মঙ্গলবার, নভেম্বর ২১, ২০১৭
হোম > বই অনুবাদ > ইউসুফ আল কারযাভী: ইসলাম ও আধুনিকতা (পর্ব ৩)

ইউসুফ আল কারযাভী: ইসলাম ও আধুনিকতা (পর্ব ৩)

এডিটর’স নোট:

সমসাময়িক বিশ্বে সবচেয়ে প্রভাবশালী ইসলামী স্কলারদের মধ্যে ইউসুফ আল কারযাভী শীর্ষস্থানীয় একজন। কারযাভীকে নিয়ে Yusuf Al-Qaradawi: Islam and Modernity শীর্ষক একটি গবেষণামূলক বই লিখেছেন স্যামুয়েল হেলফন্ট। ২০০৯ সালে তেল আবিব বিশ্ববিদ্যালয়ের মোশে দায়ান সেন্টার থেকে এটি প্রকাশিত হয়। আমরা বইটির অংশবিশেষের ধারাবাহিক অনুবাদ প্রকাশ করছি। অনুবাদ করেছেন আইয়ুব আলী। আজ  ছাপা হলো তৃতীয় পর্ব।


অন্যান্য পর্ব: প্রথম পর্ব, দ্বিতীয় পর্ব এবং  চতুর্থ পর্ব


দ্বিতীয় অধ্যায়: কারযাভীর দৃষ্টিতে আধুনিকতা

বিজ্ঞান প্রযুক্তি

কারযাভীর মতো আধুনিক ইসলামী চিন্তাবিদদের নিকট বিজ্ঞান অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ও প্রশ্নসাপেক্ষ একটি বিষয়। একদিকে বিজ্ঞানকে পাশ কাটিয়ে ইসলামী পুনর্জাগরণ সম্ভব নয়, অন্যদিকে বিজ্ঞান সবসময়ই কোনো না কোনো সমস্যা বা সন্দেহ উপস্থাপন করে। যে ব্যক্তি কোরআনকে নাযিলকৃত চূড়ান্ত সত্য হিসেবে বিশ্বাস করে, এমনকি তার কাছেও। এই দিকটি ইঙ্গিত করে বাসাম তিবি বলেন, “পশ্চিমা বিজ্ঞান দীর্ঘ সময় ধরে কার্টিজিয়ান নীতি অনুসরণ করে চলছে। এই নীতিতে ‘সন্দেহ ও অনুমান’কে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতির অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হিসেবে দেখা হয়।” যাইহোক, “যে সকল বিজ্ঞানী ইসলামী বিশ্বদৃষ্টিকে পুরোপুরি ধারণ করে … তারা এই ‘জ্ঞানতাত্ত্বিক প্রক্রিয়া’ তথা সন্দেহ ও অনুমানকে এ কারণে প্রত্যাখ্যান করেন যে, ‘পবিত্র কুরআন হচ্ছে পরিপূর্ণ এবং চূড়ান্ত ওহী’।”[1]

আধুনিক ইসলামী চিন্তাবিদরা এই সমস্যাটিকে বিভিন্নভাবে মোকাবেলা করেছেন। তালবী ও শাহরুরের মতো কয়েকজন মুসলিম চিন্তাবিদ এমন একটি ইসলামী পুনর্জাগরণের (enlightenment) কথা বলেছেন, যেখানে ইসলামের মৌলিক বিষয়গুলো পুনর্মূল্যায়ন করা হবে। এই ধারার চিন্তাবিদরা “ধর্মশাস্ত্রবাদকে (scripturalism) অগ্রাহ্য করেন এবং মুসলমানদেরকে ধর্মগ্রন্থের উপর নির্ভরতার (the authority of the text) পরিবর্তে যুক্তিবোধের উপর নির্ভরশীল হওয়ার পরামর্শ দেন।”[2]

অন্যান্য মুসলিমরা এ ব্যাপারে কট্টর মনোভাব পোষণ করেন। সৌদি অর্থায়নে পরিচালিত ওয়াশিংটনভিত্তিক International Institute of Islamic Thought (IIIT) এমনই একটি প্রতিষ্ঠান। এটি ‘বিজ্ঞানের ইসলামীকরণ’ এবং এক ধরনের ‘ইসলামী প্রযুক্তি’ গড়ে তোলার কথা বলে। এই সংস্থাটি “ইসলামের উপর ভিত্তি করে জ্ঞানের পুনর্বিন্যাস করার চেষ্টা করছে। বিদ্যমান জ্ঞানকে বিন্যস্ত করে কোন উপায়ে এই জ্ঞান অর্জিত হলো এবং এগুলো কীভাবে পরস্পর সম্পর্কিত – তা যাচাই করার চেষ্টা করে।”[3] এসব করতে গিয়ে অর্থাৎ ওহীর আলোকে (revealed truth) মহাবিশ্বকে বুঝার চেষ্টা করার মাধ্যমে তারা মূলত বিজ্ঞানের অনেক মৈালিক ধারণার প্রতি চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিয়েছে।

যারা একটি ইসলামী পুনর্জাগরণ প্রয়োজন রয়েছে বলে মনে করেন (যেমন, তালবী ও শাহরুর), অথবা যারা বিজ্ঞানের ইসলামীকরণের (IIIT) জন্যে কাজ করছেন – এই দুই পক্ষই মনে করছেন যে, ওহী ও বিজ্ঞানের মধ্যে এক ধরনের সহজাত বিরোধ রয়েছে। সকল মুসলিম চিন্তাবিদ এই ধারণাকে সমর্থন করেন না। প্রখ্যাত পাকিস্তানী চিন্তাবিদ হোসেইন আল সদর মনে করেন, ইসলাম ও বিজ্ঞানের মধ্যে কোনো প্রকার বিরোধ নেই। তার মতে, “ইসলামে জ্ঞানচর্চাই চূড়ান্ত ব্যাপার নয়। বরং জ্ঞানচর্চা হচ্ছে স্রষ্টাকে উপলব্ধি করা এবং মুসলিম সমাজের সমস্যা সমাধানের একটা উপায় মাত্র। … ইসলামী সমাজে বিচার-বিবেচনাবোধ (reason) এবং জ্ঞানচর্চা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, তবে এগুলো কোরআনের মূল্যবোধ ও নৈতিকতার অধীন।”[4]

ইসলাম ও বিজ্ঞান সম্পর্কে সদরের এই অভিমতটি মূলত কারযাভীর অবস্থানের কাছাকাছি। ইসলাম ও বিজ্ঞানের সামঞ্জস্যতার ব্যাপারে যে কোনো সন্দেহ নেই, তা তিনি বিভিন্ন ফতোয়ায় তুলে ধরেছেন। যেমন তিনি লিখেছেন,

ইসলাম বিজ্ঞানের অগ্রগতি ও গবেষণাকে স্বাগত জানায়। ইসলামের ইতিহাসের কোথাও ইসলাম ও বিজ্ঞানের মাঝে বিরোধের কোনো প্রমান পাওয়া যায় না। প্রকৃতপক্ষে, ইসলামের দৃষ্টিতে, বিজ্ঞানের প্রতিটি শাখায় উন্নতি অর্জন করা জাতির জন্যে ফরজে কেফায়া বা সামষ্টিক কর্তব্য। তবে এই অগ্রগতি অবশ্যই ধর্মবিশ্বাসের সাথে সাংঘর্ষিক হবে না।[5]

আধুনিক বিজ্ঞান নিয়ে তার এ অভিমত মূলত কোরআনের সূরা আন নাহলের ৮ নং আয়াতের উপর প্রতিষ্ঠিত। সেখানে বলা হয়েছে, “তোমাদের আরোহণের জন্যে এবং শোভার জন্যে তিনি ঘোড়া, খচ্চর ও গাধা সৃষ্টি করেছেন। আর তিনি এমন জিনিস সৃষ্টি করেন যা তোমরা জান না।”

এ আয়াতে, “যা তোমরা জান না” বাক্যাংশ দ্বারা আধুনিক সময়ের “গাড়ি, ট্রেন, বিমান ও মহাকাশযানের”[6] প্রতি ইঙ্গিত করা হয়েছে বলে কারযাভী মনে করেন। একইসাথে “বিজ্ঞানের অগ্রগতি”[7]কেও নির্দেশ করা হতে পারে বলে কারযাভী অভিমত ব্যক্ত করেন।

অন্যদিকে, আধুনিক প্রযুক্তি সম্পর্কিত আলোচনায় কারযাভী কোরআনের আক্ষরিক অর্থের চেয়ে মর্মার্থকেই বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন। উদাহরণ হিসেবে সূরা আনফালের ৬০ নং আয়াতের উল্লেখ করা যায়, যেখানে বলা হয়েছে, “তাদের (সাথে যুদ্ধের) জন্যে তোমরা যথাসাধ্য সাজ-সরঞ্জাম, শক্তি ও ঘোড়া প্রস্তুত রাখবে এবং এ দিয়ে তোমরা আল্লাহর দুশমন ও তোমাদের দুশমনদের ভীত-সন্ত্রস্ত করে দেবে।”

এ আয়াতে জিহাদের জন্য ঘোড়া পালনকে উৎসাহিত করা হয়েছে। এক্ষেত্রে কারযাভীর ভাষ্য হচ্ছে,

এটি এ কারণে যে, তখন ঘোড়া ছিল সামরিক যান। এখন আর এটি প্রাসঙ্গিক নয়। যুগের পরিবর্তনের ফলে নির্দিষ্ট কিছু অঞ্চল ছাড়া আর কোথাও যুদ্ধক্ষেত্রে ঘোড়া কাজে আসে না। বরং এখনকার যুদ্ধে ট্যাংক, সামরিক যান এবং এ ধরনের উন্নত সব সমরাস্ত্র ব্যবহৃত হয়। আমরা বলতে পারি, এগুলোই বর্তমানকালের ঘোড়া। বর্তমানে যারা এসব যথাযথভাবে ব্যবহার করতে পারে, তারাই এ যুগের অশ্বারোহী।[8]

উদারনৈতিক সংস্কারের পক্ষে তালবী যে ধরনের যুক্তি দিয়েছেন, এক্ষেত্রে কারযাভীর পদ্ধতিটাও অনেকটা তেমন। তালবীর মতো কারযাভীও কোরআনের আয়াতের মূলনীতিকে গ্রহণ করেন এবং বর্তমান আধুনিক বিশ্বে তা প্রয়োগ করেন। এই দৃষ্টিতে জিহাদের জন্যে আধুনিক প্রযুক্তির উদ্ভাবন একটি ভালো কাজ।

তবে এটি মনে রাখা দরকার, কারযাভী নিছক পশ্চিমা প্রযুক্তি আত্মীকরণের চেয়েও বেশি কিছু চান। তিনি চান, মুসলমানরা নিজেরাই এক্ষেত্রে বিশেষজ্ঞ হয়ে উঠুক। এ জন্যে তিনি শিক্ষাক্ষেত্রে সংস্কার চান। গতানুগতিক ইসলামী জ্ঞান অর্জনের জন্যে মুসলিম তরুণদের আধুনিক বিজ্ঞান অধ্যয়ন ছেড়ে দেয়া প্রসঙ্গে কারযাভী একটি ফতোয়া দেন। তিনি বলেন, বিজ্ঞান অধ্যয়ন করা “এমন একটা বিষয় যা এড়িয়ে যাবার কোনো সুযোগ নেই। এরমধ্যে রয়েছে গণিত, জ্যোতির্বিজ্ঞান, পদার্থবিজ্ঞান, রসায়নবিজ্ঞান, ভূতত্ত্ববিজ্ঞান, জীববিজ্ঞান, সমুদ্রবিজ্ঞান, মরুবিজ্ঞান, মনোবিজ্ঞানসহ বিজ্ঞানের অন্যান্য শাখা।”[9] তার মতে, অতীতের ইসলামী স্কলারদের ভিন্ন বক্তব্য থাকলেও আধুনিক সময়ের দাবি হচ্ছে, মুসলমানরা নিজেদেরকে সময়োপযোগী করে গড়ে তুলতে হবে। তার বক্তব্য হচ্ছে,

বর্তমানে বিভিন্ন জাতির মধ্যে বিজ্ঞানের বিভিন্ন ক্ষেত্রে তীব্র প্রতিযোগিতা চলছে। প্রত্যেকেই অন্যের চেয়ে এগিয়ে থাকতে চাইছে। একইসাথে, নাগরিকরাও এই প্রতিযোগিতায় অন্যদেরকে ছাড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ পাচ্ছে। কোনো জাতি যদি এসব ব্যাপারে গবেষণা ও গভীর অনুসন্ধান না করতো তাহলে আমরা আজ পরমাণুর বিভাজন, মহাশূন্য অভিযান, কম্পিউটারবিজ্ঞানের বিপ্লব, ইন্টারনেট, তথ্যপ্রযুক্তি, জীববিদ্যা, যোগাযোগ ব্যবস্থাসহ আরো অনেক ক্ষেত্রে এতসব অগ্রগতি দেখতে পারতাম না। এই সমস্ত অর্জনই আধুনিক যুগকে স্বাতন্ত্র্য দিয়েছে।[10]

কোনো কোনো ইসলামী মৌলবাদী মনে করতে পারেন যে, কারযাভীর এ আহ্বান শুধু বৈজ্ঞানিক জ্ঞান অর্জনের জন্যে, বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি ব্যবহারের জন্য নয়। কিন্তু তিনি বিষয়ের আরো গভীরে গিয়েছেন। তিনি শিক্ষাব্যবস্থাকে সম্পূর্ণ নতুন কাঠামোর আলোকে গড়ে তোলার আহ্বান জানিয়েছেন। এ ব্যাপারে তার যুক্তি হলো, “আরব এবং অন্যান্য মুসলিম দেশে আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা এখন পর্যন্ত কোনো কিছু বুঝা বা উপলব্ধি করার চেয়ে অনেক বেশি মুখস্তবিদ্যা নির্ভর।” আর তাই “আমাদেরকে অবশ্যই শিক্ষাব্যবস্থার লক্ষ্য-উদ্দেশ্য ও পদ্ধতি পরিবর্তন করতে হবে।”[11] এ কথা পরিস্কার যে, কারযাভী এক ধরনের মুক্তচিন্তার কথা বলেছেন। তারপরেও বিজ্ঞান কী করতে পারবে তা বলে দেয়ার মাধ্যমে এর সীমা নির্ধারণ করে দিচ্ছেন। তার বক্তব্য হচ্ছে, জ্ঞান অবশ্যই “ধর্মবিশ্বাস দ্বারা লালিত এবং কিছু মূলনীতি ও পদ্ধতি দ্বারা পরিচালিত হতে হবে।”[12] এ বক্তব্য আইআইআইটি’র বিজ্ঞানের ইসলামীকরণ ধারণার বিপরীত। জ্ঞান কীভাবে নির্মাণ হচ্ছে তা নিয়ে কারযাভীর তেমন আপত্তি নেই। বরং জ্ঞান কীভাবে ব্যবহৃত হওয়া উচিত, সেটা নিয়ে তিনি কাজ করেছেন। উদাহরণ হিসেবে তার এই বক্তব্য প্রাসঙ্গিক:

পাশ্চাত্যে ধর্মীয় বিশ্বাস ও জ্ঞানের মধ্যে পৃথকীকরণের কারণে সামরিক ক্ষেত্রে গণবিধ্বংসী পারমাণবিক, রাসায়নিক ও জৈবিক অস্ত্রের উন্নয়নের ফলে সেই জ্ঞান পুরো বিশ্বের জন্যে মারাত্মক হুমকি হয়ে উঠেছে। এছাড়া ধর্মবিশ্বাসবিচ্ছিন্ন জ্ঞান অনিরাপদ ও অবৈধ মাদকদ্রব্য উৎপাদনেও ভূমিকা রাখছে। আর এগুলো তারাই বাজারজাত করছে, সৃষ্টিকর্তার প্রতি যাদের কোনো ভয় নেই এবং সৃষ্টিকর্তার সৃষ্টির প্রতিও যাদের কোনো মমতা নেই।[13]

এই উদ্ধৃতি থেকেও এটি পরিস্কার, কারযাভী বৈজ্ঞানিক পদ্ধতির ব্যাপারে প্রশ্ন তোলেননি। বরং তিনি বিজ্ঞান ও যুক্তির (reason) পেছনের মূলনীতিকে গুরুত্ব দিচ্ছেন।[14] বিজ্ঞান কী করতে পারে তা নয়, বরং বিজ্ঞানের কী করা উচিত – সেই মানদণ্ড নির্ধারণের ব্যাপারে তিনি আগ্রহী। যাইহোক, বিজ্ঞান সংক্রান্ত কারযাভীর চিন্তায় একটা তাৎপর্যপূর্ণ ব্যতিক্রম আছে। বিজ্ঞান কোরআনের সাথে সরাসরি সাংঘর্ষিক হতে পারে – কারযাভী এমনটা মনে করেন না। তারপরেও বিবর্তন তত্ত্বের মতো বিষয়গুলোতে তিনি সমস্যা দেখতে পান।

আসলে কারযাভী বৈজ্ঞানিক পদ্ধতির মৌলিক নীতিমালা মেনে নিলেও এর ফলাফলকে সবসময় মেনে নিতে নারাজ। ‘পোকেমন’ ভিডিও গেম নিষিদ্ধ করে দেওয়া সংক্রান্ত এক ফতোয়ায় কারযাভী ডারউইনিজমের বিপক্ষে যুক্তি দিয়েছেন। তিনি বলেছেন,

এই কার্টুনে বিদ্যমান উপাদানসমূহ মুসলমানদের ধর্মবিশ্বাসের বিপরীত। এটি পরোক্ষভাবে ডারউইনের বিতর্কিত বিবর্তনবাদকেই সমর্থন করে। এই তত্ত্বের মূল কথা হচ্ছে, প্রতিটি জীবসত্ত্বাই ধারাবাহিক বিবর্তনের মধ্য দিয়ে যায়। এর মানে হলো, বিদ্যমান প্রজাতি নতুন পারিপার্শ্বিক অবস্থার প্রেক্ষিতে অভিযোজনের মাধ্যমে নতুন প্রজাতির উদ্ভব ঘটায়। এই তত্ত্ব অনুযায়ী, প্রথমে একটি সরল আকৃতি বিবর্তনের মাধ্যমে একটি বানর প্রজাতিতে উন্নীত হয়। ধারণা করা হয়, এই প্রজাতি মানুষের আকৃতির খুব কাছাকাছি ছিল। তারপর সেখান থেকে ধারাবাহিক বিবর্তন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে পরিবর্তিত হয়ে মানুষ বর্তমান পর্যায়ে এসে পৌঁছেছে। এই কার্টুনে চিত্রিত পোকামাকড়ের চরিত্রে ডারউইনের তত্ত্ব অর্থাৎ ধারাবাহিক বিবর্তনের বৈশিষ্ট্য রয়েছে। তার মানে কার্টুনটির মাধ্যমে শিশুদের মনে ধীরে ধীরে এই তত্ত্বটির অনুপ্রবেশ ঘটানোর চেষ্টা করা হচ্ছে।[15]

এখানে এটি পরিষ্কার যে, পূর্বে উল্লেখিত বৈজ্ঞানিক ‘সন্দেহ ও অনুমান’ সংক্রান্ত ধারণাটি এতক্ষণে প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠেছে। কোরআনের সাথে সাংঘর্ষিক না হওয়া পর্যন্ত কারযাভী এগুলোকে যৌক্তিক প্রক্রিয়া হিসেবে গ্রহণ করেছেন। বির্তন তত্ত্বের বিপক্ষে যুক্তি দেয়ার পাশাপাশি কারযাভী এটা বলাও গুরুত্বপূর্ণ মনে করেন যে, আধুনিক বিজ্ঞান ঐশ্বরিক সৃষ্টিজগতের মূলনীতির সাথে সাংঘর্ষিক কিছু করতে পারে না। ক্লোনিংকে নিষিদ্ধ করে দেওয়া এক ফতোয়ায় কারযাভী ব্যাপারটি স্পষ্ট করেছেন:

এই প্রক্রিয়াটিকে কখনোই এক ধরনের সৃষ্টি কিংবা পুনঃসৃষ্টি হিসেবে বিবেচনা করা যায় না। বরং এই প্রক্রিয়াটি ক্লোন করার নামে কোনো প্রজাতির ডিম্বকোষের নিউক্লিয়াসকে ধ্বংস করার নামান্তর। এ প্রক্রিয়ায় একই প্রজাতির একটি প্রাণীর দেহকোষ থেকে নিউক্লিয়াসকে পৃথক করা হয়। তারপর এই বিচ্ছিন্ন নিউক্লিয়াসকে ডিম্বকোষে প্রবেশ করানো হয়। নতুন নিউক্লিয়াস নিয়ে গঠিত ডিম্বানু থেকে এমন একটি প্রাণীর উৎপত্তি হয়, যার বংশগতি হুবুহু নিউক্লিয়াস দাতা প্রাণীর অনুরূপ।[16]

ক্লোনিং করা অনুমোদিত কিংবা নিষিদ্ধ কিনা – ফতোয়ার এই অংশটি সে প্রশ্নের জবাব নয়। তবুও ক্লোনিংয়ের প্রসঙ্গ আসলে পরিষ্কারভাবে এটি ব্যাখ্যা করা কারযাভীর জন্যে খুবই গুরুত্বপূর্ণ যে, ক্লোনিং আদতে কোনো সৃষ্টি নয়। একে সৃষ্টি মনে করলে আল্লাহকে সৃষ্টিকর্তা হিসেবে বলা কোরআনের মূলনীতির সাথে এটি সরাসরি সাংঘর্ষিক হয়ে পড়ে।

এই উদ্বৃতির আরেকটি আকর্ষনীয় দিক হচ্ছে, কোনো ধর্মীয় বিষয় আলোচনা করতে গিয়ে কারযাভী বৈজ্ঞানিক ভাষা ব্যবহার করেছেন। এই উপস্থাপনার ফলে আধুনিক শ্রোতারা কারযাভীর বিজ্ঞান বিষয়ক মতামতের ব্যাপারে আস্থা রাখবেন। কারযাভী জানেন যে, ইসলাম অন্যান্য মতাদর্শগুলোর সাথে প্রতিযোগিতা করছে। যদি তার বক্তব্য সার্বজনীন নীতিমালা অনুযায়ী না হয়, তাহলে আরো বেশি বুদ্ধিবৃত্তিক বক্তব্যসম্পন্ন মতাদর্শের দিকে তার অনুসারীরা ছুটবে। এছাড়া এই ধারায় কোনো আধুনিক বিষয়ে ফতোয়া দিতে গিয়ে কারযাভী অন্যান্য ‘নন-ইসলামিক’ পদ্ধতিও ব্যবহার করেছেন। যেমন, একবার একজন নাইজেরিয়ান আলেম ফতোয়া দিয়েছিলেন, শিশুদের পোলিও টিকা দেওয়া উচিত নয়। তখন কারযাভী তার সাথে দ্বিমত পোষণ করে একটি ফতোয়া দেন। তিনি কুরআনের রেফারেন্স দেওয়ার পাশাপাশি আরো বলেন, এই প্রতিষেধক নিরাপদ কিনা সে ব্যাপারে নিশ্চিত হতে তিনি বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সাথে আলোচনা করেছেন।[17]

বিজ্ঞানকে অবশ্যই একটি নৈতিক কাঠামোর মধ্যে রাখতে হবে –পাশ্চাত্যের যে সকল বুদ্ধিজীবী, বিজ্ঞানী এবং রাজনীতিবিদ এই পয়েন্টে একমত, এ দাবি করার সময় কারযাভী তাদেরকেও উদ্বৃত করেন। জন জেউই, আরনল্ড টয়েনবি, জন স্টেইনবেক, অ্যালেক্সি কাহেল, হ্যানরি লিংক, জন ফস্টার ডালাস, এমনকি প্রেসিডেন্ট উড্রু উইলসনকেও তিনি উদ্বৃত করেছেন।[18] এটি শুধুমাত্র কথার কথা নয়, বরং তারচেয়েও বড় সত্য হচ্ছে, পশ্চিমাদের মতেও তাদের সমাজ ত্রুটিহীন নয়। এসব বিজ্ঞানী, লেখক এবং রাজনীতিবিদদের গ্রহণযোগ্যতার বিষয়টি কারযাভীর বক্তব্যকে তার শ্রোতাদের নিকট অধিকতর আকর্ষণীয় করে তুলেছে।

যাইহোক, তারমানে এই নয় যে, কারযাভী তথ্যের আন্তঃসাংস্কৃতিক প্রবাহের সকল দিককে পছন্দ করতেন। বাস্তবে, সংস্কৃতি ও মূল্যবোধ – উভয় অর্থেই তিনি বিশ্বায়নের ঘোর বিরোধী। আল জাজিরাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছেন, অতীতে আমরা জাহেলী যুগের রীতিনীতি প্রচলিত হয়ে যাওয়ার ব্যাপারে সতর্ক থাকতাম। আর এখন আমরা পশ্চিমা সংস্কৃতি নিয়ে বিচলিত। বৈশ্বিক সংস্কৃতি তথা বিশ্বায়নের অজুহাতে পাশ্চাত্য তাদের সংস্কৃতি, মতাদর্শ ও দর্শন আমাদের উপর চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করছে।[19]

অন্যান্য সংস্কৃতির কোনটা গ্রহণযোগ্য আর কোনটা বর্জনীয়, তা যাচাই করতে কারযাভী ইসলামকে মানদণ্ড হিসেবে বিবেচনা করেছেন। পাশ্চাত্যে গড়ে ওঠা কোনো আইডিয়া তার দৃষ্টিতে আধুনিক ইসলামের জন্যে সহায়ক হলে তিনি তা অনুমোদন করেন, অন্যথায় প্রত্যাখ্যান করেন।

রেফারেন্স ও নোট:

[1] Tibi, p. 74.

[2] Ibid., p. 90.

[3] Ibid., p. 89.

[4] Ibid., pp. 74-5.

[5] Yusuf al-Qaradawi, “Cloning and its Dangerous Impacts,” Islam Online (29 December 2002), <http://www.islamonline.net/servlet/Satellite?pagename=IslamOnline-English-Ask_Scholar/FatwaE/FatwaE&cid=1119503544346> (accessed 2 July 2007)

[6] Al-Jazeera Television. “Life and Religion: Islamic Cleric al-Qaradawi Says Internet Part of ‘Contemporary Jihad,’” (3 October 2004) BBC Monitor, (accessed 7 October 2004).

[7] Yusuf al-Qaradawi, “Has Western Civilization Brought any Comfort?” Islam Online, (12 May 2003), <http://www.islamonline.net/servlet/Satellite?pagename=IslamOnline-English-Ask_Scholar/FatwaE/FatwaE&cid=1119503545256> (accessed 2 July 2007).

[8] Yusuf al-Qaradawi. “Raising Horses and Today’s Modern Weapons,” Islam Online, (7 March 2005), <http://www.islamonline.net/servlet/Satellite?pagename=IslamOnline-English-Ask_Scholar/FatwaE/FatwaE&cid=1119503549564 > (accessed July 2007).

[9] Yusuf al-Qaradawi, “Deserting Worldly Sciences for Religious Studies.” Islam Online (4 December 2006), <http://www.islamonline.net/servlet/Satellite?pagename=IslamOnline-English-Ask_Scholar/FatwaE/FatwaE&cid=1119503548870> (accessed 2 July 2007).

[10] Ibid.

[11] Qatar TV, “Live Sermon from Umar Bin-al-Khattab Mosque in Doha,” (28 April 2006), BBC Monitoring: Near/Middle East: Round-Up of Friday Sermons for 28 Apr 06, (accessed 02 May 2006).

[12] Yusuf al-Qaradawi, “Deserting Worldly Sciences for Religious Studies.”

[13] Ibid.

[14] মুরতাদ সংক্রান্ত বিষয়টি চিন্তার স্বাধীনতার ক্ষেত্রে একটি উল্লেখযোগ্য বাধা, যা পরবর্তী অধ্যায়ে আলোচনা করা হবে।

[15] Yusuf al-Qaradawi, “Pokemon Games,” Islam Online, (30 December 2003), <http://www.islamonline.net/servlet/Satellite?pagename=IslamOnline-English-Ask_Scholar/FatwaE/FatwaE&cid=1119503543930> (accessed 5 July 5 2007).

[16] Yusuf al-Qaradawi, “Cloning and its Dangerous Impacts.”

[17] Yusuf al-Qaradawi, “Preventing Child Vaccines: Permissible?” Islam Online, (1 January 2006), <http://www.islamonline.net/servlet/Satellite?pagename=IslamOnline-English-Ask_Scholar/FatwaE/FatwaE&cid=1119503548088> (accessed 3 July 2007).

[18] Yusuf al-Qaradawi, “Has Western Civilization Brought any Comfort?”

[19] Al-Jazeera Television, “Life and Religion: Al-Jazeera Interviews Muslim Scholar on Women’s Rights within Islam, Doha Bomb,” (20 March 2005), BBC Monitoring, (accessed 24 March 2005).

আইয়ুব আলী
আইয়ুব আলী
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগে অধ্যয়নরত

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *