রবিবার, নভেম্বর ১৯, ২০১৭
হোম > লেকচার অনুবাদ > অন্যান্য কমিউনিটির সাথে মুসলিমদের সম্পর্ক (পর্ব ৩)

অন্যান্য কমিউনিটির সাথে মুসলিমদের সম্পর্ক (পর্ব ৩)

এডিটর’স নোট:

অন্যান্য ধর্মীয় বা জাতিগত সম্প্রদায়ের সাথে মুসলিমদের সম্পর্ক কী বিদ্বেষপূর্ণ বা শত্রুতামূলক হবে, নাকি শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান হবে? এ ব্যাপারে ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গী কী? প্রশ্নটি নতুন না হলেও বর্তমান বৈশ্বিক মতাদর্শগত ও রাজনৈতিক বাস্তবতার আলোকে এটি সবার জন্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে। ২০১৫ সালের ২৭ মার্চ বৃটেনের ইস্ট লন্ডন মসজিদে জুমার খুতবায় ড. জামাল বাদাবী এ বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন। তিনি কোরআন, হাদীস ও রাসূলের (সা) জীবনীর আলোকে এ সম্পর্কিত মূল্যবোধগুলো তুলে ধরেছেন।

ড. জামাল বাদাবী মিশরীয় বংশোদ্ভূত কানাডীয় ইসলামী স্কলার। তিনি কানাডার সেইন্ট মেরি ইউনিভার্সিটির সাবেক অধ্যাপক। লেখক, অ্যাক্টিভিস্ট ও বক্তা হিসেবেও তিনি সুপরিচিত। ইসলামের সামাজিক দিক নিয়ে তাঁর প্রচুর কাজ রয়েছে। সিএসসিএস-এর পাঠকদের জন্যে এই খুতবার ধারাবাহিক অনুবাদের অংশ হিসেবে আজ ছাপা হলো তৃতীয় পর্ব।


অন্যান্য পর্ব: প্রথম পর্ব, দ্বিতীয় পর্ব এবং শেষ পর্ব



ধর্মীয় স্বাধীনতা
যদিও এটি সরাসরি আল্লাহকে প্রত্যাখ্যান করার শামিল বলে কোরআনে বলা হয়েছে, তথাপি মানুষকে পছন্দ অনুযায়ী ধর্ম বা দর্শন বাছাই করার অধিকার দেয়া হয়েছে। আমরা শুক্রবারে যে সূরাটি সচরাচর পাঠ করি, সেই সূরা কাহাফে আল্লাহ বলেছেন,

وَقُلِ الْحَقُّ مِنْ رَ‌بِّكُمْ ۖ فَمَنْ شَاءَ فَلْيُؤْمِنْ وَمَنْ شَاءَ فَلْيَكْفُرْ

বলুন, সত্য তোমাদের পালনকর্তার পক্ষ থেকে আগত। অতএব, যার ইচ্ছা, বিশ্বাস স্থাপন করুক এবং যার ইচ্ছা অমান্য করুক। (সূরা কাহাফ: ২৯)

অর্থাৎ কেউ চাইলে আল্লাহর সত্য বাণীর উপর বিশ্বাস স্থাপন করতে পারে, আবার তা অমান্যও করতে পারে। কোনো ক্ষেত্রেই জবরদস্তি করা যাবে না। ব্যক্তি তার স্বাধীন ইচ্ছায় সিদ্ধান্ত নিবে। তবে সত্য অমান্য করার পরিণতি সম্পর্কে সতর্ক করার কথা বলা হয়েছে। এসব ব্যাপারে অনেক তাৎপর্যপূর্ণ আয়াত রয়েছে। যেমন আল্লাহ তায়ালা বলেছেন,

لَا إِكْرَاهَ فِي الدِّينِ ۖ قَد تَّبَيَّنَ الرُّشْدُ مِنَ الْغَيِّ ۚ فَمَن يَكْفُرْ بِالطَّاغُوتِ وَيُؤْمِن بِاللَّهِ فَقَدِ اسْتَمْسَكَ بِالْعُرْوَةِ الْوُثْقَىٰ لَا انفِصَامَ لَهَا ۗ وَاللَّهُ سَمِيعٌ عَلِيمٌ

দ্বীনের ব্যাপারে কোনো জবরদস্তি বা বাধ্যবাধকতা নেই। নিঃসন্দেহে হেদায়াত গোমরাহী থেকে পৃথক হয়ে গেছে। এখন যারা গোমরাহকারী তাগুতদেরকে মানবে না এবং আল্লাহতে বিশ্বাস স্থাপন করবে, সে ধারণ করে নিয়েছে সুদৃঢ় হাতল যা ভাঙবার নয়। আর আল্লাহ সবই শুনেন এবং জানেন। (সূরা বাকারা: ২৫৬)

এটি কোরআনের একটি মুহকাম তথা সুস্পষ্ট আয়াত। তাই এর ভিন্ন কোনো ব্যাখ্যা করার সুযোগ নেই। এটি কোরআনের একটি সার্বজনীন ধারণা। আরেকটি আয়াতে আল্লাহ তায়ালা মহানবীকে (সা) উদ্দেশ্য করে বলেছেন,

فَإِنْ أَعْرَ‌ضُوا فَمَا أَرْ‌سَلْنَاكَ عَلَيْهِمْ حَفِيظًا ۖ إِنْ عَلَيْكَ إِلَّا الْبَلَاغُ

যদি তারা মুখ ফিরিয়ে নেয়, তবে আপনাকে আমি তাদের রক্ষক করে পাঠাইনি। আপনার কর্তব্য কেবল প্রচার করা। (সূরা আশ-শু’রা: ৪৮)

এর মানে হচ্ছে, কেউ ইসলাম তথা সত্য থেকে মুখ ফিরিয়ে নিলেও কেউ তাদেরকে আসামী সাব্যস্ত করতে পারে না। স্বয়ং নবীর (সা) ক্ষেত্রেও এ কথা প্রযোজ্য! তাহলে ব্যাপারটা কী দাঁড়াচ্ছে? ইসলাম সম্পর্কে যে কিছুই জানে না অথবা ইসলাম সম্পর্কে যার সঠিক বুঝজ্ঞান নেই, তাকে ইসলাম গ্রহণে বাধ্য করা বা হত্যা করার কোনো সুযোগ কি কারো আছে? অবশ্যই না। আল্লাহ তায়ালা আমাকে-আপনাকে তাদের অভিভাবক করে পাঠাননি। তিনি কোরআনে কী বলেছেন দেখুন:

فَذَكِّرْ‌ إِنَّمَا أَنْتَ مُذَكِّرٌ‌- لَسْتَ عَلَيْهِمْ بِمُصَيْطِرٍ‌

অতএব, (হে নবী!) আপনি উপদেশ দিতে থাকুন, আপনি তো একজন উপদেশদাতা মাত্র। আপনি তো তাদের জিম্মাদার নন। (সূরা গাশিয়াহ: ২১-২২)

কোরআনে এ রকম অসংখ্য আয়াত রয়েছে, যেখানে মানুষের বিশ্বাসের স্বাধীনতাকে নিশ্চিত করা হয়েছে। কারো বিশ্বাসকে আপনি ভুল মনে করলেও আপনি নিজেই তাদেরকে বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় করাতে পারেন না, এটা আপনার দায়িত্ব নয়। বরং তাদের সাথে আচরণের ক্ষেত্রে আপনাকে কোরআনের নির্দেশনাই মেনে চলতে হবে। শুধু অন্য ধর্মে বিশ্বাস করাই নয়, বরং সেই ধর্মের আচার-অনুষ্ঠান পালনের অধিকারকেও কোরআন সম্মান করে; যতক্ষণ পর্যন্ত তা অন্যের অধিকার লঙ্ঘন না করে। কোরআনে বলা হয়েছে,

وَلَوْلَا دَفْعُ اللَّهِ النَّاسَ بَعْضَهُم بِبَعْضٍ لَّهُدِّمَتْ صَوَامِعُ وَبِيَعٌ وَصَلَوَاتٌ وَمَسَاجِدُ يُذْكَرُ فِيهَا اسْمُ اللَّهِ كَثِيرًا

আল্লাহ যদি মানবজাতির একদলকে আরেক দল দিয়ে শায়েস্তা না করতেন তাহলে দুনিয়ার বুক থেকে মঠ, চার্চ, সিনাগগ ও মসজিদগুলো ধ্বংস হয়ে যেতো; যেখানে বেশি বেশি পরিমাণে আল্লাহর নাম স্মরণ করা হয়। (সূরা হাজ্জ: ৪০)

এই আয়াতের শিক্ষা হলো, কোনো ধরনের ধর্মীয় নিপীড়ন চালানো নিকৃষ্ট কাজ। মুসলমান হোক কিংবা অন্য ধর্মাবলম্বী হোক – প্রত্যেকেই স্ব স্ব ধর্মকে হৃদয় দিয়ে ভালোবাসে। এটি মানুষের শুদ্ধ আত্মপরিচয়কে নির্ণয় করে। সে কারণে এই আয়াতে বলা হয়েছে, আল্লাহ যদি অত্যাচারীদেরকে দমন না করতেন, তাহলে যেসব উপসনালয়ে আল্লাহর নাম স্মরণ করা হয় সেগুলো ধ্বংস হয়ে যেত।

এখন দেখুন, বর্তমানে কী ঘটছে। কিছু কিছু মুসলিম নামধারী ব্যক্তি এমনকি ভিন্ন মতাবলম্বীদের মসজিদগুলোতে পর্যন্ত বোমা মারছে। এসব কর্মকাণ্ড আল্লাহ সমর্থন করেন না, এমনকি অন্য ধর্মের উপসনালয় ধ্বংসের ব্যাপার হলেও। এ কারণে নিষ্ঠাবান মুসলমানদের ইতিহাস হচ্ছে উপাসনালয়গুলোর পূর্ণ নিরাপত্তা বিধান করার ইতিহাস। এমনকি ইবাদতের ধরনের পার্থক্য কিংবা ভিন্ন কোনো ধর্মের উপাসনালয়ের ক্ষেত্রেও তারা নিরাপত্তা দিয়েছেন।

র্মীয় ভিন্নতার বাস্তবতা
ধর্মীয় ভিন্নতার বাস্তবতাকে আমাদের গ্রহণ করতে হবে। তারমানে সব ধর্ম একই রকমের নয়। বাস্তবতা হচ্ছে, লোকজন নানা ধর্মে বিভক্ত। এই পরিস্থিতিতে আপনি দাওয়াতি কাজ করতে পারেন, তথ্য আদান-প্রদান করতে পারেন। কিন্তু কেউ এ কথা বলতে পারে না, ‘আমি আমার মর্জি মতো সমাজকে পরিশুদ্ধ করবো’। কেউ কেউ এ ধরনের কাজের দলীল হিসেবে কোরআনের নিম্নোক্ত দুটি আয়াতের ভুল ব্যাখ্যা করেন:

وَقَاتِلُوهُمْ حَتَّىٰ لَا تَكُونَ فِتْنَةٌ وَيَكُونَ الدِّينُ لِلَّـهِ

ফেতনা-ফাসাদ দূরীভূত হয়ে আল্লাহর দ্বীন প্রতিষ্ঠিত না হওয়া পর্যন্ত তোমরা তাদের সাথে যুদ্ধ কর (সূরা বাকারা: ১৯৩)

কিংবা,

وَقَاتِلُوهُمْ حَتَّىٰ لَا تَكُونَ فِتْنَةٌ وَيَكُونَ الدِّينُ كُلُّهُ لِلَّـهِ

তোমরা সদা তাদের বিরুদ্ধে লড়াই করতে থাকবে যতক্ষণ না ফেতনার অবসান হয় এবং দ্বীন সম্পূর্ণরূপে আল্লাহর জন্যেই হয়ে যায় (সূরা আনফাল: ৩৯)

তারা বলতে চান, এসব আয়াতে অন্যদের অধিকার হরণের কথা বলা হয়েছে। এটাই বাস্তবতা। তাই আমাদের অন্য কিছু করার নেই।

এ ধরনের ব্যাখ্যার বিপরীতে কোরআনে অন্তত দুটি আয়াত রয়েছে:

وَلَوْ شَاءَ رَ‌بُّكَ لَجَعَلَ النَّاسَ أُمَّةً وَاحِدَةً ۖ وَلَا يَزَالُونَ مُخْتَلِفِينَ

(হে নবী,) তোমার মালিক চাইলে দুনিয়ার সব মানুষকে একই উম্মত বানিয়ে দিতে পারতেন, (কিন্তু আল্লাহ কারো ওপর তার ইচ্ছা চাপিয়ে দিতে চাননি) এ কারণে তারা হামেশাই নিজেদের মধ্যে মতবিরোধ করতে থাকবে। (সূরা হুদ: ১১৮)

وَلَوْ شَاءَ رَ‌بُّكَ لَآمَنَ مَنْ فِي الْأَرْ‌ضِ كُلُّهُمْ جَمِيعًا ۚ أَفَأَنْتَ تُكْرِ‌هُ النَّاسَ حَتَّىٰ يَكُونُوا مُؤْمِنِينَ

আর তোমার পরওয়ারদেগার যদি চাইতেন, তবে পৃথিবীর বুকে যারা রয়েছে তাদের সবাই ঈমান নিয়ে আসতে সমবেতভাবে। তুমি কি মানুষের উপর জবরদস্তি করবে ঈমান আনার জন্য? (সূরা ইউনুস: ৯৯)

এটা ঠিক, আমরা বিশ্বাস করি ইসলাম হচ্ছে সত্য ধর্ম। এটাই ছিল মহানবীর (সা) দাওয়াতের মূলকথা। এটিই শুদ্ধ ধর্ম, যেটি সুসংরক্ষিত এবং ক্রমাগতভাবে বিস্তৃতি লাভ করছে। কিন্তু তারমানে এই নয় যে, পৃথিবীতে অন্য ধর্মাবলম্বীদের কোনো স্থান নেই। আল্লাহর ইচ্ছার ফলেই ধর্মের এই বৈচিত্র্যতা বিদ্যমান। অন্যদের দায়দায়িত্ব একান্তই তাদের ব্যক্তিগত। আমাদের কর্তব্য হলো, সবার সাথে ন্যায্য আচরণ করা।

সার্বজনীন ভ্রাতৃত্ব
অন্য ধর্মাবলম্বীদের জীবনযাপন বা উপাসনা কিংবা মুসলিম কর্তৃত্বের অধীন উপাসনালয় রক্ষা করার অধিকারের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকলেই মুসলমান হিসেবে দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না। বরং সার্বজনীন ভ্রাতৃত্ব প্রতিষ্ঠার যে মহান বক্তব্য ইসলামের রয়েছে, তাও প্রতিষ্ঠা করতে হবে। এ ব্যাপারে কোরআনে কমপক্ষে দুটি আয়াত রয়েছে। সূরা নিসার প্রথম দিকে এ সংক্রান্ত একটি আয়াত রয়েছে, যা বিবাহ অনুষ্ঠানের সময়ও সাধারণত পাঠ করা হয়। আল্লাহ বলেছেন,

يَا أَيُّهَا النَّاسُ اتَّقُوا رَ‌بَّكُمُ الَّذِي خَلَقَكُمْ مِنْ نَفْسٍ وَاحِدَةٍ وَخَلَقَ مِنْهَا زَوْجَهَا وَبَثَّ مِنْهُمَا رِ‌جَالًا كَثِيرً‌ا وَنِسَاءً ۚ وَاتَّقُوا اللَّـهَ الَّذِي تَسَاءَلُونَ بِهِ وَالْأَرْ‌حَامَ ۚ إِنَّ اللَّـهَ كَانَ عَلَيْكُمْ رَ‌قِيبًا

হে মানবজাতি! তোমরা তোমাদের পালনকর্তাকে ভয় কর, যিনি তোমাদেরকে এক ব্যক্তি থেকে সৃষ্টি করেছেন এবং যিনি তার থেকে তার সঙ্গীনীকে সৃষ্টি করেছেন; আর বিস্তার করেছেন তাদের দুজন থেকে অগণিত নারী-পুরুষ আর আল্লাহকে ভয় কর, যাঁর নামে তোমরা একে অপরের নিকট অধিকার দাবি করে থাক এবং রক্তের সম্পর্কের ব্যাপারে সতর্কতা অবলম্বন কর। নিশ্চয় আল্লাহ তোমাদের ব্যাপারে সচেতন রয়েছেন। (সূরা নিসা: ১)

এখানে ‘ইয়া আইয়ুহান নাস’ তথা ‘হে মানবজাতি’ সম্বোধন করার মাধ্যমে শুধু মুসলমানদেরকেই আহ্বান করা হচ্ছে না, বরং সমস্ত মানুষের উদ্দেশ্যে আল্লাহ বক্তব্য দিচ্ছেন। বক্তব্যের শুরুতেই সমগ্র মানবজাতিকে বলা হচ্ছে, তারা যেন আল্লাহকে ভয় করে। অর্থাৎ, শুধু মুসলমানদের বলা হচ্ছে না যে – যাও, লোকদের আল্লাহকে ভয় করতে বল। এমনকি ইসলামের কাছাকাছি কোনো ধর্মের (যেমন- ইহুদী ধর্ম) কাউকেও বিশেষভাবে বলা হচ্ছে না। আবার এই বক্তব্যকে মানবজাতির প্রতি এক ধরনের হুমকি হিসেবেও বিবেচনা করার সুযোগ নেই। কারণ যিনি সবচেয়ে বড় মুত্তাকী সেই মোহাম্মদকেও (সা) কোরআনে তাকওয়া অর্জন করার জন্য বলা হয়েছে,

يَا أَيُّهَا النَّبِيُّ اتَّقِ اللَّـهَ

হে নবী! আল্লাহকে ভয় করুন। (সূরা আহযাব: ১)

এই আয়াত আমাদেরকে বিনয়ী হতে শিক্ষা দেয়। স্বয়ং নবী (সা), যিনি শ্রেষ্ঠ মুত্তাকী, তাকেও যদি এ ব্যাপারে কোরআনে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হয়; তাহলে যদি কেউ বলে, “তোমরা ভয় কর তোমাদের পালনকর্তাকে, যিনি তোমাদেরকে এক ব্যক্তি থেকে সৃষ্টি করেছেন…” তাতে আমাদের বিব্রত হওয়ার কী আছে!

এ বিষয়ে প্রাসঙ্গিক আরেকটি আয়াত রয়েছে, যা একটু আগেও আমি বলেছি। আল্লাহ তায়ালা বলেছেন,

يَا أَيُّهَا النَّاسُ إِنَّا خَلَقْنَاكُم مِّن ذَكَرٍ وَأُنثَىٰ وَجَعَلْنَاكُمْ شُعُوبًا وَقَبَائِلَ لِتَعَارَ‌فُوا ۚ إِنَّ أَكْرَ‌مَكُمْ عِنْدَ اللَّـهِ أَتْقَاكُمْ ۚ إِنَّ اللَّـهَ عَلِيمٌ خَبِيرٌ‌

হে মানবজাতি! আমি তোমাদেরকে এক পুরুষ ও এক নারী থেকে সৃষ্টি করেছি এবং তোমাদেরকে বিভিন্ন জাতি ও গোত্রে বিভক্ত করেছি, যাতে তোমরা পরস্পর পরিচিত হতে পারনিশ্চয় আল্লাহর কাছে সে-ই সর্বাধিক সম্ভ্রান্ত যে সর্বাধিক পরহেযগার। নিশ্চয় আল্লাহ সর্বজ্ঞ, সবকিছুর খবর রাখেন। (সূরা হুজরাত: ১৩)

আল্লাহ মানুষকে বিভিন্ন জাতি ও গোত্রে ভাগ করেছেন। এর কারণ কী হতে পারে? কোনো জাতি বা গোত্র নিজেদেরকে অন্যদের থেকে শ্রেষ্ঠ দাবি করার জন্যে? নাকি, অন্যদের উপর নিজেদের অন্যায় শাসন প্রতিষ্ঠা করার জন্যে? এর কোনোটার জন্যেই আল্লাহ এটি করেননি। এই বিভাজন না হলে আমরা অন্যকে চিনতাম না, আমাদেরকেও অন্যরা চিনত না। একে অপরকে চেনা তথা পারস্পরিক স্বীকৃতির জন্য আল্লাহ এটি করেছেন। এবং তিনি বলে দিয়েছেন, আল্লাহভীতির উপরই নির্ভর করবে মর্যাদাগত শ্রেষ্ঠত্ব।

আমি চ্যালেঞ্জ করে বলতে পারি – কোরআনের এই আয়াতে সার্বজনীন ভ্রাতৃত্বকে ব্যাখ্যা করার জন্য ধর্ম ও মতাদর্শের ব্যাপারে নিরপেক্ষ থেকে অতি সংক্ষেপে যে চমৎকার বক্তব্য দেয়া হয়েছে, তা অন্য কোনো ধর্ম বা দর্শন দিতে পারেনি।

উপরোক্ত আয়াতটি তেলাওয়াত করার সময় আমি এমন একটি ফুলের তোড়ার কথা কল্পনা করি, যার ফুলগুলো লাল, সাদা, গোলাপীসহ বিভিন্ন রঙের। এককভাবে প্রত্যেকটি ফুলই সুন্দর, কিন্তু সবগুলো ফুল মিলে তৈরি হওয়া তোড়াটির সৌন্দর্যই বেশি। বহু রঙের বৈচিত্র্য থাকায় এতে বিরক্তি আসে না। ঠিক এভাবেই আল্লাহ তায়ালা মানুষ, ফুল, পশুপাখিসহ যাবতীয় সৃষ্টির মধ্যেও বৈচিত্র্যতা দিয়েছেন। এমনকি কোরআনে ভিন্ন ভিন্ন রঙের পাহাড়ের কথা বলা হয়েছে,

وَمِنَ الْجِبَالِ جُدَدٌ بِيضٌ وَحُمْرٌ مُّخْتَلِفٌ أَلْوَانُهَا وَغَرَابِيبُ سُودٌ

পর্বতসমূহের মধ্যে রয়েছে বিভিন্ন বর্ণের গিরিপথ সাদা, লাল ও নিকষ কালো(সূরা ফাতির: ২৭)

শেষ পর্ব পড়তে ক্লিক করুন

আইয়ুব আলী
আইয়ুব আলী
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগে অধ্যয়নরত

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *