ ধরনের নামাজে নারীদেরকে ইমামতি করতে আমাদের উৎসাহ প্রদান করা উচিত।’

এটা খুবই প্রগতিশীল দৃষ্টিভঙ্গি। তাই না? কিংবা তারা এমনটাও বলতে পারে – ‘নৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে সমকামী সম্পর্ক অনুমোদনযোগ্য। এ ধরনের সম্পর্ককে মসজিদগুলোর অনুমোদন দেয়া উচিত।’

সমাজের প্রভাবশালী ন্যারেটিভ যেহেতু এ জাতীয় সম্পর্ককে ইচ্ছার স্বাধীনতা হিসেবে বিবেচনা করছে, তাই এইসব আপসকামী মুসলমানরা মনে করে, ইসলামেরও উচিত এগুলোকে অনুমোদন করা। ফলে তারা বলছে, ‘এ জাতীয় সম্পর্ক নিষিদ্ধ হওয়ার ব্যাপারে কোরআনে কিছুই বলা হয়নি।’ অথচ কোরআনে এ ব্যাপারে বলা হয়েছে। তারা মিথ্যা দাবি করছে।

নিজেদের মূল্যবোধ কোরআনের উপর চাপিয়ে দেয়া
এক্ষেত্রেও তারা নিজেদের মূল্যবোধকে কোরআনের উপর চাপিয়ে দিতে চাচ্ছে। নিজেদের বিকৃত ব্যাখ্যাকে তারা নানা কৌশলে ও গায়ের জোরে কোরআনের উপর এমনভাবে চাপিয়ে দেয়, যেন তাদের কথাটা কোরআনেরই কথা। এ ধরনের লোকেরা হাদীসকে সাধারণত পুরোপুরি অস্বীকার করে থাকে। তবে কোনো নির্দিষ্ট বিষয়ের জন্যে ব্যবহৃত বিশেষ কোনো পরিভাষাকে সাধারণীকরণ করে ফেলতে তারা ঠিকই হাদীসের অপব্যবহার করে। যেসব হাদীস উদ্ধৃত করলে তাদের উদ্দেশ্য হাসিল হয়, তারা শুধু সেগুলোই ব্যবহার করে।

এই গ্রুপটির জন্য আমার তেমন সহানুভূতি নেই। এরা আসলেই হীনমন্যতায় ভুগছে। এই ধারার অনুসারীরা ইসলাম ও ইসলামের শিক্ষার প্রতি বিশ্বস্ত নয়। তারপরও তারা কেন নিজেদেরকে মুসলিম দাবি করে – তা সত্যিই বিস্ময়কর!

সত্যি বলতে কি, মুরতাদরা স্পষ্টভাবে প্রত্যাখ্যানকারী হওয়া সত্বেও প্রগতিবাদীদের চেয়ে বেশি যুক্তিবোধ ও বিচারবুদ্ধিসম্পন্ন। ব্যাপারটা নিয়ে ভেবে দেখুন। আমি বলছি না যে, মুরতাদরা তুলনামূলকভাবে ভালো। বরং আমি বলেছি, তারা তুলনামূলকভাবে যুক্তিবোধসম্পন্ন। একটা উদাহরণ দিলে ব্যাপারটা পরিষ্কার হবে। যেমন, মুরতাদ ব্যক্তি বলে থাকে, “ইসলাম ‘ক’-বিষয়কে মেনে চলতে বলে। আমি এটা পছন্দ করি না, তাই আমি মুসলমান নই।”

এক্ষেত্রে আপনি খুব সাধারণ একটা লজিক অনুসরণ করতে পারেন।

‘ক’ প্রসঙ্গে সারাবিশ্বের মুসলিম স্কলারগণ একমত অর্থাৎ তারাও এটা মেনে চলতে বলেন। দীর্ঘদিনের পরিক্রমায় এটা যখন প্রতিষ্ঠিত একটা ব্যাপার হয়ে গেছে, তখন এই প্রগতিবাদীদের কেউ বলবে, ‘এ ব্যাপারে আমার কাছে একটি ইউনিক ব্যাখ্যা আছে। আমি কোরআনের অন্তর্গত রহস্যের চাবিকাঠি পেয়ে গেছি। এ ব্যাপারে সম্পূর্ণ নতুন ফিকাহ ও নতুন ব্যাখ্যা রয়েছে।’

এ ধরনের কোনো ব্যক্তির কাজ-কারবার দেখলে মনে হয় যেন তিনি নতুন একজন নবী, যিনি নতুন বাণী নিয়ে আবির্ভূত হয়েছেন! তাই নয় কি? আসলে এসব ব্যাখ্যা দেয়ার মাধ্যমে প্রগতিবাদীরা এমনসব বিষয়ে জড়িয়ে পড়ছে, যেগুলোকে তারা আসলে অস্বীকার করে। তারা ফিকাহ ও হাদীসকে পরোয়া করে না। কোরআন যেন ডমিন্যান্ট ন্যারেটিভকে মেনে নেয় – এই হলো তাদের চাওয়া।

সত্যি কথা হলো, উপরের দুটি গ্রুপের কোনোটির প্রতি আমার কোনো প্রকার শ্রদ্ধাবোধ নাই।



রক্ষণশীল ধারার বৈশিষ্ট্য

এবার তৃতীয় অর্থাৎ রক্ষণশীল ধারা নিয়ে আলোচনা করা যাক। ভেগানিজমের গল্পে এই গ্রুপটি মাংস খাওয়াকে ইসলামের ‘বিধিবদ্ধ’ ব্যাপার ও ধর্মীয় রীতি বানিয়ে ফেলেছিল, যা আদতে ইসলাম বলেনি। এই গ্রুপে ইতিবাচক ও নেতিবাচক উভয় দিকই রয়েছে।

সোজা কথায়, এই ধারার মুসলমানরা ইসলামী আন্দোলন এবং দেশের মসজিদ লাইব্রেরির বইগুলো অনুসরণ করে থাকে। এটাই হচ্ছে বাস্তবতা। আমি তাদের প্রতি শ্রদ্ধা রেখেই এ কথা বলছি, তাদেরকে কোনোভাবে হেয় করা আমার উদ্দেশ্য নয়।

ভবিষ্যৎ নিয়ে রক্ষণশীলদের ভীতি
রক্ষণশীল ধারা সম্পর্কে সামগ্রিকভাবে এটাই হচ্ছে সত্য যে, দ্বিতীয়, তৃতীয় ও চতুর্থ প্রজন্ম ইসলাম থেকে বিচ্যুত হয়ে পড়ার ব্যাপারে তাদের মধ্যে প্রচণ্ড ভীতি কাজ করে। হ্যা, নীতিগতভাবে সবারই এ ব্যাপারে সচেতন থাকা উচিত। যাইহোক, এই ভীতির ফলে তারা কী প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করছে? ইসলাম সম্পর্কে তাদের যদ্দুর ধারণা আছে, ততটুকুকেই তারা আইনসিদ্ধ মনে করছে। ইসলামের যে ব্যাখ্যা তাদের স্ব স্ব অঞ্চলে প্রচলিত এবং যে সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলে তারা বেড়ে ওঠেছে, তাকেই তারা একমাত্র সঠিক ইসলাম মনে করে। এই ধারাটি বেশ জনপ্রিয়। কারণ ডমিন্যান্ট ন্যারেটিভে তাদেরই প্রথম আগমন ঘটেছে।

স্থানীয় সংস্কৃতি ও ধর্মীয় বিধান
বিশ্বের অনেক অঞ্চলে বিরিয়ানী খুব জনপ্রিয় খাবার। একইভাবে শর্মাও জনপ্রিয়। উভয় খাবারেই মাংস থাকায় ওইসব অঞ্চলের মুসলমানরা মাংস খেয়ে অভ্যস্ত। অতএব, তারা যখন এ দুটি খাবার এই দেশে প্রচলন করে তখন তারা ভাবে, এটা বুঝি ইসলামেরই একটা প্রতীক। এভাবে তারা কোনো মুসলিম অঞ্চলের একটা বিশেষ সাংস্কৃতিক উপাদানকে নিয়ে আসে এবং একে ইসলামের অন্যতম মূল ব্যাপার হিসেবে অনুসরণ করে।

কেউ বিরিয়ানী বা শর্মা খাওয়া নিয়ে প্রশ্ন করলে তারা এমনভাবে প্রতিক্রিয়া দেখায় যেন ইসলামকেই প্রশ্নবিদ্ধ করা হচ্ছে। এর কারণ হচ্ছে, তারা পূর্বপুরুষদের থেকে যা পেয়েছে তাকেই সত্যিকার অর্থে ইসলামের অংশ মনে করে। হ্যা, এর কিছু ভালো দিক রয়েছে বটে। কারণ, বিশ্বের প্রচুর মানুষ এ ধরনের খাবার খায়। মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশগুলোতেও সাধারণত এসব খাবার প্রচলিত। তাই যখনই আপনি এ ধরনের রক্ষণশীল কোনো ধারায় যোগ দিবেন, তখন আপনার মনে হবে যেন বিশ্বের একটা বৃহৎ অংশে এ ধরনের ইসলামই রয়েছে।

কিন্তু এই রক্ষণশীল ধারাটির প্রতিক্রিয়াশীলতা ও নিছক ভীতি থেকে উদ্ভূত কার্যকলাপের ফলে কিছু সমস্যা তৈরি হচ্ছে। তরুণ প্রজন্মের অনেকে ইসলাম পালন করাকে অনেক কঠিন মনে করছে। বিশেষত, কোরআন ও সুন্নাহ কোনো বিশেষ ধরনের খাদ্যের কথা বলেনি। অথচ এখানে ইসলামের নামে বাধ্যতামূলকভাবে এ ধরনের খাদ্যাভ্যাস প্রচলিত থাকায় তরুণ প্রজন্মের জন্য তা কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। কারণ এটা এমন ইসলাম, যা কোরআন-হাদীস থেকে উৎসারিত নয়। বরং ইউনাইটেড কিংডম অব ভেগানোপোলিসে বসবাসরত মুসলমানদের আচরিত সংস্কৃতি থেকে এর উদ্ভব হয়েছে।

বিরিয়ানী খাওয়া কোনো নির্দিষ্ট সময়, স্থান ও সংস্কৃতিতে জনপ্রিয় হয়েছিল। প্রকৃতপক্ষে, এর মধ্যে ইসলামের কিছুই নেই। কিন্তু রক্ষণশীল মুসলমানরা এই ব্যাপারটা অনুধাবন করতে পারেনি। আর তাই, ইউকেভির কোনো মুসলমান ফিশ অ্যান্ড চিপস খেলে কাফের হয়ে যাবে, ব্যাপারটা তেমন নয়। যদিও এটি ইউকেভি সংস্কৃতিতে জনপ্রিয় খাবার। বিরিয়ানী ও ফিশ অ্যান্ড চিপস – এ দুটির কোনোটিরই একটির উপর আরেকটির বিশেষ কোনো ধর্মীয় তাৎপর্য নেই।

ড্রেস কোড
বিরিয়ানী কিংবা ফিশ অ্যান্ড চিপস আমাদের ইস্যু নয়। অবশ্য কিছু ক্ষেত্রে তা হতেও পারে, তবে বাস্তবে এটা কোনো প্রধান ইস্যু নয়। সরল মনের কারো চিন্তায় আসতে পারে –কীভাবে পোশাক পরিধান করতে হবে? একজন আলেম তার নিজের জন্য কী ধরনের পোশাক পছন্দ করেন? রক্ষণশীল ধারার আলেমগণ কীভাবে পোশাক পরিধান করেন? এটা একটা ইস্যু বটে।

এক্ষেত্রে সরল সত্যটা হলো – তারা সবাই কোনো বিশেষ মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ অঞ্চল, শতাব্দী বা যুগে প্রচলিত ইসলামী ঐতিহ্য অনুযায়ী পোশাক পরিধান করেছেন। এটি ছিল তাদের ধর্মবোধের পরিচায়ক। আপনারা কি বুঝতে পারছেন, আমি কী বলতে চাচ্ছি?

সুতরাং, আপনি যদি রক্ষণশীল ধারার কোনো সমাজে যান, তাহলে আপনার সাদা শাল-কোর্তা পরিধান করা উচিত। আমার অভিজ্ঞতা থেকে বলছি, তা না করলে আপনি তাদের মসজিদে খোতবা দিতে পারবেন না। একইভাবে, রক্ষণশীল ধারার অন্য কোনো এলাকায় গেলে আপনাকে ‘সাওব’ পরিধান করতে হবে। আবার, অন্য কেউ আপনাকে ‘জালাবিয়্যাহ’ পরতে বলবে। এভাবে চলতেই থাকবে। কারণ তারা স্ব স্ব ন্যারেটিভের সাথে পুরোপুরি অভ্যস্ত। তাই ভিন্ন পোশাকে তাদের নিকট কেউ যাওয়া মাত্রই অবশ্যম্ভাবীভাবে তিনি প্রত্যাখ্যাত হবেন। শুরুতেই তারা ধরে নিবে, বিদ্বান সমাজের একজন হওয়া এই ব্যক্তির পক্ষে সম্ভব নয়। কারণ তাদের বিদ্বান সমাজে এ ধরনের কোনো ব্যক্তিকে তারা দেখেনি।

স্থানীয় সংস্কৃতির সাথে মানিয়ে নেওয়াই সুন্নতের আদর্শ
পোশাকের সুন্নত নিয়ে বাস্তবসম্মত কথা হলো, শরীয়াহর আওতার মধ্যে থেকে স্থানীয় সংস্কৃতির সাথে যতটুক সম্ভব মানিয়ে নিয়ে পোশাক পরিধান করা উচিত। এটা শুধু আমার মতামত নয়। ইমাম ইবনে কাইয়ুমসহ অনেক আলেম এই মত দিয়েছেন।

ফ্যাশন বিপ্লব করার জন্যে মোহাম্মদ (সা) আসেননি। আবু জাহেল, উতবা, উমাইয়া ইবনে খালফসহ মক্কার মুশরিকরা যে ধরনের পোশাক পরত, আল্লাহর রাসূল (সা) ঠিক সে ধরনের পোশাকই পরতেন। কারণ, তাঁর সময়ে সে ধরনের পোশাক পরিধান করাই ছিল প্রচলিত সংস্কৃতি।

অতএব, পোশাক পরিধানের ক্ষেত্রে কেউ একটি বিশেষ সংস্কৃতিকে অনুসরণ করতে পারে। বিভিন্ন সংস্কৃতিতে এমন অনেক ধরনের কাপড় রয়েছে, যেগুলো মহানবী (সা) কখনোই দেখেননি। এরমধ্যে ‘সাওব’ও রয়েছে। অথচ একে আমরা সুন্নতের খুব কাছাকাছি মনে করি। সত্যিই এটা খুব চমৎকার পোশাক। এতে জাঁকজমকপূর্ণ বিভিন্ন উপাদান ও সুন্দর বোতাম লাগানো থাকে এবং পোশাকের মাপ থাকে পুরোপুরি নিখুঁত!

তবে আপনি যদি সত্যিই সুন্নত অনুসরণ করতে চান, তাহলে খুবই খসখসে ভেড়ার চামড়া জোগাড় করে পোশাক বানান। এই পোশাক কোনোভাবেই নিখুঁত হয় না। এটা হচ্ছে সুন্নত। তবে এটা সেই সুন্নত নয়, যা আমাদের অনুসরণ করা রাসূলের (সা) কাম্য ছিল। আমাদের মহানবী (সা) কখনোই বলেননি – ‘এই ধরনের পোশাক পরিধান করো।’

ব্রিটিশ হিজাব
আরেকটি উদাহরণ হচ্ছে মুসলিম বোনদের হিজাব। ইন্দোনেশিয়া ও মালয়েশিয়ার নারীরা যুগ যুগ ধরে যেভাবে হিজাব পরিধান করে আসছেন, নাইজেরীয় বোনদের পদ্ধতি থেকে তা বেশ আলাদা। আবার নাইজেরীয় নারীদের হিজাব মরোক্কান ও সৌদি বোনদের হিজাব থেকে আলাদা। আবার আফগান বোনদের হিজাব ভিন্নরকম।

তাই আমরা যদি সৌদি আরবের হিজাবকে একমাত্র গ্রহণযোগ্য মনে করি, তাহলে তা ভুল হবে। অপেক্ষা করুন, ‘বৃটিশ হিজাবে’র যে ধারা গড়ে ওঠছে, তাতেও কোনো সমস্যা নেই। আমি আপনাদের কাছে জানতে চাই – নাইজেরীয় বোনদের জন্য নাইজেরীয় হিজাব, একইভাবে ইন্দোনেশীয়, মরোক্কান, পাকিস্তানীসহ অন্যান্য অঞ্চলের বোনদের জন্য যদি স্ব স্ব সংস্কৃতির হিজাব পরিধান হালাল হয়; তাহলে অন্য আরেকটি সাংস্কৃতিক ভূখণ্ডের মুসলমানরা ইসলামের সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলের ভেতরে থেকে যদি একই কাজ করে, সেটা হারাম হবে কেন?

এখানেই সংস্কারপন্থী এবং রক্ষণশীল ধারার মধ্যে পার্থক্য। হ্যা, রক্ষণশীল মুসলমানদের মধ্যেও অনেক ভালো কিছু রয়েছে। ইসলামের নিদর্শন বলে মনে করা হয় এমন দৃশ্যমান প্রতীক, যেমন – কোর্তা, সাওব ইত্যাদি তারা পরিধান করে। বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে এটি তাদের মুসলিম পরিচিতি তুলে ধরে। এতে তারা স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে। যদিও এটি কোনো অপরিহার্য বিষয় নয়। এটা ধর্মের এমন কোনো বিষয় নয়, যা আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (সা) সবাইকে অনুসরণ করতে বলেছেন।

আইয়ুব আলী
আইয়ুব আলী
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগে অধ্যয়নরত

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *