মঙ্গলবার, নভেম্বর ২১, ২০১৭
হোম > লেকচার অনুবাদ > ইসলামী চিন্তার সংস্কার: বিচ্যুতি, প্রগতি, নাকি সময়ের দাবি? (পর্ব ৩)

ইসলামী চিন্তার সংস্কার: বিচ্যুতি, প্রগতি, নাকি সময়ের দাবি? (পর্ব ৩)

এডিটর’স নোট:

ইসলামী চিন্তার সংস্কারের প্রসঙ্গ আসলে প্রায়শই একটা প্রশ্ন উত্থাপিত হয় – সংস্কারের ক্ষেত্রে কোন বিষয়গুলো বিবেচনাযোগ্য, আর কোনগুলো অপরিবর্তনীয়? এক্ষেত্রে অতি উদার কেউ কেউ শরীয়াহর খোলনলচে পাল্টে ফেলতে চান, আবার অতি রক্ষণশীল কেউ কেউ মনে করেন ইসলামে সংস্কারের কোনো ধরনের সুযোগ নেই। এই দুই প্রান্তিক অবস্থানের বাইরে সঠিক পথ কী হতে পারে?

২০১৪ সালের নভেম্বরে লন্ডনে প্রদত্ত দীর্ঘ দেড় ঘণ্টার এক বক্তৃতায় শায়খ ড. ইয়াসির ক্বাদী এ ব্যাপারে গভীর পাণ্ডিত্যপূর্ণ আলোচনা করেছেন। একটি গল্পের আশ্রয় নিয়ে পুরো বিষয়টিকে তিনি চমৎকারভাবে উপস্থাপন করেছেন। সিএসসিএস-এর পাঠকদের জন্যে বক্তৃতাটি ধারাবাহিকভাবে অনুবাদ করা হচ্ছে। অনুবাদ করেছেন আইয়ুব আলী


বক্তৃতা: পর্ব ১, পর্ব ২, পর্ব ৩, পর্ব ৪, পর্ব ৫, পর্ব ৬ ||| প্রশ্নোত্তর: পর্ব ১, পর্ব ২, পর্ব ৩


সংস্কারপন্হী ধারা

নয়া প্যারাডাইম
পঞ্চম অর্থাৎ শেষ ধারাটি হচ্ছে আধুনিকতাবাদী ধারা। ‘আধুনিকতাবাদী’ পরিভাষাটির ব্যাপারে মিশ্র প্রতিক্রিয়া থাকায়, এটি ব্যবহার করার কিছু বিপদ আছে। তবুও আমি এটি ব্যবহার করতে চাই। কারণ এরচেয়ে ভালো কোনো পরিভাষা আমার জানা নেই। আর হ্যা, এই ধারাটির ব্যাপারেই আমার সবচেয়ে বেশি দরদ রয়েছে।

এই ধারাটিকে সংস্কারপন্থী হিসেবে অভিহিত করা যায়। পূর্বে উল্লেখিত চারটি ধারা থেকেই এটি আলাদা। ইউকেভির প্রভাবশালী ভেগান সংস্কৃতি এবং রক্ষণশীল ধারার মুসলমান কর্তৃক ইসলামী আইনের বিশেষ ধরনের ব্যাখ্যা – এই দুটি বিষয়কেই সংস্কারপন্থীরা একটা ঐতিহাসিক ব্যাপার হিসেবে দেখে।

দুটি প্রশ্ন
সংস্কারপন্থীরা মূলত দুটি প্রশ্নের উত্তর খোঁজার চেষ্টা করে:

এক) কেন এবং কীভাবে ভেগানিজম এত বেশি জনপ্রিয় হয়েছে? ভেগানিজমের সবকিছুই কি খারাপ কিংবা সবকিছুই কি ভালো? এখানে ভালো কী আছে, যা আমরা গ্রহণ করতে পারি? কিংবা, মন্দ কী আছে, যা আমাদের বর্জন করা দরকার?

দুই) ভেগানিজম সম্পর্কে ইসলামের সুনির্দিষ্ট কোনো বক্তব্য আছে কি? নাকি, এটা আধুনিক যুগের একটা ব্যাপার, যার উত্তর আমাদেরকেই খুঁজে বের করতে হবে?

এই ধারার অনুসারীরা বুঝতে পেরেছে, প্রাক-আধুনিক যুগে ভেগানিজম বলতে কিছু ছিল না। সেই কারণে ইসলামের চিরায়ত ঐতিহ্যে এ ব্যাপারে কিছু বলা নেই। কারণ অতীতের আলেমগণ কোনো ভেগান দেশে বাস করেননি। ফলে ইউকেভির মতো দেশের গতি-প্রকৃতি ও নীতি-নৈতিকতা সম্পর্কে তাদের কোনো অভিজ্ঞতা ছিল না।

ইসলামী ঐতিহ্যের প্রতি মনোভাব
সংস্কারপন্থীরা আপসকামীদের মতো ইসলামী ঐতিহ্যকে খারিজ করে না। আপসকামীরা নিজেদেরকে মুসলিম দাবি করলেও ‘চৌদ্দশ বছরের পুরনো’ হওয়ার অজুহাতে ইসলামী আইনকে অগ্রাহ্য করে। এর বিপরীতে ঐতিহ্যের প্রতি শ্রদ্ধা রেখেই সংস্কারপন্থীরা মনে করে, ‘স্বভাবতই চিরায়ত ঐতিহ্যের পক্ষে আধুনিক ইস্যু নিয়ে কথা বলতে পারার কথা নয়। আধুনিক যুগের সমস্যাগুলোর যে ধরনের সমাধান দরকার, এটি তা পারে না। সে কারণে আমাদেরকে নতুন সমাধান বের করতে হবে। ঐতিহ্যকে বাতিল করে দিলে তো সমাধান হবে না। বরং চিরায়ত ঐতিহ্য ও বর্তমান সময়ের প্রেক্ষাপট বিবেচনা করে আধুনিক যুগের আলেমগণ ভেগানিজম সম্পর্কে মুসলিমদের অবস্থান নির্ণয় করবেন।’

উদার মানসিকতা
সংস্কারপন্থীরা ভেগানিজমকে যাচাই করে দেখতে আগ্রহী। ভেগান হওয়ার মাঝে ভালো কোনো দিক থাকতে পারে কিনা, সেই সম্ভাবনাও তারা যাচাই করেন। ‘ভেগান হওয়া কি অনৈসলামিক? একইসাথে একজন ভেগান ও ভালো মুসলমান হওয়া কি সম্ভব? কোনো মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ট দেশ থেকে আসার পরিবর্তে ইউকেভিতে ভেগানিজমের উদ্ভব হওয়ার কারণে স্বয়ংক্রিয়ভাবেই কি একে মন্দ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে? এর মধ্যে কি কোনো ইতিবাচক দিক আছে, যা আমরা গ্রহণ করতে পারি?’

এই দলটি এ প্রশ্নগুলোর জবাব পেতে আগ্রহী, যে কারণে তারা অন্যান্য গ্রুপ থেকে আলাদা। ধর্মত্যাগী ও আপসকামী ধারা দুটি আধুনিক মূল্যবোধকে প্রতিষ্ঠিত সত্য হিসেবে গ্রহণ করে নিয়েছে, যাকে কোনো প্রকার প্রশ্ন করা যাবে না। অন্যদিকে, রক্ষণশীল ও কট্টরপন্থী – উভয় ধারাই প্রতিক্রিয়াশীল। তারা মনে করে, আধুনিক মূল্যবোধগুলো আদতেই খারাপ। তাই এগুলো বৈধ নাকি অবৈধ, তা যাচাই করাটাও অবান্তর। নিছক এগুলোর বৈধতা যাচাই করতে গেলেও তাদের দৃষ্টিতে আপনি মন্দলোক হিসেবে বিবেচিত হবেন।

উভয় পক্ষকেই প্রশ্ন করা
উল্লেখিত চারটি ধারার বিপরীতে সংস্কারপন্থীরা বলবে – “না, উভয় পক্ষকেই প্রশ্ন করতে হবে। প্রশ্নটা কী? আমরা প্রতিটি প্রভাবশালী ন্যারেটিভকে প্রশ্ন করি। এ ক্ষেত্রে প্রভাবশালী ন্যারেটিভ হচ্ছে ভেগানিজম। আমরা কোরআন ও সুন্নাহকে প্রশ্ন করি না, আপসকামীরা যেমনটা করে থাকে। আমরা বরং ইসলামের গতানুগতিক বুঝজ্ঞানকেই (classical understanding) প্রশ্ন করি। বিশেষ করে রক্ষণশীল আলেমদের ‘বিধিবদ্ধ ইসলাম’কে (codified Islam) আমরা প্রশ্ন করি।”



টেক্সটুয়ালিটি এবং টেকনিক্যালিটি
‘হ্যা, নিশ্চিতভাবেই এটা সত্য – ইসলাম মোটাদাগে মাংস খাওয়ার পক্ষে। এটাও সত্য – মুসলিম সমাজের অনেকে বিরিয়ানী পছন্দ করে, আবার অনেকে শর্মা পছন্দ করে। কিন্তু ইসলাম কি সরাসরি আমাদেরকে বিরিয়ানী বা শর্মা খেতে বলেছে? এ ব্যাপারে কোরআন-হাদীস আমাদেরকে কী বলে?’ এভাবেই সংস্কারপন্থীরা প্রশ্ন করতে শুরু করে। অবশ্য অন্যদের জন্যে এটা বেশ অস্বস্তিকর ব্যাপার।

মূলকথা হচ্ছে, সংস্কারপন্থীরা কোনো ধরনের কমপ্লেক্সে ভোগেন না। ফলে ‘ভেগানিজম সর্বদা ভালো’ – এ ধরনের দাবি করার মানসিকতাও তাদের নেই। তারা প্রতিক্রিয়াশীলও নয়, আবেগপ্রবণও নয়। বরং তারা মনে করে, একজন ব্যক্তি মুসলিম হওয়া সত্ত্বেও টেকনিক্যালি ভেগান হতে পারে। এটি তার খোদাভীতির ক্ষেত্রে কোনো নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে না।

সকল ইসলামী স্কলার এই ব্যাপারে একমত যে, কোনো ব্যক্তি স্বেচ্ছায় মাংস না খেলে কিংবা মাংস খেতে অপছন্দ করলে, ইসলামের দৃষ্টিতে তা অন্যায় কিছু নয়। এর ফলে তাকে কেউ এ রকম বলতে পারে না যে, ‘এই ব্যক্তি হীনমন্য কিংবা ভালো মুসলমান নয়।’ তাই না?

কোনো সীমারেখা আছে কি?
কোনো ব্যক্তি যদি বলে, ‘মাংস খাওয়াটা পশ্চাৎপদ একটা ব্যাপার হওয়া সত্বেও আল্লাহ কীভাবে এটা হালাল করলেন!’ এটা কি কোনো ধর্মতাত্ত্বিক সমস্যা? না, আপনি তা বলতে পারেন না। মনে করুন, কোনো একজন মুসলমান মাংস খেতে পছন্দ করে না; কিংবা ইউকেভির কথাই ধরুন, যেখানে মাংস খাওয়ার সুযোগ নেই। অর্থাৎ ইসলাম মাংস খাওয়াকে অনুমোদন করলেও সমাজ তা করে না – এমন পরিস্থিতিতে কেউ ভেগান হওয়ার সিদ্ধান্ত নিলেও তিনি পুরোপুরি ইসলামী জীবনব্যবস্থার মধ্যেই থাকেন। তিনি কোনোভাবেই ইসলামকে ছোট করেন না। একদিকে, আধুনিক সংস্কৃতি তাকে মাংস খাওয়ার অনুমোদন দেয় না। অপরদিকে, একজন ভালো মুসলমান হওয়ার জন্যে মাংস খেতেই হবে, এমন নয়।

সমন্বয়মূলক অবস্থান
কোনো কোনো ক্ষেত্রে সংস্কারপন্থীরা রক্ষণশীলদের সাথে একমত পোষণ করে। যেমন – ইসলামের সাধারণ নীতি হচ্ছে মাংস খাওয়া হালাল। অন্যদিকে, কিছু কিছু ক্ষেত্রে তারা প্রগতিবাদীদের সাথেও একমত হন। যেমন – ভেগানিজমের কিছু ভালো দিকও থাকতে পারে। এমনকি সংস্কারপন্থীরা এমনটাও বলতে পারে – ‘কসাইখানায় পশুদের সাথে এমনকিছু আচরণ করা হয়, যা ইসলামের দৃষ্টিতেও অন্যায়। কোনো প্রাণীকে অন্য প্রাণীর সামনে জবাই করা উচিত নয়, প্রাণীদের সাথে খারাপ আচরণ করা উচিত নয়, তাদেরকে আজেবাজে খাবার খাওয়ানো ঠিক নয়। প্রাণীদের ব্যাপারে এইসব সুস্পষ্ট বিধান ইসলাম আমাদেরকে পালন করতে বলেছে।’

এসব বিধানের কথা কেউ বললে প্রচলিত সংস্কৃতি তাকে ইসলাম থেকে দূরে সরিয়ে নিয়ে যেতে পারে – এই আশংকাটাও ঠিক নয়। আবার, মাংস খাওয়ার ব্যাপারে ইসলামের বক্তব্য তুলে ধরার পর কেউ যুক্তি দিতে পারে, আসলে মাংস কম খাওয়াই স্বাস্থ্যসম্মত। আমাদের সময়ের প্রচলিত সংস্কৃতিতে এমনটাই বলা হয়ে থাকে। তাই না? এমতাবস্থায় সংস্কারপন্থীরা বলতে পারে – ‘আপনি কি জানেন, ইসলাম অনুযায়ী আপনি নিজের ব্যাপারে যত্ম নিতে বাধ্য? তাই আমাদের মাংস কম খাওয়া উচিত। আর ইসলামের নির্দেশনা মোতাবেক পশু-প্রাণীদের সাথে আমাদের আরো ভালো ব্যবহার করা উচিত। এগুলোকে আপনি সংস্কারপন্থীদের বক্তব্য হিসেবে বিবেচনা করতে পারেন।’

এই ধরনের নৈতিক অবস্থান প্রথম চারটি দলেরই বিপক্ষে যায়। তাতে স্পষ্টতই কিছুসংখ্যক মানুষ একটা ভিন্নতর প্যারাডাইম তৈরি করছে। রক্ষণশীলদের মতো জনপ্রিয় না হলেও সংস্কারপন্থীরা এই পাঁচটি ধারার অন্যতম হিসেবে ইতোমধ্যেই আবির্ভূত হয়েছে।

গল্পের সমাপ্তি

গল্পটি এখানেই শেষ। এবার চলুন পেছনে ফেলে আসা মূল বিষয়ের প্রতি আমরা মনোযোগী হই। মাংস খাওয়া নিয়ে আলোচনা করা আমাদের মূল প্রসঙ্গ নয়। আমরা জানি, শরীয়াহ আমাদের জন্যে মাংস খাওয়া হালাল করেছে, আলহামদুলিল্লাহ। সত্যি কথা বলতে কি, রাতের খাবারে মাংস না থাকলে আমার মনে হয় যেন খাবারই পরিবেশন করা হয়নি!

যাইহোক, গল্পটি মূলত মাংস নিয়ে নয়। তাই একে উড়িয়ে দেবেন না। কারণ, দুনিয়া যেভাবে চলছে, তাতে করে ইউরোপের কোথাও এমন একটা সমাজের কথা কল্পনা করা অসম্ভব নয়, যারা ভেগানিজমকে গ্রহণ করে নেবে। তখন কিন্তু এই ইস্যুগুলো তৈরি হতে পারে।

বাস্তব ইস্যু

ভবিষ্যতে যাইহোক না কেন, সত্যি কথা হচ্ছে বর্তমানে ভেগানিজম কোনো ইস্যু নয়; আমরা যা নিয়ে এতক্ষণ কথা বলছিলাম। এখনকার ইস্যুগুলো হচ্ছে – নারী-পুরুষের সম্পর্ক, যৌনতা, গণতন্ত্র, ভোটাধিকার, পোশাক-পরিচ্ছদ এবং আধুনিক পাশ্চাত্য যুগে ইসলামী আইনের প্রয়োগযোগত্যা ইত্যাদি।

সাদাকালো নয়, রঙিন
এই পাঁচটি ধারার কোনোটিই পুরোপুরি স্বাধীন ও স্বতন্ত্র ধারা নয়। এগুলোর মধ্যে পারস্পরিক সম্পর্ক রয়েছে এবং এ সবগুলো ধারার সমন্বয়ে এক ধরনের বর্ণচ্ছটা (spectrum) তৈরি হয়েছে। এ কারণে আপনি হয়তো একইসাথে একাধিক ধারায় একই ধরনের বৈশিষ্ট্য লক্ষ্য করে থাকবেন। এটি হলো নানা রংয়ের সমাহার। তাই না? আর তাই আমি এই ধারাগুলোর কিছু স্বাতন্ত্র্যসূচক বৈশিষ্টের কথা আপনাদেরকে এখন বলবো।

মুসলমানদের মধ্যে নানা মত ও পথের ধারাবাহিকতার কারণে কারো কারো মাঝে একইসাথে প্রথম ও দ্বিতীয় ধারার কিছু বৈশিষ্ট্য থাকতে পারে, আবার কারো কারো মাঝে দ্বিতীয় ও তৃতীয় ধারার কিছু প্রভাবও থাকতে পারে। একজন মুসলমানের উপর এই সকল পরস্পরবিরোধী ধারার প্রভাব থাকাটাও এই স্পেকট্রামের একটা অংশ। তাছাড়া, কঠোরভাবে যাচাই-বাছাইয়ের ভিত্তিতে এই ধারাগুলো নির্ধারণ করা হয়নি। যাইহোক, আমি আসলে এই গল্পটির শিক্ষনীয় দিকের উপরই জোর দিতে চাচ্ছি।

আইয়ুব আলী
আইয়ুব আলী
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগে অধ্যয়নরত

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *