অন্যান্য কমিউনিটির সাথে মুসলিমদের সম্পর্ক (শেষ পর্ব)

এডিটর’স নোট:

অন্যান্য ধর্মীয় বা জাতিগত সম্প্রদায়ের সাথে মুসলিমদের সম্পর্ক কী বিদ্বেষপূর্ণ বা শত্রুতামূলক হবে, নাকি শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান হবে? এ ব্যাপারে ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গী কী? প্রশ্নটি নতুন না হলেও বর্তমান বৈশ্বিক মতাদর্শগত ও রাজনৈতিক বাস্তবতার আলোকে এটি সবার জন্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে। ২০১৫ সালের ২৭ মার্চ বৃটেনের ইস্ট লন্ডন মসজিদে জুমার খুতবায় ড. জামাল বাদাবী এ বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন। তিনি কোরআন, হাদীস ও রাসূলের (সা) জীবনীর আলোকে এ সম্পর্কিত মূল্যবোধগুলো তুলে ধরেছেন।

ড. জামাল বাদাবী মিশরীয় বংশোদ্ভূত কানাডীয় ইসলামী স্কলার। তিনি কানাডার সেইন্ট মেরি ইউনিভার্সিটির সাবেক অধ্যাপক। লেখক, অ্যাক্টিভিস্ট ও বক্তা হিসেবেও তিনি সুপরিচিত। ইসলামের সামাজিক দিক নিয়ে তাঁর প্রচুর কাজ রয়েছে। সিএসসিএস-এর পাঠকদের জন্যে এই খুতবার ধারাবাহিক অনুবাদের অংশ হিসেবে আজ ছাপা হলো শেষ পর্ব।


অন্যান্য পর্ব: প্রথম পর্ব, দ্বিতীয় পর্ব এবং তৃতীয় পর্ব



ন্যায়বিচার

শুধু মুসলমানদের সাথেই নয়, সকলের সাথেই ন্যায়বিচার করতে হবে। এ ব্যাপারে কোরআনে দুইটি গুরুত্বপূর্ণ আয়াত রয়েছে। প্রথমটিতে বলা হয়েছে,

يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا كُونُوا قَوَّامِينَ بِالْقِسْطِ شُهَدَاءَ لِلَّـهِ وَلَوْ عَلَىٰ أَنْفُسِكُمْ أَوِ الْوَالِدَيْنِ وَالْأَقْرَ‌بِينَ ۚ إِنْ يَكُنْ غَنِيًّا أَوْ فَقِيرً‌ا فَاللَّـهُ أَوْلَىٰ بِهِمَا ۖ فَلَا تَتَّبِعُوا الْهَوَىٰ أَنْ تَعْدِلُوا ۚ وَإِنْ تَلْوُوا أَوْ تُعْرِ‌ضُوا فَإِنَّ اللَّـهَ كَانَ بِمَا تَعْمَلُونَ خَبِيرً‌ا

হে ঈমানদারগণ! তোমরা ন্যায়ের উপর প্রতিষ্ঠিত থাকো এবং আল্লাহর ওয়াস্তে ন্যায়সঙ্গত সাক্ষ্যদান করো, তাতে তোমাদের নিজের বা পিতা-মাতার অথবা নিকটবর্তী আত্মীয়-স্বজনের যদি ক্ষতি হয় তবুও। তাদের কেউ যদি ধনী বা দরিদ্র হয়, তবুও তাদের ব্যাপারে তোমাদের চাইতে আল্লাহই অধিক শুভাকাঙ্খী অতএব, তোমরা বিচার করতে গিয়ে প্রবৃত্তির কামনার অনুসরণ করো না। আর যদি তোমরা ঘুরিয়ে-পেঁচিয়ে কথা বলো কিংবা পাশ কাটিয়ে যাও, তবে জেনে রেখো, আল্লাহ তোমাদের যাবতীয় কাজকর্ম সম্পর্কেই অবগত। (সূরা নিসা: ১৩৫)

যা সত্য, বিচার করতে গিয়ে তার পক্ষেই থাকতে হবে। কার ব্যাকগ্রাউন্ড কী, কে কোন ধর্মের অনুসারী – এ ধরনের কোনো কিছুকে বিচারের ক্ষেত্রে বিবেচনায় নেয়া যাবে না। এ সংক্রান্ত অপর আয়াতটি আরো চমৎকার। আল্লাহ বলেছেন,

يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا كُونُوا قَوَّامِينَ لِلَّـهِ شُهَدَاءَ بِالْقِسْطِ ۖ وَلَا يَجْرِ‌مَنَّكُمْ شَنَآنُ قَوْمٍ عَلَىٰ أَلَّا تَعْدِلُوا ۚ اعْدِلُوا هُوَ أَقْرَ‌بُ لِلتَّقْوَىٰ ۖ وَاتَّقُوا اللَّـهَ ۚ إِنَّ اللَّـهَ خَبِيرٌ‌ بِمَا تَعْمَلُونَ

হে মুমিনগণ, তোমরা আল্লাহর উদ্দেশ্যে ন্যায়ভিত্তিক সাক্ষ্যদানের ব্যাপারে অবিচল থাকবে এবং কোনো সম্প্রদায়ের শত্রুতার কারণে তাদের ব্যাপারে কখনও ন্যায়বিচার পরিত্যাগ করো না। সুবিচার করো, এটাই খোদাভীতির অধিক নিকটবর্তী। আল্লাহকে ভয় করোতোমরা যা করো, নিশ্চয় আল্লাহ সে বিষয়ে অধিকতর জ্ঞাত। (সূরা মায়েদা: ৮)

এ রকম অসাধারণ বক্তব্য দুনিয়ার আর কোথায় আছে? লোকজন তো বরং বলে থাকে – শত্রুকে ধ্বংস করে দাও, যত পারো হত্যা করো, ভূলুণ্ঠিত করে দাও। যদিও কোরআনে কোনো কোনো সময়ে ন্যায়সঙ্গত আত্মরক্ষার কথা বলা হয়েছে, কিন্তু একইসাথে মীমাংসার দরজা খোলা রাখার কথাও বলা হয়েছে। আল্লাহ বলেছেন,

عَسَى اللَّـهُ أَنْ يَجْعَلَ بَيْنَكُمْ وَبَيْنَ الَّذِينَ عَادَيْتُمْ مِنْهُمْ مَوَدَّةً ۚ وَاللَّـهُ قَدِيرٌ‌ ۚ وَاللَّـهُ غَفُورٌ‌ رَ‌حِيمٌ

এটা অসম্ভব কিছু নয়, আল্লাহ তোমাদের এবং যাদের সাথে আজ তোমাদের শত্রুতা সৃষ্টি হয়েছে তাদের মাঝে একদিন সুসম্পর্ক তৈরি করে দেবেন; আল্লাহ তো সবই করতে পারেন; আল্লাহ ক্ষমাশীল ও পরম দয়ালু। (সূরা মুমতাহিনা: ৭)

এই আয়াতে আল্লাহ বলছেন, তোমরা যারা এখন পরস্পরের শত্রু, তোমাদের মধ্যে আল্লাহ মুওয়াদ্দাহ তথা গভীর আন্তরিকতার সম্পর্ক তৈরি করে দিবেন। এটা নিছক ভালোবাসা নয়, তার থেকেও বেশি কিছু। আমাদের প্রিয় নবীর (সা) জীবনে এ রকম অনেক উদাহরণ রয়েছে। তিনি তায়েফবাসীকে ক্ষমা করে দিয়েছিলেন। আঘাতের জবাবে তাদেরকে মমতায় সিক্ত করেছেন। মৃত্যুদণ্ড যাদের প্রাপ্য ছিল, মক্কা বিজয়ের শুরুতেই তাদের ব্যাপারে সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করেছিলেন। এ রকম আরো অনেক উদাহরণ রয়েছে।

আসল কথা হচ্ছে, ন্যায়বিচার অর্থাৎ কোনো মানুষ, এমনকি শত্রুর সাথেও অবিচার না করা; এমনকি আত্মরক্ষার ক্ষেত্রেও এটি প্রযোজ্য নয়। কেউ যদি এমন কোনো কাজের পক্ষে সাফাই দেয়, যা কোরআন-হাদীসের শিক্ষার পরিপন্থী; তাহলে সে স্পষ্টত পথভ্রষ্ট।

মধ্যপন্থা
কোরআনে আমাদেরকে গুলু তথা বাড়াবাড়ি করার ব্যাপারে সাবধান করে দেওয়া হয়েছে। এটা উগ্রপন্থার পরিচায়ক। কোরআনে একে চরম মন্দ কাজ হিসেবে বিবেচনা করে বলা হয়েছে,

لَا تَغْلُوا فِي دِينِكُمْ

তোমরা দ্বীনের ব্যাপারে বাড়াবাড়ি করো না (সূরা নিসা: ১৭১, সূরা মায়েদা: ৭৭)

এমনকি ইবাদতের ক্ষেত্রেও বাড়াবাড়ি করতে ইসলাম নিষেধ করেছে। এ ব্যাপারে বর্ণিত একটি হাদীসে স্বাভাবিক জীবনযাপনের পরিবর্তে সদাসর্বদা ইবাদতে নিয়োজিত রত থাকতে নিষেধ করা হয়েছে। কারণ মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাপনই ইবাদতে পরিণত হতে পারে, যদি কারো সৎ নিয়ত থাকে এবং আল্লাহ নির্দেশিত পথে চলে।

কোরআনেওয়াসাতিয়া তথা মধ্যপন্থা অবলম্বন করতে বলা হয়েছে। তারমানে, এটা ইসলাম অনুসরণের ব্যাপারে গাফলতি নয়। যদিও কেউ কেউ ভুলবশত এমনটা মনে করতে পারে। কেবলা সংক্রান্ত সূরা বাকারার নিম্নোক্ত আয়াতে আল্লাহ বলছেন,

وَكَذَٰلِكَ جَعَلْنَاكُمْ أُمَّةً وَسَطًا لِتَكُونُوا شُهَدَاءَ عَلَى النَّاسِ وَيَكُونَ الرَّ‌سُولُ عَلَيْكُمْ شَهِيدًا

এমনিভাবে আমি তোমাদেরকে মধ্যপন্থী উম্মাহ করেছি যাতে করে তোমরা সাক্ষ্যদাতা হও মানবজাতির জন্যে এবং যাতে রাসূল সাক্ষ্যদাতা হন তোমাদের জন্য। (সূরা বাকারা: ১৪৩)

আমারদেরকে মধ্যপন্থী উম্মাহ হিসেবে আল্লাহ পাঠিয়েছেন। এই আয়াতে বর্ণিত ওয়াসাতান শব্দের অর্থ হচ্ছে – যথাযথ ভারসাম্যপূর্ণতা, বাড়াবাড়ি ও শৈথিল্য প্রদর্শনের মাঝামাঝি অবস্থান, মধ্যপন্থা অবলম্বন করা ইত্যাদি। নিছক রাজনৈতিক অর্থে মধ্যপন্থা নয়, বরং ওয়াসাতিয়ার আলোকে মধ্যপন্থা। এর পেছনে যথার্থ কারণ রয়েছে। তাহলো আমরা যাতে আল্লাহর পক্ষ থেকে মানুষের কাছে সাক্ষ্য হিসেবে দাঁড়াই, যেভাবে মহানবী (সা) আল্লাহর পক্ষ থেকে আমাদের নিকট সাক্ষ্য হিসেবে প্রেরিত। এটি একটি খুব গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার।

রহমত
নবম মূল্যবোধটি হচ্ছে রহমত তথা সকলের প্রতি দয়া করা। আমরা জানি, এটি আল্লাহর বৈশিষ্ট্য ও গুণাবলির মধ্যে সবিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ একটি গুণ। আমরা ভালো করে কোরআন পড়লে দেখতে পাবো – রহমত এবং এ ধরনের আরো অসংখ্য শব্দ কোরআনে রয়েছে। এগুলোই হচ্ছে মহানবীর (সা) দাওয়াতের মূলকথা। আল্লাহ বলেছেন,

وَمَا أَرْسَلْنَاكَ إِلَّا رَحْمَةً لِّلْعَالَمِينَ

আমি আপনাকে বিশ্বজগতের জন্যে রহমত হিসেবেই প্রেরণ করেছি। (সূরা আম্বিয়া: ১০৭)

এই আয়াতে আলম (বিশ্ব) শব্দের বহুবচন আলামীন শব্দটি ব্যবহৃত হয়েছে। এর মানে হচ্ছে জগৎ সম্পর্কে মানুষের যে গতানুগতিক ধারণা, শুধু সেগুলোই নয়; বরং মনুষ্য জগত, জ্বীনদের জগত (কারণ তাদের কেউ কেউ কোরআন শোনার পর ইসলাম গ্রহণ করেছিল), প্রাণীজগত, উদ্ভিদজগত, পরিবেশ জগতসহ সবার জন্যেই রাসূল (সা) রহমত হিসেবে প্রেরিত হয়েছেন।

তাহলে স্রেফ ভিন্নমত পোষণ করার কারণে যখন মানুষকে নির্যাতন করা হয়, শিরচ্ছেদ বা মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয়, অসহায় নারী-পুরুষ ও শিশুদেরকে পাইকারীভাবে হত্যা করা হয়, তখন রহমতের কার্যকারিতার কী হবে? এটা খুবই গুরত্বপূর্ণ প্রশ্ন। এ বিষয়টি হচ্ছে মুসলমানদের সাথে অন্যান্য কমিউনিটির সম্পর্কের ভিত্তির মূল ব্যাপার। এটা শুধুমাত্র শান্তির সময়ে নয়, বরং যুদ্ধক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। এ বিষয়ে এখন শুধু এটুকু বলে রাখি, কিছু লোক কোরআনের এ সংক্রান্ত কোনো কোনো আয়াতের অপব্যাখ্যা করে। তারা এসব আয়াতের ঐতিহাসিক এবং প্রাসঙ্গিক ঘটনা না জেনে বা এ সম্পর্কে ভুল বুঝে জঘন্য সব কাজ করে বেড়ায়। তারা কোরআন থেকে নিজেদের সুবিধা মতো কিছু আয়াত বাছাই করে (cherry picking) সেগুলোর অপব্যবহার করে।

১০ সহাবস্থান ও সদাচরণ
কেউ মুসলমানদের সাথে শান্তিতে বসবাস করতে চাইলে সেক্ষেত্রে ইসলামের মূলনীতি হচ্ছে, আমাদেরকে যথোচিত ভূমিকা পালন করতে হবে। এ বিষয়ে আল্লাহ তায়ালা বলেছেন,

لَا يَنْهَاكُمُ اللَّـهُ عَنِ الَّذِينَ لَمْ يُقَاتِلُوكُمْ فِي الدِّينِ وَلَمْ يُخْرِ‌جُوكُمْ مِنْ دِيَارِ‌كُمْ أَنْ تَبَرُّ‌وهُمْ وَتُقْسِطُوا إِلَيْهِمْ ۚ إِنَّ اللَّـهَ يُحِبُّ الْمُقْسِطِينَ

যারা দ্বীনের ব্যাপারে তোমাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেনি এবং কখনো তোমাদেরকে বাড়িঘর থেকে বের করে দেয়নি, তাদের প্রতি সদাচরণ ও ন্যায়বিচার করতে আল্লাহ কখনো নিষেধ করেন না; অবশ্যই আল্লাহ ন্যায়পরায়ণদের ভালোবাসেন (সূরা মুমতাহিনা: ৮)

যুদ্ধ না করা এবং বাড়িঘর থেকে তাড়িয়ে না দেওয়া – এটুকু কি খুব বেশি চাওয়া? এটা কি মুসলমানদের অবাস্তব কোনো চাহিদা? এটা কি প্রত্যেক মানুষের প্রাপ্য অধিকার নয়? এটা খুবই সহজ একটি দাবি যা সবার জন্যেই জরুরি। তাহলে এ চাহিদাটুকু পূরণ হলে মুসলমানরা অন্যদের সাথে কেমন আচরণ করবে? অবশ্যই ‘সদাচারণ ও ন্যায্য আচরণ’ করবে। উপরোক্ত আয়াতে এ সংক্রান্ত শব্দটি হলো তাবাররুহুম, যা সদাচরণ বা সহৃদয়তা থেকেও বেশি কিছু বুঝায়। এটা অনেকটা মা-বাবা ও সন্তানের সম্পর্কের মতোই সহৃদয়তাপূর্ণ সম্পর্ক, যেখানে আছে সদাচারণ, সম্মান ও ভালোবাসা। এমনকি মা-বাবা অমুসলিম হলেও তাদেরকে ভালোবাসতে হবে। কারণ মানুষ হিসেবে মা-বাবার কাছে কৃতজ্ঞ থাকার সহজাত ব্যাপার থেকেই তাদেরকে আমরা ভালোবাসি। যদিও আল্লাহ প্রত্যেকের কৃতকর্মের হিসাব নিবেন।

তাই আমাদের উচিত ‘কিস্ত’ তথা ন্যায়বিচার করা। কোনো কোনো আলেমের মতে, ‘কিস্ত’ হচ্ছে ‘আদল’ বা ন্যায়বিচারের চেয়েও বেশি কিছু। ‘আদল’ হচ্ছে কাউকে তার প্রাপ্য যতটকু, ঠিক ততটুকু প্রদান করা; কমও নয়, বেশিও নয়। কিন্তু ‘কিস্ত’ হচ্ছে প্রাপ্যের চেয়েও বেশি কিছু দেয়া। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, অমুসলিম প্রতিবেশীকে উপহার প্রদান করা। আলেমদের কারো কারো মতে, অমুসলিমদের অনু্ষ্ঠান উপলক্ষ্যে শুভেচ্ছা জানানো যায়। যেমন – ইস্টার সানডে। তবে শুভেচ্ছা জানানোর ক্ষেত্রে আমি নিরপেক্ষ কোনো শব্দ ব্যবহার করতে চাই। যেমন – হ্যাপি হলিডে। কারণ হলি শব্দটি এখন আর ‘হলি’ তথা পবিত্র অর্থে ব্যবহৃত হয় না। এটা এখন অনেকটাই বাণিজ্যিক পণ্যে পরিণত হয়েছে। কারো কারো মতে, এতে কোনো সমস্যা নেই। তাই বলে বিধর্মীদের যাবতীয় আকিদা-বিশ্বাসই সঠিক, এমনটি মনে করা অবকাশ নেই। এই ইস্যুতে কেউ কেউ পক্ষে ও বিপক্ষে যথেষ্ট যুক্তি দিয়ে থাকে।

এতক্ষণের আলোচনায় আমরা যা জানলাম, ইসলামের এই বুঝজ্ঞান ও মূল্যবোধ বিবেচনায় রেখে বিশ্বের দিকে তাকালে আমরা কী দেখতে পাই? আমরা দেখি – কিছু ক্ষুদ্র গোষ্ঠী তাদের কাজকর্মের মাধ্যমে মানুষের কাছে ইসলাম ও মুসলমানদের একটা ভয়াবহ চিত্র তুলে ধরছে। তারা দাবি করে, কোরআন-সুন্নাহর আলোকেই তারা এসব করছে। অথচ আমি এতক্ষণ যা বলেছি, তা কোরআন-সুন্নাহর আলোকেই বলেছি। তাহলে তারা এগুলো ভুল প্রমাণ করুক। তারা প্রমাণ করুক – আমি কোরআনের যেসব আয়াত উল্লেখ করেছি, সেগুলো আল্লাহর কথা নয়, কোরআনের কোনো সূরার আয়াত নয়! মহান আল্লাহ তায়ালা আমাদেরকে এবং তাদেরকে সঠিক পথে পরিচালনা করুন। আমরা যেন অন্যান্য কমিউনিটির লোকজনসহ আল্লাহর সমস্ত সৃষ্টির সাথে শান্তিপূর্ণভাবে বসবাস করতে করতে পারি, মহান আল্লাহ আমাদেরকে সে তওফিক দান করুন। আমীন।

আমাদের করণীয়
আয়োজক ভাইদের পক্ষ থেকে আমাকে অনুরোধ করা হয়েছে, আমি যেন বর্তমান সময়ে মুসলমানদের জন্যে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে করণীয় তিনটি কাজের কথা বলি। আমি খুব সংক্ষেপে এ ব্যাপারে আমার ক্ষুদ্র মতামত ব্যক্তি করছি।

ঈমানকে শক্তিশালী করা
আমাদের ঈমানকে শক্তিশালী এবং অন্তরকে পরিশুদ্ধ করতে হবে। কারণ অন্তর থেকে অনুভব না করলে নিছক ইবাদত আমাদেরকে পরিবর্তন করতে পারবে না এবং আমরা আল্লাহর নৈকট্যও লাভ করতে পারবো না। অর্থাৎ, এই ইবাদত আমাদের কাজে আসবে না। হ্যা, ইবাদত একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়; কিন্তু তা ঈমানের ভিত্তিতে হতে হবে। তাই প্রথমে আমাদের অন্তরকে পরিশুদ্ধ করতে হবে। তাহলে আমরা যাবতীয় মন্দ কাজ থেকে নিজেকে বিরত রাখতে পারবো।

ইসলামের সঠিক বুঝজ্ঞান অর্জন করা
আল্লাহ কোরআনে যা বলেছেন ঠিক সেভাবে অর্থাৎ পরিপূর্ণ ভারসাম্যতা সহকারে ইসলামের সঠিক বুঝজ্ঞান আমাদের অর্জন করতে হবে। কট্টরপন্থী হওয়া যাবে না। মধ্যপন্থা সংক্রান্ত ইসলামের ধারণাকে নিছক রাজনৈতিক অর্থে না নিয়ে যথার্থ অর্থে একে গ্রহণ করতে হবে। আমরা জানি, ইসলামের প্রাথমিক যুগে উদ্ভূত খারেজি সম্প্রদায় ছিল অত্যন্ত ধর্মভীরু। নামাজ, রোজাসহ যে কোনো ইবাদতে অত্যন্ত তৎপর থাকা সত্বেও ইসলামের ভারসাম্যপূর্ণ জ্ঞানের অভাবে তারা গোমরাহ হয়েছিল। মহানবী (সা) তাদের সম্পর্কে ভবিষ্যতবাণী করেছিলেন, তীর যেমন ধনুক থেকে বেরিয়ে যায়, তারাও তেমনি দ্বীন থেকে বেরিয়ে যাবে। তাদের কাজকর্ম পুরোপুরি ইসলাম পরিপন্থী। যেসব মুসলমান খারেজিদের মনগড়া ব্যাখ্যা গ্রহণে অস্বীকার করতো, তাদের হত্যা করা খারেজিরা বৈধ মনে করত।

জ্ঞানকে বাস্তবে কাজে লাগানো
ঈমান এবং এর সঠিক বুঝজ্ঞানকে শুধু কেতাবী বিদ্যা মনে করা যাবে না। বরং এসবকে কাজে লাগিয়ে অন্যান্য মানুষের সাথে সম্পর্কোন্নয়নে সচেষ্ট করতে হবে। এক্ষেত্রে মহানবী (সা) আমাদের জন্য অনুকরণীয় আদর্শ। তিনি অমুসলিম প্রতিবেশীদের সাথে অত্যন্ত সদয় আচরণ করতেন। অথচ এদের কেউ কেউ তাঁর বাড়ির সামনে ময়লা-আবর্জনা ছুঁড়ে ফেলত। প্রতিবেশী মুসলিম নাকি অমুসলিম, সে প্রশ্ন না তুলে তাদের প্রতি সদয় হওয়ার ব্যাপারে কোরআনেও বলা হয়েছে।

আমরা যেন ইসলামের উত্তম আদর্শ হতে পারি, অন্যান্য মানুষের সাথে সম্পর্কের ক্ষেত্রেও যেন উত্তম আদর্শ হতে পারি; আল্লাহ আমাদেরক সেই তওফিক দান করুন। আমীন।

Leave a Reply