মঙ্গলবার, নভেম্বর ২১, ২০১৭
হোম > বই অনুবাদ > ইউসুফ আল কারযাভী: ইসলাম ও আধুনিকতা (পর্ব ২)

ইউসুফ আল কারযাভী: ইসলাম ও আধুনিকতা (পর্ব ২)

এডিটর’স নোট:

সমসাময়িক বিশ্বে সবচেয়ে প্রভাবশালী ইসলামী স্কলারদের মধ্যে ইউসুফ আল কারযাভী শীর্ষস্থানীয় একজন। কারযাভীকে নিয়ে Yusuf Al-Qaradawi: Islam and Modernity শীর্ষক একটি গবেষণামূলক বই লিখেছেন স্যামুয়েল হেলফন্ট। ২০০৯ সালে তেল আবিব বিশ্ববিদ্যালয়ের মোশে দায়ান সেন্টার থেকে এটি প্রকাশিত হয়। আমরা বইটির অংশবিশেষের ধারাবাহিক অনুবাদ প্রকাশ করছি। অনুবাদ করেছেন আইয়ুব আলী। আজ  ছাপা হলো দ্বিতীয় পর্ব।


অন্যান্য পর্ব: প্রথম পর্ব, তৃতীয় পর্ব এবং  চতুর্থ পর্ব


অধ্যায়

কারযাভীর দৃষ্টিতে আধুনিকতা

আধুনিকতার ব্যাপক প্রচার ও প্রসারে সবচেয়ে বেশি অবদান রেখেছে বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, উন্নয়ন ও গণমাধ্যম। এতে অবাক হওয়ার কিছু নেই যে, কারযাভীকে প্রায়ই এসব বিষয় নিয়ে কাজ করতে হয়। ইসলামী জগতে কারযাভী মধ্যপন্থী হিসেবে পরিচিত হওয়ায় প্রথমে তার বিশ্বদৃষ্টি (worldview) সম্পর্কে সংক্ষেপে আলোচনা করা হবে। একইসাথে ইসলামী মধ্যপন্থা এবং কারযাভীর উপর এর প্রভাব পর্যালোচনা করা হবে।

কারযাভী ইসলামী মধ্যপন্থা

ইসলামী জ্ঞানের জগতে বেশ কিছু বিষয়ে কারযাভী তাৎপর্যপূর্ণ অবদান রেখেছেন। তবে মধ্যপন্থী চিন্তাধারার (ওয়াসাতিয়া) প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে তিনি সবচেয়ে বেশি পরিচিত। স্যাগি পলকা তার পিএইচডি অভিসন্দর্ভের উপর ভিত্তি করে লেখা এক নিবন্ধে এ বিষয়ে বিস্তৃত আলাপ করেছেন। তার মতে, আল কোরআনের সূরা বাকারার ১৪৩ নং আয়াতকে ভিত্তি করে কারযাভীর চিন্তাধারা গড়ে ওঠেছে:

“আমি তোমাদেরকে একটি মধ্যপন্থী জাতি হিসেবে পাঠিয়েছি যাতে করে তোমরা মানবজাতির জন্যে সাক্ষ্যদাতা হও এবং যাতে রসূল তোমাদের জন্য সাক্ষ্যদাতা হন।”

‘একটি মধ্যপন্থী জাতি’র ব্যাখ্যা হতে পারে, খ্রিষ্টানদের চরম বৈরাগ্যবাদ এবং কোনো কোনো নবীকে হত্যা করার ব্যাপারে ইহুদীদের বেপরোয়া ভাব – ইসলামী জাতি ধর্মীয় অর্থে এই দুইয়ের মাঝামাঝি একটা ব্যাপার।

কোরআনের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, ‘সাক্ষ্যদাতা’ মানে হচ্ছে রাসূলের প্রতিনিধি হিসেবে প্রত্যেক ব্যক্তি স্বীয় জাতির কাছে আল্লাহর বাণী দৃঢ়তার সাথে প্রচার করা, তারা তা প্রত্যখ্যান করলেও।[1]

মধ্যপন্থী ধারাকে সংজ্ঞায়িত করতে গিয়ে পলকা সাতটি মূলনীতির কথা বলেছেন:

সালাফপন্থা তাজদীদ: মধ্যপন্থীরা এ ধারণা পোষণ করেন, “সালাফপন্থা[2] এবং তাজদীদের[3] মধ্যে কিছু যৌক্তিক সমন্বয় রয়েছে।” ইসলামের পূর্বপূরুষদের পথে ফিরে যাওয়াকে সালাফপন্থা এবং সংস্কারকে তাজদীদ হিসেবে সাধারণত বিবেচনা করা হয়। কারযাভী দাবি করেন, এই দুই দৃষ্টিভঙ্গিকে সমন্বয় করে আধুনিক যুগের মুসলিমরা ইসলামী অতীতকে যথাযথভাবে বুঝতে পারলে তাদের মর্যাদা ফিরে পাবে। কারযাভীর নিকট এই পরিভাষা দুটি সুসঙ্গতিপূর্ণ। তিনি এটিও মনে করেন যে, যারা একপেশে কথা বলছে তারা মূলত সেকেলে ধ্যান-ধারণায় বিশ্বাসী (anachronistic)। এর কারণ হলো তারা নতুনত্বকে মেনে নিতে অপারগ।[4]

বিশ্বাসের সংকীর্ণতা ব্যাপকতা: অন্যান্য রক্ষণশীল চিন্তাবিদগণ ইসলামকে শুধু ব্যক্তিগত বিশ্বাস ও কতিপয় ধর্মীয় ইবাদতের সমষ্টি মনে করে। তাদের বিপরীতে মধ্যপন্থীরা মনে করে, ইসলাম হচ্ছে জীবনযাপনের সামগ্রিক ব্যবস্থা। সুনির্দিষ্টভাবে বলতে গেলে – “ধর্মীয়, সামাজিক, রাজনৈতিক, আইনি ও সাংস্কৃতিক”[5] – ইসলামের এই পাঁচটি ব্যাপারে মধ্যপন্থীরা বিশেষ মনোযোগ প্রদান করে।

বিশ্বাসের অপরর্তনীয় ও পরিবর্তনীয় ক্ষেত্র: “ধর্মের মৌলিক বিশ্বাস এবং পরিবর্তনযোগ্য বিষয়গুলোর মাঝে ভারসাম্য রয়েছে।”[6] ইসলাম যে নৈতিক কাঠামো দিয়েছে, তারমধ্যে থেকেই কোনো নির্দিষ্ট সমস্যার সমাধান সম্ভব। নির্দিষ্ট কোনো ইস্যুর সমাধান করতে ইজতেহাদ বা ইসলামী আইনশাস্ত্রে যুক্তি বা কাণ্ডজ্ঞানের পুনর্জাগরণ ঘটাতে কারযাভী আহ্বান জানিয়েছেন।

মুসলিম আইনের ঐতিহ্য স্বগত বৈশিষ্ট্য: এটা তৃতীয় মূলনীতির মতোই। মধ্যপন্থীরা “ধর্মীয় হুকুম ও মুসলিম আইনের মাঝে স্পষ্ট পার্থক্য করেছেন।”[7] তারা অবশ্যই কুরআন ও হাদীসের আদেশ-নিষেধগুলো মেনে চলার পক্ষে, কিন্তু অতীতের স্কলাররা যেভাবে সেগুলোকে প্রয়োগ বা অবলম্বন করেছেন তারা তা গ্রহণ করেননি।

নয়া প্রেক্ষিত বিবেচনা: মধ্যপন্থীরাও অদৃষ্টে বিশ্বাস রাখেন, তবে তারা মানবীয় যুক্তি ও ইতিহাসের শিক্ষার উপর বেশি গুরুত্ব দেন। তারা ঐহিত্য দ্বারা প্রভাবিত হওয়া সত্ত্বেও এর সাথে বিচারবুদ্ধিকে সাংঘর্ষিক মনে করেন না। ২০০৩ সালে প্রদত্ত এক খুতবায় কারযাভী এই পাঁচটি মূলনীতিকে ব্যাখ্যা করেছেন এভাবে:

সংস্কার মানে হচ্ছে জ্ঞানী আলেমদের মাধ্যমে ইজতেহাদের পুনঃপ্রবর্তন। তাই আমরা ইজতেহাদের ডাক দিচ্ছি। পূর্ববর্তীদের মতো করেই চিন্তাভাবনা করা আমাদের উচিত হবে না। কারণ আমাদের সমস্যা, প্রয়োজন এবং সময় – এ সবকিছুই তাদের থেকে আলাদা। যারা কয়েক শতাব্দী আগে মৃত্যুবরণ করেছেন তাদের ওপর আমরা আমাদের চিন্তার ভার ছেড়ে দিতে পারি না। ইসলামের মহান ইমামগণ ক্ষেত্রবিশেষে তাদের জীবদ্দশায়ই ব্যক্তিগত মতামত পরিবর্তন করেছিলেন। … তাই বর্তমান যুগ, পরিবেশ এবং জীবনের প্রয়োজনে অবশ্যই আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি পুনর্গঠন করতে হবে। তাই নব্য-রক্ষণশীলরা[8] সংস্কারের নামে যা চাচ্ছে, আমরা তা অগ্রাহ্য করছি।[9]

ক্রমধারার অপরিহার্যতা: মধ্যপন্থীরা আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে ক্রমধারা অবলম্বনকে শ্রেয় মনে করেন। জীবনের সকল দিক সম্পর্কে ইসলাম সঠিক দিকনিদের্শনা প্রদান করতে পারে বলে তারা বিশ্বাস করেন। তবে তারা মনে করেন, “বিদ্যমান যেসব আইন সমাজকে পরিচালনা করছে, তার বিকল্প হিসেবে সমপর্যায়ের ইসলামী আইনের প্রচলন না হওয়া পর্যন্ত সেগুলোকে বাতিল বা স্থগিত করা ঠিক হবে না।”[10]

বিশ্বসভ্যতায় অংশগ্রহণ: “রাজনৈতিক ও সামাজিক কাঠামো সম্পর্কে যথাসম্ভব সতর্ক থেকে অন্যান্য জাতি ও মানুষ থেকে শিক্ষাগ্রহণ করাকে”[11] মধ্যপন্থীরা অনুমোদন করে। বাইরের জ্ঞানকে ইসলামের সাথে সমন্বয় সাধনকে কারযাভী শুধু বৈধই মনে করেননি, বরং তিনি একে করণীয় কর্তব্য হিসেবে বিবেচনা করেছেন। এ প্রসঙ্গে প্রদত্ত এক ফতোয়ায় তিনি লিখেছেন, “মুসলিম জাতি হিসেবে সামগ্রিককভাবে আমাদের অন্যতম দায়িত্ব হচ্ছে অন্যান্যদের ভাষা শেখা। যারা বিজ্ঞান-জ্ঞানের বিভিন্ন শাখায় মুসলমানদের দীনতাকে ‘উপভোগ’ করে, বিশেষ করে তাদের ভাষা শেখা বেশি দরকার।”[12]

কারযাভীকে পাশ্চাত্যের চিন্তাধারার প্রতি স্পষ্টত উদার মনোভাবের মনে হলেও তিনি পাশ্চাত্যকরণের কথা বলেছেন – এমনটা মনে করার কোনো সুযোগ নেই। ইতোপূর্বে উল্লেখিত জুমার খুতবায় তিনি স্পষ্ট বলেছেন, “জাতিকে পাশ্চাত্যকরণ করতে যারা কাজ করছে, তাদের উদ্দেশ্য কখনোই সফল হবে না। তাদের কেউ কেউ এমনও বলে, প্রাচ্য যদি তাদের নবী-রাসূল ও ধর্মগ্রন্থগুলো ত্যাগ করতে পারে, তাহলেই কেবল উন্নতি সম্ভব!”[13] পরবর্তীতে এক সাক্ষাৎকারে তিনি আরো বলেন,

মধ্যপন্থী হওয়া মানে আমাদের অধিকার, পবিত্র স্থানসমূহ, ইসলামের প্রখ্যাত ব্যক্তিত্ব বা সাংস্কৃতিক পরিচয়কে আমরা বর্জন করবো, ব্যাপারটা মোটেও তা নয়। মধ্যপন্থা সম্পর্কে এটি একটি ভুল ধারণা। র‍্যাডিক্যাল, চরমপন্থী ও মৌলবাদী ধারা এবং এর বিপরীতে অবজ্ঞা ও লাগামহীনতা – এই দুই ধারা থেকে মুক্ত থাকাই হলো মধ্যপন্থা। কারণ এ দুটি ধারাই জাতির জন্য হুমকিস্বরূপ। আমরা এমন এক ধরনের মধ্যপন্থার কথা বলছি, যা ইসলামের মূলনীতির প্রতি বিশ্বস্ত থাকে, পাশাপাশি পরিবর্তনশীল বিষয়গুলোকেও বিবেচনায় রাখে।[14]

মধ্যপন্থী ধারার এই দৃষ্টিভঙ্গি থেকে এটা পরিষ্কার যে, ইসলামের অত্যন্ত যুগোপযোগী কাঠামোর দিকেই কারযাভী মানুষকে আহ্বান করছেন। অনুপ্রেরণা নিতে অতীতকে সন্ধান করলেও তিনি মূলত ইসলাম ধর্মের এমন একটি ধারা তৈরি করতে চাচ্ছেন; যা তার সময়কাল তো বটেই, ভবিষ্যতের জন্যেও অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক হবে। এই মধ্যপন্থী মতাদর্শ কারযাভীর জীবনের সর্বত্র গভীর প্রভাব ফেলেছে। নিঃসন্দেহে গণমাধ্যম সম্পর্কে তার দৃষ্টিভঙ্গিকেও এটি প্রভাবিত করেছে।

গণমাধ্যম

ইসলামী চিন্তাজগতে মধ্যপন্থী ধারার বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালনের পর যে ইস্যুকে কারযাভী সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন সেটা হলো গণমাধ্যম। তিনি তালেবান বা সৌদি আরবের স্কলারদের মতো উগ্রপন্থী নন, তবে সতর্ক। গণমাধ্যম মাত্রই ‘ক্ষতিকর’ – তিনি এমনটা মনে করেন না। বরং অনেকক্ষেত্রেই জনসাধারণের কল্যাণে মিডিয়াকে ব্যবহার করা যায় বলে তিনি মনে করেন। এ বিষয়ে প্রদত্ত এক ফতোয়ায় তিনি বলেছেন:

“টিভি, রেডিও, ম্যাগাজিন এবং সংবাদপত্র বিভিন্ন উদ্দেশ্যে ব্যবহৃত হতে পারে। এই মাধ্যমগুলো ভালো বা মন্দ, আইনসঙ্গত কিংবা আইনবিরুদ্ধ – আমরা এ রকম কোনো সংকীর্ণ অর্থ আরোপ করতে পারি না। এটি নির্ভর করছে এ সকল মাধ্যম কী উদ্দেশ্যে ব্যবহৃত হচ্ছে, প্রচারিত অনুষ্ঠানের মান কেমন, কী তথ্য তুলে ধরছে – এসবের উপর। যেমন, একটি অস্ত্র কেউ আল্লাহর রাস্তায় যুদ্ধ করার উদ্দেশ্যে ব্যবহার করতে পারে, আবার কেউ কোনো অন্যায় কাজেও ব্যবহার করতে পারে। … সংক্ষেপে আমি বলতে পারি, টিভি এবং অন্যান্য সকল মিডিয়া ভালো-মন্দ এবং ন্যায়-অন্যায় – উভয়ই তুলে ধরতে পারে। এক্ষেত্রে মুসলমানদের কর্তব্য হচ্ছে পরিস্থিতি বুঝে নিজের বিচার-বিবেচনা অনুযায়ী কাজ করা। টেলিভিশনে যখন ভালো কিছু কিংবা ইসলামসম্মত কোনো আকর্ষণীয় অনুষ্ঠান প্রচার করা হয় তখন কোনো মুসলিম তা দেখতে পারে। অন্যথায় টিভি বন্ধ করে রাখতে পারে।”[15]

তার এ অবস্থানকে যুগান্তকারী কিছু মনে হয় না এবং এটা আসলে তা নয়ও। কারযাভী সমসাময়িক অনেকের আগেই বুঝতে পেরেছিলেন, ইসলাম প্রচারে মিডিয়াকে একটা গুরুত্বপূর্ণ উপায় হিসেবে ব্যবহার করা যেতে পারে। এই উপলব্ধিই কারযাভীকে বিশ্বমঞ্চে তুলে এনেছে। গ্যাডরুইন ক্র্যামারের মতে, “তিনিই প্রথম যিনি মিডিয়ার এই নতুন ধরনের সাথে জড়িত হয়েছেন। এ কারণেই তার প্রজন্মের স্কলারস-কাম-অ্যাক্টিভিস্টের মধ্য থেকে তিনি ব্যতিক্রম।”[16]

১৯৭০ সালে কাতারে প্রথম বেতার কেন্দ্র খোলা হলে কারযাভী তখনই এর মাধ্যমে ধর্মীয় অনুষ্ঠান প্রচার শুরু করেন। কিছুদিন পর কাতারে টেলিভিশন সম্প্রচার শুরু হলে সেখানেও তিনি একই ধরনের অনুষ্ঠানের আয়োজন করেন। শুক্রবার ও রমজানে এই টেলিভিশনে সম্প্রচারিত বিভিন্ন ধর্মীয় অনুষ্ঠানগুলো পুরো মধ্যপ্রাচ্যে ব্যাপক জনপ্রিয়তা লাভ করে। নব্বই দশকের মাঝামাঝি সময়ে কাতার থেকে আল জাজিরা স্যাটেলাইট টেলিভিশন সম্প্রচার শুরু করে। আর ১৯৯৬ সালেই কারযাভী সেখানে ‘শরীয়াহ ও জীবন’ শীর্ষক একটি সাপ্তাহিক অনুষ্ঠান শুরু করেন। এই অনুষ্ঠানটিও ব্যাপক দর্শকপ্রিয়তা লাভ করে। নব্বই দশকের শেষ দিকে কারযাভী দুটি ওয়েবসাইট চালু করেন। ১৯৯৭ সালে www.qaradawi.net এবং ১৯৯৯ সালে www.islamonline.net চালু করেন।[17]

এইসব তৎপরতার মাধ্যমে কারযাভী একজন গতানুগতিক ইসলামী স্কলার থেকে সম্পূর্ণ ভিন্নভাবে নিজেকে উপস্থাপন করেন। তার মতো প্রাজ্ঞ একজন স্কলারের অনুসারী ছাত্র-শিষ্যদের কোনো সার্কেল নেই (a circle of student followers), যা সচরাচর থাকে।[18] এর বিপরীতে বেট্টিনা গ্রেফ দেখান, একটি ‘বিশ্ব ইসলামী সমাজ’[19] গড়ে তোলার লক্ষ্যে কারযাভী কাজ করছেন। এ জন্য তিনি নিজেকে ‘সারা পৃথিবীর মুসলিমদের নির্ভরযোগ্য একজন ধর্মীয় পণ্ডিত’[20] হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে চেয়েছেন।

এই দৃষ্টিভঙ্গি থেকে গ্যাডরুইন ক্র্যামার দেখিয়েছেন, আধুনিক গণমাধ্যম যুগের আগে আসলে কারযাবী এত প্রভাবশালী ও আধুনিক ধর্মীয় ব্যক্তিত্ব কিংবা পণ্ডিত হতে পারতেন না।[21] আরো একধাপ এগিয়ে বলা যায়, কারযাভী নিজেই শুধু আধুনিক নন, তার সমর্থক ও শ্রোতারাও আধুনিক। এই নতুন ‘বিশ্ব ইসলামী সমাজে’ কারযাভীর ধর্মীয় মতামতগুলো কার্যকর করতে কোনো নির্দিষ্ট কোনো প্রক্রিয়া (mechanism) নেই। বরং, তিনি তার অনুসারীদেরকে এর বিপরীত দিকেই আহ্বান জানিয়েছেন। ফলে কারযাভীর অনুসারীরা ধর্মকে অনুসরণের ক্ষেত্রকে নিজেদের মতো করে নিয়েছেন। এটি সম্ভব হয়েছে শিক্ষা ও গণমাধ্যমের কল্যাণে, যা আধুনিকতার অন্যতম অনুষঙ্গ। কারযাভী বিষয়টি বুঝতে পেরেছেন এবং একে কাজে লাগিয়েছেন। কারযাভীর ধর্মীয় মতামতগুলো কার্যকর করার জন্যে এখনো কোনো রাষ্ট্রব্যবস্থা গড়ে না ওঠায় এগুলো বাস্তবায়নের একমাত্র উপায় হলো – তার অনুসারীরাই এসব মতামতের প্রতিনিধিত্ব করবে।

রেফারেন্স ও নোট:

[1] Sagi Polka, “The Centrist Stream in Egypt and its Role in the Public Discourse Surrounding the Shaping of the Country’s Cultural Identity,” Middle East Studies, Vol. 39, No. 3 (July 2003), p. 40.

[2] কারযাভীর সালাফী চিন্তা (এই ধারা সাধারণত সংস্কারপন্থী হয়) এবং ‘আধুনিক সালাফী’ ধারার মধ্যে গ্যাডরুইন ক্র্যামার পার্থক্য করেছেন। “আধুনিক সালাফী ধারা বর্ণিত সূত্রের আক্ষরিক অর্থকে গ্রহণ করে এবং যে কোনো ধরনের অভিযোজন ও নতুনত্বকে প্রত্যাখ্যান করে।” G. Kramer, p. 194.

[3] Polka, p. 42.

[4] Ibid.

[5] Ibid.

[6] Ibid.

[7] Ibid., p. 43.

[8] পাশ্চাত্যের বুদ্ধিবৃত্তিক আন্দোলনকে প্রায়শ নব্য-রক্ষণশীলতা বলে অভিহিত করা হয়। কারযাভী এদিকে ইঙ্গিত করেননি। ইসলামী চিন্তাজগতের যে ধারা রক্ষণশীল চর্চার পুনঃপ্রবর্তন করতে চাচ্ছে, কারযাভী তাদেরকে ইঙ্গিত করেছেন।

[9] BBC Monitoring: Near/Middle East: Round-Up of Friday Sermons 26 Sept 03 (accessed 29 September 2003).

[10] Polka, p. 44.

[11] Ibid.

[12] Yusuf al-Qaradawi, “Learning Language is a Collective Duty,” Islam Online, (22 July 2004), <http://www.islamonline.net/servlet/Satellite?pagename=IslamOnline-English-Ask_Scholar/FatwaE/FatwaE&cid=1119503548814> (accessed 1 July 2007).

[13] BBC Monitoring: Near/Middle East: Round-Up of Friday Sermons 26 Sept 03 (accessed 29 September 2003).

[14] Al-Jazeera Television, “Open Dialogues: Al-Jazeera TV Hosts Cleric al-Qaradawi on ‘Religious Rhetoric,’” (20 November 2004), BBC Monitoring, (accessed 29 November 2004).

[15] Yusuf al-Qaradawi, “Watching TV: Permissible?” Islam Online, (14 January 2004), <http://www.islamonline.net/servlet/Satellite?pagename=IslamOnline-English-Ask_Scholar/FatwaE/FatwaE&cid=1119503544868> (accessed 1 July 2007).

[16] G. Kramer, p. 190.

[17] Ibid., pp. 190-1.

[18] Ibid.,

[19] Bettina Graef, “The International Association of Muslim Scholars: Yusuf al–Qaradawi and the Foundation of a Global Muslim Authority,” ISIM Review 15 (Spring 2005).

[20] Bettina Graef, “How Religion, in the Media, Contributes to the Shaping of Middle Eastern Society,” Unpublished article presented at 5th Annual Media Conference: Religion, Media, and the Middle East, Beirut, 2–5 October 2005 [sent to me by Ms. Graf].

[21] G. Kramer, 193.

আইয়ুব আলী
আইয়ুব আলী
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগে অধ্যয়নরত

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *